মহাবিশ্বঃ বিস্ময়ের এক ইতিহাস

এই বিশাল বিস্তৃত মহাবিশ্ব, বিস্তৃত আকাশ রাজি আকাশে রয়েছে গ্রহ, নক্ষত্র নীহারিকা মন্ডলী। মানুষের মনে যখন চিন্তা করার ফুসরত জন্মেছে তখন থেকেই এই দিন-রাত্রি, গ্রহ নক্ষত্র আকাশ আর মানুষের চিন্তার অন্ত ছিল না। কৌতুহলের সীমা ছিল না। আজও এর সীমা নেই। মানুষের এই জানতে চাওয়াই মানুষের মানুষ হয়ে ওঠা। তবে প্রাচীনকালে মানুষের মনে পৃথিবীর এই বিস্তৃতি বিরাটত্বের দাবিদার ছিল। প্রাচীনকালে কোথাও মানুষ মনে করত পৃথিবী সমতল থালার মত মহাসমুদ্রে পানির ওপর ভাসমান কোথাও মনে করত চ্যাপ্টা থালার মত, যা একটি হাতির শুরের উপর ভর করে আছে। হাতিটি আছে আবার একটি কচ্ছপের উপর। মূলত প্রাচীন সমস্ত ধারনা এরকমই। সমস্ত ধারনাই পৃথিবী কেন্দ্রে রয়েছে। আমরা এখনে দেখার চেষ্ঠা করব সময়ের পরিক্রমার সাথে পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে মানুষ মহাবিশ্বের রহস্যময় সমস্যা ও ঘটনাবলীর ব্যাখ্যাগুলো কিভাবে দিচ্ছে, দিয়ে চলেছে।

প্রথমেই যদি বলি তাহলে বলতে হয় মহাবিশ্ব সম্পর্কিত অ্যারিস্টটলীয় ধারনা। তাঁরও চিন্তায় মহাবিশ্বের কেন্দ্র ছিল পৃথিবী। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন পৃথিবী চ্যাপ্টা থালার মত নয়। ৩৪০ খ্রি পূর্বে চন্দ্রগ্রহন পর্যবেক্ষন করে বুঝেছিলেন যে পৃথিবীর ছায়াই মূলত চাঁদে পড়ার করনে চন্দ্রগ্রহন হয় যদি পৃথিবী চ্যাপ্টা থালার মত হত তবে কখনোই ছায়া ঠিক বৃত্তাকার হতো না। হতো উপবৃত্তাকার। আর দুরবর্তী জাহাজের আগে পাল দেখা যায় পরে কাঠামো দৃশ্যমান হয়। পৃথিবী গোলাকার না হলে এমনটা হত না। তিনি বলেছিলেন চাঁদ, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই আবার্তিত হয়। অর্থাৎ এখানে পৃথিবীর বৃহৎ ও স্থির। টলেমীও একই মত পোষন করেন। তিনি পৃথিবী কেন্দ্রিক এমন এক মহাবিশ্বের রূপরেখা তৈরি করেন যেখানে জটিল গতির মাধ্যমে গ্রহ-নক্ষত্রগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিন করে। কিন্তু এদের এ জটিল গতির ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হয়নি, তবে এ সম্পর্কে খানিক ভবিষ্যৎবানী করার চলে। ১৫১৪ সালে নিকোলাস কোপারনিকাস একটি সরলতম মডেল উপস্থাপন করেন। এখানে তিনি দেখান পৃথিবী  নয়, পৃথিবী সহ সমস্ত গ্রহ সূর্যকে কেন্দ্র করে কতগুলো বৃত্তাকার পথে পরিভ্রমন করে। অ্যারিস্টটলীয় মতবাদ বাইবেলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধায় কোপারনিকাসের মত প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। তবে অ্যারিস্টটলীয়-টলেমীয় তত্ত্বের উপর মরন আঘাত আসে ১৬০৯ সালে। সে বছর গ্যালিলিও সদ্য আবিষ্কৃত দূরবীক্ষন যন্ত্র দিয়ে বৃহষ্পতির চাঁদ পর্যবেক্ষন করতে গিয়ে দেখেন সেগুলো আসলে বৃহষ্পতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। এদের তো পৃথিবীকে আবর্তন করা উচিৎ! কিন্তু তাতো হচ্ছে না। এরপর জোহান কেপলার গ্রহের বৃত্তাকার কক্ষের পরিবর্তে উপবৃত্তকার গতি কল্পনা করে যে প্রতিরূপ দিলেন তা গ্রহের গতি সম্পর্কিত ভবিষ্যৎবানীর সাথে পুরোপুরি মিলে গেল। কিন্তু অ্যারিস্টিটল-টলেমীর তত্ত্বের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা তখনও বাঁকি ছিল। ১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দে নিউটন তার অমরগ্রন্থ ‘ফিলোজফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা’য় সর্বব্যাপী এক বল, যাকে বলা হয়েছে মহাকর্ষ বল, এই বলের বর্ণনা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মূলত বোঝা গেল গ্রহগুলো কেন সূর্যের চারিদিকে আবর্তনশীল। এ বল মহাবিশ্বের সকল বস্তুর মধ্যে আকর্ষন রূপে কার্যকর রয়েছে। তিনি দূরবর্তী তারাকে ক্ষুদ্র জোতিষ্ক না বলে তাদেরকেও সূর্যের মত নক্ষত্র বলে অভিহিত করেছেন।

অ্যারিস্টটল এবং টলেমির ধারনায় মহাবিশ্ব

মহাবিশ্বের বর্ণনাকারী এবং এই দুই প্রতিরূপের গোরাপত্তনকারী অ্যরিস্টটল ও নিউটন দুজনেই মনে করেন মহাবিশ্বের শুরু নেই, তা স্থির, স্থিত। এখানেই প্রশ্নের সম্মুখীন হন নিউটন, মহাবিশ্ব যদি স্থির হয় তাহলে নক্ষত্রের আকর্ষনের ফলে কোন এক সময় সমস্ত নক্ষত্র একটি বিন্দুতে পরিনত হওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে না।  তাহলে? নিউটন বললেন মহাবিশ্বের পরিধি অসীম ফলে গড়পড়তা সব জায়গা থেকেই আকর্ষন সমান অনুভূত হয়। ফলে কোন একটি বিন্দুতে মহাবিশ্বের পতন হবে না। কিন্তু এখানে আরও প্রশ্ন আসে, মহাবিশ্ব যদি অসীমে বিস্তৃত হয়, তবে আমাদের নিকট থেকে দূর পর্যন্ত আকাশে এত সংখ্যক নক্ষত্র থাকতে হবে যে আমাদের দৃষ্টি সীমায় নক্ষত্র ব্যাতীত কোন বিন্দু থাকার কথা নয়। এবং রাতের আকাশ দিনের আকাশের মতই উজ্জ্বল হওয়ারর কথা। তাহলে ? এর উত্তর সব জায়গায় নক্ষত্র থাকলেও কিছু নক্ষত্র উজ্জ্বলতা হারিয়েছে। ফলে তাদের আর দেখা যায় না। তার মানে এরা স্থির, স্থিত নয়। তাহলে এদেরও জীবনকাল সীমিত, অসীম নয়। এদের জীবন কালের শুরু থাকতে হবে! ফলে মহাবিশ্ব অসীম, স্থির, স্থিত নয়। এরকম ভাবাও সঠিক নয়।

নক্ষত্রগুলো আসলেই এক সময়ে সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের এ মহাবিশ্বে ছড়ানো ছিল হাইড্রোজেন ধোয়ার মেঘ। এদের ঘনত্ব সব জায়গায় সমান ছিল না, কোথাও ঘনত্ব বেশী আর কোথাও ছিল ঘনত্ব কম ছিল। ফলে অধিক ঘন অঞ্চলের মেঘ মাহাকর্ষীয় আকর্ষন বল দ্বারা আকর্ষিত হয়ে কোন এক বিন্দুকে কেন্দ্র করে সম্মিলিত হতে শুরু করে একটি গোলক তৈরী করে। মহাকর্ষীয় বলে এটি ভেতরের দিকে সংকুচিত হতে থাকে। ফলে এদের অভ্যন্তরে হাইড্রোজেন বল পরষ্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং একে অপর থেকে দূরে সরে যেতে চায় ফলে তারা প্রচন্ড উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এই উত্তাপ বাড়তে বাড়তে যদি এক লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মত তাপমাত্রায় পৌছায় তবে সংঘর্ষে হাইড্রোজেন পরমানু গুলোর দূরত্ব না বেড়ে বরঞ্চ এদের নিউক্লিয়াস পরষ্পর যুক্ত হয়ে হিলিসিয়াম পরমানুতে পরিনত হতে শুরু করে। এ ঘটনাটি অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হাইড্রোজেন বোমার মত। এর ফলে বস্তুপিন্ডটির অভ্যন্তরে প্রচন্ড চাপ ও তাপ উৎপন্ন হয়। এক সময় বহির্মূখী এ চাঁপ অন্তর্মূখী মহাকার্ষীয় চাঁপ পরষ্পর সমান হয় এবং বস্তু পিন্ডটি স্থিতাবস্থায় পৌছায় এবং দ্যোতি ছড়াতে শুরু করে। এটাই তখন নক্ষত্রে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। একটি নীহারিকায় এরকম অসংখ্য নক্ষত্র তৈরী হয় এবং অসংখ্য নক্ষত্র আবার একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে আবর্তনশীল থাকে। এই আবর্তনীয় নক্ষত্র মন্ডলিকে বলা হয় ছায়াপথ। আমাদের সূর্যও একটি ছায়াপথের সদস্য, এর নাম মিল্কিওয়ে। একটি ছায়াপথে আড়াআড়ি মাপে প্রায় এক লক্ষ আলোক বর্ষ হবে। আলোক বর্ষ হলো আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে। মনে রাখতে হবে আলো সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার পথ পরিভ্রমন করে। তাহলে বুঝুন একেকটি ছায়াপথ বা গ্যালক্সির মাপ কত বড়। প্রত্যেকটি গ্যালাক্সিতে প্রায় এক লক্ষ মিলিয়ন (১০১১ টি) নক্ষত্র রয়েছে। সাম্প্রতিক (২০১৬) তথ্যমতে আমাদের এ মহাবিশ্বে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ( ২×১০১৩ টি) ছায়াপথ রয়েছে। ছায়পথ যে নক্ষত্র মন্ডলী দ্বারা গঠিত একসময় এদের জ্বালানী শেষ হয়ে যায়। ফলে তাকে নতুন পরিনতি গ্রহন করতে হয়। তবে কোন নক্ষত্রটি সময় ধরে দ্বীপ্তি ছড়াবে তা এর ভরের উপর নির্ভর করবে। বেশি ভরের বস্তুর মহাকষীয় চাপ বেশি ফলে নক্ষত্রটি সামাবস্থাে হাসতে এর অভ্যান্তরে বেশি পরিমান জ্বালানী খরচ করে বহিমূখী চাপ তৈরী করতে হয়। ফলে নক্ষত্রটি খুব তাড়াতাড়ি জ্বালানি খরচ করে ফেলেন এবং ঐ অন্যদের থেকে বেশি থাকে। নক্ষত্রটিকে নতুন জীবচক্রে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু নক্ষত্রের কপাল এরপর কি ঘটে তা একটু পরে বর্ণনা করব।

১৯২৪ সালের পূর্বে আমরা জানতাম মিল্বিওয়ে গ্যালিক্সিই আমাদের মহাবিশ্বের শেষ সীমানা। কিন্তু সে বছর এডুইন হাবল গ্যালাক্সি দেখতে পান আসলে মিল্কিওয়ে ছাড়াও আরও গ্যালাক্সি রয়েছে যার সনাক্তকরন বর্তমানেও চলমান রয়েছে। এই হাবলই এক সময় এমন একটা ঘটনা পর্যবেক্ষন করে বসলেন যাতে যারা স্থিত মহাবিশ্বর কথা কল্পনা করেছিলেন তাদের কপালের ভাজ আরও দৃঢ় হল। ১৯২৯ সালে হাবল পর্যবেক্ষন করলেন যে গ্যালাক্সী যত দুরে অবস্থিত তার দূরাপসারনের হারও তত বেশি। অন্য ভাষার বলা চলে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারমান। তাহলে বলা চলে বিপরীতক্রমে আমাদের এ মহাবিশ্ব কোন এক সময় কোন এব বিন্দুতে সংকুচিত ছিল। সেখান থেকে প্রসারিত হতে হতে বর্তমানে প্রসারমান মহাবিশ্বে পরিনত হয়েছে এবং হচ্ছে।

মহাবিশ্বের পরিবর্তনের সাথে আমাদের এ মহাবিশ্বের স্থান-কালেরও ধারনায় এসেছে পরিবর্তন। অ্যারিস্টটল মনে করেছেন কোন ঘটনা ঘটার ক্ষেত্রে যেকোন পর্যবেক্ষক যে অবস্থানেই থাকুক না কেন উভয়ের সাপেক্ষেই ঘটনার অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিতে স্থান ও কাল ধ্রুব। নিউটন তার গতি তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্থান ও কালকে ধ্রুবক রাখার সর্বান্ত চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পরেননি। একটি ট্রেনের সাপেক্ষে ঘটনাটি বর্ণনা করা চলে। ধরি ট্রেনটি সেকেন্ডে ৪০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। ট্রেনে বসে একজন একটি বল ঠিক উপরে ছুড়ে মেরে আবার হাত দিয়ে ধরছেন। ধরা যাক বলটি এক সেকেন্ড শূণ্যে ভেসে ছিল। ঘটনাটি কিন্তু ট্রেনের কোন যাত্রী দেখবে বলটি শুধু উপরে উঠছে আর নিচে নামছে। বলটি ট্রেনের অভ্যন্তরীণ কোন কিছুর তুলনায়ই সামনে বা পিছনে এগোয়নি কিন্তু ট্রেনের বাইরে স্থির কোন ব্যক্তি দেখবেন এক সেকেন্ডে ট্রেনটি ৪০ মিটার অতিক্রম করেছে । ফলে বলটি ছোড়ার পর ধরার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত বলটি ৪০ মিটার সামনে এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ একই ঘটনায় দূরত্ব অতিক্রম দুই রকম দেখা গেল। অর্থাৎ স্থানের পরিমাপ বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের কাছে বিভিন্ন হল। নিউটন শেষ পর্যন্ত— কিন্তু ধরে নিয়েছিলেন স্থানের পরিমাপ ভিন্ন হলেও সময়ের ব্যবধান সবার ক্ষেত্রে সমান হবে। এখানেই বাধ সেধে বসেলন আইনস্টাইন। তিঁনি তার বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে দেখার স্থান, কাল,ভর আসলে আপেক্ষিক ভিন্ন বেগে চলমান দুজন পর্যবেক্ষকের কাছে একই ঘটনা ঘটার স্থানের পরিমাপের ভিন্নতার সাথে সময়ের ব্যবধানও ভিন্ন হবে। অর্থাৎ একই ঘটনা ঘটতে ট্রেনের যাত্রীর ঘড়িতে যে সময় নিবে বাইরে স্থির ব্যক্তির ঘড়িতে সময় তার চাইতে বেশি নিবে অবশ্য যদি দুজনেরই ঘড়ি একেবার নির্ভুল হয়। তবে সময়ের এই ব্যবধান আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে প্রভাব ফেলে না। তবে আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে চলমান বস্তুর ক্ষেত্রে এই ব্যবধান মোটেই অগ্রাহ্য করা যায় না। তবে এখানে আরও একটু বলে রাখি আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রদানের পূর্বে মহাবিশ্বর মাত্রা মনে করা হত তিনটি, যথা স্থানের তিনটি মাত্রা। আপেক্ষিক তত্ত্বেই সময়কে স্থানের সাথে একটি মাত্রা হিসেবে উল্লেখ করে তৎকালীন সময়ের উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানাকাশে যে সংকট দেখা দিয়েছিল তা পরিপূর্ণ রূপেই সমাধা করা সম্ভব হয়।

গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে আবিষ্কৃত দুটি মূলগত আংশিত তত্ত্বের বাগ্বিধিতে মহাবিশ্বের বিবরন দান করা হয়। একটি তত্ত্ব আপেক্ষিক তত্ত্ব তথা সাধারন আপেক্ষিক তত্ত্ব এবং অপরটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। সাধারন আপেক্ষিক তত্ত্ব মহাবিশ্বের বৃহৎ মানের গঠন ও মহাকার্ষীয় বল নিয়ে আলোচনা করে। এ মাপ কয়েক মাইল থেকে শুরু করে মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন (১০২৪ ) মাইল পর্যন্ত বা তারও অধিক পাল্লায় বিস্তৃত। অপরদিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কাজ হল ক্ষুদ্র পরিসরের ক্ষেত্রে। এক ইঞ্চির এক মিলিয়ন ভাগেরও এক মিলিয়ন ভাগ নিয়ে। অর্থাৎ একটি বৃহৎ মানের সীমায় কাজ করে, অপরটি করে ঠিক অতি ক্ষুদ্র মানের সীমায় তবে দুটা তত্ত্বকে সূত্রে সূত্রায়িত করা সম্ভব হয়নি এখনও। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব মতে মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তু যেকোন অবস্থার তুলনায় আলোর বেগ ধ্রুবক। যেকোন পর্যবেক্ষক সে স্থির কিবা গতিশীল তার কাছে সব সময় আলোর বেগ (৩^১০৮ মিটার/সেকেন্ড) একই মানের প্রতীয়মান হবে (তত্ত্ব প্রদানের আগেই এটি প্রমানিত)। এর সাথে তুলনা করেই স্থান, কাল ও ভরের আপেক্ষিকতা ভিন্ন ভিন্ন পর্যবেক্ষকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন মাপে পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ স্বাতন্ত্র ব্যক্তির স্থান-কাল অন্যদের থেকে স্বাতন্ত্র। ১৯১৫ সালের পূর্বে ধারনা ছিল স্থান-কাল একটি স্থির ক্ষেত্র, মহাবিশ্বের কোন ঘটনা দ্বারা এটি প্রভাবিত হয় না। কিন্তু ঐ বছরে আনষ্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রদানের ফলে দেখা যায় বস্তু এবং তার গতি দ্বারা স্থান-কাল প্রভাবিত হয়। স্থান-কাল এই চার মাত্রা নিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষনযোগ্য মহাবিশ্ব। চারটি মাত্রা প্রতিসম এবং একে অপরের উপর লম্ব। আমাদের দৃশ্যমান তিন মাত্রার জগতে পরষ্পর লম্ব চার মাত্রা আমরা দেখতে এবং কল্পনাও করতে পারি না যা আপেক্ষিক তত্ত্বকে এক প্রহোলিকায় পরিনত করেছে। যাই হোক কোন বস্তু তার ভর যত বেশি ভারী হবে সে তার চারপাশের স্থান-কালকে নিজের দিকে তত বক্র করে নিবে। কোন বস্তু তার চারপাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ঐ বক্রপথ দিয়ে গমনের ফলে তার গতিও বক্রগতি হবে। বাস্তবিক পক্ষে বস্তুটি স্থান-কালকে তার সাপেক্ষে সব সময়ই সমতল মনে করবে। এখানে ঐ আপাত বক্র পথটাই হবে তার জন্যে সবচেয়ে সোজা পথ। বস্তু যত ভারি হবে তার চারপাশের স্থান-কাল তত বেশি বক্র হয়ে ভিতরে ঢুকে যাবে। ফলে কোন বস্তু ভারি বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় স্থান কালের বক্রতায় অভ্যন্তরে পতিত হবে। এটাই ছিল নিউটনের মহাকর্ষীয় বল। গ্রহগুলো মূলত তার গতিপথে চারমাত্রার সোজা পথেই চলছে কিন্তু সূর্যের চারপাশের স্থান-কালের বক্রতা আমাদের স্থানের তিন মাত্রার জগতে বক্রই দেখাচ্ছে। ফলে তাকে আমরা বৃত্তাকার পথে গতিশীল দেখেছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে তাদের এটাই হল চলার সবচেয়ে সোজা পথ। আর এই স্থান-কালের বক্রতার ফলই হল নিউটনের মহাকর্ষ বল। সাধারন আপেক্ষিক তত্ত্বের সত্যতা পরিক্ষা জন্য ১৯৯৯ সালে ব্রিটিশ এক অভিযাত্রি দল পশ্চিম আফ্রিকায় এক গ্রহন পর্যবেক্ষন করে দেখছিলেন আলো সত্যিই সূর্যের পাশ দিয়ে আসার সময় বেঁকে যায়। অর্থাৎ আপেক্ষিক তত্ত্বের সত্যতা হাতে হাতেই প্রমানিত হল। এ তত্ত্বের মাধ্যমেই বুধ গ্রহের কক্ষপথের বিচ্যুতিরও সঠিক ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হয়েছে। অপর দিকে ক্ষুদ্র পরিসরে আপেক্ষি তত্ত্ব কিন্তু ঠিক কাজ করে না। এখানে রাজত্ব করে কোয়াল্টাম বলবিদ্যা। এ তত্ত্ব মতে মহা বিশের¦ বা কিন্তু রয়েয়ে সমস্তই কনা দিয়ে গঠিত। বস্তু এবং শক্তি সবাই কনার সমষ্টি। বস্তু কনাকে বলা হয় ফার্মিয়ন এবং শক্তি কনাকে বলা হয় বোসন। বোসন নামটি এসেছে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিজ্ঞানী সত্যেন বোসেন নামানুসারে। বস্তু কনা অর্পবর্জন নীতি নামক পলির বর্জন নীতি অনুসরন করে। শর্তমতে একই বৈশিষ্ট্যে সম্পন্ন দুটি কনা পলির বর্জননীতি তথা অপবর্জন নীতির কারনে কখনোই একই কোয়ান্টাম সীমনার সহাবস্থান করতে পারে না। বোসন কনার ক্ষেত্রে এ বালাই নেই। মহাবিশ্বর শুরু থেকে এসকল কনা ছিল এবং এখনও আছে। প্রত্যেকটা কনার নিদিষ্ট ইতিহাস আছে। কোন স্থানে এদের ধ্বংস হওয়ার নীতিসিদ্ধি নয়। তবে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুসারে এদের একশ শতাংশ নিশ্চিৎ অবস্থাও জানা কখনো সম্ভব নয়।

এবার আসি নক্ষত্রের কথায়। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে জ্বালানী যতদিন থাকবে সে ততদিন স্থিতিশীলভাবে আলোক বিকিরন করে যাবে। এক সময় এর জ্বালানীও ফুরিয়ে আসবে। তখন তার স্থিতিশীল অবস্থা আর থাকবে না। অভ্যন্তরীন চাপ না থাকার কারনে নক্ষত্রটি চুপসে যেতে থাকবে। ফলে এর কেন্দ্র পুনরায় উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকবে। নক্ষত্রের আকার যদি সূর্যের আকারের দেড়গুন অপেক্ষা ছোট হয় তবে বস্তুকনার অপবর্জনীয় বিকর্ষনের কারনে পুনরায় সম্প্রসারিত হতে থাকবে। এক সময় এটি উত্তাপে সাদা রং ধারন করবে। এই অবস্থাকে বলা হয় শ্বেত বামন। এর জ্বালানী না থাকার কারনে এর তাপ উৎপাদনের উৎস আর থাকবে না ফলে এক সময় এটি তাপ বিকিরন করতে করতে শীতল ও অনুজ্জ্বল অবস্থায় এসে দাড়াবে তখন একে বলা হয় কৃষ্ণ বামন। তৎকালীন সময়ে আপেক্ষিক তত্ত্ব বোঝা লোকের সংখ্যা খুবই কম ছিল। এর মধ্যে ভারতীয় একজন গ্রাজুয়েট ছাত্র সুব্রহ্মন্যম চন্দ্র শেখর আপেক্ষিক তত্ত্ব ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন। ১৯২৮ খ্রিঃ তিনি ইউরোপে গবেষনা করতে যাওয়ার সময় জাহাজে বসে হিসাব কষে দেখলেন অপবর্জনীয় বিকর্ষনের একটা সীমা আছে। ঐ সীমার বাইরের ভরের কোন বস্তুর জ্বালানী ফুরিয়ে যাওয়ার পর নিজেদের চুপসে যাওয়া থামানো যাবে না। এ প্রস্তাব তার শিক্ষক আর্থার এডিংটনের সামনে উপস্থাপন করলে তিনি তা অবজ্ঞা ভরে প্রত্যাখান করলেন। এই ঘটনায় চন্দ্র শেখর এতই মর্মামত হলেন যে তিনি এ বিষয়ে গবেষনা রেখে অন্য বিষয় নিয়ে গবেষনায় মনোযোগ দিলেন। ১৯৮৩ সালে কিন্তু তিনি এ গবেষনার জন্যই নোবেল পুরুষ্কার পেয়েছিলেন। পরে এক ধরনের নক্ষত্র আবিষ্কৃত হল পালসার নামে পরিচিত নিউটন নক্ষত্র। এর ভর সূর্যের ভরের দেড় গুন থেকে তিন গুনের মধ্যে হয়ে থাকে। এদের জ্বালানী ফুরিয়ে গেলে এরা চুপসে যেতে শুরু করলে ইলেকট্রনের অপবর্জন এদের চুপনসানোয় বাধা দিতে পারে না। ফলে তারা পরমানুর কেন্দ্রে পতিত হয় এবং প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়ে নিউটনে পরিনত হয়। তখন সমস্ত নক্ষত্রটি নিউট্রন কনার ঘন কেন্দ্রে পরিনত হয় এ নক্ষত্রের ব্যাসার্ধ সাধারনত দশ মাইলের মত হয়ে থাকে। এর প্রতি ঘন ইঞ্চিতে ভর থাকে কয়েক কোটি টনের মত। তারকার যে ভরসীমায় নক্ষত্রটি নিজের চুপসে যাওয়ার সময় অপবর্জন নীতি অতিক্রম করতে পারে সে সীমাকে বলা হয় চন্দ্র শেখর সীমা।

নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের তিনগুন বা তার বেশি হয় তবে তার কী হবে? এ হিসাবে আসছি। তার আগে বলে রাখি কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল (Black Hole) সম্পর্কে আমরা অনেকেই কম বেশি শুনেছি। রোমার যখন দেখলেন আলোর বেগ ধ্রুবক তখন ১৮৮৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন মিচেলসন নামের একজন ডন প্রকাশ করলেন মহাবিশ্বে এমন এক নক্ষত্র থাকতে পারে যার ভর এত বেশী হবে যে যার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র অতিক্রম করে আলোও বের হয়ে আসতে পারবে না। এর আকর্ষনীয় বলের মান আলোর বেগকেও হার মানাবে। এর পূর্বেও এ সম্পর্কে ধারনা ছিল। তবে এটি ছিল মূলত একটি ধারনার নক্সা। ব্ল্যাক হোল (Black Hole) বা কৃষ্ণগহ্বর শব্দটি প্রথমে ব্যবহৃত হয় ১৯৬৯ সালে। জন হুইলার নামে মার্কিন এক বিজ্ঞানী এই শব্দটি প্রবর্তন করেন। চন্দ্র শেখরের গননা মতে অপবর্জনকে অতিক্রমকারী জ্বালানীবিহীন নক্ষত্র অসীমে চুপসে যাওয়ার কথা। অর্থাৎ আয়তন শূণ্য হওয়ার কথা। ফলে এর প্রতিরূপ কী হবে এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মহলে সংশয় ছিল। আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে ১৯৩৯ সালে সে সমস্যার সমাধান করেছিলেন আরেক আমিরিকান বিজ্ঞানী ওপনহাইমার। তার আরেকটা পরিচয় আছে তা হলো তিনি পারমানবিক বোমারও উদ্ভাবক। সূর্যের ভরের তিন গুনের বেশী ভারী নক্ষত্রের  জ্বালানী ফুরিয়ে গেলে এটি চুপসে যেতে শুরু করে এবং এর চুপসানো অবর্জনীয় চাপও রুখতে পারে না। ফলে এটি এমন এক অবস্থায় এসে পতিত হয় যখন এর ঘনত্ব হয় প্রায় অসীম। তখন এর চারপাশের স্থান-কাল অত্যন্ত বক্র হয়ে যায় এবং এর চারপাশে একটা সীমা পর্যন্ত স্থান-কালের বক্রতা হয় অসীম। ঐ সীমা পর্যন্ত প্রচলিত অভিকর্ষ বলের মান এত বেশী হয় যে, আলোও সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। এই সীমানাকে বলা হয় ঘটনা দিগন্ত (Event Horizon)। কোন নক্ষত্রের ভর জানা থাকলে তার ব্যসার্ধ কত হলে সেটি কৃষ্ণহ্বরে পরিনত হবে সে সম্পর্কে ১৯১৭ সালে একটি সমীকরন প্রদান করেছিলেন বিজ্ঞানী শোয়ার্জচাইল্ড। ব্যসার্ধটি হল  , এখানে M নক্ষত্রের ভর, c আলোর বেগ এবং G মহাকর্ষীয় ধ্রুবক। এই ব্যসার্ধকে বলা হয় শোয়ার্জচাইল্ড ব্যাসার্ধ। তবে এখানে আমি একটু বলে রাখি, আমিও স্বতন্ত্রভাবে একটি হিসেব বের করেছিলাম। সেটা ছিল শোয়ার্জচাইল্ড থেকে একটু এগিয়ে, সেখানে দেখিয়েছিলাম যেকোন বস্তুপিন্ডকে কৃষ্ণগহ্বরে পরিনত হতে হলে সেটির ব্যাস এমন হবে যে তার ব্যাসার্ধ হ্রাস পেয়ে ভরের ১.৩^১০২৭ ভাগের এক ভাগ হতে হবে। তবে উভয় ক্ষেত্রে মূল সমীকরন মূলত একটাই। কৃষ্ণ গহ্বরের মহাকর্ষ বল তার চারপাশে এত বেশী অনুভুত হবে যে কোন কিছুই সেখান থেকে বের হতে পারবে না। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং দেখিয়েছেন ঘটনা দিগন্তের অভ্যন্তরে একটি অনন্যতা (Singularity) সৃষ্টি হবে। সেখানে আমাদের চেনা এ জগতের কোন নিঅনন্যতায়মই কার্যকর হবে না, সকল বিধি ভেঙ্গে পড়বে। ঘটনা দিগন্ত থেকে অভ্যন্তরে স্থান কালের মাত্রার থাকার কথা অসীম বক্র। মহাবিশ্ব আলোর দ্রুতিই সর্বোচ্চ দ্রুতি । সেখানে এ দ্রুতি নিয়ে আলোও বের হয়ে আসতে পারবে না। ফলে আর কোন কিছুরই সেখান থেকে বের হওয়া অসম্ভব। কবি দান্তে নরকের প্রবেশ দ্বার সম্পর্কে বলেছিলেন “যারা এখানে প্রবেশ করেছো তারা পরিত্যাগ করো সমস্ত আশা”। ঠিক একই কথা কৃষ্ণগহ্বরের  ঘটনা দিগন্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোন মহাকাশচারী যদি দূরে কোন পর্যবেক্ষককে রেখে কৃষ্ণগহ্বরের দিকে এগিয়ে যায় এবং প্রতি সেকেন্ডে যদি একটি করে সংকেত পাঠানোর কথা থাকে তবে মহাকাশচারী যতই এগিয়ে যাবে বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে দুটি সংকেতের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান বাড়তে থাকবে। কারন কৃষ্ণগহ্বরের নিকট দিকে সময়ের মাত্রা বক্র হয়ে যতই কাছে যাওয়া যায় সময় ততই ধীর হতে থাকবে এবং ঘটনা দিগন্তে সময় অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে। এ কারনেই মাহাকাশচারীর কাছে এক সেকেন্ড সময়ের ব্যবধান বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে এক সেকেন্ড অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ সময়ে পরিনত হবে। যখন মহাকাশচারী ঘটনা দিগন্ত ঘেষে অবস্থান করবে তখন পর্যবেক্ষক পরবর্তী সংকেত পাওয়ার জন্য অসীমকাল যাবৎ অপেক্ষা করতে হবে। বাস্তবিক পক্ষেই কোন ব্যক্তি যদি কৃষ্ণগহ্বরের দিকে অগ্রসর হয় তবে ঘটনা দিগন্তের নিকটে মহাকর্ষ বলের মান এত বেশি হবে যে তার পা এবং মাথার মধ্যে মহাকর্ষ বলের ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে এবং সে চিরে চ্যাপ্টা ও লম্বা সেমাইয়ের মত হয়ে অনন্যতায় প্রবেশ করবে। তবে সাধারন আপেক্ষিক তত্ত্বের  এমন কতগুলো সমাধান আছে যেখানে দেখানো যায় অনন্যতার ঠোকর না খেয়ে কোন নভোচারী কৃষ্ণগহ্বরে প্রবেশ করে বেরিয়ে যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে সে বেচারা কখনই অনন্যতা দেখতে পাবে না। সে যখন কৃষ্ণগহ্বরে প্রবেশ করবে তখন অনন্যতা থাকবে তার ভবিষ্যতে। আর প্রবেশ করার পর তার সময় স্থির হয়ে যাবে, এবং অপর প্রান্ত দিয়ে বের হয়ে যখন সময়ে চলতে থাকবেন তখন অনন্যতা থাকবে তার অতীতে। বেচারা অনন্যতার মধ্য দিয়ে গেলেও অনন্যতাকে কখনোই দেখতে পাবেন না। এটা অনেকটা আমরা যখন কোন ভিডিও দেখি তখন তার সময় আমাদের ঘড়ির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলে। কিন্তু যদি তাকে চধঁংব করে রাখা হয় এবং ঘন্টার পর ঘন্টা রেখে অন্য কোন সময়ে চালু করলে যে সময়ে চধঁংব হয়েছিল সে সময় থেকে যাত্রা শুরু করে মাঝের সময় তার উপর প্রভাব ফেলে না এটা তার সময়ও না। এক্ষেত্রে মাঝখানে সময় তার কাছে অস্তিত্বহীন, তারপর থেকেই তার যাত্রা। এক্ষেত্রে নভোচাড়ির ক্ষেত্রে নভোচারীর ভাগ্যে অনেকটা একই ঘটনা ঘটে।

এ পর্যন্ত কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে যা জানলাম তাতে মনে হচ্ছে কৃষ্ণগহ্বর কোন বিকিরনই বিকিরিত করতে পারে না। ফলে সেটি সর্বোচ্চ অন্ধকার ও শীতল হবে। সে কিছু হারাবে না তবে গ্রহন করবে। ফলে গ্রহন করার সাথে সাথেই তার ঘটনা দিগন্তের আয়তন বাড়বে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে কৃষ্ণগহ্বর কখনই ছোট হতে পারবে না কিন্তু আকারে বড় হতে থাকবে। এখানেই বাঁধ সাধে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র। যাকে বলতে পারি Philosophy of science। সমস্ত বিজ্ঞানের বিধিই শেষ পর্যন্ত উতরাতে পারবে যদি এই বিধি মেনে চলে। কোন ক্ষেত্রের বস্তু বা কনা গ্রহন করে তার আয়তন বাড়লে এন্ট্রপি তথা বিশৃঙ্খলা বাড়ার কথা। ফলে তাকে হতে হবে উত্তপ্ত। কিন্তু কৃষ্ণ গহ্বরের ক্ষেত্রে দেখছি এর উল্টোটা। তাহলে কী তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় বিধি এখানে লঙ্ঘিত হচ্ছে ? না, এর ব্যাখ্যাও করলেন হকিং। অনিশ্চয়তা নীতি অনুসারে সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি বিন্দুতে, যাকে আমরা পরমশূণ্য বলি সে সেখানেও প্রতিনিয়ত কনিকা ও প্রতিকনিকার ভার্চুয়াল জোড় গঠিত হচ্ছে এবং প্রায় ১০-৫ সেকেন্ডেই নিজেদের মধ্যে অন্তক্রিয়ায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনা ঠিক কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের বাইরেও ঘটছে। সেখানে কৃষ্ণগহ্বরের প্রচন্ড বলের কারনে ভার্চুয়াল কনিকা বাস্তব কনিকা রূপে কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের প্রান্ত এলাকা থেকে কৃষ্ণগহ্বরের বাইরের দিকে বেড়িয়ে আসে আর প্রতিকনিকা কৃষ্ণগহ্বরে পতিত হয়। যে কনিকাগুলো কৃষ্ণগহ্বরের প্রান্ত এলাকা থেকে বেড়িয়ে আসে তা প্রচন্ড গামারশ্মির বিকিরন সৃষ্টি করে। ফলে মনে হয় এ রশ্মিগুলো কৃষ্ণগহ্বর থেকে বেরিয়ে আসছে এবং তখন তাকে উত্তপ্ত মনে হয়। ফলে কৃষ্ণগহরকে আর সর্বোচ্চ অন্ধকার ও শীতল বলে মনে হয় না। এই যে বিকিরন বের হয়, একে বলা হয় হকিংস রেডিয়েশন। আর এর সাথে কৃষ্ণগহ্বরের অমরত্মের মৃত্যু ঘন্টাও বেজে উঠেছে। প্রতিকনিকা কৃষ্ণগহ্বরের অভ্যন্তরে ঢুকে এর আয়তন প্রতিনিয়ত ধ্বংস করছে। ফলে কৃষ্ণগহ্বর ধীরে ধীরে আয়তন ক্ষুদ্র করতে করতে এক সময় ক্রান্তি আয়তনে পৌছে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে বিষ্ফোরিত হয়ে শেষ হয়ে যায়। আর এই ব্যাখ্যা মতে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় বিধিও রক্ষিত হয়।

১৯৪৮ সালে বৈজ্ঞানিক জর্জ গ্যামো তার একজন ছাত্র র‍্যালফ আলফারের সাথে একটি বিখ্যাত গবেষনা পত্র প্রকাশ করেন। এখানে তিঁনি দেখান মহাবিশ্বের শুরুর চিত্র। মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল এক বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে বিষ্ফোরনের মাধ্যমে এক অত্যন্ত উত্তপ্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে এবং তা সময়ের সাথে প্রসারিত হয়েছে এবং প্রসারনের সাথে তাপমাত্রা হ্রাস পেয়ে  বর্তমান রূপ লাভ করেছে। এ ঘটনাই হলো মহা বিষ্ফোরন বা বিগ ব্যাং (Big Bang)। তাঁদের গবেষনা মতে মহাবিশ্বের সেই প্রাথমিক উত্তাপের অনুতরঙ্গ এখনও থাকার কথা তবে মহাবিশ্বের সম্প্রসারনের সাথে দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে পরিনত হওয়ায় এর তাপমাত্রা পরমশূণ্য তাপমাত্রার সাত আট কেলভিন উপরে থাকার কথা। তবে স্থিতিশীল মহাবিশ্বের যারা প্রবক্তা ছিলেন তারা বলতে শুরু করেন মহাবিশ্ব যদি এরকম মহাবিষ্ফোরিত অবস্থা থেকেই আরম্ভ হয় তবে এর ছাই ভষ্ম কিছুতো থাকতে হবে। ফলে তত্ত্বকে উৎরাতে হলে এর স্বপক্ষে প্রমান থাকা প্রয়োজন হয়ে দাড়াল। জর্জ গ্যামো যে লঘু অনুতরঙ্গের কথা বলেছিলেন তার খোজে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন পদার্থ বিজ্ঞানী বব ডিক ও জিমস পিবল কাজ করছিলেন। কিন্তু তার মধ্যেই চলে এলো সুসংবাদ। একই সময় ১৯৬৫ সালে আমেরিকার বেল ল্যাবরিটরিতে অর্নো পেঞ্জিয়াস এবং রবার্ট উইলসন পৃথিবীর বাইরে থেকে চলে আসা রেডিও তরঙ্গ সনাক্তকরনের জন্য দুটি স্পর্ষকাতর এ্যান্টেনা নিয়ে কাজ করছিলেন। তখন তারা খেয়াল করলেন একটা গোলযোগপূর্ণ তরঙ্গ কোন ভাবেই দূর করা যাচ্ছে না। এবং এটা সবদিক থেকে সমান ভাবেই আসছে। তারা অবচেতনেই মাহকাশের একটি বিষ্ময়কে আটকালেন । এটাই সেই বিগ ব্যাং এর ফলে ছড়িয়ে থাকা অনুতরঙ্গ। আমরাও এ অনুতরঙ্গ দর্শনের সঙ্গী হয়েছি। তবে বিব্রতকর অভিজ্ঞতা নিয়ে। আমরা যারা ক্যাবল টিভি চালাই না তাদের টিভিতে চ্যানেল চলে গেলে যে ঝিরঝির বা ক্যাবল টিভিতেও যে ঝিরঝির অবস্থা অনকে সময় থাকে, তা এই মহাবিষ্ফোরনের অনুতরঙ্গের ফল। এ আবিষ্কারের জন্য ১৯৭৮ সালে পেঞ্জিয়াস এবং উইলসন নোবেল পুরুষ্কার পান। বিগ ব্যাং এর প্রতিরূপ নিয়ে গবেষনা করে আপেক্ষিক তত্ত্বের ভিত্তিতে স্টিফেন হকিং দেখান, বিগ ব্যাং একটি অনন্য অবস্থা থেকে আরম্ভ হয়েছে। তখন এর অভ্যন্তরে বর্তমান পরিলক্ষিত মহাবিশ্বের কোন নিয়মই কার্যকরী ছিল না। ঠিক কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রের মত । বিষ্ফোরনের পূর্বে স্থান ও কালের কোন অস্তিত্ব ছিল না। স্থান এবং কালের যাত্রা বিষ্ফোরন থেকেই, স্পষ্ট করে বললে সময়ের কোন অস্তিত্ব ছিল না। সময়ের যাত্র তখন থেকেই। বিষ্ফোরনের পূর্বের অবস্থা ব্যখ্যা করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। তবে অনন্যতা ভঙ্গের পর যে মহাবিশ্বের প্রতিরূপ হওয়ার কথা তা সবদিক সুষম ভাবে বিকিরন ও কনার বন্টন সুষম হওয়ার কথা ছিল। প্রসারিত হয়ে যে অবস্থাতেই আসত মহাবিশ্বি সুষম ঘনত্বের একটি গোলীয় প্রতিসম রূপে আসার কথা ছিল। সেখানে কোন নক্ষত্রের সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল না। এর ব্যাখ্যা দিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের অনিশ্চয়তার নীতি দ্বারা। কনার এই অনিশ্চিত অবস্থানই বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্তযোগ্য কনার সংখ্যার তারতম্য সৃষ্টি করে। আর এর ফলেই এ বর্তমান রূপ।

কিন্তু বিজ্ঞানে এক জায়গাতেই সন্তুষ্টি নেই। বিগ ব্যাং নিয়েও এসেছে নানা প্রশ্ন। আদিম মহাবিশ্ব কেন এত উত্তপ্ত ছিল ? মহাবিশ্বের বিধি বা নিয়মগুলো কেন এমন হল ? বস্তুর প্রকাশিত ধর্মতো অন্য রকমও হতে পারতো। বিগ ব্যাং ঘটার এক সেকেন্ড পর যদি সম্প্রসারনের হার এক লক্ষ মিলিয়ন মিলিয়ন (১০১৭) ভাগের এক ভাগেরও কম হতো তবে মহাবিশ্ব বর্তমান রূপে আসার আগেই চুপসে যেতো। বৃহৎ মানে মহাবিশ্ব কেন সমরূপ ? মহাবিশ্বের তিনটি প্রতিরূপ হওয়ার কথা-বদ্ধ, উন্মুক্ত ও সমতল। বদ্ধ হলে সম্প্রসারন হার হ্রাস পেয়ে এক সময় চুপসে যাবে। উন্মুক্ত হলে সম্প্রসারিত হওয়ার হার এত বেশি হবে যে একসময় গ্রহ নক্ষত্র দূরে হারিয়ে যাবে যা কখনোই চুপসে যাবে না এবং এত দূরে যাবে যে, একটি নক্ষত্রের আলো আর কখনোই অপর নক্ষত্রে পৌছাবে না। আর তৃতীয়টি হল সমতল। এই প্রতিরূপে মহাবিশ্ব বদ্ধ আর উন্মুক্তের মাঝামাঝি একটা সমতা বজায় রেখে চলে। সম্প্রসারনের হার এমন হতে হবে যে মহাবিশ্বের ঘনত্ব এর সংকট ঘনত্বের সমান হয়। আমাদের মহাবিশ্ব এভাবেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। এখন মহাবিশ্ব কেন এই প্রতিরূপেই সম্প্রসারিত হচ্ছে এ প্রশ্ন এসে যায়। এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় অ্যালেন গুথের গবেষনা থেকে। তার মতে মহাবিশ্বের উৎপত্তি বিগ ব্যাং থেকে হয়নি। এর আগে স্ফীতি অবস্থা থেকে মহাবিশ্বের যাত্র শুরু। স্ফীতি তত্ত্ব মতে পূর্বকার প্রশ্নের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এ তত্ত্ব মতে মহাবিশ্ব একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় উত্তপ্ত ছিল না। আর মহাবিশ্ব বিভিন্ন প্রতিরূপে সম্প্রসারিত হতে পারে, আমাদের এ মহাবিশ্ব ব্যাতীত অন্যরকম মাহাবিশ্ব থাকার সম্ভাবনাও এ তত্ত্বে মেলে। বিভিন্ন মহাবিশ্বের মধ্যে আমাদের মহাবিশ্ব একটি। এর মধ্যে বিজ্ঞান আকাশে দেখা দিয়েছিল আরেক সমস্যা সম্প্রসারনের তুলনায় আমাদের মহাবিশ্বের ভর খুবই নগন্য। শেষে ২০০৫ সালের মধ্যে বিজ্ঞানীরা যে হিসাব পেলেন তাতে আমাদের এ মহাবিশ্বের দৃশ্যমান বস্তু ৪%, কৃষ্ণ বস্তু ২৩%, কৃষ্ণ শক্তি ৭৩%। অর্থাৎ আমাদের এ মহাবিশ্ব সমতল হওয়ার জন্য তা খাপে খাপে মিলে গেল। কিন্তু আরও একটি ব্যাপার পাওয়া গেল স্ফীতি তত্ত্ব মতে মহাবিশ্ব যে কোন অবস্থা থেকেই  যাত্র শুরু করুক না কেন, তার ঘনত্ব এক সময় সংকট ঘনত্বের সমান হবে। এ তত্ত্ব মতে মহাবিশ্বের প্রাথমিক অনন্য অবস্থাকেও এড়ানো যায়। ফাইনম্যানের ইতিহাসের যোগফল থেকে দেখা যায় একটি কনার একাধিক ইতিহাস থাকতে পারে, কোয়ান্টাম তত্ত্ব মতে সময়ের দিক পেছনের দিকে বাড়ালে অনন্যতাকে অতিক্রম করারও একটা সম্ভবনা থাকে। কোয়ান্টাম তত্ত্ব মতে স্থান ও কাল সমরূপ। পশ্চাতে বাড়ালে এদের এমন একটা রূপ পাওয়া যায় যেখানে স্থান ও কালের শুরু নেই। অর্থাৎ মহাবিশ্ব সীমিত কিন্তু সীমাহীন। অনকেটা পৃথিবী পৃষ্ঠের মত। এর কোন প্রান্ত নেই কিন্তু অসীম নয়। এরকম একটি হিসাব মতে দেখানো যায় মহাবিশ্বের আসলে শুরুও নাই শেষও নাই।

কৃষ্ণগহ্বরের ধারনা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও এর অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা-গবেষনার শেষ ছিল না। কৃষ্ণগহ্বর যেহেতু পর্যবেক্ষন করা যায়নি ফলে এটি বাস্তবেই কি আছে এ নিয়েও প্রশ্ন ছিল। আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, সব দিক দিয়েই একে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কৃষ্ণগহ্বর ও এর অনন্যতা এবং মাহাজাগতিক প্রহরা হিসেবে ঘটনা দিগন্তের ধারনা মূলত আপেক্ষিক তত্ত্বের স্বীকার্য প্রসুত। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব কিছু যায়গায় প্রশ্ন তৈরী হয়। আর তা হল মহাবিশ্বের সমস্ত কিছুই কনা দিয়ে গঠিত এবং এ কনার ইতিহাসও থাকবে, তার অস্তিত্ব কখনও বিলীন হবে না। কিন্তু আপেক্ষিক তত্ত্ব মতে কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্ত ভেদ করে যা কিছুই প্রবেশ করবে তার সমস্ত অস্তিত্বই বিলীন হওয়ার কথা। আরেকটি অনুযোগ হলো-ফায়ার বল ইফেক্ট। আপেক্ষিক তত্ত্ব মতে কোন বস্তু ঘটনা দিগন্ত ভেদ করে কৃষ্ণগহ্বরে পতিত হওয়ার সময় তার কাছে কোন আকষ্মিক পরিবর্তন অনুভূত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব মতে, ঘটনা দিগন্তে কোন কিছু প্রবেশ করলেই অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে বিকিরন ছড়াবে। অর্থাৎ ঘটনা দিগন্তটি ফায়ার বলের মত কাজ করবে। এ সকল বিষয় পর্যালোচনা করে স্টিফেন হকিং ২০১৫ সালে নতুন তত্ত্ব প্রদান করেন। তার ভাষ্যমতে ঘটনা দিগন্তের ভিতরে স্থান-কালের অসীম বক্রতা এবং বাইরে সীমিত বক্রতাকে বিভাজনকারী যে ঘটনা দিগন্ত আমরা কল্পনা করেছি সেটা আসলে ঠিক নয়। অসীম বক্রতা ও সীমিত বক্রতার সংযোগস্থল স্থিতিস্থাপক ভাবাটা ভুল। সেখানে একটি নমনীয় স্থান কালের একটি স্তর তৈরী হবে, যা ভেদ করে কোন বস্তুকনা মূলত অনন্যতায় প্রবেশ করবে না এবং তার ইতিহাসও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে না এ সীমানার নাম দিয়েছেন অ্যাপারেন্ট হরাইজন (Apparent Horizon)। সেখান থেকে কনা পুনরায় আবার ফিরে আসতে পারবে। এ তত্ত্ব প্রদানের মাধ্যমে তিঁনি দুটি অসামঞ্জস্যতাকারী তত্ত্বকে পাশাপাশি রেখে উভয়ের সংঘর্ষ থেকে বাঁচিয়ে দিলেন। কিন্তু একীভূত করতে পারলেন না। আর ২০১৫ সাল পর্যন্ত কৃষ্ণগহ্বর পর্যবেক্ষন করার মত কোন সৌভাগ্য মানুষ অর্জন করতে পারেনি। সাধারন আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে আইনস্টাইন ১৯১৫ সালে বলেছিলেন যে কোন বস্তু চলমান থাকলে সে স্থান কালের যে ফেব্রিকে তরঙ্গ সৃষ্টি করবে এবং এ তরঙ্গ আলোর যোগে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। ঠিক যেন পানিতে ভেসে চলমান কোন বস্তু চারিদিকে যে রকম তরঙ্গ সৃষ্টি করে সেরকম। তিনি দেখিয়েছিলেন পৃথিবী বা সূর্যের মত ভারী বস্তু এত লঘু তরঙ্গ উৎপন্ন করে যা হয়তোবা কখনো পর্যবেক্ষন করা যাবে না। আমাদের পৃথিবী চলার সময় একটি হাতঘড়ির ব্যাটারী যে হারে শক্তি ক্ষয় করে সে হারে শক্তি ক্ষয় করে স্থান-কাল তরঙ্গ সৃষ্টি করছে এবং প্রতিনিয়ত তার কক্ষপথ ক্ষুদ্র করছে। তবে তা এত সামান্য ভাবে যে তা পর্যবেক্ষন যোগ্য নয়। আইনস্টানের ভবিষ্যত বানীর পর ১০০ বছর মানুষের প্রযুক্তিগত জ্ঞান বৃদ্ধি পেয়েছে ফলে মানুষ এ তরঙ্গ পর্যবেক্ষনেরও যোগ্যতা অর্জন করেছে। অবশেষে ২০১৫ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর LIGO দুটি পরষ্পর আবর্তনশীল হয়ে এক সময়ে একত্রীভূত হওয়া দুটি কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষীয় তথা স্থান-কালের স্পন্দনের তরঙ্গ সনাক্ত করে। এদের একটি ছিল সূর্যের ভরের ২৯ গুন অপরটি ছিল সূর্যের ভরের ৩৬ গুন। অবশেষে শতবর্ষ পূর্বে আইনস্টাইনের ভবিষ্যতবানীকে সত্য প্রমানিত করে একই সাথে মানুষ প্রথমবারের মত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষন করতে সক্ষম হয়।

কিন্তু এখন মহাবিশ্ব ও বস্তুর অন্তনিহীত ধর্ম নিয়ে মানুষের ধারনার পূর্ণতা পুরোপুরি পায়নি। আপেক্ষিক তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বকে একীভূত করা সম্ভব হয় নি। তবে স্ট্রিং তত্ত্ব বা গ ঞযবধৎু নামে একটি তত্ত্ব এ বিষয়ে আমাদের সামনে বর্তমান আছে এ তথ্যমতে সমস্ত বস্তুকনাই স্ট্রিং নামক ক্ষুদ্র একমাত্রিক বিভিন্ন রকম সূত্রক বা সুতার সমষ্টি। এরা বিভিন্ন ভাবে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রকৃতি ও মাত্রার বস্তুকনা গঠন করে। এই তত্ত্বটাকে ধরে নিলে দুটি তত্ত্বের মধ্যেই সামাঞ্জস্য বিধান করা যায়। আর এ তত্ত্ব ভবিষ্যতবানী করে বস্তু শুধু চার মাত্রার নয়, ছয় দশ এমনকি একশ মাত্রার পর্যন্ত হতে পারে। সে হিসাবে গননা করলে আমাদের এ চার মাত্রিক মহাবিশ্ব ছাড়াও আরও বিভিন্ন মাত্রার বিভিন্ন প্রকৃতির কমপক্ষে ১০৫০০ টি অর্থাৎ ১ এর পরে ৫০০ টি শূণ্য দিলে যা হয় ততটি মহাবিশ্ব সম্ভব। সংখ্যাটা এত বড় যে আমরা তা অনুভবেও ভাবতে পারব না। একটা তুলনা দিলে ধারনা হতে পারে কিছুটা, আমাদের এই পৃথিবীতে যতগুলো বালুকনা রয়েছে ঠিক তত সংখ্যক যদি পৃথিবী থাকে, তবে প্রত্যেকটা পৃথিবীর সমস্ত বালিকনা মিলে যে সংখ্যা হয় তা ঐ সংখ্যার কাছে অত্যন্ত নগন্য। আবার আমাদের মহাবিশ্বের আকারের তুলনায় পৃথিবীর স্থান খুবই নগন্য। যেমন সমগ্র পৃথিবীর তুলনায় পৃথিবীর বুকে একটি বালিকনা যত ক্ষুদ্র, আমাদের এই মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের এই পৃথিবী তার থেকেও অধিক ক্ষুদ্র। আমাদের এই মহাবিশ্বে পৃথিবীর মত বাসযোগ্য কোটি কোটি গ্রহ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেখানে বাস্তবিকই কেউ বাস করছে কিনা আমরা তা জানি না। আমাদের এ পৃথিবী বাসযোগ্য হওয়া কোন দৈব ঘটনা নয়। অসংখ্য বিভিন্ন মহাবিশ্বের মধ্যে আমাদের এ মহাবিশ্ব একটা। আবার আমাদের এ মহাবিশ্বের অসংখ্য বিভিন্ন বৈশিষ্ঠের গ্রহের মধ্যে পৃথিবী একটা। অনেকটা এরকম, আপনি যদি পাঁচ ফুট দূরে একটি সরু সুতাকে লক্ষ্য করে একটি বালি নিক্ষেপ করেন তাহলে সঠিক নিশানায় পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু একমুঠি বালি নিক্ষেপ করলে বিভিন্ন গতির বালির মধ্যে কোন একটি বালি কনা লক্ষ্যকে আঘাত করবেই। তেমনি বিভিন্ন বৈশিষ্ঠ্যের মহাবিশ্ব আমাদের মহাবিশ্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ঠ্যের গ্রহের মধ্যে পৃথিবী বাসযোগ্য হওয়ার শর্ত পূরন করে ফেলেছে। এরকম হয়ত অসংখ্য গ্রহ পাওয়া যাবে যাদের কোন এক বা একাধিক বৈশিষ্ঠ্য পৃথিবীর কাছাকাছি। কিন্তু পৃথিবীই সমস্ত বৈশিষ্ঠ্যে বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে বিভিন্নতার মধ্যে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এতক্ষন শুরু থেকে মহাবিশ্বের বর্তমান রূপ পর্যন্ত বর্ণনা করেছি। এখন দেখব এর অন্তিম পরিনতি কি হতে পারে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম তার ‘The Ultimate Fate Of The Universe’- এ এ সম্পর্কে বলেছেন। তার মতে মহাবিশ্বের  সমস্ত নক্ষত্রেরই একসময় জ্বালানী শেষ হয়ে যাবে। তখন সমগ্র মহাবিশ্ব হয়ে পড়বে অন্ধকার, ধীরে ধীরে গ্রহ-নক্ষত্রগুলো বিভিন্ন কেন্দ্র জড়ো হতে থাকবে। নীহারিকা মেঘ পুঞ্জও এক সময় জড়ো হয়ে মেঘমালা পরিষ্কার করবে। তখন ঐ নক্ষত্র পুঞ্জ মহাকর্ষীয় বলে সংকুচিত হয়ে কৃষ্ণ গহ্বরে পরিনত হবে, আর যে বস্তুলো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকবে, তাদের ভরও যদি কৃষ্ণগহ্বরে পরিনত হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট না হয় তবে তারাও দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ‘টানেলিং ইফেক্ট’ নামক এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কৃষ্ণগহ্বরে পরিনত হবে। এবং এ কৃষ্ণগহ্বরগুলো হকিং বিকিরনের মাধ্যমে বিকিরন বিকীর্ণ করে একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবে। তখন সমগ্র অন্ধকার বিশ্বে শুধু থাকবে শক্তির বিকিরন। আইনস্টাইনের E=mc2 সূত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছি বস্তু এবং শক্তি মূলত একই জিনিস এবং সৃষ্টি মুহুর্তে শক্তি থেকে বস্তুর উৎপত্তি হয়েছে এবং সময়ের বিবর্তনে অবশিষ্ট বস্তুকেই বিভিন্ন পর্যায় পরিক্রম করে অন্তিম দশায় নিয়ে যাবে এবং সর্বশেষ জগৎ হবে বস্তুহীন।

 

সহায়ক উৎসসমূহ:

১| A Brief History of Time; Stephen W. Howking.
২| শূণ্য থেকে মহাবিশ্ব; অধ্যাপক মীজান রহমান, ড.অভিজিৎ রায়।
৩| Theory of Relativity; Albart Eainstain.
৪| Quantam Mechanics ; Professor A.M Harun-Ar-Rashid.
৫| The Grand Design; Stephen W.Hawking, Leonard Mlodinow
৬| কৃষ্ণ বিবর; জামান নজরুল ইসলাম।
৭| The Fourth Dimision; Facebook Group.
৮| বিভিন্ন আরও বই।
৯| Internet Browsing.

Facebook Comments

One thought on “মহাবিশ্বঃ বিস্ময়ের এক ইতিহাস

  • July 9, 2018 at 4:40 pm
    Permalink

    অনেক তথ্যসমৃদ্ধ, অসাধারণ গোছানো লিখা এবং লেখককে অনেক ধন্যবাদ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: