টাইম ট্রাভেল ৬৩২ খ্রীস্টাব্দ

আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, আর যারা জানেন না, এখন জেনে নেন – আমি কিন্তু বেশ কয়েকবার টাইম ট্রাভেল করে ভবিষ্যৎ পৃথিবী ঘুরে এসেছি। এছাড়াও জবিরুল নামের দেবদূতের সাথেও এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা মহান অম্নির সাথেও দেখাসাক্ষাৎ করে এসেছি।

আজকে সেরকমই এক রাতের ঘটনা বলছি। সে রাতে একটা ভুতের স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় বারান্দায় গিয়ে সিগারেট ধরাতে না ধরাতেই আমার সামনে এক অপরূপা মনমোহিনী অষ্টাদশী সদ্য তরুনী এসে উপস্থিত। এসব আমার কাছে ডালভাত। এর আগেও ভবিষ্যতের পৃথিবী থেকে অনেক রূপবান এবং রূপবতী তরুণ তরুণী এসেছে। আজকের জনের চেহারাসুরত একেবারে ফোবি কেটসের মত হলেও আর তরুনীর স্বচ্ছ পলিথিনে তৈরী অতি সংক্ষিপ্ত পোশাকও আমার চোখে এখন আর খুব একটা উত্তেজক বলে মনে হলো না।হিজরি ১১ সালের ১২ ই রবিউল আউয়াল, অর্থাৎ, ইংরেজি ৮ই জুন ৬৩২ সন এবার ঠিক আছে?

নাম পরিচয় ইত্যাদি সম্পর্কে সে যা বলল, তা হচ্ছে, সে এসেছে ২২১৮ সাল, অর্থাৎ দুইশ বছরের পরের পৃথিবী থেকে। তার নাম বিলকিস বানু। সে একজন গাইড কাম ভ্রমনসংগী। তার আগমনের উদ্দেশ্য, আমাকে তার সাথে করে তাদের পৃথিবীতে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া। আজকের জামানার যে কারো জন্যে এটা একটা বিশেষ সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু, এইবার আসা বিলকিসকে কিছুটা অবাক করে দিয়ে বললাম, ভবিষ্যৎকালে তো কয়েকবারই গিয়েছি। সেগুলি দেখে হা হুতাস করার চেয়ে তুমি বরং এক কাজ কর। আমাকে অতীতে নিয়ে চল।

শুনে, বিলকিস বলল, সেটা অসম্ভব কিছুই না। তাদের প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে তারা এখন মহাবিশ্বের সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে যে কোন স্থান এবং সময়ে যেতে পারে। তবে সেখানে গিয়ে কোনভাবেই ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেয়ার মত কিছু করা যাবেনা। আমি কোন তারিখে কোন জায়গায় যেতে চাই, জানতে চাওয়ায় বললাম, আমাকে হিজরি ১১ সালের ১২ ই রবিউল আউয়াল, অর্থাৎ, ইংরেজি ৮ই জুন ৬৩২ সনে নিয়ে চল, সৌদি আরবের মদিনায়, আজকের জামানায় যেখানে আমাদের প্রিয় নবিজী চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। সেখানে যেতে চাওয়ায় বিলকিস বলল, আমাকে আগে একটু হেড অফিসে জানিয়ে রাখা দরকার। সে তার হাতের ঘড়িতে কি যেন লিখে টিপে দিল, একটু পরে সবুজ একটা বাতি জ্বলে উঠতেই বললো, “কোন অসুবিধা নাই। অনুমতি পাওয়া গেছে। চলেন যাওয়া যাক!”

সাথে সাথে আমার চোখের ভীতরে ফকাৎ করে একটা আলো জ্বলে উঠলো। চোখ বন্ধ অবস্থাতেও মনে হল, চারিদিক আলোকিত হয়ে গেল। চোখ খুলে দেখি আমরা দুজন দাঁড়িয়ে আছি মরুভুমির মাঝখানে ছোট এক গ্রামে। রুক্ষ পরিবেশ। গ্রামের এক বাড়ির সামনে অনেক লোকজনের জটলা। আমি আরবী ভাষা তেমন একটা বুঝিনা, বলতেও পারিনা। তবে বিলকিস আমার এক কানে ছোট একটা ইয়ারফোন জাতীয় অনুবাদযন্ত্র লাগিয়ে দেয়ার পর মানুষজনের কথাবার্তা বুঝতে শুরু করলাম। তবে আমি আরবী ভাষায় কিছু বলতে চাইলে বিলকিসের মাধ্যমে বলতে হবে।

আমাদের পোষাক আশাক আর বেশভূষা দেখে নারী পুরুষ সবাই বিশ্মিত। বিলকিসের পোষাকের কথা ততো আগেই বলেছি। সংক্ষিপ্ত প্রায় স্বচ্ছ পলিথিন। এদিকে আমি লুঙ্গী আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরেই চলে এসেছি। গরমের দিনে এটাই তো বাঙ্গালীর পোষাক। আমার পরামর্শে বিলকিস তাদেরকে বলল, আমরা অষ্টম আসমান থেকে এসেছি। আমাদেরকে দশম আসমান থেকে বিশ্বজগতের পরিচালক অম্নি মহাশয় পাঠিয়েছেন কিছু খবরাখবর জানানোর জন্য। ওম্নি হচ্ছেন আল্লাহতালারও বিগ বস।

উপস্হিত জনগন আকাশ থেকে নেমে আসা ফেরেশতার কথা এতোদিন আল্লাহ্‌র নবীর মুখে অনেক শুনেছে। এই প্রথম তাদের কাউকে, তাও আবার একসাথে দুইজনকে, চোখের সামনে দেখতে পেয়ে তারা আহ্লাদে বিগলিত হয়ে সালাম কালামের সাথে, আহলান ওয়া সাহলান, কাইফা হালুকা, সুবহানাল্লাহ, মাশাল্লাহ, ইত্যাদি বলতে বলতে শুরু করলো। একজন বললো, এতোদিন সপ্তমাকাশের উপরের আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা দিয়ে এসেছে। কাজেই, অষ্টম আকাশ থেকে আসা আমাদেরকেও অবশ্যই সেজদা দেয়া উচিৎ। সাথে সাথে সবাই ঢিপিশ করে সেজদা দিয়ে পড়ে রইল। তাদেরকে উঠে দাঁড়ানোর অনুমতি দেয়ার পর বললাম, আমরা আল্লাহর নবীর সাথে দেখা করতে এসেছি।

আমাদেরকে নিজের চোখে দেখে তাদের জীবন ধন্য হয়ে গেল, এরকম উত্তেজক পোষাকে ইতিপূর্বে তারা আর কাউকে দেখেনি, নবীজীও নিশ্চয়ই খুশী হবেন, ইত্যাদি বলতে বলতে তারা আমাদেরকে একটা বাড়ির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলল। সেটা নাকি বিবি আয়েশার বাড়ি। শুনলাম, আল্লাহ্‌র নবী ভীষন অসুস্থ্য। কয়েকদিন ধরেই জ্বরে ভুগছেন। টানা তিন বছর ধরেই তিনি অসুস্থ। খয়বারে এক ইহুদী নারীর বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়ে সেই নারী নাকি বকরীর কাঁধের মাংসে বিষ মিশিয়ে খেতে দিয়েছিল। সেই থেকে নবিজী অসুস্থ। আর অনেকদিন হল, নবীজীর কাছে কোন ফেরেশতাও আসছেন না। তাই তারা বিশেষ চিন্তিত।

নবীজীর সুস্হ্যতার জন্য জমজমের পানি, কালোজিরা, ইত্যাদি অনেক কিছু খাইয়ে, অসংখ্যবার অনেক সুরা আর দোয়া দরুদ পড়েও কাজ না হওয়ায় এক বুজুর্গ ভীনদেশী বৃদ্ধের পরামর্শে সাতটি কুয়ার পানি দিয়ে গোসল করেও যখন কাজ হয়নি, তখন নবীজী তাঁর শারীরিক কষ্ট বর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রায়ই আল্লাহ্‌র কাছে মৃত্যুকামনা করে ফরিয়াদ জানাচ্ছেন বলে সবাই বলাবলি করছিল।

আমরা যেদিন সেখানে গেলাম, সেদিন সকাল থেকেই নাকি নবীজীর জ্বরের তীব্রতা বেড়ে গেছে। সেই বাড়ির বৈঠকখানা ঘরে প্রবেশ করার পর শুনলাম, কিছুক্ষণ আগেই আল্লাহ্‌র নবী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। উপস্থিত লোকজনের সামনে আরেকবার আমাদের পরিচয় দেয়ার পর, সবাই বলল, তারাও জীবনে প্রথম সত্যিকারের ফেরেশতা দেখছে। এর আগে আল্লাহর নবীর কাছে অনেকবার ফেরেশতার আগমন আর সাত আসমান পার হয়ে আল্লাহর সাথে দেখা-সাক্ষাতের গল্প শুনলেও অনেকেই নাকি মনে মনে কিছুটা হলেও সন্দেহ করত। নবীজির প্রিয়তমা স্ত্রী বিবি আয়েশাও নাকি একবার আরো একটা বিয়ে করার খবর শুনে রাগ দেখানোর পর নবীজি ততক্ষনাৎ কোরানের ওহী ঘোষনা করেছিলেন, তখন তার বিবি তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, “রাখো তোমার ওহী! তোমার আল্লাহর কি খেয়েদেয়ে আর কোন কাজ নাই? যখন দরকার তখনই ফেরেশতা মারফৎ অহী পাঠিয়ে তোমাকে ইচ্ছামত বিয়েসাদী করার অনুমতি দিতে থাকবেন!”

আমরা যখন সশরীরে সেই ঘরে প্রবেশ করলাম, আমাদেরকে দেখে অজ্ঞান হয়ে শুয়ে থাকা নবীজির পাশ থেকে চোখ গোলগোল করে তাকিয়ে থাকা মহিলাটিই যে বিবি আয়েশা, বুঝতে পারলাম। তার চেহারা, সুরত দেখে বুঝতে বাকি রইলোনা, কেন নবীজি তার এই স্ত্রীকে এতো ভালোবাসতেন। তবে আমাদের পরিচয় দেয়ার পরও তিনি সেটা বিশ্বাস করলেন বলে মনে হলোনা। ভ্রু কুঁচকে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষনের মধ্যে নবীজির জ্ঞান ফিরে আসল। আমাদের পরিচয় দেয়ার পর তিনি প্রচন্ড শারীরিক কষ্টের মধ্যেও, করুণ মুখে মুচকি হাসলেন। তার চোখেও সুষ্পষ্ট অবিশ্বাস।

আমাদেরকে একপাশে বসতে বলে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি, আমার হাতে আর বেশি সময় নাই। এই দুজন অতিথি সম্ভবতঃ সেই সংবাদই নিয়ে এসেছেন।

তিনি ক্ষীণ কন্ঠে আশেপাশের সবাইকে কাছে এগিয়ে আসতে বললেন এবং এক দোয়াত কালি এবং এক খন্ড কাগজ এনে দিতে বললেন, “আমি তোমাদের জন্য কিছু লিখতে চাই। অথবা, আমি যা বলবো, তোমাদের কেউ আমার হয়ে লিখে রাখো। তোমাদের জন্য এটাই হবে আমার শেষ কথা। আমার এই কথাটুকু অনুসরন করে চললে ভবিষ্যতে তোমরা আর কোনদিন বিপথে যাবে না।”

যারা নবির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তারা প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কারো কারো মন্তব্য, আল্লার নবী কখনো মারা যেতে পারেন না। কেউ কেউ বললো মাত্রাতিরিক্ত জ্বরের ঘোরে আল্লাহর নবী এসব কথা বলছেন। কেউ কেউ বললেন, এ অবস্থায় তিনি যেসব কথা বলবেন, পরবর্তীতে সেগুলো অনুসরণ করা উচিৎ হবেনা। এসব নানারকম মন্তব্য করতে করতে একসময় তাঁরা নিজেদের মধ্যে প্রচন্ড বচসা শুরু করে দিলেন। একজন বললেন “আল্লাহর নবী কি ক্রোধান্বিত হয়ে এসব বলছেন? তাঁকে কি ভূতে ধরেছে? তাহলে বরং একজন ওঝা ডেকে নিয়ে আসি?”

শুনে পাশে দাঁড়ানো জয়নাব বিনতে জাহশ নামের নবীজির আরেক স্ত্রী এবং কয়েকজন সাহাবি বলে উঠলেন “আল্লাহর নবী যা চাইছেন, তোমাদের উচিৎ, অবিলম্বে তা নিয়ে আসা।” ওমর নামের একজন শক্তপোক্ত পেশীবহুল দেহের অধিকারী লোক রাগত কন্ঠে বললেন, “নবীর জ্বর অত্যধিক। এ পরিস্থিতিতে তিনি কি বলেন না বলেন, ঠিক নাই। তাছাড়া, আমাদের জন্য রয়েছেন আল্লাহ্‌ এবং কোরানের বানী। এগুলোই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এরপর আর অন্য কোন উপদেশ বা বানীর দরকার নাই।”

আমাদের কাছেও বিষয়টা বেশ দুর্ভাগ্যজনক মনে হলো। সংগী সাথীদের বেশীরভাগই নবীজীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে অস্বীকৃতি জানালো। যারা চাচ্ছিল নবীজীর লিখিত পথনির্দেশ, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতে ভুল পথে না যান, আর যারা চাচ্ছেননা তিনি কিছু লিখুন, এই দুই দলে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে তুমুল তর্ক বিতর্ক শুরু করে দিলেন। এই বচসা দেখে নবিজীকে খুবই মর্মাহত মনে হলেো। এক সময় তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে তিনি ধমক দিয়ে, দুই পক্ষকেই তাঁর সামনে বাকযুদ্ধ বন্ধ করে তাকে কিছুক্ষনের জন্য একা থাকতে দিতে অনুরোধ করলেন। তিনি শুধু ইশারায় আয়েশা আর আমাদের দু’জনকে সেখানে থাকাতে বলে চোখ বন্ধ করলেন।

উপস্থিত কারোই কোন ধারণা ছিল না যে নবিজী কী লিখতে চাচ্ছেন। তাছাড়া তিনি অসুস্থ, তাই তাদের কারো বোধগম্য হচ্ছিল না, কাকে দিয়ে লেখাবেন তাঁর নির্দেশগুলো। তিনি আসলে কি লিখতে চাচ্ছেন? তাঁর উত্তরাধিকারীর নাম লিখতে চাচ্ছেন? এমন কিছু লিখতে চাচ্ছিলেন যা কোরানে বলা হয়নি? এমন কোন ওহীর কথা বলবেন যেগুলো তিনি শুধু তাঁর নিজস্ব প্রয়োজনে প্রচার করেছিলেন? অথবা, কোরানের কোন কিছু কি তিনি বাতিল করতে চাচ্ছেন? অথবা আরব জাতির প্রগতির জন্য কি কোন নীতিমালা দিতে চাচ্ছেন? এই সবই যদি হয়, তবে তিনি মৌখিকভাবে তা বলছেন না কেন? – এরকম নানা মন্তব্য করতে করতে একে একে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

সবাই চলে যাওয়ার পর নবিজী চোখ খুললেন। করুন কন্ঠে আমাদের দুজনকে আরেকবার “আহ্লান ওয়া সাহ্লান” বলে স্বাগতম জানিয়ে আমাদের আসল পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি বিলকিসকে বললম, নবিজীকে যেন বলে, আমরা আল্লাহর বিগবস ওম্নির সবচেয়ে ঘনিষ্ট ফেরেশতা ম্যাকিনসন আর বিলকিস। আমরা মহাপ্রভূর কাছ থেকে কোন আদেশ নির্দেশ বা ওহী নিয়ে আসিনি। আমরা তাঁর সেই অন্তিম মুহূর্তের চিন্তাভাবনার বিষয়ে জানতে এসেছি।

নবীজী করুন কন্ঠে বললেন, “এইসব ফেরেশতা খোদার নাম না নিয়ে আপনারা আসলে কোনো দূরের দেশ থেকে এসেছেন কিনা, খুলে বলেন। আপনারা আমার ওষুধ আমাকেই দিচ্ছেন? এতোদিন যে ওষুধ দিয়ে সবাইকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এতদূর আসলাম, এখন মরার সময় সেসব নিয়ে এভাবে উপহাস করার জন্য এসেছেন! একেই বোধহয় বলে কর্মফল! আপনারা যেখান থেকেই এসে থাকেন, বলেন, কি জানতে চান? আমার কথাগুলি কোনভাবে কাছের কিংবা দূরের কোন দেশের মানবজাতির কাছে পৌঁছে দেবেন, কথা দেন! এটুকু নিশ্চয়তা পেলে আমি মনখুলে সবকিছু বলতে চাই। সব বলে আমি নিজেও শান্তিতে মরতে চাই।”

আজকের যুগের একজন সাংবাদিক সেরকম একটা জায়গায় আর সেই দিনটির সেই বিশেষ পরিস্থিতিতে গিয়ে হাজির থাকলে কি কি প্রশ্ন করতো, সেগুলো ভাবতে ভাবতে বিলকিসের মাধ্যমে নবীজীকে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। নবীজীর উত্তর আমার অনুবাদযন্ত্রের কল্যানে শুনতে পাচ্ছিলাম, বুঝতেও পারছিলাম। তার সহজ সরল স্বীকারোক্তি আর সংক্ষিপ্ত কথাগুলি শুনে বুঝলাম, তিনি আসলেই একজন অত্যন্ত মোহনীয়, যাদুকরী আর সন্মোহনী শক্তির অধিকারী বক্তা এবং মহান নেতা। প্রথম দুয়েকটা প্রশ্ন শুনেই ইশারায় আর কোন প্রশ্ন করতে নিষেধ করলেন। তারপর নিজে থেকেই নিচুস্বরে, করুন কন্ঠে কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারনে নবীজী বলতে শুরু করলেন,

“আমি ছিলাম অভাগা, এতিম, মূর্খ এক রাখাল। একবার দেখার পর দ্বিতীয়বার আমার দিকে কেউ ঘুরেও তাকাতো না। নিদারুন অভাব অনটন আর অবহেলার মধ্য দিয়ে কেটেছে আমার যুবক বয়স পর্যন্ত। নিতান্তই ভাগ্যগুনে অথবা নিয়তির টানেই হোক আর ঠান্ডা মাথায় দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করে সুযোগ মত সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার কারনেই হোক, বিবি খাদিজার ব্যাবসা দেখাশুনার চাকরিটা পাওয়া আর তাকে বিয়ে করার পর থেকেই আমার জীবন অন্যরকম হয়ে গেল। সে তার বংশের পূর্বপুরুষদের কাছে নাকি শুনেছিল, এই অঞ্চলের কোন এক যুবক একসময় নবী হিসাবে আবির্ভূত হবেন।

আমি কিন্তু বরাবরই এই এলাকার প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মকর্মের কোনোটাই পছন্দ করতাম না, পালন করা দূরের কথা। কিন্তু আমার বিবি ছিল নামকরা ইহুদী বংশের মেয়ে। তার কাছেই ইহুদীদের ধর্ম সম্পর্কে কিছু কিছু জেনেছিলাম। এরপর ব্যাবসার কাজে দূরের দেশগুলিতে সফরে গিয়ে অনেক ইহুদী আর খ্রিস্টান পাদ্রী, সাধু সন্নাসী দরবেশদের কাছে তাদের ধর্মীয় কিচ্ছা-কাহিনী, রীতি-রেওয়াজ আর আধ্যাত্মিক সাধনার কথা শুনে মনে মনে ভাবতে শুরু করেছিলাম, এগুলোর ভালো দিকগুলো নিয়ে নতুন একটা ধর্ম চালু করা যায় কিনা। আমি নিজে অশিক্ষিত বকলম হলেও অনেক জ্ঞানী গুনী মানুষের কাছে জ্ঞান বিজ্ঞানের অনেক কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। সবকিছু মিলিয়ে যে ধর্মটা দাঁড়া করাতে চেয়েছি, সেটা যে আসলে আমার একার বুদ্ধিতে করেছি, তাও না। এবিষয়ে আমার বড় বিবির বুদ্ধি, পরামর্শ, অনুপ্রেরণা আর আমার ভাগ্যেরও অনেক সহায়তা ছিল।

বিবির পরামর্শেই হেরা পাহাড়ের গুহায় গিয়ে ইহুদীদের কায়দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেলাদুলা করতে করতে নানান ধরনের মন্ত্র পড়তে পড়তে আমার পা ফুলে গেল। মাঝে মাঝে প্রচন্ড ঘোরের মত লাগতো। শেষে একদিন তো মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। চোখে তারা দেখছিলাম। এরই মধ্যে সামনে দেখি আলোয় উজ্জ্বল এক ভুত। আমি লেখাপড়া না শিখে কোন আক্কেলে নতুন একটা ধর্ম চালু করতে চাচ্ছি, সে বিযয়ে অনেক ধমক ধামক দিয়ে, পড়াশুনা শুরু করার নির্দেশ দিয়ে একটু পরেই উধাও হয়ে গেল। আমি রীতিমত আতংকিত অবস্থায় এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে বিবিকে পুরো ঘটনা খুলে বললাম। প্রয়োজনে আবার রাখাল হয়ে যাবো, নাহয় মুদির দোকান করে খাবো, কিন্তু জীবন থাকতে আর কোনদিন সেই পাহাড়ের গুহায় যাবোনা, এ কথা বলায় বিবি বলল, ঠিকআছে, আর যেতে হবেনা। তুমি বরং এক কাজ কর। কালকেই ঘোষণা দিয়ে দাও, তুমি নবী হয়ে গেছ। বাকি ব্যাবস্থা আমি করছি।

সেই থেকে আমি নবী হয়ে গেলাম। কিন্তু নিজেকে নবী হিসাবে চালাতে গিয়ে শুরুতেই খেলাম ধাক্কা। মক্কার কেউ আমার কথা কিছুতেই বিশ্বাস করেনা। প্রথম যেদিন মানুষজন জড় করে নিজেকে আল্লাহর নবী হিসাবে ঘোষণা দিলাম, সেদিনই আবু লাহাব নামের এক গন্যমান্য লোক বিরক্ত হয়ে বলে উঠেছিল, “এইসব ভন্ডামি বাদ দেও। এইরকম কত পাগল দেখলাম!” তার সেই কথা শুনে রাগের মাথায় আমিও তাকে পাল্টা ধমক দিয়ে কিছু অভিসাপ দিলাম।” – এটুকু বলে নবীজী দম নেয়ার জন্য একটু থামলেন।

এই সুযোগে কে আমি তাকে সুরা লাহাব পড়ে শোনালাম। নবীজী তো অবাক! সেই অভিশাপের কথাগুলি হুনহু আমি কিভাবে জানলাম, সেটা নিয়ে বিশ্ময় প্রকাশ করলেন। আমি বললাম,

– এটাতো আমি কোরান শরীফে পড়েছি। সুরা লাহাব নামে একটা সুরা আছে, আল্লাহর পাঠানো ওহী হিসাবে।

– বলেন কি! এই সুরা লাহাব নামে যে ওহীর কথা বললেন, এইটা তো আমার রাগের মাথায় বলে ফেলা অভিশাপের কথা। এইটা কি আল্লাহর ওহী হিসাবে লেখা হবে? কোরান শরীফ আবার কি জিনিশ! সেখানে এই কাহিনী কিভাবে ঢুকলো?

– আপনি মারা যাওয়ার পর আল্লাহর কাছ থেকে আপনি যেসব ওহী পেয়েছিলেন, সেগুলি একসাথে করে সাজিয়ে গুছিয়ে একসাথে করে কোরান শরীফ লেখা হবে। সারা পৃথিবীর মানুষ সেই কোরান পড়বে।

– হায়! হায়! বলেন কি! তা সেই কোরান শরীফে আর কি কি লেখা হবে?

– কোরান শরীফে প্রথমেই থাকবে সুরা ফাতিহা। – এই বলে আমি তাকে সুরা ফাতিহা পড়ে শোনালাম। শুনে তিনি দ্বিতীয়বার অবাক হলেন।

– আরে, সুরা ফাতিহা বলে যা বললেন, সেটা তো আসলে মন অস্থির হলে অথবা বিপদে পড়ে গেলে একটা দোয়া হিসাবে পড়তাম। এইটাও তো আমি আল্লাহর ওহী হিসাবে প্রচার করি নাই। এইটাও কি কোরানে সুরা হিসাবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে?

– হ্যাঁ। এইটা হচ্ছে মুসলিমদের সবচেয়ে প্রিয় আর বেশী করে পড়া সুরা। একসময় দুনিয়ার পাঁচ ভাগের একভাগ লোক মুসলিম হয়ে যাবে। তারা এই সূরা পড়বে আল্লাহর ওহী হিসাবে। আপনার ইসলাম ধর্ম পৃথিবীর সব দিকের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।

– বলেন কি! এই অবস্থা হলে তো বিরাট বিপদ! আমি তো আজকে সবার কাছে এই বিষয়গুলিই খুলে বলতে চাচ্ছিলাম। এইসব ওহী আসলে কোন ফেরেশতা আমাকে বলে দিয়ে যায় নাই। নানান সমস্যায় পড়ে, সমাধানের জন্য আমাকে যেসব কাজ করতে হয়েছে, সেগুলি আমার নিজের মনের কথা হিসাবে চালাতে গেলে, আমার এই টাউট বাটপার যুদ্ধবাজ খুনীর দলকে চালানো মুশকিল হয়ে যেত। তাই বিবির সাথে পরামর্শ করে একেক সময় একেকটা ওহী বানিয়ে বলতে হয়েছিল। আর বড় বিবি মারা যাওয়ার পর আমার কাছের বন্ধুবান্ধবদের সাথে সলাপরামর্শ করে যেসব নিয়ম কানুন ঠিক করতাম, সেগুলিই আল্লাহর বানী হিসাবে চালিয়ে দিতে হয়েছে। অনেকেই এটা বুঝে গিয়েছিল। বিশ্বাস করে নাই। অনেকে উপহাস করতো। আমাকে পাগল অথবা কবি মনে করতো। মাঝে মধ্যে প্রচন্ড হতাশ হয়ে যেতাম। দুয়েকবার মনের দুঃখে পাহাড়ের উপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যাও করতে চেয়েছিলাম। আমার বড় বিবি তখন আমাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করতো।

একসময় বুঝতে পারলাম, মাত্র শ’খানেক বেকার ছেলেপেলে দিয়ে নতুন একটা ধর্ম দাঁড় করানো যাবেনা। মক্কার লোকজন অনেক চালাক। তাই দলবল নিয়ে পালিয়ে চলে আসলাম মদিনায়। এখানে আমাদেরকে আশ্রয় দিলেও কামাই রোজগার তো নাই। শেষে দলবল নিয়ে ডাকাতি আর চোরাগোপ্তা হামলা শুরু করলাম মক্কাগামী বানিজ্য কাফেলার উপরে। এতে রুজি রোজগার ভালই হচ্ছিল। সেইসাথে কাফেলার সাথে থাকা মেয়েমানুষগুলিও পেয়ে যেতাম ফ্রি উপহার হিসাবে। সেই গনিমতের মালের লোভে মদিনার বেশিরভাগ বেকার যুবক আমাদের সাথে যোগ দিল। দিনে দিনে দলে ভারী হতে শুরু করলাম। কিন্তু আরবের লোকজনের চিন্তা ভাবনা শুধু আরাম-আয়েশ, খানা-পিনা আর মেয়েমানুষ। তাই এদেরকে নগদে যা দিতে পারলাম, তার উপরে আবার মরার পরে বেহেস্তের লোভ দেখাতে হল। মরুভূমি এলাকার মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট হল গরম আর পোকামাকড়ের ভয়। তাই, আমার কথামতো না চললে আগুন, গরম আর পোকামাকড় ওয়ালা দোজখের ভয় দেখাতে হল। একের পর এক যুদ্ধ করতে হল অন্যান্য জাতির লোকজনের সাথে। যারা দলে আসলো, তারা থাকলো, আর অন্যরা ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেল। এভাবেই আমি আমার দলবল নিয়ে হয়ে গেলাম আরব জাহানের নেতা। আমাদের ভয়ে দূরদূরান্তের রাজা বাদশারাও উপহার হিসাবে ধনসম্পদ আর সুন্দরী দাসী পাঠিয়ে দিত, যেন তাদেরকেও আক্রমণ না করি।

– আপনার বিয়েশাদীর কথাও কিন্তু কোরান শরীফ আর হাদিসে আছে। এসব নিয়ে অনেক গল্প গুজব ছড়িয়ে যাবে সারা দুনিয়ায়। এবিষয়ে যদি কিছু বলতেন!

– দেখেন, আরব সমাজে পৌরুষ, শান শওকত আর প্রভাব প্রতিপত্তির সবচেয়ে বড় চিন্হ হচ্ছে কার ঘরে কতজন সুন্দরী স্ত্রী আর দাসদাসী আছে। আমার যৌবনকাল কাটাতে হয়েছে আমার চেয়ে পনের বছরের বেশী বয়স্ক স্ত্রীর সাথে। আমিতো সবসময় বলেছি, আমি অন্য সবার মতোই রক্তমাংসের তৈরী মানুষ। আমারও জৈবিক চাহিদা আছে। সুযোগ পেলে কে না চায়, তার ঘরেও অনেকগুলি সুন্দরী যুবতী স্ত্রী থাকুক! তারপরেও, আরো অনেক সুযোগ থাকলেও আমি তো শুধু বেছে বেছে সবচেয়ে সুন্দরী নারীদেরকেই স্ত্রী আর সেবাদাসী হিসাবে গ্রহন করতাম। আমি না নিলে তাদেরকে নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যেত আমার দলের লোকজনের মধ্যে। অনেকে নিজে থেকে এসে আমার কাছে সমর্পণ করতো। যে দেশের যে সমাজের যেমন রীতি। এসব রীতি রেওয়াজ পুরাপুরি পাল্টানোর চেষ্টা করতে গেলে উল্টা বিপদে পড়ে যেতাম। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি চাই, আমার চালু করা ধর্ম যেন শুরু আরব দেশেই সীমিত থাকে। এই ধর্ম দিয়ে আমাদের যুদ্ধবাজ আরবদেরকে কোনমতে ঠিক রাখা গেলেও দুনিয়ার অন্য কোন এলাকায় অন্য সমাজে এই ধর্ম চালু করতে গেলে তারা পদে পদে যুদ্ধ আর উপহাসের মুখে পড়বে। শান্তির চেয়ে অশান্তিই হবে বেশী। আর যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাদীক্ষায় উন্নতি করতে হবে। সত্যি কথা বলতে কি, সেই হেরা পর্বতের গুহায় দেখা সেই ভুতের একটা কথাই শুধু সত্য, তা হচ্ছে, “পড়।” এছাড়া আমি আর যা কিছুই বলেছি, করেছি, সবই আমার নিজের বুদ্ধি বিবেচনামতে আর আমার বড় বিবি ও সাহাবীদের পরামর্শে করেছি। এর মধ্যে অলৌকিক কোন কিছুই নাই।

– তাহলে আল্লাহ, ফেরেশতা, কোরান, সুন্নাহ, এগুলির কি হবে?

– বললাম তো, এই সবই আমার বানানো। আল্লাহ আবার কি? সময়, ইচ্ছাশক্তি, ভাগ্য, পরিশ্রম – এই সবকিছু মিলেই হলো আল্লাহ। সময়ের কথাই চিন্তা করে দেখেন। সময় অনুকুলে থাকলে সবই সম্ভব। আর, সময় যদি খারাপ যায়, তাহলে সহজ জিনিশটাও অসম্ভব হয়ে যায়। সময় একটাই – বর্তমান। আপনি অতীতে গিয়ে কিছু পাল্টাতে পারবেন না, ভবিষ্যতে গিয়েও কিছুই করতে পারবেন না। বর্তমানকে সর্বোচ্চ মূল্য দিতে পারলেই আপনি ভবিষ্যতে সুখে শান্তিতে থাকতে পারবেন। সুরা আর দোয়া পড়ে আপনি মনে সাহস পেতে পারেন, কিন্তু পরিশ্রম না করলে, সময়কে কাজে না লাগালে কি ফায়দা হবে? সময় সব সমস্যার সমাধান করে দেয়। সময় সর্বশক্তিমান। সময় সর্বশ্রেষ্ঠ ওষুধ। সময় সবকিছুর উত্তর দিতে পারে। সময় সবচেয়ে জ্ঞানী।

– সময়ই যদি আল্লাহ হয়, তাহলে ইবলিশ শয়তান কি?

– শয়তান আসলে বাইরের কিছু না, মানুষের মনের অহংকার, লোভ লালসা, রাগ-ক্ষোভ, ঘৃণা আর অন্যের কুপরামর্শ – এগুলিই শয়তান। আমি যখন হতদরিদ্র ছিলাম, তখন আমার গরীবি হালত দূর করতে চেয়েছি, কিন্তু অতিরিক্ত লোভ করি নাই। আলাদা আলাদা ধর্ম আর গোত্রভেদের অহংকার দেখে সবাইকে একত্র করতে চেয়েছি, ক্ষমতার লোভে না। কিন্তু তা করতে গিয়ে অনেক ভালোমন্দ কাজ করতে হয়েছে সময়ের তাগিদে। মানুষ আমাকে মনে না রাখলেও আমার কাজের কথা মনে রাখবে। আর আজকে আমি মরে গেলে হয়তো আজকে থেকেই এরা ক্ষমতা আর নেতৃত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যেই রেষারেষি করে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনবে। আমি আমার কোন উত্তরাধিকার বাছাই করে যেতে চাইনা। সময়ই ঠিক করবে, কখন কাকে কোনপথে নিয়ে যাবে, কার কি পরিনতি হবে।

– তাহলে পরকাল?

– আপনি ভালোকাজ করলে আপনি মনে শান্তি পাবেন। শান্তিতে মরতেও পারবেন। ভালো মানুষ হিসাবে মানুয আপনাকে মনে রাখবে। মানুষের চিন্তায় কল্পনায় আপনি সুখে থাকবেন। সেটাই বেহেশতের সুখ। আর মন্দ কাজ করলে একসময় তা আপনাকে অনুশোচনা করতে বাধ্য করবে। আর অমানুষের মত কাজ করলে মরার পরেও মানুয আপনাকে মনে মনে ঘৃনা করবে। সেটাই দোজখ।

– আপনার অনুসারী আর মানবজাতির জন্য কিছু বলে যেতে চান?

– কি আর বলবো! আমার সময় বোধকরি শেষ হয়ে আসছে। দুনিয়ার সব মানুষ সুখে থাকুক, শান্তিতে থাকুক। সময়ের কাছে কৃতজ্ঞ থাকুক। দুঃসময় আসতেই পারে। কিন্তু খারাপ সময়েও কেউ যেন সময় কিংবা ভাগ্যকে দোষারোপ না করে। কারন সময়ই ঈশ্বর। সময় ছাড়া উপাসনার মত আর কিছুই নাই। আমরা সবাই সময়ের দাস।

এটুকু বলার পর নবীজী গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি বিবি আয়শার কাছে হাতের ইশারায় মেসওয়াক করতে চাইলেন। আয়েশার ডাক শুনে তাঁর সেই মুমূর্ষু অবস্থায় আব্দুর রহমান বিন আবু বাকর নামের এক কিশোর মেসওয়াক হাতে প্রবেশ করলেন। বিবি আয়েশা নবীকে তার গায়ের উপর ঠেস দিয়ে ধরে রেখেছিলেন। আমি দেখতে পেলাম, তিনি আব্দুর রহমানের দিকে তাকাচ্ছেন। আয়েশা বললেন, “মেসওয়াকটি কি আপনার হাতে দেব?” তিনি মাথার ইশারায় হাঁ বললেন। আয়েশা মেসওয়াক খানা তার হাতে ধরিয়ে দিলেন। ওটা সম্ভবতঃ তাঁর কাছে শক্ত মনে হলো। আয়েশা তাঁকে বললেন, “আমি কি ওটাকে নরম করে দিব?” তিনি মাথার ইশারায় হাঁ বললেন। আয়েশা তখন দাঁত দিয়ে চিবিয়ে মেসওয়াকটি নরম করে আবার নবীজীর হাতে ধরিয়ে দিলেন। নবীজী তাঁর দাঁতের উপর খুব সুন্দর করে মেসওয়াক করলেন। তাঁর সামনে ছোট একটা পানির পাত্র ছিল। তিনি সেই পাত্রে হাত ডুবিয়ে ভেজা হাত দিয়ে চেহারা মাসাহ করতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেনঃ “লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, নিশ্চয় মৃত্যূ সবচেয়ে যন্ত্রনাময়।”

এরপর তিনি তাঁর হাতের অাঙ্গুল উপরে উঠালেন এবং ঘরের ছাদের দিকে তাকালেন। তাঁর ঠোঁট নড়ে উঠল। আয়েশা তার মুখের কাছে কান পাতলেন। সে সময় তিনি বলছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি যাদেরকে পুরস্কৃত করেছেন তাদের অর্থাৎ নবী, সিদ্দীক, শহীদ সৎ ব্যক্তিদের সাথে আমাকেও শামিল করে নিন। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, রহম করুন এবং সুমহান বন্ধুর সাথে মিলিয়ে দিন।” শেষোক্ত বাক্যটি তিনি তিন বার বললেন। তারপর “ইয়া উম্মাতি! ইয়া উম্মাতি! ইয়া উম্মাতি!” বলতে বলতে তাঁর দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। একসময় তার হাতটি একপাশে ঝুঁকে পড়ল আর বিস্ফোরিত চোখে বিবি আয়শার দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় একসময় একেবারে স্থির হয়ে গেলেন। আয়েশা আর্তনাদ করে কেঁদে উঠলেন। আমরা বুঝতে পারলাম, নবীজী ইন্তেকাল করেছেন।

আব্দুর রহমান দরজার কাছে গিয়ে উপস্থিত জনতাকে নবীজীর মৃত্যূসংবাদ জানালো। তার কথা শুনে ওমর উচ্চকন্ঠে বলে উঠলেন, “আল্লাহর কসম! যে ব্যক্তি এ কথা বলবে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন – আমি আমার তরবারি দিয়ে তাকে আঘাত করব।” তখন পাশ থেকে আরেকজন সৌম্য চেহারার মুরুব্বী ধরনের লোক তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বললেন, “হে ওমর, তুমি শান্ত হও। নবীরাও মানুষ। তাঁরাও মৃত্যূবরন করেন। এর আগের সকল নবীই মৃত্যূবরন করেছেন।”

এরই মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখার জন্য লোকজন ঘরের ভিতরে সমবেত হতে শুরু করলো। সেই সৌম্য চেহারার বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাক্তিটি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, “হে লোক সকল, আমার জন্য রাস্তা করে দাও।” তিনি নবীজীর সামনে এসে ঝুঁকে তাঁর কপালে চুম্বন করে কোরানের আয়াত পড়লেন,

إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ

অর্থাৎ, “নিশ্চয় আপনি মরণশীল এবং তারাও (আপনার শক্ররা) মরণশীল।”

অতঃপর সমবেত লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, হে রাসূলের সাহাবী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি সত্যি সত্যিই ইন্তেকাল করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন সবাই তাঁর কথা বিশ্বাস করলো। তারা আবার জিজ্ঞেস করলো, হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথী! আমরা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জানাযা পড়ব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তারা জিজ্ঞেস করলো, তা কী নিয়মে? তিনি বললেন, একদল লোক প্রবেশ করবে, তারা তাকবীর বলবে, দু’আ করবে এবং দরূদ পাঠ করবে। তারা বের হয়ে এলে আরেক দল প্রবেশ করে একই নিয়েম তাকবীর, দু’আ ও দরূদ পড়ে বের হয়ে আসবে। এ নিয়মে জামা’আত ছাড়া সকলে আলাদা আলাদা জানাযার সালাত আদায় করবে। তারা আবার জিজ্ঞেস করলো, হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গী! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কি দাফন করা হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তারা জিজ্ঞেস করলো, কোথায়? তিনি বললেন, যে স্থানে তাঁর ইন্তেকাল হয়েছে সেখানেই। আল্লাহ তাঁর পছন্দের স্থানেই তাঁর জান কবজ করেছেন। তখন সকলের বিশ্বাস হলো, তিনি সত্য কথাই বলেছেন। তারপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গোসল দেয়ার জন্য তাঁর পরিবারবর্গ ও আত্মীয়-স্বজনকে আদেশ করলেন।

আমরা একফাঁকে দ্রুত বেরিয়ে আসলাম। এখানে আমাদের আর কিছুই করার নেই। একবার মনে হলো, মৃত্যূর আগে নবীজীর সাথে আমাদের কথপোকথনের বিষয়ে উপস্থিত লোকদেরকে জানাই। পর মূহূর্তে মনে পড়লো, অতীতে গেলেও ইতিহাসের গতিপথ পাল্টানোর চেষ্টা করার নিয়ম নেই। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিপথ বেছে নিক।

জীবিত অবস্থায় সাহাবীদের উপস্থিতিতে বলতে চেয়েও যা নবীজী বলে যেতে পারেন নি, নিরব থাকতে হয়েছে, তাঁর সেই নীরবতা চিরকালের জন্য এক রহস্য হয়ে থাকতো, যদিনা আমরা ঠিক ঐ মুহূর্তে হাজির হতাম।

Facebook Comments

সিয়ামুজ্জামান মাহিন

Feminist,Atheist,Humanist-Writer/Blogger

2 thoughts on “টাইম ট্রাভেল ৬৩২ খ্রীস্টাব্দ

  • August 8, 2018 at 7:16 am
    Permalink

    বেশ মন দিয়েই পরলাম।আপনার এসব লেখা আমার ধারনা সত্যিকারের বুদ্ধিমানের ভিত নড়াতে পারবে না।খুবই সস্তা টাইপের লেখা। বুঝা যায় বা অনুমান করা যায়।

    Reply
  • October 12, 2018 at 1:16 pm
    Permalink

    অতি চমেৎকার হয়েছে

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: