বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে খুন বা ধর্ষণের শাস্তি কী?

শুরুতে জানা দরকার বিজ্ঞান বলতে আপনি কী বোঝেন। বিজ্ঞান বলতে আমরা সাধারণ মানুষ অনেক সময় হয়তো বুঝি কিছু কলকব্জা, যন্ত্রপাতি, বড় বড় মেশিন ইত্যাদি। কিন্তু সেগুলো হচ্ছে বিজ্ঞানের এক একটি আবিষ্কার, বা হাতিয়ার। সেগুলো আসলে বিজ্ঞান নয়। বিজ্ঞান হচ্ছে একটি পদ্ধতির নাম। প্রযুক্তি আর বিজ্ঞান আলাদা বিষয়। এই সহজ বিষয়টা না বুঝলে মুশকিলের ব্যাপার হয়।

আমাদের দেশের অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত মানুষের কাছে বিজ্ঞান মানে টেস্টটিউবে কিছু নীল রঙ্গের পদার্থ, বা একটা বড়সর মেশিন ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু সেগুলো আসলে এক একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার যন্ত্র। সেগুলো বিজ্ঞান নয়। বিজ্ঞান একেবারেই আলাদা বিষয়। তথ্য সংগ্রহ করা, তথ্যগুলো এনালাইসিস করা, তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে আসা, সেই সিদ্ধান্তকে পুনরায় যাচাই করা, পরীক্ষা করা, সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সেই সিদ্ধান্তটিকে একটি বৈজ্ঞানিক থিওরীর সম্মান দেয়া। বিজ্ঞানের কাজ এভাবে। এখানেই থেমে থাকে না। এরপরেও চলতে থাকে পরীক্ষানিরীক্ষা। যখনই কোথাও ভুল হচ্ছে মনে হবে, সাথে সাথে দেখতে হবে সেই তত্ত্বে কোন সমস্যা রয়েছে কিনা। ধরুন বিবর্তনবাদ সম্পর্কে যদি কোনদিন সামান্য কোন ভুল পাওয়া যায়, পৃথিবীর তামাম বিজ্ঞানীগণ সাথে সথে ঝাঁপিয়ে পড়বে সেটা শুদ্ধ করতে। তখন কেউ “হেফাজতে বিবর্তনবাদ” নামে সংগঠন খুলে আন্দোলনে নামবে না, কিংবা বিবর্তনবাদে অবিশ্বাসীদের ফাঁসি দাবী করবে না। সেগুলো বিশ্বাসভিত্তিক সংগঠনগুলো করে।

একজন অপরাধী কী করেছে, তার শাস্তি কী হতে পারে, বিজ্ঞান সরাসরি সেগুলো নিয়ে ডিল করে না। জ্ঞানের নানা শাখা প্রশাখা রয়েছে। কোন কোন বিষয় কোন কোন বিষয়গুলো ডিল করবে, তা সুনির্দিষ্ট। এখানে কোন পরিপূর্ণ জীবন বিধান নেই, এক বইতে সব বলে দেয়া নেই। জ্ঞান এভাবে কাজ করে না। সেভাবে কাজ করে রূপকথা। এক মন্ত্রে সকল সমস্যার সমাধান!

যেমন, নিউটনের সূত্র বিষয়ে জীববিজ্ঞান কী বলে? না, জীববিজ্ঞান নিউটনের সূত্র নিয়ে ডিল করে না। অথবা আপেক্ষিক তত্ত্ব বিষয়ে মেডিকেল সায়েন্সের মতামত কী? না, আপেক্ষিক তত্ত্ব বিষয়ে মেডিকেল সায়েন্সের কোন মতামত থাকতে পারে না। প্রতিটি অংশের আলাদা ক্ষেত্র, আলাদা কাজ। তবে আধুনিক সময়ে জ্ঞানের বেশিরভাগ শাখাই, বিজ্ঞানের পদ্ধতি ব্যবহার করে। সেই বিজ্ঞানের পদ্ধতিটি হচ্ছে, তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ বা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংস, হাইপোথিসিস তৈরি, পরীক্ষানিরীক্ষা, সেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে তত্ত্ব বা থিওরী তৈরি করা, সেই থিওরী যাচাই করা, ভবিষ্যতে কী হতে পারে, পূর্বের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তা ধারণা করা, সেটি মিলিয়ে দেখা, সঠিক হলে সেটাকে থিওরী হিসেবে মেনে নেয়া।

একজন অপরাধীকে শাস্তি দেয়া কিংবা না দেয়া অপরাধ কমাতে বা বাড়াতে কোনভাবেই সাহায্য করে না। বরঞ্চ বিজ্ঞান সেই অপরাধের মূল খুঁজতে চেষ্টা করে। সেই সাথে দেখে, শাস্তি প্রদান সমাজে অপরাধের মাত্রা বাড়াতে বা কমাতে কীরকম ভূমিকা রাখছে। উল্লেখ্য, কোন কারণে সেই লোকটি এই অপরাধ করেছে, সেই কারণ অনুসন্ধান করা গেলেই বরঞ্চ ভবিষ্যতে সেই অপরাধকে কমানো সম্ভব। তাই শাস্তির চাইতে অপরাধের কারণ অনুসন্ধান জরুরি।

এর ওপরই ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে আধুনিক সময়ের অপরাধ বিজ্ঞান এবং অপরাধ মনস্তত্ত্ব। দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের ওপর গবেষণা করে জানার চেষ্টা হয়েছে, তারা কেন অপরাধ প্রবণ হয়। জেলখানায় নানা পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে এই নিয়ে। কয়েদিদের ওপর অনেক গবেষণা করা হয়েছে দীর্ঘদিন। অতীতের ঠিক কোন কোন ঘটনা তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে তা নিয়ে। হয়তো একটি শিশু চুরি করছে, অবচেতন মনে। তার মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে দেখা হয়েছে, এটি একটি মানসিক রোগ কিনা। যারা ধর্ষণ করে, বা গণহত্যা চালায়, তাদের মনের গঠন ভালভাবে বোঝা জরুরি। শুধুমাত্র শাস্তি প্রদান এই ধরণের বড় অপরাধকে কমাতে পারে না। সেই জানার পদ্ধতিটিই বিজ্ঞান।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্ষককে কী শাস্তি দেয়া হবে? এর উত্তর হচ্ছে, বিজ্ঞান তা ডিল করে না। সমাজের অন্যান্য জ্ঞানের শাখা বিজ্ঞানের পদ্ধতি ব্যবহার করে নির্ধারণ করবে, অপরাধীকে কী শাস্তি দেয়া যেতে পারে। পদ্ধতিটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মানে ইলেক্ট্রিক চেয়ারে তাকে হত্যা নয়, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মানে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ, তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সিদ্ধান্তকে পুনরায় যাচাই বাছাই, ইত্যাদি। অর্থাত অতীতে কী কী শাস্তি দেয়া হয়েছিল, তার ফলাফল কী হয়েছে, তা অপরাধ কমাতে সফল হয়েছিল কিনা, তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে যাওয়া।

Facebook Comments