কোরআনে মূত্রত্যাগ প্রসঙ্গে

সেদিন লাইভ ভিডিওতে একজন জানতে চাইছিলেন, অমুক ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার মতামত কী, যিনি কোরআনে মুত্রত্যাগ করেছে। আবার আরেকজন আমার ফ্রেন্ডলিস্টে যুক্ত হওয়ার জন্য দাবী করলো, উনি নাকি কোরআনে পায়খানা করেন। তার মানে উনি বোঝাতে চাচ্ছেন, উনি অনেক বড় মুক্তমনা। তাই উনাকে আমার বন্ধু তালিকায় স্থান দিতে হবে!

ব্লগে বা অনলাইন জগতে দীর্ঘ ১২/১৩ বছর লেখালেখির সুবাদে অনলাইনের প্রায় সকল মুক্তচিন্তার মানুষের সাথেই আমার পরিচয় আছে। শুধু যে দেশে তা নয়, বিদেশেরও অনেক মুক্তমনা মানুষের সাথে পরিচয় আছে। পরিচয় হয়েছে রিচার্ড ডকিন্স, আয়ান হিরসি আলীর মত মানুষের সাথে, পিজে মায়ার থেকে শুরু করে ডেভিড সিলভারম্যান, স্টেফেন ল, আরো অনেক বিখ্যাত দার্শনিক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, লেখক। বাঙলাদেশে পরিচয় ছিল প্রথাবিরোধীর লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের সাথে। আরো পরিচয় রয়েছে বিখ্যাত নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিনের সাথে। যেই ব্লগাররা আহত বা নিহত হয়েছেন, তাদের সকলের সাথেই কমবেশী সখ্যতা ছিল আমার। রাজীব শুরুতে সেভাবে নাস্তিক ছিল না, আমার সাথে দীর্ঘদিনের আড্ডা কথাবার্তার পরেই তিনি নাস্তিক হন। বাবু থেকে শুরু করে নিলয়ের মত ব্লগারদের সাথেও আড্ডা দিয়েছি। আড্ডা দিয়েছি অভিজিত অনন্তের মত মানুষদের সাথেও। আরো অনেকের সাথে। অনেকের সাথে হয়তো সেভাবে বন্ধুত্ব এখন আর নেই, কিন্তু প্রায় সবাইকেই চিনি।

তাই এই কথা হলপ করেই বলতে পারি, দেশের অনেক মুক্তচিন্তার মানুষের সাথেই আমার পরিচয় ছিল কিংবা আছে। এই আন্দোলনটি আমরা অনেক শ্রম দিয়ে তিলে তিলে গড়ে তুলেছি। কিন্তু এটা কেমন সময়ে আমরা উপস্থিত হলাম? মুক্তচিন্তা কী এখন কেতাবে মুতামুতি বা পায়খানা করাতে নেমে যাচ্ছে? আমাদের মুক্তচিন্তার আন্দোলনটি কী কোরআনে হাগামুতার আন্দোলন?

অনেককে যেমন চিনি, অনেক নতুন নাস্তিককেও আবার চিনি না। অমুক ব্যক্তিকে যেহেতু আমি চিনি না, তাই সেদিন লাইভ ভিডিওতে আমি কিছু বলতে পারি নি। পরে জেনে দেখলাম, কোন কোন ব্যক্তি কোরআন পোড়াতে চাচ্ছে, কিংবা কোরানে মুত্রত্যাগ করতে চাচ্ছে। নিজেদের মুক্তচিন্তার প্রমাণ হিসেবে তারা কোন কেতাবে হাগামুতাকে বেছে নিয়েছে। কাজটা কী তারা করতে পারে? কিংবা কাজটাকে কী আমি সমর্থন করি কিনা, সেই প্রশ্ন করলেন অনেকে।

এমন যদি হতো, এইসব নতুন ছেলেপেলে মুক্তচিন্তার আন্দোলনে বিশাল কোন অবদান রেখেছে, কোন অত্যন্ত যৌক্তিক লেখা লিখেছে, ধর্মের অত্যন্ত কঠোর সমালোচনা করেছে যুক্তি প্রমাণ রেফারেন্স সহকারে, তাহলে একটা কথা ছিল। কিন্তু এইসব নতুন ছেলেপেলে নিজেদের নাস্তিক বা মুক্তমনা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে, কোরআনে হাগামুতা ছাড়া এদের অন্য কোন কর্মকাণ্ড চোখে পরছে না। বিষয়টা অদ্ভুত! এরা কেনই বা নাস্তিক হচ্ছে, কেনই বা নিজেদের মুক্তমনা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে, জানি না। 

দেখুন, কোন পুস্তকে, তা যেই পুস্তকই হোক, মুত্রত্যাগ করা কিংবা পোড়ানো আমি সমর্থন করি না। সেটা হতে পারে সুকুমার রায়ের কবিতার বই, কিংবা বাইবেল, কোরান। আমার কাছে সুকুমার রায়ের ছড়ার বই যেরকম বই, কোরান হাদিস বাইবেল গীতাও একই রকম। তাহলে? সুকুমার রায়ের বই কী আমি পোড়াবো? না, পোড়াবো কেন? ব্যাটম্যানের কমিকস বইও আমি পোড়াবো না।

প্রতিটা বই সেই সময়ের, সেই কালচার, সেই সময়ের মানুষের জীবনের এক একটি ইতিহাস বহন করছে। কোরআন বাইবেলের মত বইগুলো সেই সময়ের আরব সমাজের মানুষের মন মানসিকতা, অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনীতি ইত্যাদি নানা বিষয় আমাকে বোঝাতে সাহায্য করে। তাই এই বইগুলো আমার কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ বই। তবে তার মানে এই নয় যে, এই সকল বইকে আমি অন্যান্য বইয়ের চাইতে বেশী সম্মান দেবো, বা সম্মানের অধিকারী বলে গণ্য করবো। কিছু মানুষ কোন বইকে ঐশি কেতাব ভাবে, সেটা তাদের সমস্যা। আমার কাছে অন্য দশটা বইয়ের মতই সেটাও একটা সাধারণ বই ছাড়া কিছু নয়। আমি যেই বই ওজু ছাড়াই ধরবো, সেটা আমার টেবিলে অগোছালোভাবে রাখবো, সেটার ওপর আমার চায়ের কাপ, সিগারেটের প্যাকেট কিংবা মোবাইল ফোনটাও রাখবো। তাতে কেউ যদি ক্ষুব্ধ হয়, সেটা তাদের সমস্যা। আমার নয়।

সেই সাথে, কোরআন পোড়ালে কাউকে হত্যা করা যাবে, এরকম ধারণাকেও আমি অত্যন্ত হাস্যকর, নির্বোধ এবং বর্বর বলে মনে করি। যার কোরআন পোড়াতে ইচ্ছা হচ্ছে, সে পোড়াতে পারে। আমার নিজের টাকায় কেনা কোরআনটা আমি পোড়াবো না। বাইবেলও না। এর কারণ এই নয় যে, কেউ এইসব বইকে সম্মানের চোখে দেখে। কারণ এটা যে, এই বইগুলো আমার ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি বোঝার জন্য, জানার জন্য গুরুত্বপুর্ণ।

ডেইলি অসংখ্য লোক এসে আমাকে গালি দিয়ে যায়। আমি সাধারণ একটা ছবি দিলেও কমপক্ষে ৫০ জন মুমিন আমাকে হুমকি দেয়। আমি তাদের পাল্টা হুমকি দিই না, বা গালি দিই না। কারণ নিজেকে আমি তাদের স্তরে নামিয়ে ফেলতে চাই না।

সেই একই ভাবে, কেউ যদি হুমকি ধামকি গালাগালি করে, তার পাল্টা জবাব হিসেবে কোরআন পোড়ানো বা কোরানে পেশাব করার মত বিষয়গুলো কুকুরকে পাল্টা কামড় দেয়ার মত। মনে রাখতে হবে, ধর্মান্ধ মানুষ এক ধরণের অসুস্থতার শিকার। তাদের সাথে যুদ্ধে নেমে তাদের মতই হয়ে গেলে তো আমাদের সাথে তাদের পার্থক্য থাকবে না। তাহলে আমরা কোন হিসেবে নিজেদের উন্নত দাবী করবো?

তাই নতুন নাস্তিকদের কাছে অনুরোধ, আপনারা সময় নিয়ে, ধৈর্য্য নিয়ে দিনের পর দিন আলাপ করতে থাকুন। যুক্তি তুলে ধরুন। তারা গালি দেবে, হুমকি দেবে। অনেক কিছুই করবে। কিন্তু এক সময় তারা পরিবর্তিত হবেই। দীর্ঘদিনের ব্লগিং এবং মুক্তচিন্তার আন্দোলনে এরকম অনেক দেখেছি। অনেক মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম পর্যন্ত গোপনে জানিয়েছে, নাস্তিকদের লেখা পড়ে ধর্ম বিশ্বাস তাদের চলে গেছে। কিন্তু ভয়ে কাউকে বলার সাহস করছে না।

যাইহোক। আমার উত্তর হচ্ছে, আমি কোন বই পোড়াবার, বা বইতে পেশাব করার পক্ষপাতি নই। বই পোড়াবে অন্ধকার আদর্শের মানুষেরা। বই, তা যেমন বই-ই হোক, সেটা মানব জ্ঞানের একটা অংশ। যুগে যুগে বই পুড়িয়েছে মোল্লারা। মুক্তমনারা সবাইকেই বই পড়তে বলে। এমনকি, কোরান বাইবেলও পড়তে বলে। বুঝে।

পোড়াতে নয়।

আর সবচাইতে জরুরি বিষয় হচ্ছে, অনেক মানুষের শ্রম, কষ্ট আর রক্তের বিনিময়ে গড়ে ওঠা মুক্তচিন্তার আন্দোলনকে যেন আমরা কোন পুস্তকে হাগামুতা আন্দোলনে পরিণত না করি। যারা এসব করে হিট হওয়ার চেষ্টায় আছে, যেভাবেই হোক আলোচনায় আসার চেষ্টা করে যাচ্ছে, তারা নিজের স্বার্থে আমাদের আন্দোলনকেই ধ্বংস করতে চাচ্ছে। তাদের সম্পর্কে যেন আমরা সতর্ক থাকি।

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: