ইহুদী বুড়ির গল্প

ছোটবেলা একটা গল্প মায়ের মুখে শুনতাম। গল্পটা মহানবী আর এক ইহুদী বুড়ির গল্প। এক ইহুদী বুড়ি রোজ মহানবীর নামাজে যাবার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো, মহানবী নামাজে সিজদা করার সময় পিঠে উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিতো, নানান অত্যাচার করতো, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করতো। কিন্তু মানবদরদী মহানবী তাকে কিছুই বলতেন না। একদিন মহানবী দেখলেন, তার রাস্তায় কাঁটা নেই, তিনি তো হতবাক! নামাজ বাদ দিয়েই দৌড়ে গেলেন বুড়ির বাসায়। গিয়ে দেখেন বুড়ি অসুস্থ। এরপরে মানবতাবাদী মহানবী বুড়ির সেবা শুশ্রূষা করলেন, ভাল করে তুললেন। মহানবীর এই মানবপ্রেম দেখে ইহুদী বুড়ি পরে ইসলাম গ্রহণ করলো।
গল্পটা অসাধারণ। ছোটবেলা যখন গল্পটা শুনতাম, তখন আবেগে চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে যেত। আহা, মহানবী কত ভালমানুষই না ছিলেন। ধর্ম বর্ণ সবাইকে সমান ভালবাসতেন। এরকম মানুষই তো পৃথিবীর জন্য দরকার। ছোটবেলা তাই মহানবীকে খুব ভালবাসতাম। আমার মা এরকম আরো নানান গল্প বলতেন মহানবীকে নিয়ে। শুনতাম আর মুগ্ধ হয়ে ভাবতাম, আমিও মহানবীর মত মানবদরদী হবো। আমাকেও কেউ গালাগালি, কটাক্ষ করলে আমি তাকে ভালবাসা দিয়ে উত্তর দেবো। কোনদিন তাদের হত্যা করবো না।
একটু বড় হবার পরে এই গল্পটা আরো বিস্তৃতভাবে জানার জন্য কোরআন পড়তে শুরু করলাম, স্বাভাবিকভাবেই ধারণা ছিল কোরআন হাদিস এই ধরণের ঐতিহাসিক সত্য ইতিহাসে পরিপূর্ণ থাকবে। কিন্তু কোরআন হাদিসগুলো সব তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। কোথাও এরকম কিছু খুঁজে পেলাম না। আমি খুব খুশি হতাম যদি আসলেই ঘটনাগুলো এরকম হতো, মহানবী তার সমালোচক, তাকে গালাগালি করা, তার বিরুদ্ধে কবিতা লেখা, তার সমালোচনা করা, তার উপরে অত্যাচার করা সবাইকে ভালবাসা আর প্রেম দিয়ে জয় করে ফেলতেন। মানবতার জয়গান গাইতেন। কোরআন, হাদিস, এবং অন্যান্য ইসলামি ইতিহাসে মহানবী আসলে তার সমালোচকদের, তাকে কটাক্ষকারীদের সাথে কী আচরণ করেছিলেন, তা খুঁজে দেখা তাই আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, হাদিস গ্রন্থগুলো ঘেঁটে একেবারেই ভিন্ন এক মুহাম্মদকে আবিষ্কার করলাম!
যেমন একটি ঘটনাঃ
সুনানে আবু দাউদ শরীফে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- মহানবীকে গালি দেওয়ার অপরাধে এক অন্ধ সাহাবী তার স্ত্রীকে হত্যা করে ছিলেন।
অন্ধ সাহাবী দাঁড়ালেন মানুষকে অতিক্রম করে সে কাঁপতে ছিল এমনকি রসূলের সামনে বসে পড়লেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল ! আমি ঐ মহিলার স্বামী সে আপনাকে গালি দিত এবং আপনার নিন্দা করত। আমি তাকে নিষেধ করতাম সে বিরত হত না এবং আমি তাকে ধমক দিতাম কিন্তু সে থামতো না, সে আমার প্রিয় সঙ্গিনী ছিল, তার থেকে আমার দুইটা মুক্তার মত ছেলে আছে। গতকল্য সে আপনাকে গালি দিচ্ছিল এবং দোষারোপ ও নিন্দা করছিল। অতঃপর আমি ছুরি নিয়ে তার পেটে রেখে তার উপর ভর দিয়ে এমনকি আমি তাকে হত্যা করেছি। তখন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বললেন : ” তোমরা সাক্ষী থাক ঐ মহিলার রক্ত বৃথা হয়ে গেল”।(আবু দাউদঃ ৪৩৬১)


কয়েকবছর আগে আমাদের দেশে একটি ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। আমাদের একজন প্রধানতম কবি, ভাষাবিজ্ঞানী এবং সাহিত্যিক ডঃ হুমায়ুন আজাদকে চাপাতি দিয়ে বইমেলার সামনে কোপানো হয়েছিল। যারা কুপিয়েছে, তারা ছিল ইসলামি মৌলবাদী, যারা হুমায়ুন আজাদের একটি উপন্যাস “পাক সার জমিন সাদ বাদ” এর বক্তব্য সহ্য করতে পারে নি। তাই অত্যন্ত নির্মমভাবে এই প্রথাবিরোধী মানুষটিকে তারা কুপিয়েছে এবং পরবর্তীতে হত্যাও করেছে। হ্যাঁ, এটাকে আমি হত্যাই বলবো, হুমায়ুন আজাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয় নি। হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, এই আক্রমণের পিছনে হাত রয়েছে জামাত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাইদীর, কিন্তু দেলোয়ার হোসেন সাইদীকে এই মামলায় গ্রেফতার করা হয় নি।
ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা নির্বোধ, কারণ হুমায়ুন আজাদকে যদি কোপাতেই হয়, কোপানো উচিত ছিল তার “শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার”-উপন্যাসটির জন্য। তাকে যদি কোপাতেই হয়, কোপানো উচিত ছিল তার “নারী”-গ্রন্থটির জন্য। এই দুইটি গ্রন্থের তুলনায় “পাক সার জমিন সাদ বাদ” নিতান্তই শিশু, কিন্তু ধর্ম যারা পালন করেন তাদের বুদ্ধিবৃত্তি যে কতটা নিচু সেটা তারা বুঝিয়ে দিলেন। শুভব্রত তাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করেনি, নারী পড়ে ধর্মদণ্ড উত্তেজিত না হয়ে হয়ত অন্য কিছু উত্তেজিত হয়েছে। কারণ এটাই তাদের কাজ, উত্তেজনা ছাড়া তাদের আর কিছুই নেই। তাদের সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে উত্তেজনা আর উত্তেজনা, পরকালে হুর সঙ্গমের স্বপ্নে যৌন উত্তেজনা, তার সাথে মেলে ধর্মতত্ত্ব। অথবা দুটোই একই রকমের উন্নতমম-শির, বোরখা না দেখলেই উত্তেজনা-হিজাব না দেখলেই উত্তেজনা-মেয়েদের চুল দেখা গেলেও তাদের উত্তেজনা। উত্তেজনার যেন শেষ নেই, তাদের ধর্মীয় এবং যৌন উত্তেজনা পরস্পর পরিপূরক।
শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনও রক্তপাতের মাধ্যমে সম্ভব নয়। রক্তপাত এবং হত্যার মাধ্যমে যারা শান্তি কায়েমের স্বপ্ন দেখেন, তারা আসলে জানেন না, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রক্তপাত এবং কারো সম্ভ্রম রক্ষার জন্য ধর্ষণ একই অর্থ বহন করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এক মার্কিন জেনারেলকে একটি গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়ার কারণ জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। উত্তরে সেই জেনারেল বলেছিলেন, ভিয়েতকঙ্গদের হাত থেকে গ্রামটিকে রক্ষার জন্যই তারা পুরো গ্রামটিকে ধ্বংস করে দেয়!
আমরা যারা সভ্য মানুষ বলে নিজেদের দাবী করি, তারা সবসময়ই বলি, মতের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করতে হবে, লেখার বিরুদ্ধে লিখে প্রতিবাদ জানাতে হবে, কবিতার বিরুদ্ধে কবিতা লিখে বা সমালোচনা করে তার প্রতিবাদ জানাতে হবে। কোনভাবেই কেউ কিছু লিখলে সেই লেখককে আক্রমণ করা যাবে না, নির্যাতন করা যাবে না। এটা সভ্য সমাজে বাস করার অন্যতম অলিখিত নিয়ম। মানুষ তার বাক-স্বাধীনতার চর্চা করবে, এবং আপনারও অধিকার রয়েছে কোনকিছু গ্রহণ না করার, আপনি তা বর্জন করুন বা তার প্রচণ্ড সমালোচনা করুন। কিন্তু আপনি আমার বিরুদ্ধে হাজার হাজার শব্দ ব্যবহার করে আমাকে আক্রমণ করলেও আপনার উপরে কখনই শারীরিক আক্রমণ চালাবো না। কারণ আমি নিজেকে সভ্য মানুষ বলে দাবী করি, এবং একজন চিন্তাশীল সভ্য মানুষ সর্বদা কলমকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে, চাপাতি বা তরবারিকে নয়।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাঙলাদেশের ঘাতক দালাল রাজাকার আলবদর বাহিনী এদেশের নামকরা সব বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল। এই জাতিকে একটি মেধাশূন্য, বুদ্ধিহীন, ধর্মান্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন জাতি হিসেবে অন্ধকূপে আটকে রাখার জন্যেই তারা এই কাজ করেছিল। মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধি সর্বদাই তাদের শত্রু। তারা রাজনীতি করে, তারা ধর্ম পালন করে। তারা রাজনীতি দখল করতে চায়, তারা ধর্ম দখল করতে চায়। এবং এভাবেই তারা সবসময় মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকে রাখতে চায়, আর সাধারণ মানুষও সেই শেকল গলায় ঝুলিয়ে দাসত্ব করে যায়। আর আমাদের প্রগতিশীল মুক্তমনা বুদ্ধিজীবী সমাজ সর্বদাই সেই সকল ধর্মান্ধ রাজনীতিবিদদের মুখোশ জনগণের সামনে খুলে দেয়। এই কারণেই তারাই ধর্মান্ধদের রোষানলে পরে সবচাইতে বেশি। এই কারণেই তারা আহমদ শরীফকে মুরতাদ খেতাব দেয়, আরজ আলীকে কোর্টে ওঠায়, জাহানারা ইমামকে জাহান্নামের ইমাম নাম দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়, এই কারণেই কবি শামসুর রাহমানের বাড়িতে গিয়ে তারা আক্রমণ করে। এই চক্র অনেক প্রাচীন।
স্বাভাবিকভাবেই একজন উদারমনা ধার্মিক মানুষ মনে করেন, এই ধরণের কর্মকাণ্ডের সাথে ইসলাম বা কোন ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। এই সবই গুটিকয়েক মৌলবাদীর কাজ, তারা ধর্মকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে। আমরাও তাদের কথা মেনে নিই। কিন্তু আসলেই কি ধর্ম এই ধরণের মৌলবাদী কর্মকাণ্ডের সমর্থন দেয়, কি দেয় না, আমরা তা কখনই যাচাই করে দেখি না।
সাইদী নামক জামাতের নেতাটির নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এটা এখন কমবেশি সকলেই জানেন। সাইদী ডঃ হুমায়ুন আজাদের বইটির খানিকটা পড়েই হুকুম দিয়েছিলেন তাকে হত্যা করতে। কারণ ছিল, এই বইটিকে ডঃ আজাদ খুব স্পষ্ট করে মৌলবাদীদের চরিত্র অংকন করেছিলেন, তাদের কদর্য জীবন তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু এই ঘটনাকে কি ইসলাম সমর্থন করে? নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, শতকরা ১০০% জন মুসলিম বলে উঠবে, না, এই কর্মকাণ্ডের সাথে ইসলামকে জড়ানো যাবে না। এই ১০০% এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ হয়তো মনে মনে হাসবে, এবং বলবে ভালই হয়েছে, এই লেখককে হত্যাই করা উচিত। কিন্তু মুখে বলবে, না-এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।
তাদের কথা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু কথা হচ্ছে, এগুলো কী আসলেই ইসলাম সম্মত খুন? ইসলাম সম্মত আক্রমণ? মহানবী তার সমালোচকদের সাথে কেমন আচরণ করতেন? মহানবী তার উম্মতদের কী শিক্ষা দিয়ে গেছেন যার জন্য কিছু হলেই মুমিন মুসলমানগণ নাড়ায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবর বলে চাপাতি হাতে কল্লা নামিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকে? মহানবী যদি সেই বুড়িকে সেবা করে ভালবাসা দিয়ে জয় করে থাকে, তার উম্মতরা কোপাকুপির শিক্ষা পেল কোথা থেকে?
সত্য হচ্ছে, মুহাম্মদ নিজেও সমালোচনা একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। হযরত মুহাম্মদের জীবনীতেও যে ঠিক একই রকম অনেকগুলো ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়, সেটা সম্ভবত আমাদের উদারমনা মুসলিমরা ভালভাবে জানেনই না। ঠিক একই ধরণের ঘটনা ঘটেছিল সেই সময়ে আরবে, এবং আজকে সাইদী যা করেছিল, ঠিক একই কাজ করেছিল মধ্যযুগে ইসলাম ধর্মের মহান পয়গম্বর হযরত হযরত মুহাম্মদ, যার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় বিভিন্ন হাদিস এবং মুহাম্মদের প্রথম জীবনী ইবনে ইসহাকের সিরাতে রাসুলাল্লাহ গ্রন্থতে।

ঘটনা ১

আবু আফাক ছিলেন একজন ইহুদি কবি, খুব সম্ভবত তিনি এক’শ বছর বয়সী বৃদ্ধ ছিলেন, অথবা তার কিছু কম বেশি। তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান এবং একই সাথে তিনি ছিলেন হযরত মুহাম্মদ ও ইসলামের আগ্রাসী ও যুদ্ধংদেহী চরিত্রের সমালোচক। মুহাম্মদের সমালোচনা করে তিনি লিখেছিলেনঃ
Long have I lived but never have I seen
An assembly or collection of people
More faithful to their undertaking
And their allies when called upon
Than the sons of Qayla when they assembled,
Men who overthrew mountains and never submitted,
A rider who came to them split them in two (saying)
“Permitted”, “Forbidden”, of all sorts of things.
Had you believed in glory or kingship
You would have followed Tubba.
তথ্যসুত্রঃ Alfred Guillaume’s translation of Ibn Ishaq’s prophetic biography, chapter “Salim b. Umayr’s expedition to kill Abu Afak”
এই কবিতাটি শোনার সাথে সাথে হযরত মুহাম্মদ চিৎকার দিয়ে বলে উঠেছিলেনঃ “কে আমার জন্য এই বদমাশকে শাস্তি দেবে?”। ফলশ্রুতিতে মহানবীর অনুসারী সেলিম বিন উমায়ের তলোয়ার নিয়ে গিয়ে হত্যা করলেন আবু আফাককে! এত বৃদ্ধ একজন মানুষকেও রেহাই দেয়া হয় নি, এই বৃদ্ধ তো কাউকে একটি চড় মারার মত সামর্থ্যবানও ছিল না!
ইবনু হিশাম এখানে সারিইয়া সালেম বিন ওমায়েরকে আগে এনেছেন। তিনি বলেন, হারেছ বিন সুওয়াইদ বিন ছামেতকে হত্যা করার পর আবু ‘আফাক-এর মুনাফেকী স্পষ্ট হয়ে যায় এবং সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা গেয়ে কবিতা বলে। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে হত্যার আদেশ দেন (ইবনু হিশাম ২/৬৩৫-৩৬)। অতঃপর আবু ‘আফাক-এর হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ‘আছমা বিনতে মারওয়ান আল-খিত্বমিয়াহ মুনাফিক হয়ে যান এবং ইসলাম ও ইসলামের নবী (ছাঃ)-এর বিরুদ্ধে কুৎসা গেয়ে কবিতা বলেন। তখন রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশে ওমায়ের বিন ‘আদী তাকে হত্যা করেন (ইবনু হিশাম ২/৬৩৬-৩৭)।

ঘটনা ২

ইবনে আল আশরাফ ছিলেন একজন ইহুদি গোত্রের প্রধান এবং একজন কবি। তিনিও ছিলেন তৎকালীন ইসলামিক জিহাদ, ইসলাম ও মুহাম্মদের সমালোচক। তিনি কবিতা লিখে সমালোচনা করতেন, একই কায়দায় মুহাম্মদের হুকুমে তাকেও হত্যা করা হয়, রাতের অন্ধকারে, চোরাগোপ্তা আক্রমণের মাধ্যমে।

ঘটনা ৩

ইয়াযিদ ইবনে যায়েদ ইবনে হিসান আল-খাতমির স্ত্রী আসমা বিনতে মারওয়ান ছিলেন ইসলাম এবং মুহাম্মদের সমালোচক। তিনি কবিতার মাধ্যমে সমালোচনা করতেন, মুহাম্মদের যুদ্ধ এবং কাফের নিধনের বিরুদ্ধে তিনি একটি কবিতা রচনা করেন, তা ছিলঃ
“তোমরা এক বিদেশীর বশীভূত হয়েছ আর তার উৎসাহে মালামালের লোভে খুন করছো। তোমরা সব লোভী মানুষ তোমাদের মধ্যে কি সামান্যতম আত্মসম্মানও নেই?”
এই কবিতা কানে আসার পর হযরত মুহাম্মদ বললেন, “তোমাদের মধ্যে কে আছে যে এই মহিলাকে খুন করবে?”
উমায়ের বিন আল-খাতমি নামের এক সাহাবী একথা শোনার সাথে সাথে সে রাতেই সেই মহিলার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। এই মহিলা কবি তখন তাঁর শিশুসন্তান পরিবেষ্টিত হয়ে ঘুমচ্ছিলেন। একটি শিশু তখন তার মায়ের স্তন্যপান করছিলো, উমায়ের সেই দুগ্ধপানরত শিশুটিকে সরিয়ে মহিলার বুকে তার তলোয়ার আমূলবিদ্ধ করে হত্যা করেন।
পরদিন সকালে উমায়েরের সাথে দেখা হলে হযরত মুহাম্মদ তাঁকে বলেন, “তুমি আল্লাহ আর তার নবীকে সাহায্য করেছ।” উমায়ের বলেন, “তার পাঁচটি ছেলে ছিল; আমার কি অনুশোচনা করা উচিৎ?” হযরত মুহাম্মদ উত্তর দেন, ” না, কারণ তার মৃত্যু আর দুটো ছাগলের ঢুঁশোঢুঁশি করা সমান।”
(In the morning he came to the apostle and told him what he had done and he [Muhammad] said, “You have helped God and His apostle, O Umayr!” When he asked if he would have to bear any evil consequences the apostle said, “Two goats won’t butt their heads about her”, so Umayr went back to his people.)
তথ্যসূত্র: ইবনে সা’দ কিতাব আল-তাবাকাত আল-কবির অনুবাদ এস. মইনুল হক, ভল্যুম ২, পৃ. ৩১

এখানেই শেষ নয়, এরকম উদাহরণ অসংখ্য, অসংখ্য। কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি।

আবু রাফে হত্যাঃ

মুহাম্মদকে বিদ্রূপ করার দায়ে হত্যার আদেশ দেয়া হয় এবং তার দুর্গের ভিতর শয়নকক্ষে ঢুকে হত্যার আদেশ কার্যকর করে মহানবীর সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আতিক ও অন্যান্যরা।
(বুখারী হাদিস)

আব্দুল্লাহ বিন কাতাল ও তার দুই নর্তকী দাসী হত্যাঃ

বুখারী,তাবারী, ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে, মক্কা বিজয়ের পর মহানবীকে কে কটাক্ষ করে, অপমান করে গান গাওয়ার কারণে শুধু হত্যার আদেশই নয়, প্রকাশ্যে হত্যার আদেশ (যদিও কাবার গিলাফ ঝুলে আশ্রয় চায় তবুও) দেয়া হয়। এসময় এটাও বলা হয় যে, ক্রীতদাসী যাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই, অন্যের অনুগত তাদেরকেও হত্যা করতে হবে।
আর যিনি এই হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পন্ন করে মহানবীর প্রিয়পাত্রতে পরিণত হয়েছিলেন, তিনি হচ্ছেন সাঈদ ও আবু বারযাহ।

আল হুয়াইরিদ বিন নুকাইদঃ

ইবন সাদ রচিত‘কিতাব আল তাবাকাত আল কাবির’থেকে জানা যায়, তার কথা শুনে মুহাম্মদ কষ্ট পেয়েছিলেন, তাই মুহাম্মদ তাকে হত্যার হুকুম দিয়েছিলেন। এই কথা শুনে হযরত আলী লোকটার বাসায় গেলে বলা হয়, লোকটি বাড়িতে নেই। এ মিথ্যা কথা শুনে আলী তার ঘরের পিছনে লুকিয়ে ছিলেন, পরবর্তীতে তাকে হত্যা করেন আলী।
এই ধরণের চোরাগোপ্তা হামলা এবং হত্যা করা বর্বর বেদুইনদের আরবের অত্যন্ত প্রাচীন রীতি, তারা সুপ্রাচীন কাল ধরেই এর চর্চা করে আসছে। এবং এই সংস্কৃতি আমাদের দেশে ঢোকার ফলেই আমাদের বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিকদের উপরেও নেমে এসেছে বর্বর চোরাগোপ্তা হামলা। তাদের কণ্ঠ রোধ করে দেয়া হচ্ছে, তাদের হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে, ঠিক যেভাবে পাক বাহিনী করেছিল। পাক বাহিনী অজুহাত দেখিয়েছিল, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা তাদের অখণ্ড পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের উস্কানিতে লিপ্ত, একইভাবে এই মৌলবাদীরাও দাবী করছে, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা তাদের ধর্মের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু একজন কবি বা একজন সাহিত্যিকের লেখাতেই যেই ধর্মের ভিত্তি কেঁপে ওঠে, তাকে হত্যা না করলে আর তাদের ধর্ম টেকে না, সেই ধর্মের কি আদৌ কোন যৌক্তিক ভিত্তি থাকে?
ভেবে দেখা প্রয়োজন, কত পরিশ্রম আর কত সাধনার দ্বারা এরকম এক একজন যুক্তিনিষ্ঠ মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি হয়, আধুনিক মননশীলতা তৈরি হয়। মানবতার কল্যাণে তাদের এই অপূর্ব মেধা ব্যবহার করা যেত, সৃষ্টিশীলতা এবং মননশীলতার বিকাশে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু মৌলবাদীরা সৃষ্টিশীলতার বিরুদ্ধে, মননশীলতার বিরুদ্ধে, মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় সবসময়ই। একজন কবি যাই লিখুক, যেভাবেই লিখুক, তার সমালোচনা হতে হবে কবিতা দিয়ে, লেখা দিয়ে। কোনমতেই চাপাতি বা তরবারি দিয়ে নয়। এই সহজ সত্যটা ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না কিছুতেই। কিন্তু এই ধর্মম্মাদদের রুখতে হবে, নতুবা তারা আমাদের টেনে নিয়ে যাবে মধ্যযুগে, সেই বর্বর আরবে। ডঃ হুমায়ুন আজাদ সহ যুগে যুগে ধর্মের হাতে বলি হওয়া কবিদের প্রতি জানাচ্ছি শ্রদ্ধা। তারা বেঁচে থাকবেন আমাদের শ্রদ্ধায়, আমাদের চিন্তায়, আমাদের মননে। মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তার চিন্তাকে এই মৌলবাদী ধর্মান্ধরা কীভাবে হত্যা করবে?

[পুরনো লেখা থেকে]

Facebook Comments

7 thoughts on “ইহুদী বুড়ির গল্প

  • January 17, 2017 at 2:02 pm
    Permalink

    আল্লাহ্‌র প্রতি ভয় আর কিছু পাওয়ার লোভেই এ জাতি অন্ধ।
    কবে যে এই অন্ধত্ব দূর হবে?

    Reply
  • February 11, 2017 at 7:21 pm
    Permalink

    First of all, sorry for writing the comment in English. However, this write-up is really an eye-opener. When the whole world is rejecting the so-called religious and spiritual beliefs, South-Asians are getting more devoted on that. My simple observation said it’s all because of lack of proper education, self-confidence, and fear of losing positions. Especially the Bangladeshis, they use the internet and modern technology for entertainment purpose like Facebook, pornographic website, but less tempted to study science and logical arguments from scholars. Sad, that they become so obsessed to use vulgar and curse words to anyone talk about their so-called beliefs and taboos. And anyone who try to enlighten them with anti-religious viewpoints, they bring Jews and Christians and their so-called funding against Islam. Grow up, morons! Thanks Asif for bringing back that sweet childhood memory.

    Reply
  • March 29, 2017 at 7:20 pm
    Permalink

    লেখাটা পড়ে বেশ ভালো লাগলো। তবে ঘটনাগুলোর সাথে হাদিসের রেফারেন্সগুলো দিলে আরও ভালো লাগতো। ধন্যবাদ।

    Reply
  • April 25, 2017 at 1:47 pm
    Permalink

    Esob sotto jenew amader deshe chup kore sotto take vetore chapa diye thakte hoy… Samanno ter pawate ekon amar uncle amake ignore kore 🙁 , obosso tate amar kichu jay ase na. Ei utejona sristikari borbor dhormer background oder kobe j janar iccha hobe! Afsus.

    Reply
  • June 11, 2017 at 4:57 am
    Permalink

    মানুষ কেন আরেকটা মানুষের অন্ধভক্ত হয়ে তার সব হিংস্র আদেশ পালন করবে?

    Reply
  • December 30, 2017 at 5:08 pm
    Permalink

    ★বুড়ির কাহিনী মিথ্যা। এমন ঘটনা লোক মুখেই শোনা যায়। বাস্তবে তেমন কিছু হয়নি।
    ★ একদিন কাবার সামনে সিজদাহ রত অবস্থায় রাসুল্লাহ (স) এর পিঠে নাড়ি ভুড়ি চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তিনি কোনো ভাবে উঠতে পারছিলেন না। কিছু সময় ফাতিমা (রা) এর কাছে এই খবর আসলে তিনি তাড়াতাড়ি গিয়ে তা হতে মুক্ত করেন। সেদিন নাম ধরে ধরে কাফের আবু জেহেল, উদবা, সাইবা দের জন্য বদ দোয়া করেছিলেন। যেটি আউট পুট ১২ বছর হয়েছিলো। তিনি যেখানে যেখানে বলেছিলেন যে এখানে উমুক এখানে উমুক মরে পড়ে থাকবে সেভাবেই ছিলো।
    –#( স্বাভাবিক ভাবে বদ দোয়া আসবে। আপনাকে কেউ এমন খারাপ আচরণ করলে নিশ্চয় আপনি খুশি হতেন না!)
    ★অন্ধ সাহাবী বার বার তার স্ত্রীকে নিশেধ করতো বাট সে শুনতো না। প্রায় গালী দিতো। যেহেতু সবার চাইতে ভালবাসার পাত্র নবী মুহাম্মদ (স) তাই তিনি হত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।(আপনার মাকে কেউ গালি নিশ্চয় বলবেন না আচ্ছা তুমি গালি দাও। একটা প্রতিক্রিয়া থাকবেই।)
    আজ এইটুকু এর মাঝে কোনো কথা থাকলে জানাবেন। বাকী টুকু অন্য একদিন।

    Reply
  • February 17, 2018 at 6:50 am
    Permalink

    অসাধারণ

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: