রোবটের স্রষ্টা থেকে মানুষের স্রষ্টা

ইনবক্স থেকেঃ আপনি একটা রোবট তৈরি করলেন। রোবটটাকে তৈরি করেছেন আনুষাঙ্গিক কাজ করার জন্য।
তো আপনি রোবটটাকে ছাড়লেন কাজ করার জন্য, কন্ট্রোল করার জন্য আপনিই নিজেই যথেষ্ট।
এখন রোবটটা যদি আপনার দিকনির্দেশনা না মানে তো আপনি বা আপনারা কি করবেন?

উত্তরঃ আপনার কী ধারণা, আমি রোবটটাকে লাঠি দিয়ে পাছায় পিট্টি দিবো? হাহ হা হা। আচ্ছা উত্তর দিচ্ছি।

শুরুতে বিবেচনা করা প্রয়োজন, একটি রোবট বানাবার মত মেধা বা যোগ্যতা আমার রয়েছে কিনা। এটি খুবই জরুরি এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়। আমার বুদ্ধিমত্তার মানের ওপর নির্ভর করে আমি কী করবো।

আমার ভাগনে যখন ছোট ছিল, তার একটা খেলনা ছিল। খেলনাটি তার মাথায় একবার জোরে লাগে, এবং সে খুব ব্যাথা পায়। এরপরে সে রেগেমেগে খেলনাটাকে মারা শুরু করে। এরপরে যখনই সে ব্যাথা পেতো, চেয়ার টেবিল কিংবা মেঝেতে, সে ব্যাথা পেলেই সেইগুলোকে মারতে থাকতো। কিন্তু একটা খেলনাকে, কিংবা চেয়ার টেবিলকে মেরে কী লাভ? বিষয়টা অল্প বুদ্ধিমত্তার মানুষ হিসেবে সে বুঝতো না। ভাবতো, ঐগুলোকে মারলেই তারা আর ব্যাথা দেবে না। বস্তুত পক্ষে, ব্যাথা সে পেতো নিজের দোষেই।

আপনি নিম্নবুদ্ধিমত্তার যেকোন প্রাণির ভেতরে বিষয়টি লক্ষ্য করবেন। হয়তো একটা গাছের ডাল থেকে সে ব্যাথা পেয়েছে, সে তেড়েমেড়ে গাছটিকে আক্রমণ করে বসবে। এরকম ঘটনা আপনি একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন।

যাইহোক। পুরনো কথায় ফিরে আসি। ধরুন, আপনি একটি রোবট তৈরি করার মত যথেষ্ট মেধাবী এবং বুদ্ধিমান কীনা। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ, বা একটি শিশু, বা একটি অশিক্ষিত স্বল্পবুদ্ধিমত্তার মানুষ যদি একটা বৈঠা তৈরি করে, পরে দেখা যায়, বৈঠাটি দিয়ে ঠিকভাবে নৌকা চালানো যাচ্ছে না, তারা রেগেমেগে হয়তো বৈঠাটিকে কিছুক্ষণ মারবে, কিছুক্ষণ দা দিয়ে কোপাবে, কিছুক্ষণ লাত্থি দেবে, কিছুক্ষণ ঘুষি মারবে, কিছুক্ষণ আগুনে পোড়াবে। অর্থাৎ রাগ ঝাড়বে। কারণ হচ্ছে, বৈঠাটিকে তিনি যেই উদ্দেশ্যে বানিয়েছিলেন, সেই উদ্দেশ্যটি সফল হয় নি। বৈঠাটি দিয়ে সে একটা কাজ করবে ভেবেছিল, কাজটি হচ্ছে না। তার উদ্দেশ্য সফল হয় নি। চাহিদা পূরণ হয় নি। তার একটি আক্ষেপ থাকবে, বৈঠাটি কাজ না করায়। সে ভাববে, এত পরিশ্রম করে বানালাম, একটা বিশেষ কাজের জন্য, অথচ কাজটি হচ্ছে না।সেই আফসোসের কারণেই সে এরকম হয়তো করবে।

কিন্তু ধরুন, খুব দারুণ বুদ্ধিমত্তার একজন, মনে করি আইন্সটাইন বা স্টিফেন হকিং এর মত একজন মানুষ। তিনি একটি রোবট বানালেন। উনি রোবটটি বানালেন বাসার কাজ করার জন্য। কিন্তু দেখা গেলো, রোবটটি ঠিকভাবে কাজ করছে না। সেই বুদ্ধিমান মানুষটি যা করবেন, তা হচ্ছে, পুরো রোবটটিকে আবার প্রোগ্রাম করবেন। তিনি বুঝে যাবেন, উনার প্রোগ্রামিং এ নিশ্চিতভাবেই কোন গণ্ডগোল ছিল। সেই কারণেই রোবটটি ঠিকভাবে কাজ করতে পারে নি। এখানে রোবটের দোষ দিয়ে রোবটকে কিলঘুষি মারা বা আগুনে পোড়ানো খুবই হাস্যকর এবং শিশুতোষ কাজ বলেই উনার কাছে মনে হবে। বুদ্ধিমত্তার উন্নতির সাথে সাথে, উনার সেন্সেরও পরিবর্তন হবে। রোবটটিকে ধরে কিছুক্ষণ পেটালে যে আসলে কোন লাভ নেই, উনি সেটা সহজেই বুঝবেন।

এবারে ধরুন, যিনি রোবটটি বানাচ্ছেন, তিনি অসীম বুদ্ধিমত্তার একজন।
এবং রোবটটির কাছ থেকে উনার কোন প্রত্যাশা বা চাহিদা নেই। মানে হচ্ছে, যিনি অসীম বুদ্ধিমত্তার স্রষ্টা, যিনি স্বয়ং সম্পূর্ণ, যিনি চাইলেই সবকিছু করতে পারেন, তার কোন চাহিদা, আকাঙ্খা, মনের খায়েশ, এগুলা কিছুই থাকতে পারে না। কারণ তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই করতে পারেন। তার মনে যদি এরকম কোন ইচ্ছা, খায়েশ, আকাঙ্খা থাকে যে, রোবটটি তার পিঠ টিপে দেবে, বা পায়ে তেল মালিশ করবে, তাহলে তিনি আর স্বয়ং সম্পূর্ণ নন বলেই গণ্য হবেন। কারণ তিনি তাহলে পায়ে তেল মালিশের জন্য, বা পিঠ টিপে দেয়ার জন্য, বা বাসার কাজ করার জন্য রোবটটির কাছে মুখাপেক্ষী হয়ে যান। অসীম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ং সম্পূর্ণ কারোর এরকম মুখাপেক্ষী হওয়ার কথা নয়।

এখন যদি দেখা যায় যে, সেই রোবটটির স্রষ্টা একই সাথে স্বয়ং সম্পূর্ণ এবং অসীম বুদ্ধিমত্তার বলে নিজেকে দাবী করছে, নিজেকে সর্বশক্তিমান বলে দাবী করছে, এবং একই সাথে সে রোবটটিকে হুমকি দিচ্ছে এই বলে যে, তার কথা অনুসারে কাজ না করলে রোবটটিকে অনন্তকাল আগুনে পোড়াবে, এবং একই সাথে, মনে মনে কামনা করছে যে, রোবটটি দিনে পাঁচবার তার পায়ে তেল মালিশ করে দেবে, তেল মালিশ না করলেই রেগেমেগে সে অভিশাপ দেয়া শুরু করছে, তখন বুঝতে হবে, কোন গণ্ডগোল রয়েছে।

কারণ একই সাথে, সেরকম স্রষ্টার স্বয়ং সম্পূর্ণ, অসীম বুদ্ধিমত্তার, হুমকিবাজ, পায়ে তেল মালিশের জন্য রোবটের প্রতি চাহিদা সম্পন্ন, মনের খায়েশওয়ালা, এবং নিম্নবুদ্ধিমত্তার শিশুদের মত রোবটটিকে আগুনে পোড়াবার মন মানসিকতা সম্পন্ন হতে পারে না।

লজিক্যালি এগুলো একটি আরেকটির সাথে কনফ্লিক্ট করে।

Facebook Comments

2 thoughts on “রোবটের স্রষ্টা থেকে মানুষের স্রষ্টা

  • June 11, 2018 at 11:54 am
    Permalink

    acceptable status

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: