হোমো ডিউস – ধারাবাহিক অনুবাদ। পর্ব – ১

প্রথম অধ্যায়। পর্ব ১।

মানবতার নতুন কার্যবিধি

তৃতীয় মিলেনিয়ামের শুরুতে মানবতা চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে। কাল রাতে কিছু দুঃস্বপ্ন দেখেছিলো সে। বাথরুমে গিয়ে মানবতা তার মুখ ধুয়ে এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় এসে বসে। সে একটা ডায়েরী খোলে, যেখানে তার আজকের কার্যবিধি লেখা আছে।

হাজার বছর ধরে উত্তর অপরিবর্তিত থেকেছে। বিশ শতকের চিন, মধ্যযুগীয় ভারত আর প্রাচীন মিশর যে একই সমস্যাগুলোর বারবার মুখোমুখি হয়েছিলো সেগুলো হলো দূর্ভিক্ষ, মহামারী এবং যুদ্ধ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষেরা দেবতাদের কাছে এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাবার জন্য প্রার্থনা চালিয়ে গেছে, তবু মুক্তি মেলেনি। বরং ধর্মের নাম করে তথাকথিত ‘দেবদূত’-রা বোকা মানুষকে ভয় দেখিয়ে এগুলোকে ইশ্বরের ইচ্ছা বলে অভিহিত করেছে।

তবে বর্তমান পৃথিবীতে গত কয়েক দশকে আমরা দূর্ভিক্ষ, মহামারী এবং যুদ্ধ নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় এনেছি। এই তিনটে সমস্যা একেবারে সমাধান করা যায়নি বটে, তবু আমরা নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে অন্তত আনতে পেরেছি। এই সমস্যাগুলো থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য আমাদের এখন ইশ্বর, দেবতা, বা দেবদূতের কাছে প্রার্থনা করতে হয় না। এখন আমরা জানি সমস্যাগুলো রুখতে হয় কীভাবে, এবং আমরা সফলভাবে তা করে চলেছি।

এটা সত্য যে এখনো উল্লেখযোগ্য পরাজয় রয়েছে আমাদের। তবে সেই পরাজয় কাটিয় উঠার জন্য আমরা এখন ইশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি না। দূর্ভিক্ষ, মহামারী এবং যুদ্ধ যখন আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন ব্যার্থতার জন্য আমরা নিজেদের দোষী করি, আমাদের দূর্বলতা খুঁজে বের করি এবং ভবিষ্যৎে এরকম যেন আবার না হয় সেই বিষয়ে লক্ষ্য রাখি। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষ না খাওয়ার চেয়ে বেশী খেয়ে মরছে, তারচেয়ে বেশী মানুষ ছোঁয়াচে রোগের চেয়ে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যাচ্ছে। তার থেকেও বেশী মানুষ যুদ্ধে মরার থেকে, বা জঙ্গীদের আক্রমণে নিহত হবার থেকে আত্মহত্যা করে মরছে।

এখনো অনেক রাষ্ট্রপ্রধান, মানবাধিকার কর্মী আর জেনারেল সমস্যাগুলো থেকে পুরোপুরি নিষ্কৃতি পাবার জন্য কাজ করছেন। তবে আমরা যদি দূর্ভিক্ষ, মহামারী এবং যুদ্ধ পুরোপুরি উৎখাত করতে পারি, তবে আমাদের সামনে কী মোকাবেলা করার জন্য আর কিছুই থাকবে না? নাকি নতুন সমস্যার উদয় হবে? স্বাস্থ্যবান নাগরিক, শান্তিপূর্ণ সমাজ আর নিরাপদ পৃথিবীতে আমাদের নতুন কী সমস্যা মোকাবেলা করতে হতে পারে? তাছাড়া এই সময়ে আমাদের হাতে নাগালে আসছে নিত্যনতুন জৈবপ্রযুক্তি আর তথ্য, সেগুলোর প্রয়োগ আমাদের উপর কেমন প্রভাব ফেলবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার আগে বর্তমান পৃথিবী নিয়ে আমাদের আরো কিছু তথ্য জানা প্রয়োজন। এখনো শ্রমিকেরা ২ ডলারের নীচে দৈনিক পারিশ্রমিকে কাজ করছে, মধ্যপ্রাচ্যে নিয়মিত যুদ্ধে ঝরছে শত শত প্রাণ। এর পেছনের কারণ তলিয়ে দেখতে হবে।

জৈবিক দারিদ্র‍্যের সীমানা

কয়েক দশক আগেও অনেক মানুষ অপুষ্টি আর ক্ষুধাবোধে মারা গেছেন। একটি ছোট ভুলই অতীতের পৃথিবীতে আপনার মৃত্যু পরোয়ানা সাক্ষর করে দিতো। কৃষকের পরিবার যদি অতিবৃষ্টি অথবা দস্যুর আক্রমণে আক্রান্ত হয়ে সমস্ত শস্য হারাতেন তবে তাদের না খেয়ে থাকতে হতো। প্রাচীন মিশর অথবা মধ্যযুগীয় ভারতে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়ে মোট জনসংখ্যার ৫-১০% মানুষ না খেয়ে থাকতেন। তখনকার সময়ে যাতায়াত ব্যাবস্থা ছিলো ধীরগতির আর সরকার ছিলো দূর্বল ( বর্তমান সময়ের তুলনায় ) ।

এপ্রিল ১৬৯৪ সালের ফ্রান্সের একজন সরকারী কর্মকর্তার লিপি থেকে থেকে জানা যায়, বিভ্যুয়াস শহরে দারিদ্র‍্যতা এবং অর্থনৈতিক মন্দা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই শহরে অর্থ উপার্জনের জন্য যথাযথ কোন কাজ ছিলো না। খাদ্যের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে মানুষ বিড়াল এবং ঘোড়ার মাংস খেতেন। যারা আরো গরীব তারা গাছের বিভিন্ন অংশ যেমন – শেকড়, পাতা ইত্যাদি সেদ্ধ করে খেতেন। তৎকালীন সময়ে সমগ্র ফ্রান্সজুড়ে এমন চিত্র দেখা গেছে অহরহ।

তখন ‘৯২ এবং ‘৯৩ সালে প্রচন্ড প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে শস্যের উৎপাদক ব্যাহত হয়েছিলো। একেবারেই শূণ্য হয়ে গিয়েছিলো প্রতিটি শস্যের গুদাম। যার প্রভাবে ‘৯২ থেকে ‘৯৪ এর মধ্যে ফ্রান্সে প্রায় ২.৮ কোটি মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা গেছেন, যা মোট জনসংখ্যার ১৫% । অথচ তখন ফ্রান্সের রাজা লুইস চতুর্দশ সস্ত্রীক আনন্দবিহারে ভার্সেইলে দিন কাটাচ্ছিলেন। পরের বছর ১৬৯৫ সালে এস্টোনিয়ায় দূর্ভিক্ষে আক্রান্ত হলে মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ মারা যান। ১৬৯৬ সালে ফিনল্যান্ডে দূর্ভিক্ষের কারণে মারা যান মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ। স্কটল্যান্ডে ‘৯৫ থেকে ‘৯৮ সালের মধ্যে দূর্ভিক্ষের কারণে কিছু কিছু শহরের প্রায় ২০% মানুষ মারা গিয়েছিলেন।

একবার ভেবে দেখুন। কেমন অনুভূতি হবে আপনার, যদি দিনের পর দিন না খেয়ে থাকেন, আর খাদ্যের কোন নিশ্চয়তা যদি না থাকে? আপনি নিশ্চয়ই তখন খাদ্যের অভাব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য উপায় খুঁজবেন। আমাদের পূর্বপুরুষেরা অবশ্য দূর্ভিক্ষের মুখোমুখি হলেই তথাকথিত ইশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন। বলাই বাহুল্য সেটা প্রতিবারই কোন কাজে দেয়নি।

গত একশ বছর ধরে অনেক প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে আমাদের। যার প্রভাবে আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি আমরা কাউকে না খেয়ে মরতে দেবো না, দারিদ্র‍্যতা কমিয়ে আনবো। তবে বাস্তবেও কি তাই ঘটছে? একজন অনাহারী মানুষকে মানবাধিকার সংস্থা খাদ্য সরবরাহ করছে ঠিকই, তবু অনেকসময় তা অপর্যাপ্ত থেকে যায়। তবে সামগ্রিকভাবে যেকোন বিপর্যয়ের পর খাদ্যের অভাব এখন কাটিয়ে উঠা সম্ভব। এখনো লাখো মানুষ না খেয়ে থাকে প্রতিদিন, তবু বেশীরভাগ দেশে খুব অল্প মানুষই না খেয়ে মরেম

দারিদ্র‍্যতার কারণে অনেক মানুষই অস্বাস্থ্য আর অপুষ্টিতে ভোগেন। ফ্রান্সে ছয় কোটি মানুষ ( মোট জনসংখ্যার ১০% ) এখনো অপুষ্টির স্বীকার। অনেকে হয়তো তিনবেলার বদলে দু’বেলা খান তবু না খেয়ে মরেন না। এই পর্যবেক্ষণ ফ্রান্সের দরিদ্র‍্যতম বস্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমাদের মনে রাখতে হবে অপুষ্টি এবং দূর্ভিক্ষ দু’টি আলাদা বিষয়।

এশিয়ার বর্তমান পরাশক্তি চায়না অতীত থেকেই অনেক দূর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছে। এমনকি ১৯৭৪ এ রোমে ওয়ার্ল্ড ফুড কনফারেন্সে চায়নার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বলা হয়েছিলো, চায়না তার এত বিশাল জনসংখ্যাকে খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে না। তবে চায়না সেই সমস্যা সফলভাবে মোকাবেলা করেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চায়না এখন দূর্ভিক্ষমুক্ত।

তবে এখন দূর্ভিক্ষের থেকেও কুৎসিত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। বেভারলি হিলের রাষ্ট্রপতি যেখানে বিলাসবহুল খাবার ছাড়া নৈশভোজ করেন না ; সেখানে সেই এলাকার বস্তির মানুষেরা কোনরকমে অল্প খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ২০১৪ সালে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মোট ২.১ শতকোটি মানুষ অতিরিক্ত ওজনে ভুগছিলেন। আশংকা করা হয় এই সংখ্যা ২০৩০ সালের আগেই মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হয়ে যাবে। ২০১০ সালে সম্মিলিতভাবে দূর্ভিক্ষ আর অপুষ্টিতে ভুগে মারা গিয়েছেন এক কোটি মানুষ, যেখানে মেদবাহুল্যের কারণে মারা গিয়েছেন তিন কোটি মানুষ।

চলবে…

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.