সাত সুরের সাতকাহন

সংগীত হালাল না হারাম সেই নিয়ে বিতর্ক অনেক। সেইসব হাদীস কপি পেষ্ট করে লেখাটিকে বোরিং করতে চাই না। তবে সংগীত কিভাবে মানুষের মস্তিস্ককে উদ্দীপ্ত করে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন। লেখাটি এখানে লিখছি তার মানে এই না সেটা ইসলামের কোরান হাদীসের পোস্ট মর্টেম করতে হবে। তবে এটা ঠিক ইসলামে সকল ধরণের সৃষ্টিশীলতা একপ্রকার নিষিদ্ধ। ওরা শুধু চেয়েছে মানুষ ইয়া নাফসী ইয়া নাফসী করুক। সৃষ্টিশীল না হোক। কারণ তাতে মানুষের বিবেকবুদ্ধি সচল হবে। আর তাহলেই মানুষ প্রশ্ন করা শিখবে।

আসুন এবার আমরা মূল আলোচনায় থুক্কু সুরের সাগরে ভেলা ভাসাই।

সুর

গান, শব্দ, ধ্বনি যা আমরা উচ্চারণ করি সেটাই সুর কোন একটা গান বা সুর যখন আমরা শুনি তখন আমাদের মন প্রাণ স্বাভাবিক স্তর থেকে স্বয়ংক্রিয় হতে শুরু করে। সুরের তালে তালে মনটাও দুলতে থাকে ট্রেনের কামরা যেমন দোলে সমান্তরাল পথের উপর।। সুর/গান এগুলো আমাকে স্মৃতির, বা ঐতিহ্যের সাথে সংযোগ করে। বুঝা যাচ্ছে না? উদাহরণ দিচ্ছিআমি যখন বিয়ে করি তখন তপুর গান খুব শুনতাম। বিয়ের প্রথম রাতে আমি ‘ওকে’ তপুর গান গুনগুন করে শোনাচ্ছিলাম। আজ এত বছর পর যখন সেই গানটা শুনি , আমার মন সময় ভ্রমণকরে চলে যায় সেই রাতে। অদ্ভুত ভাল লাগায় মন পরিপূর্ণ হতে থাকে কানায়কানায় আবার যখনআল্লাহু আল্লাহু তুমি জাল্লে জালালু” গানটা শুনি তখন মনে পরে যায় আমার বাবার কথা মনের ভিতরের সুখানুভুতিগুলো চোখ দিয়ে বের হতে থাকে। এভাবে প্রতিটা পুরনো গান, প্রতিটা শোনা সুর আমাদের টাইম মেশিনের মত স্মৃতি ভ্রমণ করায়।

আর ঐতিহ্য! কৃষ্টি, কালচার যাই বলি, রবিন্দ্রনাথের সুর শুনলে মনে পরে আমি বাঙ্গালী, জন ডেনভারের গান শুনে চলে যাই আমেরিকার কোন এক নাম না জানা গ্রামের পথে। লালনেরবুল্লে শাহ , জালালউদ্দিন রুমির লেখা গান শুনলে আমরা মানবতার ঐতিহ্য, জন্ম, মৃত্যুর খানিকটা ধারণা পাই। এভাবে প্রতিটা সুর , গান সে জায়গার ঐতিহ্যকে ধারণ করে।

এবার একটু বোরিং আলোচনায় যাই। যাদের মিউজিকের প্রতি আগ্রহ আছে এবং যেসব বাবা মা চান মিউজিক কিভাবে তার ,তার সন্তারের উপর পজিটিভ প্রভাব ফেলবে শুধু তারাই বাকীটা পড়বেন। আমরা যখন কোন সুর শুনি তখন আমাদের মস্তিস্কের কি হয়? কিভাবে এটা মস্তিস্ক কে উদ্দিপীত করে। কিভাবে মনকে প্রফুল্ল করে?কিভাবে সুর তাদের গাণিতিক সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে? কিভাবে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়? কিভাবে তাদের সহানুভূতিশীল মানুষে পরিণত করতে পারে ? কিভাবে সুর রোগীকে সুস্থ করে তা নিচের আলোচনায় জানা যাবে।

difference between musician and ordinary people

উপরের ছবিগুলো দেখুন। এখানে দেখানো হচ্ছে একজন সাধারণ মানুষ এবং এবং একজন সুরকারের মস্তিস্কের তফাৎ। সংগীতকারদের মস্তিস্ক অপেক্ষাকৃত বেশী তৎপর কারণ তারা সবসময় সুরের ভুবনে এবং সুর নিয়ে খেলা করেন। এবং এজন্য তাদের সৃষ্টি শীলতাও বেড়ে যায়। সুর শোনার চেয়ে যারা কোন বাজনা বাজায় তাদের মস্তিস্ক আরও বেশী সক্রিয় থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের ব্রেইনের নিউরন গুলো বই পড়াপড়াশুনাছবি আঁকায় যতটা না উদ্দীপ্ত হয়, তার চেয়ে বেশি হয় কোন গান বা সুর শুনলে। তবে গানে সুর তাল ঠিক থাকতে হবে। এটিএনবাংলার মাহফুজুর রহমানের মত গাইলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।

মেডিক্যালের আরও কিছু টার্ম আছে যা বাংলায় অনুবাদ করা আমার পক্ষে সম্ভব না তাই হুবুহু তুলে দিলাম:

মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে দেখা যায় যে সংগীতকারদের মস্তিষ্ক আমাদের বাকিদের চাইতে আলাদা। তাদের মস্তিষ্ক উল্লেখযোগ্য ভাবে প্রতিসম। মস্তিষ্কের যেসব অংশ শ্রবণ, যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, স্থানিক সমন্বয় এর সাথে জড়িত তা তুলনামূলক বড়। সেই সাথে তাদের করপাস ক্যালসাম’ও (Corpus Callosum) তুলনামূলক বড়।

রোগ নিরাময়ে সংগীত

নিউরো সায়েন্সেও আজকাল মিউজিক কে ওষুধের বিকল্প হিসেবে মেনে নিয়েছে। পুরনো স্মৃতি ফেরাতে ডাক্তাররা আজকাল মিউজিকের সাহায্য নেন। কোমা বা মৃতপ্রায় ব্রেইনের চিকিৎসায় আজকাল রোগীদের কানে হেডফোন থেরাপি দেয়া হয়। আলঝেইমারস রোগের একমাত্র চিকিৎসা এখন সংগীত। আমার বাবা যখন ব্যাংকক হাসাপাতালে কোমায় শয্যাশায়ী, তখন আমরা ভাইবোনেরা আমাদের কন্ঠ রেকর্ড করে পাঠিয়েছিলাম ডাক্তারদের অনুরোধে। আলঝেইমার্স রোগের প্রধান চিকিৎসা হলো সংগীত।

এই মিউজিক থেরাপির উপর আরও জানতে নিম্নোক্ত ডকুমেন্টারীটা সার্চ করে দেখতে পারেন- Alive Inside: A Story of Music & Memory

কর্মস্থলে মিউজিক

জীবনের কর্মক্ষেত্রেও সংগীতের অবদান অনস্বীকার্য। যারা বাইরের দেশে থাকেন তারা যদি কোনচেম্বারে অথবা কোন কর্পোরেট অফিসে যান, শুনতে পাবেন ব্যাকগ্রাউন্ড হাল্কা করে মিউজিক বাজছে। বাজছে পিয়ানোর সুর কিংবা গিটারের টুংটাং। কোন কোন বস আরেকধাপ এগিয়ে। তারা তাদের অফিসে এভাবে মিউজিক নির্বাচন করে, প্রতিদিন এক একজনের এমপ্লয়ির পছন্দ অনুযায়ী মিউজিক বাজবে আর অন্যেরা সেটা উপভোগ করবে। এতে করে সবাই কাজে উদ্দিপিত হন। আর আমাদের দেশের কাঠখোট্টা বসেরা কর্মচারির মোবাইলে কোন গান শুনলেই চিৎকার করে উঠেন যেন তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। কাজে যাবার সময় বাসে রাস্তার কষ্ট ভুলে থাকার জন্য হেডফোনটা লাগিয়ে হারিয়ে যান সুরের রাজ্যে, উপভোগ করুন পুরোটা দিন। অন্তত ট্রাফিক জ্যামের জন্য এক্সস্টেড ফিরল করবেন না।

সুর যেভাবে মস্তিস্ককে উদ্দীপ্ত করে

  • মস্তিস্কের নিউরোট্রান্সমিটারের ডোপামিন বৃদ্ধি করে।
  • ব্রেইনের “motivation molecule” অণুগুলোকে উদ্দিপ্ত করে। যেমনটা হয় চকলেট বা পছন্দের কোন খাবার খেলে।
  • গান শুনলে মস্তিস্কে অক্সিটোসিনের পরিমাণ বেড়ে যায় যা আপনাকে উৎফুল্ল থাকতে সাহায্য করে আর আপনাকে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা বাড়ায়। {Oxytocin Has been called the “trust molecule” and the “moral molecule” since it helps us bond with and trust others. There’s evidence that the oxytocin bump experienced by music lovers can make them more generous and trustworthy.}

আগে আমাদের মায়েরা আমাদের গানের স্কুলে, আর্টের স্কুলে, তবলার স্কুলে ভর্তি করাত। আর আজকাল সংস্কৃতি চর্চা প্রায় বন্ধ। আরবী সংস্কৃতির চাপে আর সৌদির টাকার পাহাড়ের নীচে পরে সুকুমার চর্চা সব বন্ধপ্রায়। গান শোনা গান গাওয়া, গান শেখানো আজকাল বেদাত। স্কুলগুলোতেও মিউজিক ক্লাস হয় না। হয় না শুদ্ধ গান চর্চা। অথচ মিউজিক এর কিছু উপকারিতা-

  • বাচ্চাদের গণিতের মত কঠিন বিষয়ে সাহায্য করে
  • তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়
  • আইকিউ বৃদ্ধি করে
  • সায়েন্সের সাবজেক্ট গুলোতে ভাল করতে সাহায্য করে
  • ব্রেইনের spatial intelligence বাড়ায়  {Spatial intelligence কি?
  • It helps students understand how things work together. This skill is critical in careers like architecture, engineering, math, and computer science subject.}
  • মানসিক দক্ষতা ও শক্তির উপরে মনোযোগ বাড়ায়

পরিশেষে

সংগীত শুধু আত্মোন্নতিই করে না, সংগীত মানুষকে সহানুভুতিশীল করে তোলে। মানুষে মানুষে ভালবাসা বাড়ায়। যে গান শোনে সে কোনদিন মানুষ হত্যা করতে পারে না। কোন মানুষ তার সংগীত গুরুর অপমান হলে তার জন্য অপমানকারীকে চাপাতি দিয়ে খুন করে না যা ধর্ম মানুষকে করতে বাধ্য করে। ধর্মের বাণীকে বাঁচাতে পৃথিবীতে যুগেযুগে অনেক খুনখারাপি হয়েছে, আর সংগীতের বাণী যেখানে ছড়িয়েছে ভালবাসা। কুরআন আমাকে যতটা না শুদ্ধ করেছে তার চেয়ে বেশী করেছে লালনহাসনরুমির লেখা কথা আর গান।

একমাত্র সংগীতই পারে সমাজ পরিবর্তন করতে। সংগীতের অপর নাম ভালবাসা। যা আজ আমাদের মানবসমাজের মেলবন্ধনে বড়ই প্রয়োজন। আমাদের পরবর্তি প্রজন্মও যেন শাহ্ আব্দুল করিমের সেই গানটা গাইতে পারে

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম

সামনেও কি সুন্দর দিন কাটাইবাম!!!

তথ্যসুত্র
Music and the Brain
Does Music Change a Child’s Brain?
Music Improves Brain Function
10 Ways Musical Training Boosts Brain Power
Keep Your Brain Young with Music
Are your Emotions Linked with the Music You Listen To?

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: