আপনার যে মগজ আছে তা কী আপনি প্রমাণ করতে পারবেন?

প্রশ্নঃ আপনার যে মগজ আছে তা কী আপনি প্রমাণ করতে পারবেন? মগজ না দেখেও কীভাবে বিশ্বাস করেন আপনার মগজ আছে? আপনি কী মগজটি ধরে দেখেছেন? নাকি আপনি বিশ্বাস করেন যে আপনার মগজ আছে? যেহেতু আপনি আপনার মগজে বিশ্বাস করছেন, সেহেতু আল্লাহয় বিশ্বাস করতে সমস্যা কোথায়?
উত্তরঃ প্রথমত, এই যুক্তটি প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো। যুক্তিবিদ্যায় সেই দুই হাজার বছর আগে এরকম যুক্তি দেয়া হতো। বর্তমান সময়ে এসব যুক্তি শুধুমাত্র ধর্মকে প্রমাণ করতেই কেউ কেউ দেয়। আধুনিক যুক্তিবিদ্যায় এইসব যুক্তি দেখালে তা নিয়ে রীতিমত হাসাহাসি শুরু হবে।
কেন এই কথাটি বললাম? কারণ এই যুক্তিটি বর্তমানে কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত আস্তিকও দিতে চান না। তারা জানেন এই যুক্তি দেয়ার বিপদ। ইতিমধ্যে বিজ্ঞানের সহায়তায় Magnetic resonance imaging (MRI) যন্ত্র তৈরি হয়ে গেছে। যা দিয়ে খুব পরিষ্কারভাবে আপনার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আমরা বাইরে থেকেই পরীক্ষা করতে পারি। রোগ নির্ণয়ও করতে পারি। সম্ভবত আপনি বিষয়টি জানেন না। যাইহোক।

আমি কোন কিছুই বিশ্বাস করি না। কিছু বিষয় আমি জানি যে সেগুলো সত্য, কিছু বিষয় আমি জানি যে সেগুলোর কোন প্রমাণ নেই, তাই মেনে নেয়ার প্রয়োজন নেই। তেমনি মগজেও আমি বিশ্বাসী নই। আমি জানি এবং মেনে নিয়েছি ওটা আছে। বিশ্বাস করছি না। বিশ্বাস আলাদা বিষয়। বিশ্বাস তখনই করতে হয় যখন কিছু প্রমাণ করা যায় না। বা প্রমাণের অপ্রতুলতা থাকে। তখন বিশ্বাস করতে বলা হয়। বিজ্ঞানের জগতে বিশ্বাসের কোন স্থান নেই। মগজের যথেষ্ট প্রমাণাদি রয়েছে।
মানুষ যে সব উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করে, তা শুধু পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের ওপর সীমাবদ্ধ নয়। সবকিছুই যে আমার হাতে ধরে দেখতে হবে, বা চোখে দেখতে হবে, এমন নয়। কিছু জিনিস আমরা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারি। যখন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারি, তখন সেটা আমরা মেনে নিই।

যেমন ধরুন অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু আমরা মেনে নিই সেসব। কারণ আমরা পরীক্ষার সাহায্যে সেগুলোর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারি। আপনি পৃথিবীর যেকোন বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারে গিয়ে এরকম পরীক্ষা দেখতে চাইলে আপনাকে দেখিয়ে দেয়া হবে। তাহলে দেখুন, না দেখেও আমরা সেগুলো মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আমরা কেউই বলি না, আমি অক্সিজেনে বিশ্বাস করি। বা আমি চাঁদে বিশ্বাস করি। বা আমি গাছে বিশ্বাসী। বা আমি এমিবায় বিশ্বাসী। কারণ বিশ্বাসের প্রশ্ন তখনই আসে যখন কোন কিছুর সত্যিকারের প্রমাণ পাওয়া যায় না। তখন সেগুলোকে বিশ্বাস করে নিতে হয়। যেমন কেউ ভুতে বিশ্বাসী, কেউ আল্লায়, কেউ ভগবানে, কেউ জ্বীনে, কেউ পেত্নীতে, কেউ সুপারম্যানে, কেউ শাঁকচুন্নিতে, কেউ জিউসে, কেউ শিবে। বিশ্বাস হচ্ছে একটি প্রমাণহীন ধারণা। প্রমাণসহকারে যেসব ধারণা সেগুলো হতে পারে প্রতিষ্ঠিত সত্য, নতুবা বৈজ্ঞানিক সত্য, নতুবা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। কিন্তু, আমরা কখনই বলি না যে, আমি অভিকর্ষ তত্ত্বে বিশ্বাসী। বা আমি বিগ ব্যাং এ বিশ্বাসী। কারণ এগুলো প্রমাণ নির্ভর, বিশ্বাস নির্ভর নয়।

আমার যে নিজের চোখ আছে, সেটা নিজের চোখ দিয়ে সরাসরি আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু সামান্য একটি পরীক্ষা করলেই আমরা জানতে পারি, আমার আসলেই চোখ আছে কিনা। যেমন আয়নার সামনে দাঁড়ালেই আমরা আমাদের চোখ দেখতে পাই। খুব সহজ সাধারণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। পরীক্ষা করে দেখুন, আপনার আর বিশ্বাস করতে হবে না যে আপনার চোখ আছে। আপনি নিশ্চিতভাবে জেনে যাবেন বা মেনে নেবেন।

আবার, আমার যে মগজ আছে, সামান্য কয়েকটি পরীক্ষায় তা আমরা প্রমাণ করতে পারি। আমরা এমআরআই করতে পারি। নতুবা আমরা আরও কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে পারি। যেমন মৃতদেহের ওপর পরীক্ষা। তার খুলিটা খুলে। কিংবা অপারেশনের সময় কারো মগজ অপারেশন হলে সেখানে উপস্থিত থেকে। আরও নানা পদ্ধতি রয়েছে। যেমন গাজা সেবন করলে। আরও অনেক পদ্ধতি আছে। পরীক্ষাগারে সেগুলো সহজেই প্রমাণযোগ্য।
সেই সাথে, আমরা যদি আমাদের পুর্বের স্মৃতি স্মরণ করতে পারি, তা থেকে বুঝতে পারি সেই স্মৃতিগুলো কোথাও জমা ছিল। নানা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষায় প্রমাণ হয়েছে যে, আমাদের স্মৃতিগুলো মগজেই সংরক্ষিত থাকে। কিডনি কিংবা হৃদপিণ্ডে নয়। মস্তিষ্কের কোষই একমাত্র স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে। ডিএনএ এর ভেতরেও স্মৃতি থাকে, তবে সেটা ভিন্ন রকমের। এটাও কেউ আপনাকে বিশ্বাস করতে বলছে না। এটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত। আপনার বিশ্বাস অবিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল নয়। আপনি চাইলে আপনাকেও পরীক্ষা করে দেখানো সম্ভব। এগুলো প্রমাণহীন স্রেফ ধারণা নয়। প্রতিষ্ঠিত সত্য, প্রমাণ সহকারে।
সেই থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায়, আমার খুলির ভেতরে মগজ রয়েছে। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে, কিংবা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার দ্বারা। কিন্তু কোন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় আল্লাহ ভগবান ঈশ্বরের কোন প্রমাণ এখনো মেলে নি। কোন পরীক্ষা দেয়ার আগে আপনি আল্লাহ, ভগবান , ঈশ্বর কিংবা মামদো ভুত, শিব বা কালী বা হারকিউলিস, আলাদা আলাদা ভাবে এদের উপাসনা করে পরীক্ষা দিলে সবক্ষেত্রে একই রকম নম্বর পাবেন। প্রাপ্ত নম্বর নির্ভর করবে আপনি সেই বিষয়ে কতটুকু পড়ালেখা করেছেন তার ওপর। মোটেও আপনি কোন ঈশ্বরের বা দেবতার প্রার্থনা করেছেন তার ওপর নয়। বা আপনি লটারির টিকিট কিনতে পারেন। এক একবার এক এক জিনিসের নামে। ফলাফল একই রকম হবে। সম্ভাবনা সবক্ষেত্রে একই।

তাই এইসব প্রাচীন ও হাস্যকর যুক্তি কাজে লাগিয়ে যদি আপনারা শাঁকচুন্নি বা মামদোভুত বা আল্লাহ ভগবান ইত্যাদি সত্য তা প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন, মানুষের বুদ্ধিমত্তার প্রতি অবমাননা বলেই আমার মনে হবে। এক হাজার বছর আগে এই যুক্তি দিলেও অন্তত মানা যেতো। আফসোস যে, আধুনিক পৃথিবী কোথায় চলে গেছে, আর আপনারা সেই খ্রিস্টপুর্ব আমলের যুক্তি দিয়ে আমাদের হাসির পাত্র হচ্ছেন।

Facebook Comments