বিভিন্ন ধর্মে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ

ইসলাম ধর্মে গ্রহণ

ইসলামের প্রবর্তক নবী মুহাম্মাদ বলেছিলেন সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ হল আল্লাহর দুইটি নিদর্শন। (বুখারি ১০৪১)

তিনি বলেছিলেন,
আমাকে জান্নাত দেখানো হয় এবং তারই একটি আঙ্গুরের ছড়া নিতে যাচ্ছিলাম। আমি যদি তা নিয়ে আসতাম, তা হলে দুনিয়ার স্থায়িত্বকাল পর্যন্ত তোমরা তা থেকে খেতে পারতে। (সাথে জাহান্নাম দেখানোর বর্ণনাও করেছেন) (বুখারি ইঃফাঃ ৭১২)

তিনি বলেছিলেন সবাই যেন চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণ দেখামাত্র ভীত হয়ে নামাজ পড়তে যায়। (বুখারি ১০৪৬)

তিনি নিজেও ভীত হয়ে দীর্ঘক্ষণ নামাজ পড়েছিলেন। (মুসলিম ১৯৮৫)
তিনি বলেছিলেন যে পর্যন্ত না চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণ পরিষ্কার না হয় ততোক্ষণ নামাজ পড়তে। (মুসলিম ১৯৮৫)

এই লিংকে সহি বুখারি এবং এই লিংকে সহি মুসলিম শরিফের সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণ সংক্রান্ত হাদিস গুলো পড়তে পারেন।

খ্রিস্টান ধর্মে গ্রহণ

খ্রিস্টান ধর্মে গ্রহণকে ঈশ্বরের অলৌকিক কর্ম হিসেবেই বর্ণনা করা আছে। বাইবেল থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া হল।

আমিই সূর্যকে দুপুরে অস্তমিত করব, পৃথিবীকে দিনদুপুরে অন্ধকার করব। (Amos 8:9)

… … সূর্য অন্ধকারচ্ছন্ন হবে, চাঁদ রক্তিম হবে, … … … … (Joel 2:31, Acts2:20)

… … … … সূর্য অন্ধকারচ্ছন্ন করা হবে, চাঁদ আলো দেবেনা (Mark 13:24, Matthew 24:29)

এছাড়াও রয়েছে Revelation 6:12′এ যেখানে ভূমিকম্পকেও অলৌকিক বলা হয়েছে।

ইহুদী ধর্মে গ্রহণ

ইহুদী ধর্মমতে সূর্যগ্রহণ হয় পাপাচারে ঈশ্বরকে রাগান্বিত করার ফলে। ঈশ্বর মানুষকে সতর্ক করেন সূর্যকে আড়াল করার মাধ্যমে।

যখন সূর্য গ্রহণ হয়, এটি মানবজাতির জন্য একটি কুলক্ষণ… … … ঈশ্বর গোস্বা করেন এবং তার আজ্ঞাবহদের আদেশ করেন, ‘আলো কেড়ে নাও, তাদের নিমজ্জিত কর অন্ধকারে’ (Talmud Bavli, Succah 29a)

হিন্দু ধর্মে গ্রহণ

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, সমুদ্র মন্থনের সময় রাহু (স্বরভানু) নামক এক অসুর লুকিয়ে দিব্য অমৃতের কয়েক ফোঁটা পান করে। সূর্য্য ও চন্দ্রদেব তাকে চিনতে পেরে মোহিনী অবতাররূপী ভগবান বিষ্ণুকে জানায়। তৎক্ষণাৎ,অমৃত গলাধঃকরণের পূর্বেই বিষ্ণু আপন সুদর্শন চক্রের মাধ্যমে রাহুর ধড় থেকে মুন্ড ছিন্ন করে দেন। অমৃত পানের জন্য মুন্ডটি অমরত্ব লাভ করে এবং এভাবেই রাহু গ্রহটির উৎপত্তি হয়; বাকী মুন্ডহীন দেহটির নাম হয় কেতু। সূর্য্য ও চন্দ্রের প্রতি বিদ্বেষের কারণে বছরের নির্দিষ্ট সময় অন্তর রাহু এদেরকে গ্রাস (গ্রহণ) করে ফেলে। কিন্তু এই গ্রহণের পর সূর্য্য ও চন্দ্র রাহুর কাটা গ্রীবা থেকে আবার বেরিয়ে আসে। [1] [2]

বৌদ্ধ ধর্মে গ্রহণ

একথা নিশ্চয়ই সবারই জানা আছে যে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতে গৌতম বুদ্ধ জন্ম মৃত্যু ও বুদ্ধত্ব লাভ সবই করেন একটি বিশেষ পূর্ণিমাতে। বৌদ্ধপালিশাস্ত্র অনুসারে, রাহু সূর্য্য ও চন্দ্রকে গ্রাস (গ্রহণ) করলে সূর্য্য ও চন্দ্র বুদ্ধদেবের স্তোত্র পাঠ করে রাহুর কবল থেকে আবার বেরিয়ে আসে। এরপর বুদ্ধ রাহুর মস্তক সাতটি টুকরো করে দেন। এজন্য এই স্তোত্রকে বৌদ্ধ সাহিত্যে সুরক্ষা স্তোত্রের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। [3] [4]

বাস্তবতা

একুশ শতকে বিজ্ঞানের উন্নতির কল্যাণে আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদ একই সরলরেখা বরাবর চলে এলে সূর্য থেকে আসা আলোতে উৎপন্ন পৃথিবীর অপর প্রান্তে ছায়ায় ঢেকে যায় চাঁদ। আর তাই সূর্যের বিপরীত দিকে থাকা অঞ্চল থেকে চাঁদ দেখা যায়না। বুঝতেই পারছেন এটা ঘটে কেবল ঐ অঞ্চলের রাতের বেলায়। [5]

Lunar Eclipse

 

আর সূর্যগ্রহণের ঘটনা পুরোপুরি এমন না হলেও কাছাকাছি। সূর্য চাঁদ ও পৃথিবী এক সরলরেখায় আসে। সূর্যের আর পৃথিবীর মাঝে চাঁদ আসায় সূর্য ঢাকা পড়ে। দেখা যায়না প্রায় অনেকটা সময় পর্যন্ত, এমনকি পৃথিবীর ঐ অঞ্চল অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। বুঝতেই পারছেন এটি ঘটে কেবল ঐ অঞ্চলের দিনের বেলায়। [6]

Solar Eclipse

পরিশেষে, পাঠক আপনাদের কাছে অনুরোধ রইল আধুনিক যুগের বিজ্ঞানের তথা মানুষের কল্যাণে আমরা যা জানি তার সাথে শত শত বছর ধরে একের পর এক স্বঘোষিত ঈশ্বরের দূতেরা তাদের স্ব স্ব কল্পিত ঈশ্বরের নামে যা জানিয়েছেন তা মিলিয়ে দেখুন গড়মিল পান কিনা, জ্ঞানের স্বল্পতা কিংবা ছলচাতুরী খুঁজে পান কিনা।
জয় হোক জ্ঞানের।

তথ্যসূত্র
[1] https://www.hinduwebsite.com/symbolism/symbols/ecclipse.asp

[2] https://bn.wikipedia.org/wiki/রাহু

[3] https://www.accesstoinsight.org/tipitaka/sn/sn02/sn02.009.piya.html

[4] https://www.accesstoinsight.org/tipitaka/sn/sn02/sn02.010.piya.html

[5] https://en.wikipedia.org/wiki/Lunar_eclipse

[6] https://en.wikipedia.org/wiki/Solar_eclipse

Facebook Comments

Leave a Reply