৯০ ভাগ মুসলমানের দ্বেষে

আমি ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে জন্মেছিলাম। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে নারীরা নিরাপদ ছিল না, হিন্দুরা নিরাপদ ছিল না, বৌদ্ধরা নিরাপদ ছিল না, চাকমা মারমা সাওতাল আদিবাসীরা নিরাপদ ছিল না, আহমদীয়ারা নিরাপদ ছিল না, খ্রিস্টানরা নিরাপদ ছিল না, ইহুদীরা নিরাপদ ছিল না, নাস্তিকরা নিরাপদ ছিল না, ধর্মনিরপেক্ষরা নিরাপদ ছিল না, সমকামীরা নিরাপদ ছিল না, বাউল সন্যাসীরা নিরাপদ ছিল না, শিশুরা নিরাপদ ছিল না, পাখীরা নিরাপদ ছিল না, পশুরা নিরাপদ ছিল না, লেখক বুদ্ধিজীবীরা নিরাপদ ছিল না, নিরাপদ ছিল না কেউই।

এখন আমি ৯০ ভাগ মানুষের দেশে চলে এসেছি। এই দেশে কেউ ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামায় না। বেশিরভাগ তরুণ তরুণী নামে খ্রিস্টান হলেও একটু কথা বললেই বোঝা যায় বেশিরভাগই নাস্তিক। তারা ধর্ম নিয়ে টাট্টা মশকরায় মেতে ওঠে। রাস্তায় যীশুকে নিয়ে কৌতুকপূর্ণ পোস্টার ছাপিয়ে ধর্মকে পচানো হয়। এই ৯০ ভাগ মানুষের দেশে মুসলমানরা নিরাপদ, নারীরা নিরাপদ, হিন্দুরা নিরাপদ, বৌদ্ধরা নিরাপদ, আদিবাসীরা নিরাপদ, আহমদীয়ারা নিরাপদ, খ্রিস্টানরা নিরাপদ, ইহুদীরা নিরাপদ, নাস্তিকরা নিরাপদ, অজ্ঞেয়বাদীরা নিরাপদ, ধর্মনিরপেক্ষরা নিরাপদ, সমকামীরা নিরাপদ, বাউল সন্যাসীরা নিরাপদ, শিশুরা নিরাপদ, পাখীরা নিরাপদ, পশুরা নিরাপদ, লেখক বুদ্ধিজীবীরা নিরাপদ।

৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে জন্ম নিয়ে আমি দেখেছি, আমাদের মুসলমান পাকি ভাইয়েরা আমাদের ওপর একাত্তরে কী আদরযত্নই না করেছে। সে সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত আমাদের কোটির বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় না দিলে আমাদের কী হতো, ভাবতেই ভয় হয়। সেই আমরাই স্বাধীন বাঙলাদেশে ভারতকে মালাউন দেশ বলে গালি দিই, হিন্দুদের বাড়ি পুড়িয়ে ভারত পাঠিয়ে দিই, আর মুসলমান বলে পাকিস্তানের প্রতি প্রেম আমাদের উতলে উতলে ওঠে। আবার, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাহায্য করার যখন প্রয়োজন হয়, সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাদের ৯০ ভাগ মুসলমান তাতে বেশি আপত্তি করে না। তারা তখন গাঁজা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কী অদ্ভুত হিপোক্রেটের জাত!

আমার অনেক বন্ধুই বলেন, ইউরোপে গিয়ে আমি এখন বড় বড় কথা বলি। যা একেবারেই সত্য নয়। দেশে থাকতেও আমি একই কথাগুলো বলতাম। আমি এইরকমই একটা দেশ হিসেবে বাঙলাদেশকে দেখতে চাইতাম। যেখানে ধর্ম নিয়ে খুনাখুনী হয় না। দিনে পাঁচবার আজান দিতে হয় না। মাইক বাজিয়ে ওয়াজ মাহফিল করতে হয় না। হ্যা, বেশ পরিষ্কারভাবেই তাদের জানাতে চাই, ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে আমি নিরাপদ বোধ করি না, নিরাপদ বোধ করি নি। খোদ মুসলমানরাও ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে নিরাপদ বোধ করেন না। ইহুদী নাসারা নাস্তিক অজ্ঞেয়বাদী সেক্যুলার এই জার্মানিতে, ৯০ ভাগ মানুষের দেশে আমি নিরাপদ বোধ করি। সম্মানিত বোধ করি। আমার সাথে লক্ষ লক্ষ মুসলমানও নিরাপদ বোধ করেন। কারণ এখানে ইসলামের শান্তির আগুন নেই। এই দেশ জন্ম দিয়েছে পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, বিজ্ঞানী, মানবতাবাদীদের। এই দেশ আইনস্টাইনের দেশ, কার্লমার্ক্সের দেশ, বিটোফেনের দেশ, গোয়েথে হাইনে গুণ্টারগ্রাসের দেশ, ইমানুয়েল কান্ট আর নিটশের দেশ, কার্ল ফ্রেড্রিখ গাউস এবং হাইজেনবার্গের দেশ, গুটেনবার্গ আর হেগেলের দেশ। অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেয়া খ্রিস্টান নাৎসিনেতা খলনায়ক হিটলারকেও পৃথিবী দেখেছে, তবে অধিকাংশ জার্মান তাকে ঘৃণা করে।

আমিও আমার দেশকে নিয়ে গর্ব করতে পারতাম। বলতে পারতাম আমার দেশও আরজ আলী মাতুব্বর আর বেগম রোকেয়ার দেশ। লালন ফকির আর রবীন্দ্রনাথের দেশ। শেখ মুজিব আর নজরুলের দেশ। শওকত ওসমান আর প্রীতিলতার দেশ। জাহানারা ইমাম আর আহমদ শরীফের দেশ। শামসুর রাহমান আর জীবনানন্দের দেশ। হুমায়ুন আজাদ আর তসলিমা নাসরিনের দেশ। কিন্তু আমাদের দেশটা হয়ে উঠলো ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ। যেখানে কেউই নিরাপদ না। শান্তির আগুনে সবাই পুড়ে ছারখার।

একদিন আমাদের দেশও ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ থেকে ৯০ ভাগ মানুষের দেশ হয়ে উঠুক। দেশের অমূল্য মেধাগুলোকে যেন দেশ ছেড়ে চলে যেতে না হয়।

Facebook Comments