শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই

পৃথিবী নামক গ্রহে বাস এবং সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে আমাদের সৌরমন্ডল নিয়ে যে গ্যালাক্সিতে আমরা অবস্থান করছি তার নাম ‘মিল্কিওয়ে’।
খোদ মিল্কিওয়ের মধ্যেই ১০বিলিয়নের অধিক সৌরমন্ডল আছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন সৌরমন্ডল আবিষ্কার হচ্ছে। এতো গেল মিল্কিওয়ের হিসেব, ধারণা করা হয় মিল্কিওয়ের মত গ্যালাক্সিই আছে ২০০ বিলিয়নের অধিক। ২০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সিতে আনুমানিক কতটি সৌরমন্ডল থাকতে পারে তার হিসেব আপনি নিজেই করতে পারেন। হিসেব সহজ করার জন্য বলে দিতে পারি, ১০০কোটিতে এক বিলিয়ন।
৭০০কোটিরও বেশি লোকসংখ্যার এই পৃথিবীতে প্রায় ১৯৫টি স্বাধীন এবং ৫-১০টি পরাধীন, অর্ধপরাধীন রাষ্ট্র। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের মানুষই মনে করে তারাই শ্রেষ্ঠ! ৭০০কোটি মানুষ বহুল প্রচলিত, কম প্রচলিত, প্রায় লুপ্তসহ মোট ৬৯০৯টি ভাষায় কথা বলে! প্রত্যেকটি ভাষার মানুষই মনে করে তারাই উত্তম, তারাই শ্রেষ্ঠ! ক্ষুদ্র-বড় হাজার হাজার গোষ্ঠী, সংস্কৃতির লোক আছে যারা প্রত্যেকেই মনে করে তারাই শ্রেষ্ঠ!

মানুষ নাকি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। পৃথিবীতে মানুষের উদ্ভবের পর থেকেই মানুষ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য সংগ্রাম করে গেছে। এই শ্রেষ্ঠত্বের যুদ্ধে সৃষ্টির আদিতে মানুষের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলো প্রকৃতি আর ভয়ানক জীবজন্তু। প্রতিকূল প্রকৃতিতে মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব ঠিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করে গেছে হাজার বছর। বুদ্ধির জোরে হাতিয়ার তৈরি করেছে, হত্যা করেছে পশু-পাখি। আগুনের ব্যবহার শিখেছে, গাছ কেটে আগুন জ্বেলেছে শীত নিবারণ জন্য, ঝলসানো মাংসের জন্য। এইসব প্রতিকূলতাকে মানুষ অনেক আগেই প্রায় জয় করেছে, বাঁচতে শিখেছে। শুধু বাঁচতেই শিখেনি, ভালো ভাবে বাঁচতে শিখেছে, আরাম আয়েশে জীবন যাপন করতে শিখেছে। প্রকৃতি আর জীবজন্তু অনেক আগেই পরাস্থ আর পরাভূত মানুষের কাছে। এখন মানুষের সামনে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে একমাত্র বাধা স্বয়ং মানুষ। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের খেদ মিটেনি, হাজার বছর, শতাব্দী, যুগ পেরিয়ে… এখন তারা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে ব্যস্ত প্রতিটি মিনিটে, প্রতিটি সেকেন্ডে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব তো… প্রতিটি সেকেন্ডই মূল্যবান।

প্রকৃতিকে জয় করা মানুষ নিজেদের মধ্যে বিভাজিত হতে থাকলো, তৈরি হলো গোত্র, উপগোত্র, উপ-উপগোত্র। প্রত্যেকেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলো, কখনো তা সীমাবদ্ধ ছিলো বুদ্ধি বা পাণ্ডিত্যে, কখনো মল্লযুদ্ধে, কখনো গোত্র-যুদ্ধে, কখনো গৃহযুদ্ধে। রক্তপাতের যুক্তি হিসেবে তারা কখনো টেনে আনল ভূমি, কখনো নারী, কখনো সম্পদ, কখনো স্বেচ্ছাচারিতা, কখনো বিশ্বাস।
মানুষ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে সবসময়ই শক্তির পূজা করেছে… কখনো সূর্যের, কখনো আগুনের, কখনো বাতাসের, কখনো হাতে তৈরি মূর্তির, কখনো অদৃশ্যের। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মানুষ সর্বদাই আপন করতে চেয়েছে দৃশ্যমান বা অদৃশ্য শক্তিকে, যা তার একান্ত নিজের বিশ্বাস। নিজের বিশ্বাসকে সর্বদাই চেয়েছে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে। প্রয়োজনে রক্তপাত করেছে, নিজের বিশ্বাস শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য। প্রত্যেকটি গোত্র নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছে, নিজের বিশ্বাসকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছে।
মানুষ যতই সভ্য হয়েছে, যতই সভ্যতা এগিয়ে নিয়ে গেছে, ততই পিছিয়ে গেছে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের রুগ্ন মানসিকতা। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নামে ভিন্ন বর্ণের, গোত্রের মানুষকেই তারা দাস বানিয়েছে… খাঁচায় ভরে চিড়িয়াখানায় রেখেছে বিনোদনের জন্য।
সভ্যতার নামে মানুষ জনপদ গড়েছে, সমাজ গড়েছে, গ্রাম, শহর, বন্দর গড়েছে… নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নামে একের পর এক তা ধ্বংসও করে দিয়েছে। আবার গড়েছে… আবার ধ্বংস করেছে, আবার গড়েছে। জয়ের আনন্দে পদদলিত করেছে সভ্যতা… নগরের পর নগর পুড়িয়ে দিয়েছে, লাশের গালিচায় শহর সাজিয়েছে… তবু তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের খেদ মিটেনি।
শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নামে দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ করেছে, পারমানবিক বোমা ফাটিয়েছে… তবু তাদের মনের খেদ মিঠেনি, শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের ইচ্ছে বিন্দুমাত্র কমেনি। নিজের বিশ্বাস, নিজের তন্ত্র, নিজের ভাষা, নিজের আচার, রীতি, নীতি… শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য সবই চাপিয়ে দিতে চেয়েছে কখনো দুর্বলদের উপর, কখনো সংখ্যালঘুদের উপর।

ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৪২০০টি ধর্মের মানুষ আছে এই পৃথিবীতে, প্রত্যেকটি ধর্মের মানুষই মনে করে তারাই শ্রেষ্ঠ! পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি ধর্মের ভিতরেই বিভক্ত গোষ্ঠী, গোত্র, কাস্ট, উঁচু-নিচু পদ মর্যাদার বংশ আছে, যারা প্রত্যেকেই মনে করে তারাই উত্তম!
পৃথিবীর প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের ভিতরে বিভাগ, জেলা, উপজেলা আছে… তার মধ্যে পাড়া-মহল্লা আছে, ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ প্রত্যেকটি এলাকার মানুষই মনে করে তারাই উত্তম! পাড়া-মহল্লা-এলাকায় আমাদের প্রতিবেশী আছে, আমরা প্রত্যেকেই মনে করি প্রতিবেশী থেকে আমরা উত্তম! প্রত্যেকটি বাড়ীতেই একাধিক সদস্য আছেন, প্রত্যেকটি সদস্যই মনে করে অন্যদের থেকে আমি বেশি বুঝি, আমি পরিবারের অন্যান্য সদস্য থেকে উত্তম!

শ্রেষ্ঠত্বের এই লড়াইয়ে মানুষ কখন যে সৃষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে… হয়ে আছে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ কীট, তা নিজেও টের পায়নি!
আমি স্বপ্ন দেখি একদিন মানুষ (নিশ্চয়ই) বুদ্ধিমান প্রাণের সন্ধান পাবে। আমার বড্ড জানার ইচ্ছে ঐখানে তারা কোন ইশ্বরের উপাসনা করে…! আহা বড় আফসোস, তখন আমি থাকবো না। ততদিনে টাইম-মেশিনও নিশ্চয় আবিস্কৃত হয়ে যাবে, …টাইম ট্রাভেলে অতীতে এসে ‘কেউ’ বলে যাবে ‘তথ্য’টুকু!!!

লেখকঃ Rationalist Human

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: