একজন প্রবাসী উন্মাদের গল্প

সেদিন ফেসবুকে একটা ভাইরাল ভিডিও দেখলাম। ভিডিও তে দেখলাম Kamrul Zaman নামে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত একজন বাঙালী প্রবাসী আমাদের দেশের একজন ভদ্রমহিলাকে যাচ্ছেতাই বলে গালাগালি করছেন, তাও নাকি প্রতিবাদ স্বরূপ! তো কিসের প্রতিবাদ? কারণ ভদ্রমহিলা একটি টক শো তে বলেছেন, চারপাশে এতো বোরখা পরা নারীর মাঝে শুধু তিনিই বাঙালী কারণ তিনি শাড়ি পড়েন। তিনি আরও বলেন, যারা শুধু চোখ খোলা রেখে পুরো শরীর বোরখায় আবৃত করে রাখেন তারা আর যাইহোক বাঙালী হতে পারেন না। অর্থাৎ ভদ্রমহিলা মনে করেন, বাঙালী পরিচয়ের জন্য বাংলা সংস্কৃতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। আরব্য বর্বরদের সংস্কৃতি অনুসরণ করে বাঙালী হওয়া যায় না।

প্রথমে ভদ্রমহিলার মতামত সম্পর্কে কিছু মন্তব্য রাখি। আমি পর্দার বিধান সমর্থন করিনা কারণ সেটা নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপিত করে, মানুষ হিসেবে নয়। শুধু চোখ খোলা রেখে নিকাব পরা আরও আগে সমর্থন করিনা কারণ সেটা নারীকে ছদ্মবেশধারী হিসেবে উপস্থাপিত করে, মানুষ হিসেবে নয়। জামা কাপড় পরিধান করা উচিৎ নিজেকে সাজানোর জন্য, উপস্থাপনের জন্য। সন্ত্রাসদের মতো ছদ্মবেশ ধারণ করার জন্য নয়। তাছাড়া বোরখা হিজাব ইত্যাদি চয়েস হিসেবে খুব কম নারী পরিধান করে। বেশিরভাগ নারী পর্দা করে জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে বাঁচাতে। অর্থাৎ ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক নারীকে বাধ্য হতে হয় পর্দা করতে। জাহান্নামের ভয় দেখিয়ে নারীকে এভাবে পর্দা করতে বাধ্য করাও সমর্থনযোগ্য নয়। তবে কেউ স্বেচ্ছায় পর্দা করতে চাইলে বা স্বেচ্ছায় অন্ধত্ব বেছে নিলে সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার। আমাদের দেশের একজন নারী যদি আরব্য সংস্কৃতি ভালবাসে বা অনুসরণ করে তাহলে যে সে অবাঙালী হয়ে যায় তা আমি বিশ্বাস করিনা। আমি যদি ধূতি পাঞ্জাবীর বদলে প্যান্ট টিশার্ট পরিধান করে বাঙালী হতে পারি তাহলে একজন নারীও বোরখা পরিধান করে বাঙালী থাকতে পারে। হয়তো ভদ্রমহিলা বুঝাতে চেয়েছেন, বোরখা হিজাব নিকাবের আড়ালে একজন বাঙালী নারীর রূপ আজ হারিয়ে গেছে! যাইহোক, তিনি তার মতামত প্রকাশ করেছেন যা করার স্বাধীনতা তিনি রাখেন।

একজন স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ সভ্য ভাবে নিজস্ব মত প্রকাশ করার পূর্ন স্বাধীনতা রাখেন। সবার মতামত ভালো লাগবে না সেটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কারো মতামত যুক্তিযুক্ত হবে এবং ভালো লাগবে। আবার, কারো মত ভালো লাগবে না। যদি কারো বক্তব্য বা কোনো মন্তব্য ভালো না লাগে তাহলে কি করা উচিৎ? অশ্রাব্য ভাবে গালাগালি করা নাকি সভ্য মানুষের মতো যুক্তিগত সমালোচনা করা? অবশ্যই একজন মানুষ হিসেবে আপনার উচিৎ সভ্য আচরণ করা। অবশ্যই উচিৎ নয় অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে নিজেকে মূর্খ প্রমাণ করা। ঘেউঘেউ রাস্তার কুকুর করলেই মানায়! মানুষ পাগল কুকুরের মতো আচরণ করলে মানুষ আর কুকুরের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। কামরুল জামান নামের সেই প্রবাসী ঠিক রাস্তার পাগল কুকুরের মতোই আচরণ করে নিজেকে পাগল কুকুরের চেয়েও অধম প্রমাণ করেছেন।

টক শো তে ভদ্রমহিলা বাঙালী সংস্কৃতির পক্ষে কথা বলায় প্রবাসী লোকটি তাকে নাস্তিক বলে দাবি করেন। যদিও আমি জানি না সে আসলেই নাস্তিক নাকি আস্তিক। নাস্তিক হলেও সেটা এখানে প্রাসঙ্গিক ছিল না। ভিডিও তে লোকটি জোর গলায় বলেন, “তোর মতো নাস্তিক বাংলাদেশে এখনো আছে কি করে! তোর হায়াৎ বেশিদিন নাই! তোর মতো নাস্তিক বোল্ড আউট করার জন্য বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ আছে! তোর মতো অনেক নাস্তিককে বোল্ড আউট করা হয়েছে!” সত্যি আমি প্রথমে থমকে গিয়েছিলাম শব্দ গুলা শুনে। কারো সামান্য দ্বিমত সহ্য করতে না পেরে মানুষ কতো বর্বর আচরণই না করতে পারে! কারো সামান্য দ্বিমত সহ্য করতে না পেরে মানুষ তাকে হত্যা করতে চায়, অন্যকে উস্কে দেয় হত্যা করতে। সবচেয়ে বেশি অবাক হওয়া লাগে তখন যখন দেখি হাজার হাজার মানুষ এধরণের পশুতুল্য আচরণ, এধরণের সন্ত্রাসবাদী বক্তব্য সমর্থন করছে! লোকটির ঘেউঘেউ স্বরূপ বক্তব্যে পরিষ্কার ভাবেই প্রকাশ পেয়েছে যে তিনি সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করেন। তিনি হুমায়ুন আজাদ স্যারের ওপর হওয়া হামলা সমর্থন করেন, তিনি রাজীব হায়দারের হত্যাকারীদের সমর্থন করেন, তিনি আসিফ ভাইয়ার ওপর হওয়া হামলা সমর্থন করেন, তিনি অভিজিৎ স্যারের হত্যাকারীদের সমর্থন করেন, তিনি অনন্ত বিজয় দাশের হত্যাকারীদের সমর্থন করেন। তার বক্তব্যে পরিষ্কার ভাবেই প্রকাশ পেয়েছে নাস্তিকদের হত্যা করা তিনি মুসলমানের অধিকার মনে করেন। না না একে তারা সন্ত্রাসবাদ মনে করেন না, নিজেদের অধিকার মনে করেন। সভ্য মানুষের চোখে কারো অবিশ্বাসের জন্য বা দ্বিমতের জন্য তাকে হত্যা করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হলেও কামরুল জামানের মতো মূর্খ বর্বরদের চোখে তা সাহসিকতার কাজ! তিনি চান মুসলিমরা দেশের সকল নাস্তিকদের ধরে ধরে হত্যা করুক, তাই তিনি বলেছেন, “তোর মত নাস্তিক এখনো দেশে আছে কি করে?” দুঃখজনক হলেও আপনার মেনে নিতে হবে যে, সন্ত্রাসবাদে উস্কানিদাতা এসব উন্মাদদের মতাদর্শ অনুসরণ করে দেশের কোটি কোটি মানুষ যারা নিজেদেরকে শান্তিপ্রিয় বান্দা মনে করেন। এদেশে মোশারফ করিমের স্বচ্ছ চিন্তা গ্রহণ করার মানুষ সংখ্যায় সামান্য অথচ কুকুরের মতো ঘেউঘেউ সমর্থন করার মানুষ অগণিত! ভাবা যায় কোথায় যাচ্ছে আমাদের দেশ? কোথায় যাচ্ছি আমরা? দেশ তাদের দখলে চলে যাচ্ছে যারা সভ্যতা অসভ্যতার মানেই বুঝে না! যারা সহিংসতাকে শান্তি প্রতিষ্ঠা মনে করে! যারা আপনার মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে নিজেদের মূর্খ মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে চায়!

তিনি ভিডিও তে আরও বলছিলেন, “বাংলাদেশ নাস্তিকদের দেশ নয়, বাংলাদেশ ৯০% মুসলিমের দেশ। বাংলাদেশে নাস্তিকদের কোনো জায়গা নেই!” এসব কথা শুনতে অদ্ভুতও লাগে আবারও হাসিও পায়। হাসি পায় কারণ এসব মৌলবাদীরা সাধারণত মানসিক ভাবে পিচ্চি বাচ্চাদের মতো হয়। পিচ্চি বাচ্চারা যেমন বলে এটা আমার খেলনা, তুই ধরবি না। তেমনি মৌলবাদীরাও বলে এটা মুসলমানদের দেশ, এদেশে নাস্তিকদের জায়গা নেই। বাংলাদেশ মুসলমানের দেশও না, নাস্তিকদের দেশও না। সহজ হিসাব বাংলাদেশ হলো বাঙালীর দেশ। এখন বাঙালী মুসলিমও হতে পারে আবার নাস্তিকও হতে পারে। বিশ্বাস অবিশ্বাস সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্বাস অবিশ্বাসের স্বাধীনতা আছে। বিশ্বাস অবিশ্বাস জোর করে পাওয়া যায় না। কেউ অবিশ্বাস করলে তাকে জোর করে বিশ্বাস করানো যাবে না আবার, কেউ বিশ্বাস করলে তাকে জোর অবিশ্বাস করানো যাবে না। একজন বিশ্বাসীর যেমন অধিকার আছে তার বিশ্বাসের পক্ষে কথা বলার, তেমনি একজন অবিশ্বাসীও তার অবিশ্বাসের পক্ষে কথা বলার অধিকার রাখে। যারা বিশ্বাস অবিশ্বাসের ওপর জোর করে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে শুধু নিজেরাই কথা বলতে চায় তারা আর যাইহোক “মানুষ” শব্দটার যোগ্য নয়। সেরকমই একজন প্রবাসী উন্মাদ কামরুল জামান যিনি একজন নারীকে জুতা দিয়ে মারতে চেয়েছেন শুধুমাত্র তার বক্তব্য ভালো লাগে নি বলে! কতো টা অসুস্থ মস্তিষ্কের হলে একজন নারীকে বলা যায়, তোকে রাস্তার কুকুরও লাগাবে না?

ভদ্রমহিলা বাঙালী সংস্কৃতি অনুসরণ করতে বলেন নিজেদের পরিচয় রক্ষার্থে। বাঙালী সংস্কৃতি অনুসরণ করে শাড়ী পরিধান করা কি অশ্লীলতা? যদি না হয় তাহলে কিভাবে শাড়ী পরার কথা অশ্লীলতার শিক্ষা হয়? আসলে অশ্লীলতা বাস করে কামরুল জামানের মতো মূর্খদের মস্তিষ্কে যারা বোরখা ছাড়া নারীকে উলঙ্গ দেখে! সেজন্য বোরখা পরিধান না করা তাদের চোখে অশ্লীলতা। সমস্যা হলো, ইসলামিক দেশে বাস করতে করতে দেশের অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিতদের ভেতর থাকা অশিক্ষা কুশিক্ষা আরও জাগ্রত হয়! জাগ্রত হয় নারী বিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবিরুদ্ধ মনোভাব! আর নিজেদের মূর্খতাকে বোধবুদ্ধি ভেবে তা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এসব সন্ত্রাসবাদীদের কাছ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হবে কবে?

Facebook Comments

Marufur Rahman Khan

Atheist, Feminist

One thought on “একজন প্রবাসী উন্মাদের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: