ইসলাম এবং আমার অবিশ্বাস (পর্ব চার)

পথ চলতে ঘুরতে বেড়াতে ধার্মিক লোকদের দ্বারা আটকা পরেছি অনেকবার। রাস্তা দিয়ে হাটছিলাম কোনো কাজে যাচ্ছিলাম তো একদল ধার্মিক লোক এসে দাঁড় করালো। বলা শুরু করলো, ‘আকাশ বাতাস পৃথিবী সবকিছু আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন। চারপাশে যা কিছু দেখি এবং যা দেখতে পাই না সবকিছুই আল্লাহ্‌র সৃষ্টি। কি অপরূপ আল্লাহ্‌র ভুবন, কতো নেয়ামত দিয়েই না আমাদের ভরে রেখেছেন। যিনি আমাদের জন্য এতো কিছু তৈরি করেছেন, যার দয়ায় আমরা বেঁচে থাকি, যার নেয়ামত ভোগ করে আমরা জীবন অতিবাহিত করি তার জন্য কি আমরা একটু ইবাদত করতে পারি না? আল্লাহ্‌র ইবাদত করলে তো আমাদের লোকসান হচ্ছে না! পরকালের জীবন সুখে সাজাতেই তো আমাদের নামাজ পড়তে হবে’! ধার্মিক লোকদের মুখের সামনে দাঁড়িয়ে এ ধরণের কথা জীবনে কম শোনা হয় নি। হয়তো পাঠকেরও এরকম অভিজ্ঞতা আছে। তবে অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, একজন অবিশ্বাসীর সামনে যখন ধার্মিক সাহেবরা এরকম কথাবার্তা বলে তখন বেশ কঠিন হয়ে পরে হাসি চেপে রাখা। মুখ ফেটে হাসি বেরিয়ে আসতে চায় তবুও মানবতার খাতিরে হেসে ওঠা হয় না। ধার্মিকদের মতো আমিও একসময় বিশ্বাস করতাম আকাশ বাতাস পৃথিবীসহ সবকিছু আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন। তখন কোনো ধার্মিক এ ধরণের কথাবার্তা বললে মুখ ফেটে হাসি আসতো না, মনোযোগ দিয়েই শুনতাম এবং ভালো লাগতো। যদিও নামাজে যেতে আলসেমি করতাম এবং সেই আলসেমিকে ইবলিস শয়তানের প্ররোচনা মনে করতাম আবার ভুলেও যেতাম। তবে একটা সময় নিজের মস্তিষ্কের ওপর ভরসা করতে ইচ্ছা করলো প্রচুর। কারণ পৃথিবীতে হাজার রকমের মানুষ হাজার রকমের ধর্ম পালন করছে। কেউ বলে, আকাশ বাতাস পৃথিবীসহ সবকিছু আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন তাই আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়তে হবে। আবার কেউ বলে, আকাশ বাতাস পৃথিবীসহ সবকিছু ভগবান সৃষ্টি করেছে তাই তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে তার পূজা করতে হবে। যার যার কাছে বিশ্বাস তার তার ধর্মের ঈশ্বরই সবকিছুর মালিক, সবকিছু তার ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণেই চলছে। এখন সকল ধর্মের ধর্মবিশ্বাসীর বিশ্বাস তো একসাথে বাস্তবতা হতে পারে না। প্রকৃত সত্য যেকোনো এক ধর্মের ধর্মবিশ্বাসীর বিশ্বাস হতে পারে আবার সকল বিশ্বাসীর বিশ্বাসও ভুল হতে পারে। আর সেজন্য নিজের মস্তিষ্ক না খাটিয়ে, সত্য অনুসন্ধান না করে নিজের বিশ্বাসকে ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস করলে সেটা শুধুমাত্র বিশ্বাস হয়েই থেকে যায়। কোনো বইতে লেখা আছে আল্লাহ্‌ আকাশ বাতাস তৈরি করেছেন তাই আল্লাহ্‌ বলে আসলেই কেউ আছেন এবং তিনিই সবকিছু তৈরি করেছেন সেটা অন্ধভাবে বিশ্বাস করলে সেটা বিশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এ বিশ্বাসই কি আমাদের বাস্তবতা নাকি বিশ্বাসের পেছনে কল্পকাহিনী ছাড়া কিছুই নেই সেটা জানতে হলে অবশ্যই নিজের মস্তিষ্ক খাটানো প্রয়োজন। কেউ যদি আপনাকে বলে শাঁকচুন্নি বলে কেউ একজন আছেন যিনি এভাবে সেভাবে সবকিছু ছয়দিনে তৈরি করেছেন এবং সবাইকে তার প্রতি মাথা নত করতে হবে তাহলে আপনি নিশ্চয় আপনার প্রচলিত বিশ্বাসে অন্ধ থেকে তাকে নিয়ে উপহাস করবেন নয়তো, নিজের মস্তিষ্ক খাটিয়ে যাচাই করে দেখবেন যে, শাঁকচুন্নি যেভাবে যেভাবে সবকিছু তৈরি করেছেন বাস্তবেও সেভাবে সেভাবে সবকিছু তৈরি হওয়া সম্ভব কি না। ঠিক সেভাবেই সবকিছুর পেছনে আল্লাহ্‌ আছেন কিনা তা জানতে হলে আল্লাহ্‌র সবকিছু তৈরির গল্প একটু যাচাই করে দেখতে হবে।

যে কিতাবের বানীকে আল্লাহ্‌র বানী বলে দাবি করা হয় সেই কোরআনের সূরা ফুসিলাত আয়াত ৯ এ বলা হয়েছে, আল্লাহ্‌ প্রথম দুইদিনে নির্মাণ করেছেন পৃথিবী। একই সূরার আয়াত ১০ এ বলা হয়, চারদিনে পৃথিবীর উপরিভাগে পাহাড় পর্বত স্থাপন করেন এবং পৃথিবীতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। আবার, একই সূরার আয়াত ১১-১২ তে বলা হয়েছে, আল্লাহ্‌ শেষের দুইদিনে সাত আসমান নির্মাণ করেন এবং নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপ মালা অর্থাৎ নক্ষত্র দ্বারা সুশোভিত করেন।

সূরা হামিম সাজদাহ/ফুসিলাত আয়াত ৯

قُلْ أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِٱلَّذِى خَلَقَ ٱلْأَرْضَ فِى يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُۥٓ أَندَادًا ذَٰلِكَ رَبُّ ٱلْعَٰلَمِينَ

কুল আইন্নাকুম লাতাকফুরূনা বিল্লাযী খালাকাল আরদা ফী ইয়াওমাইনি ওয়া তাজ‘আলূনা লাহূআনদা-দান যা-লিকা রাব্বুল ‘আ-লামীন।

বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দু’দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ স্থীর কর? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।

সূরা হামিম সাজদাহ/ফুসিলাত আয়াত ১০

وَجَعَلَ فِيهَا رَوَٰسِىَ مِن فَوْقِهَا وَبَٰرَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَآ أَقْوَٰتَهَا فِىٓ أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَآءً لِّلسَّآئِلِينَ

ওয়া জা‘আলা ফীহা-রাওয়া-ছিআ মিন ফাওকিহা- ওয়া বা-রাকাফীহা-ওয়াকাদ্দারাফীহা আকওয়া-তাহা- ফীআরবা‘আতি আইয়া-মিন ছাওয়াআললিছছাইলীন।

তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন-পূর্ণ হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে।

সূরা হামিম সাজদাহ/ফুসিলাত আয়াত ১১

ثُمَّ ٱسْتَوَىٰٓ إِلَى ٱلسَّمَآءِ وَهِىَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَلِلْأَرْضِ ٱئْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا قَالَتَآ أَتَيْنَا طَآئِعِينَ

ছু ম্মাছ তাওয়াইলাছ ছামাই ওয়াহিয়া দুখা-নুন ফাকা-লা লাহা-ওয়ালিল আরদি’তিয়া তাও‘আন আও কার হান কা-লাতাআতাইনা-তাই‘ঈন।

অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।

সূরা হামিম সাজদাহ/ফুসিলাত আয়াত ১২

فَقَضَىٰهُنَّ سَبْعَ سَمَٰوَاتٍ فِى يَوْمَيْنِ وَأَوْحَىٰ فِى كُلِّ سَمَآءٍ أَمْرَهَا وَزَيَّنَّا ٱلسَّمَآءَ ٱلدُّنْيَا بِمَصَٰبِيحَ وَحِفْظًا ذَٰلِكَ تَقْدِيرُ ٱلْعَزِيزِ ٱلْعَلِيمِ

ফাকাদা-হুন্না ছাব ‘আ ছামা-ওয়া-তিন ফী ইয়াওমাইনি ওয়া আওহা-ফী কুল্লি ছামাইন আমরাহা- ওয়া ঝাইয়ান্নাছ ছামাআদ্দুনইয়া-বিমাসা-বীহা ওয়া হিফজান যালিকা তাকদীরুল ‘আঝীঝিল ‘আলীম।

অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলীকে দু’দিনে সপ্ত আকাশ করে দিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার আদেশ প্রেরণ করলেন। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।

আল্লাহ্‌ যে ছয়দিনে সবকিছু সৃষ্টি করেছেন সেই ছয়দিন মানে ঠিক কতো সময়? এ ছয়দিনের একদিন মানে কি পৃথিবী আহ্নিকগতিতে একবার ঘুরতে যতো সময় নেয় ততো সময়? অর্থাৎ এ ছয়দিনের একদিন মানে কি চব্বিশ ঘণ্টার একদিন নাকি সময়ের হিসাব এখানে ভিন্ন? সে উত্তর অবশ্য কোরআনেই পরিষ্কার ভাবে পাওয়া যায়। কেননা সূরা হাজ্ব আয়াত ৪৭ এ বলা হয়েছে, আল্লাহ্‌র কাছে একদিন আমাদের সময়ের হিসাবে এক হাজার বছরের সমান। অর্থাৎ আল্লাহ্‌র কাছে একদিন হতে যতো সময় লাগে আমাদের সময়ের হিসাব অনুযায়ী তা এক হাজার বছরের সমান।

সূরা আল-হাজ্ব আয়াত ৪৭

وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِٱلْعَذَابِ وَلَن يُخْلِفَ ٱللَّهُ وَعْدَهُۥ وَإِنَّ يَوْمًا عِندَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ

ওয়া ইয়াছতা‘জিলূনাকা বিল‘আযা-বি ওয়ালাইঁ ইউখলিফাল্লা-হু ওয়া‘দাহূ ওয়া ইন্না ইয়াওমান ‘ইনদা রাব্বিকা কাআলফি ছানাতিম মিম্মা-তা‘উদ্দূন।

তারা আপনাকে আযাব ত্বরান্বিত করতে বলে। অথচ আল্লাহ কখনও তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। আপনার পালনকর্তার কাছে একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।

তাহলে আমরা যদি আল্লাহ্‌র একদিন সমান আমাদের এক হাজার বছরের সমান ধরে নেই তাহলে দাঁড়ায়, আল্লাহ্‌ প্রথম দুই হাজার বছরে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তারপর চার হাজার বছরে পৃথিবীর উপরিভাগে পর্বত স্থাপন করেছেন এবং পৃথিবীতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন। তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দেন এবং দুই হাজার বছরে আকাশমন্ডলকে সাত স্তরে বিভক্ত করেন ও নিকটবর্তী আকাশকে নক্ষত্র দ্বারা সুশোভিত করেন। অর্থাৎ আল্লাহ্‌ যতো সময় নিয়ে সবকিছু সৃষ্টি করেন সেটা তার কাছে ছয়দিন হলেও আমাদের সময়ের হিসাব অনুযায়ী সেটা ছয় হাজার বছর। আমাদের সময়ের হিসাব অনুযায়ী আল্লাহ্‌ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় হাজার বছরে।

অনেক ইসলামপন্থী দাবি করেন, যে ছয়দিনে সবকিছু সৃষ্টি করা হয়েছে সেই ছয়দিনের একদিন আমাদের সময়ের হিসাব অনুযায়ী পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। কেননা সূরা মাঅারিজ আয়াত ৪ এ বলা হয়েছে, ফেরেশতাগণ ও রূহ এমন একদিনে আল্লাহ্‌র পানে ঊর্ধ্বগামী হয়, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।

সূরা আল-মাআরিজ আয়াত ৪

تَعْرُجُ ٱلْمَلَٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ إِلَيْهِ فِى يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُۥ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ

তা‘রুজুলমালাইকাতুওয়াররূহুইলাইহি ফী ইয়াওমিন কা-না মিকদা-রুহূখামছীনা আলফা ছানাহ।

ফেরেশতাগণ এবং রূহ আল্লাহ তা’আলার দিকে উর্ধ্বগামী হয় এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।

সেই হিসেবে, আল্লাহ্‌ প্রথম এক লাখ বছরে পৃথিবী নির্মাণ করেছেন। তারপর, দুই লাখ বছরে তিনি পৃথিবীর উপরিভাগে পর্বত স্থাপন করেন এবং পৃথিবীতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। তারপর শেষ এক লাখ বছরে তিনি আকাশমণ্ডলকে সপ্ত স্তরে বিভক্ত করেন এবং নিকটবর্তী আকাশকে নক্ষত্র দ্বারা সুশোভিত করেন। তবে যা জানতে হবে তা হলো, সূরা মাঅারিজ আয়াত ৪ এ কিয়ামত দিবসের পরিমাণকে পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছর বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বিভিন্ন হাদীসেও কিয়ামত দিবসের পরিমাণকে পঞ্চাশ হাজার বছর বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, যাকাত না প্ৰদানকারীকে শাস্তির মেয়াদ বর্ণনার হাদীসে বলা হয়েছে যে, “তার এ শাস্তি চলতে থাকবে এমন এক দিনে যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর, তারপর তার ভাগ্য নির্ধারণ হবে হয় জান্নাতের দিকে না হয় জাহান্নামের দিকে”।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ধনী ব্যক্তি তার হাক্ব (যাকাত) আদায় না করলে ক্বিয়ামাতের দিন সোনা ও রূপা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তার ললাটে, তার পার্শ্বদেশে ও তার পৃষ্ঠদেশে সেঁক দেয়া হবে। এমন শাস্তি অব্যাহত থাকবে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা করার দিন পর্যন্ত, যে দিন হবে তোমাদের গণনা অনুসারে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। এরপর সে নিজের গন্তব্যস্থান চাক্ষুস দেখবে, জান্নাত অথবা জাহান্নাম। আর যে মেষপালের মালিক তার যাকাত দেয় না ক্বিয়ামাতের দিন সেগুলো পূর্বের চেয়েও সংখ্যায় অধিক ও মোটা-তাজা অবস্থায় উপস্থিত হবে এবং তাকে শিং দিয়ে গুঁতা মারবে ও খুর দিয়ে দলিত করবে। ওসবের কোনোটিই বাঁকা শিংবিশিষ্ট বা শিংবিহীন হবে না। যখন সর্বশেষ জানোয়ারটি তাকে দলিত করে চলে যাবে, তখন প্রথমটিকে আবার তার কাছে আনা হবে। এরূপ চলতে থাকবে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে ফয়সালা করার দিন পর্যন্ত, যে দিনটি হবে তোমাদের হিসাব মতে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।

এরপর সে তার গন্তব্যস্থান প্রত্যক্ষ করবে, জান্নাত অথবা জাহান্নাম। আর যে উটের মালিক উটের যাকাত প্রদান করে না ক্বিয়ামাতের দিন ঐ উট পূর্বের চাইতেও সংখ্যায় অধিক ও মোটা-তাজা অবস্থায় মালিকের নিকট উপস্থিত হবে। তাকে এক বিশাল সমভূমিতে উপুড় করে শোয়ানো হবে এবং পশুগুলো তাকে খুর দিয়ে দলন করতে থাকবে। সর্বশেষ পশুটি তাকে অতিক্রম করার পর প্রথমটিকে পুনরায় তার কাছে ফিরে আনা হবে। এরূপ চলতে থাকবে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মাঝে ফায়সালা করার দিন পর্যন্ত, যেদিন হবে তোমাদের গণনা অনুযায়ী পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। অতঃপর সে তার গন্তব্যস্থল প্রত্যক্ষ করবে, হয়তো জান্নাত অথবা জাহান্নাম। [সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) : হাদিস নং ১৬৫৮]

তাহলে আল্লাহ্‌ ছয়দিনে সবকিছু সৃষ্টি করেছেন যে ছয়দিন আমাদের সময়ের হিসাবে ছয় হাজার বছরের সমান। কেননা সূরা হাজ্ব আয়াত ৪৭ অনুযায়ী আল্লাহ্‌র একদিন আমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান। এবার প্রশ্ন, আল্লাহ্‌ যদি কোনো গ্রহে বাস না করেন যে গ্রহের সূর্যের মতো একটা নক্ষত্র আছে তাহলে আল্লাহ্‌ কিভাবে দিন গণনা করেন? পৃথিবী আহ্নিকগতিতে একবার ঘুরে আসলে সেটা একদিন হিসেবে গণনা করা হয়। কোনো কোনো গ্রহে দিনের দৈর্ঘ্য আমাদের পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যের তুলনায় অনেক ছোট। আবার কোনো কোনো গ্রহে দিনের দৈর্ঘ্য আমাদের পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যের তুলনায় অনেক বড়। দিনের দৈর্ঘ্য ছোট বড় হওয়া নির্ভর করে যে গতির ওপর দিন রাত হওয়া নির্ভর করে সেই গতির ওপর। অর্থাৎ আহ্নিকগতির ওপর। গ্রহের আহ্নিকগতি দ্রুত হলে একদিন হতে কম সময় লাগবে এবং গ্রহের আহ্নিকগতি ধীর হলে একদিন হতে বেশি সময় লাগবে। পার্থিব এক হাজার বছর আল্লাহ্‌র একদিনের সমান কথাটার অর্থ আল্লাহ্‌ কোনো গ্রহে অবস্থান করেন এবং সেই গ্রহ এতো ধীর গতিতে ঘূর্ণনশীল যে সেখানকার একদিন আমাদের পৃথিবীর এক হাজার বছরের সমান। যদি তা না হয় তাহলে আল্লাহ্‌র দিন গণনা অর্থহীন। আল্লাহ্‌র একদিন আমাদের গণনার পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান ধরে নিলেও সেটা একইভাবে অর্থহীন।

মহাবিশ্বের বয়স নিয়ে এবার কথা বলা যাক। বিজ্ঞানীরা আমাদের মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণ করেছেন ১৩.৮২ বিলিয়ন বছর। বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের এ বয়স কি কোনো গুহায় বসে ধ্যান করে অনুমান করে আমাদের জানিয়েছেন নাকি তথ্য উপাত্তনির্ভর প্রমাণের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করেছেন? অবশ্যই তারা কোনো গুহায় বসে ধ্যান করে আমাদের সিদ্ধান্ত জানান না। তারা অনুসন্ধান করেন, যাচাই বাছাই করেন, যা ভুল বলে প্রমাণিত হয় তা বাদ দিয়ে দেন (নিজেদের ভুল ঢাকবার জন্য রূপক অর্থে অমুক কে তমুক বানানোর চেষ্টা করেন না) , যা সঠিক বলে প্রমাণিত হয় তা গ্রহণ করেন। কোনো কিছু অনুমান করতে হলেও তারা কিছু প্রমাণের ওপর নির্ভর করে অনুমান করেন। মহাবিশ্বের বয়সও বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তথ্য উপাত্তনির্ভর প্রমাণের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করেছেন। বিজ্ঞানীরা দুটো পদ্ধতি অনুসরণ করে মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণ করেছেন। প্রথম পদ্ধতি হলো, মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন পদার্থের বয়স নির্ণয় করে। মহাবিশ্বের বয়স আর যাই হোক, এতে থাকা কোনো জ্যোতিষ্ক বা নক্ষত্রের চেয়ে কম হবে না। দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো, মহাবিশ্ব কতো দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে তা নির্ণয় করে। আমরা জানি, ছায়াপথ সমূহ একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যার অর্থ একসময় মহাবিশ্ব সংকুচিত অবস্থায় ছিল। ছায়াপথ সমূহের এ দূরের সরে যাওয়ার বেগ, পরস্পরের দূরত্ব ও মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করেছেন আজকের অবস্থানে আসতে কতো সময় পার হয়েছে [1]।

তারপর পৃথিবীর বয়স নিয়ে কথা বলা যাক। বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করেছেন ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর। পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করার জন্য বিজ্ঞানীরা রেডিও একটিভ ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, কিছু তেজস্ক্রিয় উপাদানের আইসোটোপ ক্ষয় হয়ে অন্য উপাদানে রূপান্তরিত হয় এবং সেই ক্ষয় হওয়ার হার ব্যবহার করে সহজেই বয়স নির্ণয় করা যায় [2]। মহাবিশ্বের বয়স ও পৃথিবীর বয়স জানা গেলে আমরা জানতে পারি যে, মহাবিশ্বের সূচনার ৯ বিলিয়ন বছর পর আমাদের পৃথিবী গঠন হতে শুরু করে। এদিকে কোরআন অনুযায়ী, আল্লাহ্‌ সবার আগে পৃথিবী তৈরি করেছেন। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ্‌ সবকিছু তৈরিতে সময় নিয়েছেন ছয় হাজার বছর। বাস্তবে মহাবিশ্বেরগঠন হতে যতো সময় লাগে সেই তুলনায় আল্লাহ্‌র ছয় হাজার বছর অতি সামান্য। যদি ধরা হয়, আল্লাহ্‌ তিন লাখ বছরে সবকিছু তৈরি করেছেন তাও সময়টা অতি সামান্য হয়ে যায়।

আল্লাহ্‌র ছয়দিনের সবকিছু তৈরির গল্পে আমরা জানতে পারি, তিনি প্রথম দুই দিনে পৃথিবী তৈরি করেছেন এবং শেষের দুইদিনে নক্ষত্র সমূহ তৈরি করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ্‌ যে সূর্যের আগে পৃথিবী তৈরি করেছেন সেটা পরিষ্কার এবং সেটা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করার কোনো জায়গা নেই। এখন কথা হলো, নক্ষত্রের আগে কি নক্ষত্রের গ্রহ আসতে পারে অথবা সূর্যের আগে কি পৃথিবী আসতে পারে? উত্তর না। সূর্যের আগে পৃথিবীর জন্ম কেন হতে পারে না সেটা জানার জন্য বুঝতে হবে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে কেন পৃথিবী কক্ষপথে চলছে! সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে পৃথিবী কক্ষপথে চলছে এবং সেই কক্ষপথ থেকে সরে যাচ্ছে না তার কারণ মাধ্যাকর্ষণ। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে তুলনামূলক বেশি ভরসম্পন্ন বস্তু কম ভরসম্পন্ন বস্তুকে নিজের দিকে টানে। সেই একই কারণে বেশি ভরসম্পন্ন বস্তুকে কম ভরসম্পন্ন বস্তু নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে। আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে ভারী বস্তু হলো সূর্য। আর সেজন্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে সূর্যকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করছে সৌরজগতের সকল গ্রহ। মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব বলে যদি কিছু না থাকতো তাহলে গ্রহ সমূহ প্রতিনিয়ত একটা কক্ষপথে পরিভ্রমণ করতে পারতো না। সূর্যের আকর্ষণ পৃথিবীকে পৃথিবীর কক্ষপথে ধরে রাখে বলেই পৃথিবী প্রতিনিয়ত সেই কক্ষপথে চলে।

তাহলে প্রশ্ন, সূর্য যেহেতু পৃথিবীকে নিজের দিকে টানে সেহেতু পৃথিবী কেন সূর্যের ওপর পড়ছে না এবং ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে না? প্রশ্নের উত্তর উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। আপনি যদি একটি দড়ির একপ্রান্তে একটি বল বেধে দড়ির অন্য প্রান্ত হাতে রেখে সেটা আপনার চারপাশে ঘুরান তাহলে আপনি প্রতিনিয়ত বল টাকে নিজের দিকে টানছেন। বল টাকে আপনি নিজের দিকে টানছেন বলেই অথবা বলের ওপর আপনার প্রভাব আছে বলেই বলটা আপনার চারপাশে ঘুরছে। যখন দড়ির প্রান্ত ছেড়ে দিবেন অথবা যখন তা আর নিজের দিকে টানবেন না তখন সেটা আর আপনার চারপাশে ঘুরবে না, বরং সোজা পথ বরাবর ছুটবে। একইভাবে সূর্য পৃথিবীকে নিজের দিকে টানে তবে, পার্শ্বাভিমুখ গতির কারণে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে গতিশীল থাকে। পার্শ্বাভিমুখ গতি যদি না থাকতো তাহলে পৃথিবী সূর্যের ওপর পড়তো এবং ধ্বংস হয়ে যেতো। আবার সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে পৃথিবী কক্ষপথ ধরে গতিশীল থাকতে পারতো না।

পৃথিবীর বাস্তবতা সে সূর্যকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রতিনিয়ত প্রদক্ষিণ করছে। এদিকে আল্লাহ্‌ সবার আগে পৃথিবী তৈরি করেছেন। তাহলে স্বাভাবিক ভাবে মনে প্রশ্ন জাগে, সূর্য তৈরি করার আগে পৃথিবী কিসের চারপাশে গতিশীল ছিল? সূর্য তৈরির আগে যদি পৃথিবী স্থির অবস্থায় থাকে তাহলে সূর্য তৈরির পর পৃথিবী মাধ্যাকর্ষণের কারণে সূর্যের ওপর পতিত হবে। আবার, যখন সূর্য ছিল না তখন পৃথিবীর কোনো বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার কক্ষপথে প্রতিনিয়ত পরিভ্রমণ করা সম্ভব নয়। কেননা পৃথিবীর একটি কক্ষপথে প্রতিনিয়ত পরিভ্রমণ করতে সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ প্রয়োজন ছিল! অর্থাৎ আল্লাহ্‌র সূর্যের পৃথিবী তৈরির গল্প পুরোপুরি বাস্তবতার বিপরীত। মায়ের আগে সন্তানের দুনিয়াতে জন্ম নেওয়া যেমন অবাস্তব তেমনি সূর্যের আগে পৃথিবীর জন্মও পুরোপুরিভাবে অবাস্তব!

তারপর পরের দুইদিনে আসা যাক। কোরআন অনুযায়ী, আল্লাহ্‌ দুদিনে পৃথিবী তৈরি করার পর চারদিনে পৃথিবীতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ্‌ সূর্য তৈরির আগে পৃথিবীতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন। খাদ্য বলতে আমরা অবশ্যই ইট পাথর বুঝি না। খাদ্য হিসেবে আমরা ইট পাথর খাই না। খাদ্য বলতে আমরা বুঝি ফলমূলাদি, সবজী ইত্যাদি। খাদ্য হিসেবে আমরা মানুষ ফলমূলাদি, সবজী ইত্যাদি খাই যা উদ্ভিদ থেকে আসে। তাহলে চারদিনে পৃথিবীতে খাদ্যের ব্যবস্থা করার অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ্‌ সূর্য তৈরি করার আগেই উদ্ভিদ তৈরি করেছেন। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই মনে প্রশ্ন আসে, সূর্য ছাড়া পৃথিবীতে উদ্ভিদ কিভাবে বেঁচে ছিল? ক্লাস থ্রিতে পড়া শিশুও জানে উদ্ভিদ সূর্যের আলো গ্রহণ করে সালোকসংশ্লেষণ পদ্ধতিতে নিজের খাদ্য নিজেই তৈরি করে। স্বাভাবিক ভাবেই সূর্যালোক ব্যতীত উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারে না। সূর্যালোক ব্যতীত উদ্ভিদের বিকাশ, টিকে থাকা, খাদ্য তৈরি করা কোনোটাই সম্ভব নয়। অর্থাৎ আল্লাহ্‌র সূর্য তৈরির আগে পৃথিবীতে খাদ্যের ব্যবস্থা করার গল্পও পুরোপুরিভাবে অবাস্তব এবং হাস্যকরও বটে। কোরআন যার বানী তিনি হয়তো জানতেন না, যে উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে সূর্যালোকের প্রয়োজন বা উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে যে প্রাণ সূর্যালোক ব্যতীত টিকে থাকতে পারেনা।

তার পরের দুইদিনে আসা যাক। কোরআন অনুযায়ী, শেষের দুইদিনে আল্লাহ্‌ আসমানকে সপ্ত আসমানে বিভক্ত করেন এবং নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপ মালা বা নক্ষত্র দিয়ে সুশোভিত করেন। প্রথমত, সপ্ত আসমান বলে বাস্তবে কিছু নেই এবং কেন নেই তা আগেও বিশদভাবে বলেছি। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ্‌ সবশেষে এবং শেষ দুইদিনে নক্ষত্র সমুহ সৃজন করেছেন যার অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহ্‌ আমাদের মহাজগতের বিলিয়ন বিলিয়ন ছায়াপথের বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র মাত্র দুইদিনে তৈরি করেছেন। পুরো মহাবিশ্বের মধ্যে সামান্য এবং অতি নগণ্য এক বিন্দু হলো আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি এবং সেই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মধ্যে সামান্য এবং অতি নগণ্য এক বিন্দু আমাদের পৃথিবী। সেই সামান্য পৃথিবী তৈরি করতে ও তাতে পর্বত মালা স্থাপন করতে আল্লাহ্‌র চারদিন (মানুষের গণনায় চার হাজার বছর) সময় লাগলো আর বিলিয়ন বিলিয়ন ছায়াপথ তৈরি করতে মাত্র দুইদিন (মানুষের গণনায় দুই হাজার বছর) সময় লাগলো!! এ গল্প রূপকথার কাহিনীতেই ভালো মানাবে, বাস্তবতায় বেশ হাস্যকর!

1. www.space.com/24054-how-old-is-the-universe.html
2. ‎www.space.com/24854-how-old-is-earth.html

(কিবোর্ড চলবে..)

ইসলাম এবং আমার অবিশ্বাস (পর্ব এক)

ইসলাম এবং আমার অবিশ্বাস (পর্ব দুই)

ইসলাম এবং আমার অবিশ্বাস (পর্ব তিন)

Facebook Comments

Marufur Rahman Khan

Atheist, Feminist

One thought on “ইসলাম এবং আমার অবিশ্বাস (পর্ব চার)

  • May 5, 2018 at 6:50 pm
    Permalink

    দারুণ!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: