সুখনগর অথবা শাস্তিনগর এর অস্তিত্বের প্রমান কি?

ভবের বাজার ছিল লাষ্ট ষ্টপেজ। বাস থেকে নেমে আসতেই কানে ভেসে আসলো আজানের ধ্বনি। এখানে নতুন কেউ আসার সাথে সাথে কানের কাছে ফিসফিস করে অথবা জোরালো শব্দে আজান দিয়ে তাকে বরন করে নেয়া হয়।

সেই গ্রামে পৌছে, এক চায়ের দোকানে হাল্কা চা-নাস্তা খেয়ে একটা সিগারেট ধরাতেই শুনি, এই গ্রামে নাকি সিগারেট খাওয়া নিষেধ। এই গ্রামে নিয়মের অনেক কড়াকড়ি। তার চেয়েও আশ্চর্য একটা কথা জানলাম, এটা নাকি লাষ্ট ষ্টপেজ ছিলনা। এই গ্রামের নিয়ম কানুন মেনে চললে আর গ্রাম প্রধান আলাল ভাইয়ের সাথে খাতির বজায় রেখে কিছুদিন কাটালে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে একটা চারিত্রিক সনদপত্র দেন। তখন সেই সার্টিফিকেট দেখিয়ে সুখনগরে যাওয়ার টিকেট কেটে সেখানেই আজিবন সুখে শান্তিতে পার করে দেয়া যাবে। আর নির্দিষ্ট কিছুদিন কাটানোর পরও যদি কেউ আলাল ভাইয়ের দেয়া চারিত্রিক সার্টিফিকেট অর্জনে ব্যার্থ হন, তাহলে তাকে গ্রাম থেকে বের করে একটা জাহাজে করে শাস্তিনগর দ্বীপে আজীবনের জন্য নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

ভাবলাম, আলাল ভাইয়ের সাথে দেখা সাক্ষ্যাৎ করে আসি। তার অফিসের ঠিকানা জেনে নিয়ে সেই অফিসে হাজির হয়ে শুনলাম, সেখানে তিনি নেই। তিনি নাকি কোনদিনই সেখানে সশরীরে হাজির হয়ে অফিস চালাননি। তিনি বিদেশে থাকেন। তবে তার প্রতিনিধি হিসেবে মদন বাবু নামের এক অফিসার পাঠিয়েছিলেন। তিনিও নাকি চৌদ্দ বছর আগে মারা গেছেন। মদন বাবুই এই গ্রামের নিয়মনীতি ঠিক করে দিয়ে গেছেন। তিনি অবশ্য তার ব্যাক্তিগত বিচার-বিবেচনা, পরিবেশ-পরিস্থিতি, পছন্দ- অপছন্দ অনুযায়ী নাকি সব নিয়ম কানুন ঠিক করে দিয়ে যাননি। তিনি নাকি মাঝেমধ্যে আলাল ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু দিক নির্দেশনা পেতেন। সেই দিক নির্দেশনাগুলি কোন লিখিত চিঠি, ইমেইল বা ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে না, জবিরুল নামের এক ডাকপিওন এসে মদনবাবুকে কানে কানে বলে যেত। যদিও মদন বাবু ছাড়া আর কেউ জবিরুলকে আসা যাওয়া করতে দেখেনি, তার পরও মদন বাবু সেই নির্দেশনা গুলি তার কাছের বন্ধুদেরকে দাড়ি-কমা-সেমিকোলনসহ ঝাড়া মুখস্ত বলতেন, আর তার বন্ধুরা সেগুলি রাফ কাগজ, বাদামের ঠোংগা, মিষ্টির প্যাকেট অথবা দইয়ের পাতিলের গায়ে লিখে রাখত।

মদন বাবু মারা যাওয়ার পর তার বন্ধুরা সেই রাফখাতার নিয়মকানুনগুলি একত্র করে গাইড বই হিসেবে ছাপিয়ে গ্রামের ঘরে ঘরে পৌছে দেয়া হয়েছে। আর আশেপাশের গ্রামেও নাকি ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে, মদন বাবুর মারা যাওয়ার পর কে হবেন অফিসার ইনচার্জ, সেটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি করে তার বন্ধুরাও দু’একদিনের মধ্যেই সপরিবারে মারা পড়লেন। এখন কয়েকজন কেরানী পাগড়ি মাথায় দিয়ে সেই অফিস চালাচ্ছেন। আমার উপস্থিতির খবর পেয়ে সেই কেরানীদের একজন আমার নামধাম রেজিষ্ট্রেশন করে অফিস খরচ বাবদ বাধ্যতামূলকভাবে নিয়মিত কিছু চাঁদা দেয়ার কথা জানালো। তাছাড়াও দিনে পাঁচবার করে সেই অফিসে হাজিরা দিয়ে আলাল ভাই আর মদন বাবুর প্রতি ভালোবাসা আর আনুগত্যের নিদর্শন হিসেবে কিছু গান বাজনা আর পিটি প্যারেডে অংশ নিতে বললো। নইলে আলাল ভাই নাকি অনেক মাইন্ড করবেন।

সেই কেরানী আবার দেখি বেশ ঘুষখোরও। কিছু খরচাপাতি করলে আর ব্যাক্তিগতভাবে তাকে কিছু চা-নাস্তার টাকাপয়সা দিলে, ওসব হাজিরা না দিলেও তিনি সময়মত, অথবা অগ্রীম সার্টিফিকেট দিয়ে দেবেন, সেটাও আকারে ইংগিতে বুঝিয়ে দিলেন। তাছাড়া, গ্রামের নিয়মকানুন কোন ব্যাপার না। সেগুলি না মেনে যার যা খুশী করতে থাকলেও তেমন অসুবিধা নাই। একবার সময় করে, বাড়তি কিছু টাকা পয়সা খরচ করে গ্রামের দক্ষিন কোনে একটা ধসে যাওয়া ইটের স্তুপ ঘিরে সাতটা চক্কর দিয়ে, কান ধরে নীল ডাউন হয়ে কয়েক মিনিট কাটিয়ে, কিছু পাথর বা ঢিলা কুলুপ নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে, ভবিষ্যতে আর নতুন করে গ্রামের কোন নিয়ম ভাঙবেনা, সেই কিরাকসম কেটে, যে কেউ একটা পবিত্র পরিষ্কার চারিত্রিক সার্টিফিকেট পেতে পারে, সেটাও জানলাম।

কেরানিটি সাবধান করে দিয়ে বলল, বাইরে অনেক দালাল ঘুরে বেড়ায়। তারা বলতে পারে, এই অফিস থেকে চারিত্রিক সার্টিফিকেট না নিয়ে ওদের অফিস থেকে আরো সহজে আর কম খরচে সুখি নীলগঞ্জের টিকেট পাওয়া যায়। কিন্তু, আসলে ওরা সবাই ভুয়া, মিথ্যাবাদী। আমরাই এই গ্রামে সবচেয়ে নতুন আসা ট্রাভেল এজেন্সি। এর আগে যারা টিকিট বিক্রি করেছে, তাদের সবার এরোপ্লেন নাকি কোন নদী বা সমুদ্রে গিয়ে ক্রাশ করে। তাছাড়া সুখী নীলগঞ্জ বলেও কোন জায়গা কোথাও নাই। আসল জায়গা হচ্ছে সুখনগর। এই গ্রামে প্রকাশ্যে বিড়ি সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ হলেও, সেখানে নাকি বিড়ি সিগারেট মদ গাঁজা ফ্রী পাওয়া এবং খাওয়া যাবে। আলাল ভাইয়ের নাকি একটা এতো বড় হেরেম আছে, যেখানে মদ আর কুমারী মেয়েমানুষের ছড়াছড়ি।

আমি মদ আর মেয়েমানুষ দুইটাই অপছন্দ করি। কারন আমার হাতে টাকাপয়সা কম। তাই আপাততঃ অল্প টাকায় আকিকা করে একটা আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

সেই অফিস থেকে বের হয়ে আসার সাথে সাথে পড়লাম দালালদের খপ্পরে। তাদের একেক জন একেক রকম ইউনিফর্ম পরা। কারো মাথায় গোল টুপি, কেউ মাংকি ক্যাপ, কেউ কাউবয় হ্যাট পরা, কেউ আবার পাগড়ি পরা। তাদের মধ্যে একজনের আবার পুরা মাথা কামানো, শুধু মাথার চাঁদির পিছন দিকে কয়েক গোছা লম্বা চুল বেনী করে বাধা। তার সাথে পরিচিত হয়ে শুনলাম, আলাল ভাই বলে নাকি আসলে কেউ কোথাও ছিলনা। সবই মদন বাবুর বানানো গল্প। আসলে নাকি ভবেশ বাবু নামের একজন এই গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা। তাকেও যদিও কেউ কোনদিন দেখেনি, তারপরও, তিনি নাকি অনেক পুরনো লোক। অনেক অভিজ্ঞ। শক্তিও তারই সবচেয়ে বেশী।

আমি জানতে চাইলাম, আলাল ভাই আর ভবেশ বাবুর মধ্যে কোনদিন ভার উত্তোলন, মোরগ লড়াই অথবা জব্বারের বলিখেলা হয়েছিল নাকি? কিভাবে বুঝব, এদের মধ্যে কার শক্তি বেশী? তখন বলল, ভবেশ বাবুর সাথে অন্য কেউ নাকি কোনদিন কোন প্রতিযোগিতা নামতেই রাজি হয়নি। তবে, গ্রামে নাকি আলাল ভাই আর ভবেশ বাবুর সমর্থকদের মধ্যে মাঝে মাঝে ঝগড়া, মারামারি লাগে। সেসব মারামারিতে ভবেশ বাবু আর আলাল ভাই সরাসরি অংশ না নিলেও, কোন কোন পাড়ায় ভবেশ বাবুর সমর্থক বেশী। কোথাও আলাল ভাইয়ের সাপোর্টার বেশী। তাই যেখানে যারা দলে ভারী, সেখানে তাদের অদৃশ্য বন্ধুটিকেই তারা বেশী শক্তিশালি মনে করে।

তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সামানে দেখি এক গেরুয়া ধুতি-ফতুয়া পরা লোক কথাবার্তা বা নড়াচড়া না করে একটা বটগাছের গোড়ায় ঝিম মেরে বসে আছে। মাঝে মাঝে “বোম ভোলেনাথ” বলে হাঁক দিচ্ছে। ভোলেনাথ জিনিষটা কে বা কি, আর তাকে বোমা মারতে হবে কেন, জানার জন্য তার কাছে যেতেই তিনি আমার কৌতুহলের কথা শুনে, চোখ খুলে বললেন, চারপাশে যা দেখছি, সবই নাকি বিভ্রম। সবই মায়া। আর অন্য কিছু না করে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত তার পাশে বসে বসে এক ধরনের পবিত্র বৃক্ষের শুকনো পুষ্পমঞ্জরি পুড়িয়ে সেই ধোঁয়া খেতে থাকলেই নাকি আসলে এই গ্রামের আসল প্রতিষ্ঠাতা কে, তিনি কি চান, কি করেন, সব নিজে নিজেই জানা যাবে। অন্যের গুজবে যেন কান না দেই। আর এই গ্রামে যারা আসে, এখানে এসে নিজে নিজে সাধন ভজন আর ধোঁয়া সেবন করে গ্রামের প্রতিষ্ঠাতার সরূপ জানার চেষ্টা করার মধ্যেই এই গ্রামে বসবাসের স্বার্থকতা।

আমি তাই সেদিন থেকে সেই গেরুয়া ধুতি-ফতুয়া লোকটির পাশে বসে ধোয়া খেয়ে দিব্বি সুখে শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছি।

ইদানিং আসেপাশে আরো অনেক ট্রাভেল এজেন্সি আর তাদের শাখা অফিস, প্রশাখা অফিস চালু হচ্ছে। তার পরও, আমি আসলে বুঝতে পারছিনা, এদের কাছ থেকে টিকেট কেনা ঠিক হবে কিনা। কারন, আজ পর্যন্ত যারাই এই গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও গেছে, তাদের কেউই কোনদিন ফিরে আসেনি। আর খুলে বলেনি, সুখনগর, সুখী নীলগঞ্জ অথবা শাস্তিনগর বলে কোথাও কিছু আছে কিনা!

Facebook Comments

সিয়ামুজ্জামান মাহিন

Feminist,Atheist,Humanist-Writer/Blogger

Leave a Reply

%d bloggers like this: