বিজ্ঞান বলছে, মেয়েরা জিন্স পরলে সন্তান হিজড়া হতে পারে! – আরিফ আজাদ

সাজিদের কাছে একটি মেইল এসেছে সকালবেলা। মেইলটি পাঠিয়েছে তার নাস্তিক বন্ধু সুশান্ত ধর। সুশান্ত দা’কে আমিও চিনি। সদা হাস্য এই লােকটার সাথে মাঝে মাঝেই টি.এস.সিতে দেখা হতাে। দেখা হলেই উনি একটি হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন,- ‘তুই কি এখনাে রাতের বেলা ভূত দেখিস?’ সুশান্ত দা মনে হয় হাসিটি প্রস্তুত করেই রাখতাে। দেখা হওয়া মাত্রই প্রদর্শন। সুশান্ত দা’কে চিনতাম সাজিদের মাধ্যমে। সাজিদ আর সুশান্ত দা একই ডিপার্টমেন্টের। সুশান্ত দা সাজিদের চেয়ে দু ব্যাচ সিনিয়র। সাজিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যে প্রথমে নাস্তিক হয়ে গিয়েছিলাে, তার পুরাে ক্রেডিটটাই সুশান্ত দা’র। সুশান্ত দা তাকে বিভিন্ন নাস্তিক, এ্যাগনােষ্টিকদের বই-টই পড়িয়ে নাস্তিক বানিয়ে ফেলেছিলাে। সাজিদ এখন আর নাস্তিক নেই।
আমি ক্লাশ শেষে রুমে ঢুকে দেখলাম সাজিদ বরাবরের মতােই কম্পিউটার গুতাচ্ছে। আমাকে দেখামাত্রই বললাে,- ‘তাের দাওয়াত আছে।’
– ‘কোথায়?’- আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সাজিদ বললাে, ‘সুশান্ত দা দেখা করতে বলেছেন।’ আমার সাথে উনার কোন লেনদেন নেই। আমাকে এভাবে দেখা করতে বলার হেতু কি বুঝলাম না।
সাজিদ বললাে, ‘ঘাবড়ে গেলি নাকি? তােকে একা না, সাথে আমাকেও।’
এই বলে সাজিদ সুশান্ত দা’র মেইলটি ওপেন করে দেখালাে। মেইলটি হুবহু এরকমঃ
‘সাজিদ, আমি তােমাকে একজন প্রগতিশীল, উদারমন সম্পন্ন, মুক্তোমনা ভাবতাম। পড়াশুনা করে তুমি কথিত ধর্মীয় গোঁড়ামি আর অন্ধ বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে এসেছিলে। কিন্তু তুমিও সেই ধর্মীয় অন্ধত্ব এবং মৌলবাদের কাছে আত্মসমর্পন করলে। তুমি যে আবার সেই অন্ধ বিশ্বাসের জগতে ফিরে যাবে- সেটা কল্পনাও করিনি আমি। আজ বিকেলে বাসায় এসো। তোমার সাথে আলাপ আছে।

আমরা খাওয়া-দাওয়া করে, দুপুরের নামাজ পড়ে সুশান্ত দা’র সাথে দেখা করার জন্য বের হলাম। সুশান্ত দা আগে থাকতেন ইস্কাটন, এখন থাকেন কাঁটাবন। জ্যাম-ট্যাম কাটিয়ে আমরা যখন সুশান্ত দা’র বাসায় পৌঁছি, তখন আসরের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। সুশান্ত দা’র সাথে তার গার্লফ্রেন্ড নন্দিতা বসে আছে। নন্দিতার পরণে টিশার্ট এবং নীল জিনস। আমরা নন্দিতা আপুকে আদাব দিলাম। উনিও উত্তরে আদাব দিলেন। সুশান্ত দা’র সাথে হ্যান্ডশেক করে আমরা বসলাম না।
.
সাজিদ বললো,- ‘দাদা, আলাপ একটু পরে হবে। আসরের নামাজটা পড়ে আসি আগে।’
.
সুশান্ত দা না করলেন না। আমরা বেরিয়ে গেলাম। পার্শ্ববর্তী মসজিদে আসরের নামাজ পড়ে ব্যাক করলাম উনার বাসায়।
.
সুশান্ত দা ইতোমধ্যেই কফি তৈরি করে রেখেছেন। খুবই উন্নতমানের কফি। কফির গন্ধটা পুরো ঘরময় ছড়িয়ে পড়লো মূহুর্তেই।
.
সাজিদ কফি হাতে নিতে নিতে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো,- ‘জানিস, সুশান্ত দা’র এই কফি বিশ্ববিখ্যাত। ভূ-মধ্য সাগরীয় অঞ্চলের কফি। এইটা কানাডা ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। সুশান্ত দা কানাডা থেকে অর্ডার করিয়ে আনেন।’
.
কফির কাপে চুমুক দিয়ে মনে হলো আসলেই সত্যি। এত ভালো কফি হতে পারে-ভাবাই যায় না।
.
সাজিদ এবার সুশান্ত দা’র দিকে তাকিয়ে বললো,- ‘আলাপ শুরু হোক।’
.
সুশান্ত দা’র মুখে সদা হাস্য ভাবটা আজকে নেই। উনার পরম শিষ্যের এরকম অধঃপতনে সম্ভবত উনার মন কিছুটা বিষন্ন। তিনি বললেন,- ‘তোমার সিদ্ধান্তের প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে। তবে, তোমাকে একটি বিষয়ে বলার জন্যই আসতে বলেছি। হয়তো তুমি ব্যাপারটি জেনে থাকবে-তবুও।’
সাজিদ কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললো,- ‘জানা বিষয়টাও আপনার মুখ থেকে শুনলে মনে হয় নতুন জানছি। আমি আপনাকে কতোটা পছন্দ করি তা তো আপনি জানেনই।’
.
সুশান্ত দা কোন ভূমিকায় গেলেন না। সরাসরি বললেন,- ‘ওই যে, তোমার সৃষ্টিকর্তা, উনার ব্যাপারে বলতে চাই। তুমি বিজ্ঞানের ছাত্র, তুমি হয়তো এ ব্যাপারে জানো। তুমি কী আসলেই মনে করো, মেয়েদের খৎনা করা একটি অসম্ভব বর্বর প্রথা নয়?
.
সাজিদ বললো,- ‘অদ্ভুত তো। তাহলে তো আমাকে আবার নাস্তিক হয়ে যেতে হবে দেখছি। হা হা হা হা।’
.
সাজিদ চমৎকার একটা হাসি দিলো। সাজিদ এইভাবে হাসতে পারে, তা আমি আজই প্রথম দেখলাম। সুশান্ত দা সেদিকে মনোযোগ দিয়েছেন বলে মনে হলো না।
.
উনি মোটামুটি একটা লেকচার শুরু করেছেন। আমি আর সাজিদ খুব মনোযোগি ছাত্রের মতো উনার বৈজ্ঞানিক কথাবার্তা শুনছিলাম। তিনি যা বোঝালেন, বা বললেন, তার সার সংক্ষেপ এরকম।-
.
” ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা বিজ্ঞান বিরোধী। সভ্যতা এবং মূল্যবোধ বিরোধী। এই যে, কিছুদিন আগেই এক ইসলামি মোল্লা দাবী করলো, ভূমিকম্পের কারণ নাকি মেয়েদের শর্টস আর কম জামাকাপড়। চিন্তা করতে পারো? কতটা অবৈজ্ঞানিক মূর্খ চিন্তাভাবনার হলে এরকম কথা বলতে পারে? আবার সেদিন আরেক মোল্লা দাবী করলো, মেয়েরা জিনস পড়লে নাকি সন্তান হিজড়া হয়। কত বর আহাম্মক এই মোল্লারা। তারা বিজ্ঞানের কী বোঝে? ”
.
সাজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে লম্বা একটি নিঃশ্বাস নিলো। যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। আমরা সবাই চুপ করে সাজিদের দিকে তাকিয়ে আছি। যেন পিনপতন নীরবতা চারিদিকে।
.
এমন সময় সাজিদ মুখ খুললো।
.
সাজিদ বললো,- ‘ আসলেই অদ্ভুত এইসব ইসলামই মোল্লারা। কিন্তু একই কথা যখন বিজ্ঞানীরা বলেন, তখন আপনারা সেগুলো মেনে নেন কীভাবে? আপনারা কী বিজ্ঞানে অন্ধ বিশ্বাসী?
.
সুশান্ত দা বললেন,- ‘ বিজ্ঞান কবে বলেছে ভূমিকম্পের কারণ মেয়েদের পোশাক কিংবা জিনস পড়লে হিজড়া সন্তান হয়?
.
সাজিদ বললো,- ‘ আমি বলছি না। ভারতের বিখ্যাত একজন বিজ্ঞানী বলছেন এরকম কথা। কেরালাম কাসারাগড়ের অধ্যাপক ডক্টর রজিত কুমার বলেছেন, মেয়েদের জিনস পড়ার সাথে হিজড়া সন্তান হওয়ার সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তিনি পেয়েছেন। এমনকি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গবেষণাগার নাসা পর্যন্ত মহাকাশে জিনস পড়া নিষিদ্ধ করেছে। কেন করেছে?

মেয়েদের জিনস
যুগান্তর মেয়েদের জিনস

যুগান্তরের এই নিউজটি কী ধর্মান্ধ ইসলামি মোল্লারা প্রকাশ করেছে, নাকি সেক্যুলার মিডিয়াই প্রকাশ করেছে? অধ্যাপক ডক্টর রজিত কুমার কী ধর্মান্ধ ইসলামি মোল্লা?

সুশান্ত দার চেহারা ততক্ষণে কালো হয়ে গেছে। যেন কিছুতেই নিজের পুরনো শিষ্যের কাছে এরকম পরাজয় মেনে নিতে পারছিলেন না। আসলেই তো, বিজ্ঞানই যখন বলছে মেয়েদের জিনস পড়া খারাপ, সেখানে ইসলাম বিদ্বেষীরা শুধু মোল্লাদের দোষ কেন দেয়? বিজ্ঞানকে তো আর অস্বীকার করা যায় না।

সাজিদ বলতে থাকল,- ‘ আগে জানা দরকার, মানুষ হিজড়া কেন হয়।

সন্তানের লিঙ্গ

ছেলেদের লিঙ্গ নির্ধারনের ক্রোমোজোম xy আর মেয়েদের xx । জন্মের আগে মায়ের পেটে আমাদের ক্রোমোজোম বিন্যাসের সময় বিচিত্র কারণে কিছু গোলযোগ হয়ে যায়। বিশেষ করে লিঙ্গ নির্ধারনকারী ক্রোমোজোমে এই গোলযোগ হলে xx বা xy না হয়ে xxy বা xxx বা x0 বা xyy এরকম হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা ৫ ধরণের ক্রোমোজোমাল অস্বাভাবিকতা চিহ্নিত করেছেন এরকম হিজড়া হবার জন্য। সেগুলো হল Androgen Insensitivity Syndrome; Klinefelter Syndrome; Turner Syndrome; Congenital Adrenal Hyperplasia এবং Ovotestis। আবার এধরনের অনেক রোগীর দেহের বিলিয়ন বিলিয়ন কোষের অর্ধেকে xx এবং বাকি অর্ধেকে xy ক্রোমোজোম থাকে। এদের জিন বিন্যাসকে মোজাইক জেনেটিক্স বলে। এ ধরণের রোগ নিয়ে জন্মালে কিছু অদ্ভুত জিনিস দেখা যায়। হয়তো জন্মের পরে মানুষটির দেহ দেখতে হবে মেয়ের মত কিন্তু এর জননাঙ্গ হবে ছেলেদের মত যা ১০/১২ বছর পরে অদ্ভুত ভাবে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে হতে স্ত্রী অঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে মানুষটা পুরাই মেয়ে হয়ে যাবে অথবা জন্মের সময় ছেলের মত হয়ে গঠন হয়ে জননাঙ্গ হবে মেয়ের মত যা পরে ছেলেদের মত হয়ে যাবে অথবা এদের কোনটাই না হয়ে অদ্ভুত এক প্রকারের জননাঙ্গ নিয়ে জন্ম হয় যা পুরুষাঙ্গও না স্ত্রী-অঙ্গও না। একে Ambiguous Genitalia বলে। এই জননাঙ্গ পরবর্তিতে হয়ত পুরোপুরি ছেলেদের মত বা পুরোপুরি মেয়েদের মত হয়ে যাবে। তবে ছেলে বা মেয়ে যাই হোক না কেন এদের প্রজনন ক্ষমতাহীন হবে। কিন্তু এ ধরণের ঘটনা পশু পাখিতে বা উদ্ভিদে হলে এরা সম্পূর্ণ প্রজননক্ষম হয়। এটা মানুষের সাথে তাদের পার্থক্য। তাই বর্তমানে মানুষের ক্ষেত্রে এদের Intersex ও না বলে Disorder of Sexual Development (DSD) বলছেন জিন বিজ্ঞানীরা।

আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, জিনস পড়া মেয়েদের জন্য ক্ষতিকর। কারণ জিনস পড়লে কিছু বিচিত্র শারীরিক সমস্যার দেখা দেয়, যার একটি হল শরীরে রক্ত চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি। নিচের লিঙ্কগুলো চেক করুন, কোন ইসলামি মৌলবাদী ধর্মান্ধদের ছাপানো খবর না, একদম জেনুইন সেক্যুলার ইহুদী নাসারাদের মিডিয়ার খবর। আপনারা তো আবার ইহুদী নাসারাদের খবর ছাড়া আর কিছু পড়েন না।

বিবিসি নিউজ
এক্সপ্রেস

জিনস পড়ার সমস্যা
মেয়েদের জিনস
বিবিসি মেয়েদের জিনস

.

মাগরিবের আজান পড়তে শুরু করেছে। সুশান্ত দা’কে অনেকটাই হতাশ দেখলাম। আমরা বললাম,- ‘আজ তাহলে উঠি?’
.
উনি একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,- ‘এসো।’
.
আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমি অবাক হয়ে সাজিদের দিকে তাকিয়ে আছি। কে বলবে এই ছেলেটা গত ছ’মাস আগেও নাস্তিক ছিলো। নিজের গুরুকেই কি রকম কুপোকাত করে দিয়ে আসলো। আজকে এটা সাজিদ যখন সুশান্ত দা কে বুঝাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল গুরু তার শিষ্যকে বুঝাচ্ছে। গর্ব হতে লাগলো আমার।
.
কিছুদিন পরে জানলাম, সুশান্ত দার গার্লফ্রেন্ড নন্দিতা জিনস পড়া ছেড়ে দিয়েছেন। এখন থেকে উনি শুধু হিজাব এবং ইসলামি পোশাকই পড়েন, হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও। এই কথাটি সাজিদকে বলতেই, সে বলে উঠলো, কোন নারীই জেনেবুঝে হিজড়া সন্তান জন্ম দিতে চায় না। সকল প্রশংসাই আল্লাহর। আলহামদুলিল্লাহ!

Facebook Comments

আরিফ আজাদ

আরিফ আজাদ। জন্মেছেন চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার সময় থেকেই লেখালেখির হাতেখড়ি। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা করতেই বেশি পছন্দ করেন। ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায় প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা কুড়ান। বিশ্বাসের কথাগুলােকে শব্দে রূপ দিতে পছন্দ করেন। অবিশ্বাসের দেয়ালে অনুপম স্পর্শে বিশ্বাসের ছোঁয়া দিতে তাঁর রয়েছে ব্যাপক মুন্সিয়ানা। একুশে বইমেলা – ২০১৮ তে তাঁর রচিত দ্বিতীয় বই ‘আরজ আলী সমীপে।

2 thoughts on “বিজ্ঞান বলছে, মেয়েরা জিন্স পরলে সন্তান হিজড়া হতে পারে! – আরিফ আজাদ

  • June 21, 2018 at 4:33 pm
    Permalink

    VAI DOYA KORE BOLEN HIJRA KI BHINNO KONO PROJATI NAKI SHARIRIK BHABE OCHOL?
    HIJRA SHONTAN KI MANUSH NOI?

    Reply
  • July 15, 2018 at 3:10 pm
    Permalink

    HIJRA KI MANUSH NA JE TADER JONMO HOWA NINDONIO?
    SHUDHU INDIA EBONG BANGLADESH E JOTO HIJRA ACHE PURO EUROPE EBONG AMERICA TE KI TA ACHE?
    JEANS ASHAR AGE KI HIJRA CHILO NA?
    HIJRA DER NIYE ISLAM ER BIDHAN KI?
    ISLAM E SILK ER KAPOR PORA HARAM, KENO?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: