ধর্ম, ইতিহাস ও অনান্য

মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা বা ধারণার ইতিহাস অতি প্রাচীন একটি বিষয়। মৃত্যূর অবশ্যম্ভাবিতা এড়ানোর কোন উপায় বের করতে না পেরে, সেইসাথে পার্থিব জীবনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে মানুষের মনে মৃত্যূ পরবর্তী জীবনের ধারণা তৈরী করতে আর সেই ধারণাগুলিকে বদ্ধমূল বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে গিয়ে যুগে যুগে একের পর এক ধর্ম, দর্শন ও বিশ্বাসব্যাবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে, যদিও এর কোনটিকেই নির্ভুল হিসেবে প্রমান করা যায়নি। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, বিচিত্র এসব ধারনায় বদ্ধমূল বিশ্বাসীরা তাদের ধারনাটির বাইরে প্রায় একই রকম আরো অনেক ধারণা সম্পর্কে তেমন একটা না জেনেই অন্য সব ধারণাকেই ভুল মনে করে, আর নিজেদের ধারণাটিকেই একমাত্র সঠিক আর সত্য বলে মনেপ্রানে বিশ্বাস করে। বিশেষ কিছু ধর্মের অনুসারীরা ভিন্নধারনায় বিশ্বাসীদের মৃত্যূ ঘটিয়ে নিজেও মৃত্যূবরন করে পরবর্তী জীবনে পৌঁছে যাওয়াকে নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করে। সেরকম কোন মৃত্যূর পর পুনরায় জীবিত হিসেবে ফিরে এসে কেউ সাক্ষ্য প্রমানাদিসহ জনসম্মুখে নিজেকে উপস্থাপন করেনি। সেরকম কিছু ধারণা বা মতবাদ নিয়ে উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত কিছু তথ্য যথাসম্ভব সংক্ষেপে উপস্থাপন করছি, যদিও ব্যাক্তিগতভাবে আমি এদের কোনটিকেই সম্পূর্ন সঠিক এবং সত্য বলে বিশ্বাস করিনা।

মৃত্যু পরবর্তী জীবন বা পরকাল হল একটি জগতের ধারণা, যে ধারণা অনুসারে ব্যক্তির শরীরের মৃত্যু হয়ে গেলেও তার আত্মপরিচয় বা চেতনার অস্তিত্ব থেকে যায়। পরকালের বিভিন্ন ধারণা অনুযায়ী মৃত্যুর পরেও থেকে যাওয়া ব্যক্তির এসেন্স কোন আংশিক উপাদান অথবা পূর্ণাঙ্গ আত্মা বা স্পিরিট হতে পারে। এই এসেন্স কোন ব্যক্তিগত পরিচয় বহন করতেও পারে আবার নাও পারে। পরকালের উপর বিশ্বাস প্রকৃতিবাদী দর্শন থেকে আসতে পারে অথবা অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস থেকেও আসতে পারে।

কিছু লোকায়ত মতবাদ অনুসারে, মৃত্যুর পরও অস্তিত্ববহন করা এই সত্তা কোন অতিপ্রাকৃত জগতে অবস্থান করে, আবার অন্যান্য লোকায়ত মতবাদ অনুসারে এই সত্তার পুনর্জন্ম ঘটে এবং পুনরায় জীবনচক্র শুরু হয়। এক্ষেত্রে পূর্বের জীবন সম্পর্কে কোন স্মৃতি থাকে না। এই মতবাদ অনুসারে সত্তার একটি অতিপ্রাকৃতিক জগতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত বারবার জন্ম ও মৃত্যুর প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। পরকাল সংক্রান্ত বেশিরভাগ বিশ্বাসেরই উৎপত্তি ধর্ম, দর্শন, আধ্যাতিকতা, এসোটেরিসিজম এবং অধিবিদ্যা থেকে।

কিছু বিশ্বাস ব্যবস্থা বিশেষ করে আব্রাহামিক ধর্মেগুলোরবিশ্বাস অনুযায়ী মৃত্যুর পর সত্তা জীবিতাবস্থায় পৃথিবীতে তার কৃতকার্য ও বিশ্বাস অনুযায়ী ঈশ্বর বা কোন স্বর্গীয় বিচার শেষে নির্ধারিত বিশেষ স্থানে গমন করে। অন্যদিকে ভারতীয় ধর্মগুলোর পুনর্জন্ম বিশ্বাস অনুযায়ী মৃত্যুর পর কৃতকার্য অনুসারে সত্তার প্রকৃতি সরাসরি নির্ধারিত হয়ে যায়, এতে ভিন্ন কোন সত্তার সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয় না।

অধিবিদ্যীয় মডেলগুলোতে আস্তিকরা সাধারণত একধরণের পরকালে বিশ্বাস করে থাকেন যা মৃত্যুর পর তাদের জন্য অপেক্ষা করে। কিছু সাধারণ নাস্তিক্যবাদী ধর্মের সদস্যরা পরকালে বিশ্বাসমুখী হন, কিন্তু এই বিশ্বাসে কোন ঈশ্বর থাকে না। স্যাডিউসিজ নামে একটি প্রাচীন ইহুদি সম্প্রদায় আছে যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করলেও পরকালে বিশ্বাস করতেন না।

অনেক ধর্মই, তা সে খ্রিষ্টধর্ম বা ইসলাম বা অনেক পৌত্তলিকতাবাদী বিশ্বাসব্যবস্থার মত পরকাল বলতে মৃত্যুর পর অন্য এক জগতে আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী হোক অথবা হিন্দুধর্ম বা বৌদ্ধধর্মের অনেক ধারার মত পুনর্জন্মেই বিশ্বাসী হোক, সকল ক্ষেত্রেই বিশ্বাস করা হয় যে পরকালে কোন ব্যক্তির অবস্থা হচ্ছে জীবিতাবস্থায় তার কৃতকার্যের শাস্তি অথবা পুরষ্কার।

জন্মান্তরবাদ

জন্মান্তরবাদ বা পুনর্জন্ম একটি পরকাল সম্পর্কিত ধারণা যা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, রসিক্রুশিয়ান, থিওসফিস্ট, স্পিরিটিস্টগণ এবং উইক্কানদের বিশ্বাস ব্যবস্থায় পাওয়া যায়। এছাড়া কাব্বালিস্টিক ইহুদি ধর্মেও গিলগুল নেশামত (আত্মার পুনর্জন্ম) -কে একটি বিশ্বাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। জন্মান্তরবাদের ধারণা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর আত্মা আরেকটি নতুন জীবন শুরু করে। মোক্ষ বা মুক্তি অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত পুনর্জন্মের এই ধারা চলতে থাকে।

জন্মান্তরবাদ বিশ্বাসের আরেকটি দিক হচ্ছে, এই বিশ্বাস অনুযায়ী প্রতিটি জীবন একই সাথে একটি পরকাল এবং পূর্বকাল। এই বিশ্বাস মতে, বর্তমান জীবন হল পূর্বজন্মের কর্মের ফল।

রসিক্রুশিয়ানগণ, মৃত্যু-পূর্ব অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মতই লাইফ রিভিউ পর্যায়ের কথা বলেন। মৃত্যুর ঠিক পরপরই নতুন জীবন শুরু এবং স্বর্গীয় বিচারের পূর্বে ঘটে যা অনেকটা জীবনের চূড়ান্ত পর্যালোচনা বা চূড়ান্ত রিপোর্ট এর মত।

স্বর্গ ও নরক

আব্রাহামিক ধর্মগুলো অনুসারে ব্যক্তি মৃত্যুর পর পৃথিবীতে তার কৃতকর্ম, বিশ্বাস, নিয়তি, ভাগ্য কিংবা শর্তহীনভাবে বেছে নেয়ার ভিত্তিতে স্বর্গ বা নরকে যান অথবা মৃত ব্যক্তির পুনরুত্থানের সময় পর্যন্ত একটি মধ্যবর্তী অবস্থায় অপেক্ষা করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বর্গ হল ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির জন্য মৃত্যুর পর পুরষ্কারস্বরূপ প্রাপ্ত একটি অবস্থা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বর্গকে ঈশ্বরের সাথে চিরমিলনের অবস্থা হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে নরক হল পাপী ব্যক্তিদের শাস্তি এবং পীড়নের জন্য একটি অবস্থা। এটা অনন্তকাল ব্যাপী অথবা একটি নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত শাস্তির জায়গা যেখানে ব্যক্তিকে অন্যান্য পাপাত্মা এবং পতিত স্বর্গদূতদের সাথে বন্দিদশায় থাকতে হবে।

লিম্বো

লিম্বো খ্রিষ্টধর্মের একটি জনপ্রিয় বিশ্বাস। মধ্যযুগের ধর্মতাত্ত্বিকদের দ্বারা এই মতটি বিকশিত হয়। কিন্তু যথেষ্ট জনপ্রিয় মত হলেও একে রোমান ক্যাথলিক চার্চ কখনও একটি ডগমা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবুও চার্চগুলোতে এটাকে জনপ্রিয় ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদ হিসেবে ধরা হয়। লিম্বো মতবাদ অনুসারে কোন বাপ্টিজম বা অভিসিঞ্চনের মধ্য দিয়ে না যাওয়া কোন নিষ্পাপ আত্মা যেমন শিশু অবস্থায় মৃতের নিষ্পাপ আত্মা, যিশুখ্রিষ্টের জন্মের পূর্বে মৃত কোন নিষ্পাপ ব্যক্তির আত্মা অথবা যারা অভিসিঞ্চনের পূর্বেই মারা গেছেন তাদের আত্মা স্বর্গ বা নরক কোথাও অবস্থান করে না। তাই এই আত্মারা না ইশ্বরদর্শন লাভ করে, না কোন শাস্তিপ্রাপ্ত হয়। কারণ তারা কোন ব্যক্তিগত পাপে পাপী নন কিন্তু ব্যাপ্টাইজড্ না হবার কারণে তারা জন্মগত পাপের বোঝাও বহন করেন। তাই তারা সময়ের শেষ হবার আগ পর্যন্ত একটি প্রাকৃতিক সুখের অবস্থায় থাকবেন, কিন্তু অতিপ্রাকৃতিক সুখ তারা লাভ করবেন না। কিছুকিছু ক্ষেত্রে লিম্বোকে একটি মধ্যবর্তী অবস্থা বা বন্দী অবস্থা বলা হয়েছে।

পারগেটরি

পারগেটরির ধারণাটি বিশেষভাবে ক্যাথলিক চার্চের সাথে সম্পর্কিত। ক্যাথলিক চার্চ অনুসারে, যারা ঈশ্বরের অনুগ্রহ ও বন্ধুত্ব লাভ করে মারা গিয়েছেন, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে শুদ্ধ হননি তাদের পরিণতি হিসেবে চিরমুক্তি নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর পর তাদেরকে একটি পরিশোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যাতে তিনি স্বর্গে গমন করার জন্য প্রয়োজনীয় পবিত্রতা লাভ করতে পারেন। আর এই শোধন প্রক্রিয়া পাপাত্মাদের শাস্তির প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

অ্যাংলো-ক্যাথলিকরাও এই বিশ্বাসকে ধারণ করেন। মেথোডিজম মতবাদের উদ্ভাবক জন ওয়েসলি মৃত্যু এবং মৃত ব্যক্তির পুনরুত্থানের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী অবস্থার ধারণায় বিশ্বাস করতেন যেখানে “আত্মার মাঝে পবিত্রতা বৃদ্ধি পাবার” একটি সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু মেথোডিজম আনুষ্ঠানিকভাবে এই মতবাদকে স্বীকৃতি দেয় না।

পরম্পরাগত আফ্রিকান ধর্ম

পরম্পরাগত আফ্রিকান ধর্মগুলো পরকাল সম্পর্কে বিচিত্ররকম বিশ্বাস ধারণ করে। হাজদাদের মত শিকারী-সঞ্চয়কারী সমাজের মধ্যে পরকাল সম্পর্কিত কোন বিশেষ বিশ্বাস নেই। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ব্যক্তির মৃত্যুর অর্থ হল সম্পূর্ণভাবে জীবনের শেষ। ইয়মবে, বেং, ইয়রুবা এবং এওয়ে সংস্কৃতি সহ সমগ্র সাব-সাহারান আফ্রিকাতেই “পূর্বপুরুষ আচার” প্রত্যক্ষ করা যায়। এই পূর্বপুরুষ আচার হল একটি বিশ্বাস যেখানে মৃতব্যক্তি পুনরায় জীবিতাবস্থায় তাদের পরিবারে ফিরে আসে। এই পুনর্জন্মে নতুন ব্যক্তি তার পূর্বপুরুষের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো লাভ করে কিন্তু তার আত্মা লাভ করে না। এক্ষেত্রে প্রতিটি আত্মাই আলাদা এবং একেকটি জন্ম একেকটি নতুন আত্মার প্রকাশ। ইউরোবা, ডোগোন এবং লাডোগাদের পরকালের ধারণাগুলোর সাথে আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মিল রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ আফ্রিকান সমাজেই একটা সাধারণ চিত্র দেখা যায়, সেটা হল তাদের পরকালে স্বর্গ ও নরকের পরিষ্কার ধারণার অনুপস্থিতি। কিন্তু মৃত্যুর পর ঈশ্বর কর্তৃক আত্মার বিচারের ধারণা তাদের মধ্যে পাওয়া যায়। মেন্ডে এর মত কিছু সমাজে অনেকগুলো বিশ্বাসের একত্রে উপস্থিতি দেখা যায়। মেন্ডেরা বিশ্বাস করে যে ব্যক্তি দুইবার মৃত্যু হয়। একবার মৃত্যু ঘটে মেন্ডেদের গোপন সমাজে যোগদানের পূর্বে যা দৈহিক মৃত্যু নয়, আর দ্বিতীয়বারের মৃত্যুটি হল দৈহিক মৃত্যু যখন ব্যক্তি আসলেই মারা যায়। দ্বিতীয় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ব্যক্তি পূর্বপুরুষ হয়ে যায়। মেন্ডেরা এও বিশ্বাস করে যে ঈশ্বর কর্তৃক তাদের সৃষ্টির পর তারা পরপর দশটি জীবন যাপন করেছিল আর এই প্রত্যেকটি জীবনই একেকটি নিন্মতর জগতে। এদের একটি মিশ্র-সাংস্কৃতিক ধারণা হল পূর্বপুরুষগণ জীবিতদের জগতেরই একটি অংশ এবং জীবিতদের সাথে তাদের একটি সম্পর্কও থাকে।

প্রাচীন মিশরীয় ধর্ম

প্রাচীন মিশরীয় ধর্মে পরকাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, আর এই বিশ্বাস ব্যবস্থাটি পরকাল সম্পর্কিত লিখিত ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। মৃত্যুর পর আত্মার কা (দ্বিতীয় শরীর) এবং বা (ব্যক্তিত্ব) মৃতদের রাজ্যে চলে যায়। সেখানে আত্মা ফিল্ড অব অরু নামক একটি স্থানে অবস্থান করে। মৃতদের বিকল্প হিসেবে সমাধির উপর একটি মূর্তি তৈরি করার রীতি ছিল প্রাচীন মিশরীয় ধর্মে।

মৃত্যুর পর পরকালে পুরষ্কৃত হবার জন্য একটি পাপমুক্ত হৃদয় এবং বুক অব দ্য ডেড এর মন্ত্র, পাসওয়ার্ড ও সূত্রের উচ্চারণ করার সামর্থের প্রয়োজন হয়। মৃতদের হৃদয়কে শুপালক এর বিপরীতে দাড়িপাল্লায় ওজন করা হয়। যদি হৃদয় এই পালকের চেয়ে হালকা হয় তাহলে সে ফিল্ড অব অরুতে যেতে পারে। যদি ভারি হয় তাহলে তাকে আম্মিত নামক দৈত্যের খাদ্যে পরিণত হতে হয়।

মিশরীয়গণ এও বিশ্বাস করতেন যে যদি মৃতের শরীরকে বিভিন্ন জটিল চিহ্ন, ছবি ও হায়ারোগ্লিফিক লেখা সম্বলিত কফিনে রাখা হয়, সঠিকভাবে পচনরোধক মৃতের শরীরে মাখানো হয় এবং মন্দিরে সমাধিস্ত করা হয় তাহলেই তাদের পরোলোক প্রাপ্তি ঘটবে এবং সূর্যের সাথে ফিল্ড অব অরুতে প্রতিদিনের ভ্রমণে যোগ দিতে পারবেন। পরকালের বিভিন্ন বিপদের সম্ভাবনার জন্য সমাধিতে খাদ্য, অলংকারের সাথে “বুক অব দ্য ডেড”ও দিয়ে দেয়া হত।

প্রাচীন মিশরীয়দের সভ্যতা ধর্মের উপর ভিত্ত করে গড়ে উঠেছিল। মৃত্যুর পর পরকালের বিশ্বাস ছিল তাদের মৃতের অন্তেষ্টিক্রিয়া পালনের প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের কাছে মৃত্যু ছিল কেবল মাত্র একটি অস্থায়ী বাঁধা, পূর্ণাঙ্গ সমাপ্তি নয়। আর চিরকাল ব্যাপী জীবন কেবল দেবদেবীদের করুণা লাভ, মমিকরণের মাধ্যমে দেহের সংরক্ষণ এবং মূর্তি তৈরি ও অন্তেষ্টিক্রিয়ার আচার যথাযথভাবে পালনের উপর নির্ভর করে। তাদের বিশ্বাস অনুসারে প্রত্যেক মানুষ কা, বা, এবং আখ এর সমন্বয়ে গঠিত। মৃতব্যক্তির নাম এবং ছায়াও জীবিত সত্তা। পরকালকে উপভোগ করতে হলে তাই এই সবগুলো অংশকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।

প্রাচীন গ্রীক ও রোমান ধর্ম

গ্রিক পুরাণ অনুসারে আন্ডারওয়ার্ল্ডের রাজা হলেন গ্রীক দেবতা হেডিস। আন্ডারওয়ার্ল্ড হল একটি স্থান যেখানে মৃতরা মৃত্যুর পর অবস্থান করে। দেবতাদের বার্তাবাহক, গ্রীক দেব হার্মিস মৃতদের আত্মাকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিয়ে যান। হার্মিস আত্মাকে স্টিক্স নদীর তীরে রেখে আসেন। গ্রীক পুরাণ মতে স্টিক্স নদী হল জীবন ও মৃত্যুর মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী।

এরপর যদি আত্মার কাছে সোনা থাকে (সমাধিস্থ করার সময় মৃতের পরিবার মৃতের জিভের নিচে একটি মুদ্রা রেখে দেয়), মাঝি ক্যারন এই আত্মাদেরকে নদী পাড় করে হেডিসের কাছে নিয়ে আসে। এরপর আত্মাকে একাস, রাডামেন্থাস এবং রাজা মিনোস বিচার করেন। সেই বিচারের উপর ভিত্তি করে আত্মাকে এলিসিয়াম, টারটারাস, এসফোডেল ক্ষেত্র ও ফিল্ড অব পানিশমেন্টে পাঠানো হয়। এলিসিয়াম হল তাদের জন্য যারা পৃথিবীতে পরিত্র জীবন যাপন করেছিলেন। এখানে সবুজ মাঠ, উপত্যকা এবং পর্বতমালা রয়েছে। সকলে এখানে সুখে শান্তিতে থাকে এবং সূর্য সবসময় এখানে কীরণ দেয়। টারটারাস হল সেইসব লোকের জন্য যারা দেবতাদের নিন্দা করেন, বিদ্রোহ করেন ও জেনে বুঝে খারাপ কাজ করেন।

এসফোডেল ক্ষেত্র হল তাদের জন্য যারা সমানভাবে ভাল কাজ ও পাপ কাজ করেছেন বা জীবনে যারা অমীমাংসিত ছিলেন এবং যাদের বিচার করা হয়নি। ফিল্ড অব পানিশমেন্ট বা শাস্তির ক্ষেত্র তাদের জন্য যারা প্রায়ই পাপ করেন কিন্তু টারটারাস আশা করেন না। টারটারাসে আত্মাকে লাভায় পুড়িয়ে অথবা র‍্যাকে টেনে কষ্ট দেয়া হয়।

ড্রিম অব সিপিও তে সিসারো শরীরের বাইরে বের হবার পর আত্মার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন যেখানে সেই আত্মা পৃথিবী থেকে অনে উঁচুতে উঠে গিয়ে দূর থেকে ক্ষুদ্র পৃথিবীকে দেখে।

ভারজিলের এনিয়াড এ বীর এনিয়াস তার পিতাকে দেখতে আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভ্রমণ করেছিলেন। সেখানে গিয়ে স্টিক্স নদীর তীরে তিনি অনেক আত্মাকে দেখতে পান যাদেরকে সঠিকভাবে সমাধিস্থ করা হয় নি। তাদেরকে যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ ঠিকভাবে সমাধিস্থ করছে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে এখানে অপেক্ষা করে কাটাতে হবে। তারপর তাকে একটি প্রাসাদ দেখানো হয় যেখানে ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিরা বাস করেন, তাকে ফিল্ড অব সরো দেখানো হয় যেখানে আত্মহত্যা করা ব্যক্তিগণ অনুশোচনা করেন যেখানে এনিয়াসের প্রাক্তন প্রেমিকাও ছিল। তাকে টারটারাস দেখানো হয় যেখানে টাইটান এবং অলিম্পিয়ানদের শক্তিশালী অমর শত্রুরা বসবাস করে। টারটারাসে তিনি বন্দীদের চিৎকার ও গোঙ্গানি শুনতে পান। তিনি বিস্মৃতির নদী লেথকে দেখেন, যার পানি পান করে একজন মৃত্যূপূর্বের সব ভুলে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে যায়। তিনি ফিল্ড অব এলিসিয়ামে যান যেখানে সাহসী বীরগণ বাস করেন। তার পিতা তাকে রোমের সকল ভবিষ্যৎ বীরদেরকে দেখান। এনিয়াস যদি তার উদ্দেশ্য অনুযায়ী নগর প্রতিষ্ঠা করে তাহলে এই বীরগণ জন্ম লাভ করবে।

নর্স ধর্ম

পোয়েটিক এডা এবং প্রোস এডা হল দুটো প্রাচীনতম সূত্র যেখানে নর্সদের পরকাল বিষয়ক ধারণা পাওয়া যায়। নর্সদের পরকাল সম্পর্কিত কিছু ধারণা নিচের বিষয়গুলোর মধ্যে পড়ে:

হেল: এই স্থানটি অনেকটা গ্রীক পুরাণের এসফোডেল ক্ষেত্রের মত। এখানে যারা খুব ভাল বা খুব খারাপ কোনটাই না তারা অবস্থান করে।

নিফলহেল: এই স্থানটি গ্রীক পুরাণের টারটারাসের মত। এই স্থানটি হেলের নিচে অবস্থান করে। যারা শপথ ভঙ্গ করে এবং জীবনে দুষ্কার্য করে তারা এই স্থানে কঠোর শাস্তি ভোগ করে।

আব্রাহামিক ধর্ম

 

 

ইহুদি ধর্ম

শেওলঃ হিব্রু বাইবেলে “শেওল”কে মৃতদের স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা দিয়ে সমাধি, অবলম্বন, অপেক্ষার স্থান এবং সুস্থ হবার স্থানও বোঝায়।

বুক অব জবে বলা হয়েছে: “যেসব মানুষ মারা যায় এবং শায়িত হয়; যদি সে শ্বাস-প্রশ্বাস না নেয় তাহলে সে কোথায়? সুতরাং মানুষ শায়িত হয় এবং আর কখনও ওঠে না। যতক্ষণ পর্যন্ত স্বর্গ থাকবে না তারা জাগবেও না, ঘুম থেকেও উঠবে না। যদি একজন মানুষ মারা যায়, সে কি আবার জীবিত হবে?”

তালমুদে বলা হয়েছে, মৃত্যুর পর ধার্মিকগণ একটি পরকাল ভোগ করবেন। মৃত্যুর পর আত্মাকে বিচারের কাঠগড়ায় আনা হবে। যারা পাপমুক্ত জীবন যাপন করেছেন তারা তৎক্ষণাৎ ওলাম হাবা বা ওয়ার্ল্ড টু কাম এ প্রবেশ করবেন। বেশিরভাগই এই ওলাম হাবায় প্রবেশ করতে পারেন না, বরং তারা তাদের পার্থিব জীবন পর্যালোচনা করার জন্য একটি পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যান। এই সময় তারা পৃথিবীতে কী কী ভুল কাজ করেছেন সে সম্পর্কে অবগত হন। কারও মতে এই সময়টা হল “পুনঃশিক্ষন” যেখানে আত্মা তার ভুলের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে জ্ঞান লাভ করে। অন্যদের মতে এই সময়ে পূর্বের ভুলগুলোর জন্য এক ধরণের আধ্যাত্মিক অস্বস্তি কাজ করে। এই সময়কালের শেষে, যা এক বছরের বেশি নয়, আত্মা ওলাম হাবায় প্রবেশ করে। অন্যান্য ধর্মগুলোর মত চিরস্থায়ী নরকভোগের মত বিষয় ইহুদিদের পরকালের মতবাদে নেই। তালমুদ অনুসারে আত্মার বিলুপ্তির বিষয়টি খুবই বিদ্বেষ্পরায়ণ এবং অসৎ দলনেতাদের জন্য বরাদ্দ। এদের কুকর্ম হয় নিয়মের ঊর্ধ্বে চলে গেছে, না হয় মানুষের একটি বড় অংশকে তারা প্রচণ্ড অশুভ কাজের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

মাইমোনিডিস ওলাম হাবাকে আধ্যাত্মিক অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে পরকাল প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রেই হয়, এটা হল আত্মার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া যেই দেহে এটি তার পার্থিব অস্তিত্বের সময় অবস্থান করেছিল।

ইহুদি ধর্মগ্রন্থ জোহর অনুসারে গেহেনা (ইহুদিদের নরক) পাপাত্মাদের শাস্তির জায়গা নয়, বরং এটা তাদের আত্মার শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার একটি স্থান।

যদিও ইহুদের তালমুদ বা এর পূর্বের ধর্মগ্রন্থগুলোতে জন্মান্তরবাদের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না, তারপরও অনেক বড় বড় র‍্যাবাইদের মতে জন্মান্তরবাদ ইহুদি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইহুদি রহস্যবাদের প্রাচীন গ্রন্থ জোহারে বারবার পুনর্জন্মের কথা বলা হয়েছে। বিগত পাঁচটি শতকে ইহুদিদের মাঝে পুনর্জন্মের কথা প্রকাশ করা হয়। বলা হয়, এর পূর্বে পূনর্জন্মের ব্যাপারটি লুক্কায়িত ছিল।

তোরাহ পণ্ডিত, ভাষ্যকার এবং কাব্বালিস্ট ন্যাকম্যানিডিজ জবের কষ্টভোগকে পুনর্জন্ম বলে মত দিয়েছিলেন। কারণ জবের কথায়, “ঈশ্বর একজন মানুষের সাথে এসব দুইবার বা তিনবার করে করেন যাতে তার আত্মা অন্ধকূপ থেকে জীবনের আলোয় ফিরে আসে।”

কিছু কাব্বালিস্টদের মতে, কিছু মানব আত্মা অ-মানব শরীরে জন্ম লাভ করবে। এই ধারণা ১৩শ শতক থেকে কাব্বালিস্টদের গ্রন্থে পাওয়া যায়। ১৬শ শতকের শেষের দিক থেকে অনেক রহস্যবাদীদের মাঝেও এই ধারণা পাওয়া যায়।

অনেক সুপরিচিত র‍্যাবাই জন্মান্তরবাদের ধারণাকে পরিত্যাগ করেছেন। তারপরও অনেক অর্থোডক্স ইহুদিরাও মধ্যে পুনর্জন্ম বা জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করে। রোর জিউইশ লার্নিং ইনস্টিটিউটের র‍্যাবাই নাফতালি সিলবেরবার্গ ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে বলেন, “অন্য ধর্ম ও বিশ্বাসব্যাবস্থা থেকে উৎপন্ন যেসব ধারণাগুলো জনপ্রিয় হয়েছে, সাদাসিধে ইহুদিরা সেগুলোকেই মেনে নিয়েছে।”

খ্রিষ্টধর্ম

খ্রিষ্টীয় পরকালবিদ্যা, মৃত্যু, মধ্যবর্তী অবস্থা, স্বর্গ, নরক, যিশুখ্রিষ্টের দ্বিতীয়বার ফিরে আসা, মৃতব্যক্তির পুনরুত্থান, র‍্যাপচার, গ্রেট ট্রিবিউলেশন, মিলেনিয়াম, সমাপ্তি সময়, শেষ বিচার, নতুন স্বর্গ ও নতুন পৃথিবী এবং ঈশ্বরের উদ্দেশ্যের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি নিয়ে আলোচনা করে, যদিও কিছু বিশেষ খ্রিষ্টীয় ধর্মমতে পরকালে শাস্তির কথা বলা হয়, পরকালে চিরস্থায়ী নরকভোগই খ্রিষ্টধর্মে প্রধান ধর্মমত।

যখন স্যাডিউসিজ “কারও একাধিক স্ত্রী থাকলে পরকালে তার স্ত্রী কে হবেন” – এই প্রেক্ষিতে যীশুকে মৃতব্যক্তির পুনরুত্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। যিশু উত্তর দেন, পুনরুত্থানের পর বিবাহ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে কারণ পুনরুত্থিত ব্যক্তি স্বর্গে দেবদূতের মত হয়ে যাবেন।

যিশু এও বলেন যে, একটা সময় আসবে যখন মৃতব্যক্তিগণ ঈশ্বরপুত্রের কণ্ঠস্বর শুনতে পারবেন। তখন সমাধিতে যারা থাকবেন, সবাই বের হয়ে আসবেন। যারা ভাল কাজ করেছে তারা পুনরুত্থিত হয়ে জীবন পাবেন, আর যারা পাপ কাজ করেছেন তারা পুনরুত্থিত হয়ে দণ্ড ভোগ করবেন। ম্যাথিউ এর গসপেল অনুসারে, যিশুর মৃতুর সময় সমাধিগুলো খুলে যাবে এবং তার পুনরুত্থানের সময় মৃত সেইন্টগণ তাদের সমাধি থেকে পুনরুত্থিত হবেন এবং তারা পবিত্র শহর ‘নতুন জেরুজালেম’-এ গমন করবেন। তবে নিউ টেস্টামেন্ট এর অন্য কোথাও এই ঘটনার কথা লেখা নেই।

শেষ দিন: যিশু তার শাসনে থাকা স্বর্গরাজ্যকে সমুদ্রে ফেলা জালের সাথে তুলনা করেছেন যেই জালে সকল ধরণের মাছ একত্রিত করা হয়। যখন জালে মাছ পূর্ণ হয়ে যায় তখন জেলে এটাকে টেনে তোলে। এরপর সে ভাল মাছকে পাত্রে রাখে আর খারাপ মাছকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সুতরাং যখন শেষ দিন আসবে তখন সময়ের শেষ হয়ে যাবে। দেবদূতগণ পাপী ব্যক্তিদেরকে ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিদের থেকে আলাদা করবেন এবং তাদেরকে চিরজ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করবেন। এরপর ন্যায়নিষ্ঠগণ তাদের পিতার রাজ্যে সূর্যের ন্যায় উদ্ভাসিত হবেন।

বুক অব ইনক-এ চার ধরণের মৃতের জন্য শেওলকে চারটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। এখানে বলা হয়, বিশ্বাসী সেইন্টগণ স্বর্গে পুনরুত্থিত হবার জন্য অপেক্ষা করবেন, সামান্য ধার্মিকগণ পুরষ্কারের জন্য অপেক্ষা করবেন, পাপীরা শাস্তির জন্য অপেক্ষা করবেন। যেসকল ব্যক্তিগণ ইতিমধ্যেই শাস্তি পেয়ে গেছেন তারা বিচারের দিন পুনরুত্থিত হবেন না। উল্লেখ্য যে, বুক অব ইনককে খ্রিষ্টধর্ম এবং ইহুদিধর্মের বেশিরভাগ সম্প্রদায়ই প্রামাণিক হিসেবে ধরে না।

ম্যাকাবিজ গ্রন্থে ভবিষ্যতে পুনরুত্থান এবং বিচারের জন্য অপেক্ষারত মৃতব্যক্তির সংখ্যা পরিষ্কারভাবে দেয়া আছে। সেই সাথে গ্রন্থটিতে মৃতদেরকে তাদের পাপের বোঝা থেকে মুক্ত করার জন্য প্রার্থনার এবং দানের বিধানও দেয়া আছে।

ল্যুক এর লেখক ল্যাজারাস এন্ড দ্য রিচ ম্যান এর গল্পটির বর্ণনা করেছেন যেখানে দেখানো হয়েছে হেডিসে (যেখানে মৃতের আত্মারা অপেক্ষা করে) মানুষেরা সুখের জীবন অথবা কষ্টের যন্ত্রণার জীবনে পুনরুত্থিত অপেক্ষা করছেন। বুক অব রেভেলেশন এর লেখক শেষ বিচারের সময় ঈশ্বর ও দেবদূতদের সাথে শয়তান এবং ডিমনদের মহাকাব্যিক যুদ্ধের কথা বর্ণনা করেছেন। এখানে পূর্বের নবীদের আত্মা এবং যিশুর ট্রান্সফিগারেশনের কথাও বলা হয়েছে।

এজ অব এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকিত যুগে ধর্মতাত্ত্বিক এবং দার্শনিকগণ পরকাল সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের দর্শন এবং বিশ্বাস পেশ করেন। এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছেন ইমানুয়েল সোয়ডেনবর্গ যিনি প্রায় ১৮টি ধর্মতাত্ত্বিক রচনা প্রকাশ করেছিলেন যেখানে তার দাবীকৃত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া পরকালের প্রকৃতি সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল হ্যাভেন এন্ড হেল। তিনি পরকাল সম্পর্কিত অনেক জিনিস আলোচনা করেছেন তার রচনাগুলোতে, যেমন স্বর্গে বিবাহ (যেখানে সকল দেবদূত বিবাহিত), স্বর্গের শিশু (যেখানে সকলেই তাদের দেবদূত পিতামাতার দ্বারা পালিত হয়), স্বর্গে স্থান ও কাল, মৃত্যুর পর আত্মাদের দুনিয়ায় জেগে ওঠা (একটি স্থান যা স্বর্গ ও নরকের মাঝামাঝি অবস্থান করে এবং মৃত্যুর পর মানুষ প্রথমে সেখানে জেগে ওঠে), স্বর্গ ও নরকে স্বাধীন ইচ্ছা বা ফ্রি উইলের অনুমতি (ঈশ্বরের আদেশে স্বর্গ বা নরকে না যেতে চাইলে কী হবে), নরকের চিরস্থায়িত্ব (ব্যক্তি নরক ত্যাগ করতে পারবে কিন্তু কোন দিন তা করতে চাবে না) এবং সকল দেবদূত এবং শয়তান পৃথিবীতে একদিন মানুষ ছিল।

অন্যদিকে, আলোকিত যুগে অনেক যুক্তিবাদী দর্শনের জন্ম হয় যেমন ডেইজম বা স্বরবাদ। অনেক স্বরবাদী মুক্তমনা বিশ্বাস করতেন যে, পুরষ্কার ও শাস্তিযুক্ত একটি পরকাল যুক্তি এবং ভাল নৈতিকতার জন্য প্রয়োজনীয়।

কিছু খ্রিষ্টান মনে করেন, স্বর্গে প্রবেশানুমতি সম্পূর্ণভাবে যোগ্যতাবলে অর্জন করা যায়, তারা বরং বিশ্বাস করেন যে স্বর্গপ্রাপ্তি সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বরের যোগ্যতা নিরপেক্ষ দয়া। তারা সেইন্ট পলের একটি বাক্যের উপর ভিত্তি করে এটা বিশ্বাস করেন যা বলে, “দয়ার কারণে বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে তোমরা সুরক্ষিত হলে। আর এটা তোমাদের নিজেদের জন্য না, এটা ঈশ্বরের দেয়া উপহার, এটা তোমরা কাজের দ্বারা অর্জন করনি, যাতে তোমাদের কেউ দম্ভ না করতে পারে।” প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মসংস্কারের সময় লুথারিয়ান এবং কেলভিন ধর্মতাত্ত্বিক ধারা ঈশ্বরের অনাকাঙ্ক্ষিত দয়ার উপর জোড় দেয় এবং তথাকথিত পেলাজিয়ানিজমকে বর্জন করে, যা মানুষকে ভাল কাজের মাধ্যমে স্বর্গলাভ অর্জনকে সমর্থন করত। অন্যান্য খ্রিষ্টানগণ এই নীতিকে স্বীকার করে না, যার ফলে দয়া, স্বাধীন ইচ্ছা এবং নিয়তির নিয়ে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ভাল কাজের জন্য পরকালে পুরষ্কার লাভ করা যায় এটা একটি খ্রিষ্টীয় সমাজের একটি সাধারণ লোকবিশ্বাস, এমনকি সেইসব চার্চের সদস্যগণও এই ধারণায় বিশ্বাস করেন যেসব চার্চ এই বিশ্বাসকে বর্জন করে।

কিছু খ্রিষ্টান নরকের শাস্তিকে স্বীকার করে না। ইউনিভারসালিস্ট বা সার্বজনীনতাবাদীদের মতে পরকালে পুরষ্কার সকলের জন্যই। জিহোভাস উইটনেসেস ধারা এবং সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্টস চার্চে জীবনযাপনের অনেক বাঁধা ধরা নিয়ম সত্ত্বেও তারা শেখায় যে পাপীরা চিরকাল নির্যাতিত হবে না বরং তারা ধ্বংস হবে।

পরবর্তী যুগের মরমনিজম ধারার সেইন্টগণ বিশ্বাস করতেন যে পৃথিবীতে জীবন শুরুর পূর্বে আত্মার অস্তিত্ব ছিল এবং পরেও আত্মার অস্তিত্ব থাকবে। দেবদূতরা হয় এমন আত্মা যারা এখনও পৃথিবীতে তাদের মরনশীল জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পৃথিবীতে আসেন নি, অথবা এমন আত্মা যারা ইতিমধ্যেই পৃথিবীর মরণশীল জীবন অতিবাহিত করে পুনরুত্থিত হয়েছেন এবং ঈশ্বরের আজ্ঞা পালন করছেন। লেটার ডে সেইন্টদের চার্চের নীতি অনুসারে, আর্চএঞ্জেল মাইকেল পৃথিবীতে মরণশীল জীবনের অভিজ্ঞতা লাভের জন্য প্রথম মানব আদমে পরিণত হন।

ক্যাথলিক ধারণা অনুসারে মৃত্যুর পর পরকালে আত্মার বিচার হয়। ন্যয়নিষ্ঠ এবং পাপমুক্তগণ স্বর্গে গমন করেন, কিন্তু যারা পাপ করে অনুশোচনা না করেই মারা গেছেন তারা নরকে গমন করেন। ১৯৯০ এর দশকে ক্যাথলিক চার্চের নীতি অনুসারে নরককে পাপীদের উপর বর্ষিত শাস্তি হিসেবে নয়, বরং ঈশ্বরের কাছ থেকে আত্মবর্জন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অন্যান্য খ্রিস্টীয় ধারার সাথে ক্যাথলিক চার্চের একটি পার্থক্য হল, ক্যাথলিক চার্চ অনুসারে যারা ঈশ্বরের করুণায় মারা যান কিন্তু তারপরও জন্মগত পাপ বহন করেন তারা পারগেটরি নামক একটি স্থানে গমন করেন এবং স্বর্গে গমনের জন্য শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান।

অর্থোডক্স খ্রিস্টান চার্চগুলো ঐচ্ছিকভাবেই পরকালের বিষয়ে কম কথা বলে, কারণ তারা সকল বিষয়েই, বিশেষ করে যেসব ঘটনা এখনও পর্যন্ত ঘটেনি সেসব বিষয়ে রহস্যের স্বীকৃতি দেয়। যিশুর প্রত্যাবর্তন, দেহের পুনরুত্থান এবং শেষ বিচার সহ যেসব বিষয় নাইসিন ক্রিড (৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ) কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়, তার বাইরে গিয়ে অর্থোডক্সি স্পষ্ট করে তেমন কিছু শেখায় না। পশ্চিম দিকের খ্রিষ্টধর্মের মত না হয়ে এরা ঐতিহ্যগতভাবেই নন-ডুয়েলিস্ট এবং এরা স্বর্গ ও নরক নামের দুটো আলাদা স্থানকে আক্ষরিক অর্থে স্বীকার না করে একটি চূড়ান্ত নিয়তিকে স্বীকার করেন, যেখানে স্বর্গ নরক শব্দদুটো আক্ষরিক নয়, বরং আলঙ্কারিক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থোডক্সিতে শেখানো হয়, শেষ বিচার কেবলই ব্যক্তির স্বর্গীয় ভালবাসা ও করুণার সম্মুখীন হওয়া, কিন্তু ব্যক্তি কতটুকু রূপান্তরিত হয়েছেন বা কতটুকু স্বর্গীয়তা লাভ করেছেন তার উপরে নির্ভর করবে তিনি কেমন বা কতটুকু স্বর্গীয় ভালবাসা এবং করুণার সম্মুখীন হবেন। স্বর্গীয় ক্রিয়া সবসময়ই অপরিবর্তনীয় এবং সকলের জন্যই সমান ভালবাসা এবং কেউ যদি এই ভালবাসা নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করলে তা ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার কারণে একধরণের আত্মদণ্ড।

দ্য চার্চ অব জেসাস ক্রাইস্ট এন্ড লেটার ডে সেইন্টস এর লেখক জোসেফ স্মিথ পরকাল সম্পর্কিত একটি বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। স্বর্গের পুন্যাত্মা ব্যক্তিগণ অন্ধকার স্পিরিট প্রিজন বা নরকে বসবাসকারী ব্যক্তিদের প্রতি ব্যাপক ধর্মপ্রচারে লিপ্ত। পরকাল এখানে দুই ভাগে বিভক্ত স্পিরিট প্রিজন এবং স্বর্গ। একত্রে তারা স্পিরিট ওয়ার্ল্ড বা আত্মার জগৎ নামে পরিচিত। তারা বিশ্বাস করে যে, যীশু স্পিরিট প্রিজন বা আত্মার কারাগারে ভ্রমণ করেছি যারা তাদের কৃতকার্যের জন্য অনুতাপ করেছিলেন তাদের জন্য এই কারাগারের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। এই মত অনুসারে স্পিরিট প্রিজন এবং প্যারাডাইস বা স্বর্গ উভয়ই অস্থায়ী। পুনরুত্থানের পর আত্মারা স্থায়ীভাবে তিনটি মাত্রার স্বর্গীয় সম্মান লাভ করে যা নির্ধারিত হয় তাদের কার্যের ভিত্তিতে। এই তিনটি মাত্রার স্বর্গীয় সম্মান হল সেলেস্টিয়াল, টেরেস্ট্রিয়াল এবং টেলেস্টিয়াল। যারা ঈশ্বরকে দেখে বা জেনেও স্বীকার করবে না, তাদেরকে চিরকালের জন্য শয়তানের রাজ্যে প্রেরণ করা হবে, যাকে বাইরের অন্ধকার বলা হয়, যেখানে তারা চিরকালের জন্য দুঃখ ও কষ্টে বেঁচে থাকবে।

সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্টস ধারার খ্রিস্টান চার্চ শেখায়, পৃথিবীতে জীবিত থাকা অবস্থায় যে মৃত্যু হয় তা হল প্রথম মৃত্যু এবং এই মৃত্যু বিভিন্ন পাপী অবস্থার কারণে ঘটে, যেমন অসুস্থতা, বার্ধক্য, দুর্ঘটনা ইত্যাদি। এই মৃত্যু কেবলই আত্মার নিদ্রা। জিওভাস উইটনেসেস এর মত এডভেন্টিস্টগণও বাইবেল থেকে নেয়া কিছু মূল অংশ ব্যবহার করেন যেমন, “জীবিতদের বেলায় জেনে রেখো তারা মরবে: কিন্তু মৃতরা কিছুই জানবে না, তারা আর কোন পুরস্কারও পাবে না; তাদের স্মৃতি বিস্মৃত হবে।” এডভেন্টস্টগণ বলেন, পাপের পরিণাম হল মৃত্যু এবং কেবল ঈশ্বরই অমর। এরা এও বিশ্বাস করেন যে, ঈশ্বর শুধু সেইসব উদ্ধারকৃতদেরকেই অমরত্বের অনুমোদন দেবেন যারা যিশুর দ্বিতীয় আগমনে পুনরুত্থিত হবেন। ততক্ষণ পর্যন্ত সকল মৃতই ঘুমন্ত অবস্থায় থাকবে। যখন যিশু দ্বিতীয়বারের মত আসবেন, সৎ ব্যক্তিগণ অক্ষত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবেন এবং তাদেরকে ঈশ্বরের সাথে সাক্ষাতের জন্য মেঘে নিয়ে যাওয়া হবে। সৎ ব্যক্তিগণ এক হাজার বছর যাবৎ স্বর্গে জীবন যাপন করবেন। তারা উদ্ধার হয় নি এমন ব্যক্তি এবং পতিত দেবদূতদের বিচারকার্য ঈশ্বরের সাথে বসে দেখবেন। যখন উদ্ধারকৃতগণ স্বর্গে থাকবেন তখন পৃথিবীতে মানুষ ও পশুপাখি বসবাস করবে না। কেবল পতিত দেবদূতরাই সেখানে জীবিত বসবাস করবে। দ্বিতীয় পুনরুত্থান হবে অসৎ ব্যক্তিদের যখন যিশু নতুন জেরুজালেমকে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে এনে স্থাপন করবে। যিশু সকল অসৎ ব্যক্তিকে জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন। শয়তান ও তার দেবদূতগণ অসৎ ব্যক্তিদেরকে নতুন জেরুজালেম শহরকে ঘিরে ফেলতে প্ররোচিত করবে। তখন স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে নরকের আগুন ফেলা হবে। এতে জগৎ চিরকালের জন্য পাপ হতে মুক্ত হয়ে যাবে। একে বলা হয় দ্বিতীয় মৃত্যু। নতুন পৃথিবীতে ঈশ্বর উদ্ধারকৃতদের জন্য একটি চিরস্থায়ী আবাস এবং চিরকাল বাঁচার জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ দান করবেন যেখানে ইডেন পুনঃস্থাপিত হবে। এর ফলে সকল বাদানুবাদের নিষ্পত্তি ঘটবে এবং কোন পাপ থাকবে না। ঈশ্বর তখন যথার্থ ঐকতানে চিরকাল জুড়ে শাসন করবেন।

ইসলাম

কুরআনে পরকাল সংক্রান্ত ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। স্বর্গের আরব্য শব্দটি হল জান্নাত এবং নরকের আরব্য শব্দটি হল জাহান্নাম । সমাধিস্হদের স্বাচ্ছন্দ্যের মাত্রা সম্পূর্ণরূপে তাদের ঈমানের বা এক সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা এবং সর্বোচ্চ আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসের মাত্রার উপর নির্ভর করে। সঠিক, দৃঢ় এবং সুস্থ ইমান অর্জনের জন্য একজনকে অবশ্যই ধর্ম নির্দেশিত কার্যাবলি পালন করতে হবে, অন্যথা তার ঈমান সংকুচিত হবে এবং যথেষ্ট দীর্ঘ সময় ধরে ইসলাম পালন না করলে সেই ঈমান নির্জীব হয়ে যাবে। তাই ইসলাম পালন করা পরকালে পুরষ্কৃত হবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

ইসলাম শেখায় মানবজাতির সম্পূর্ণ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হল সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করা। এখানে বলা হয়, পৃথিবীতে মানুষ যে জীবন যাপন করে সেটা তাদের জন্য একটা পরীক্ষা এবং মৃত্যুর পর তাদেরকে তাদের ভাল ও মন্দ কাজের উপর ভিত্তি করে শেষ বিচারের পর জান্নাত বা জাহান্নাম দেয়া হয়।

জান্নাত এবং জাহান্নাম দুটোরই বিভিন্ন স্তর রয়েছে। জান্নাতে সাতটি দরজা এবং সাতটি স্তর রয়েছে। সর্বোচ্চ স্তরটি সবচেয়ে ভাল এবং সেখানকার মানুষেরা সবচেয়ে সুখী থাকবেন। জাহান্নামে সাতটি গভীর স্তর রয়েছে। স্তর যত নিচে যাবে তা ততই খারাপ। ইসলাম অনুসারে, মৃত্যুর পর আত্মার চিরস্থায়ী অস্তিত্ব এবং সেই সাথে পরীবর্তিত শারীরিক অবস্থাও থাকবে।কুরআনের একটি কেন্দ্রীয় নীতি হল শেষ দিন, যখন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আল্লাহ্‌ বিচারের জন্য সকল মানুষ ও জ্বিনকে মৃত অবস্থা থেকে জাগ্রত করবেন। শেষ দিনকে গণনার দিন, জেগে ওঠার দিন, বিচারের দিন ইত্যাদি বলা হয়।

বিচারের দিনের আগ পর্যন্ত, মৃত আত্মাগণ সমাধিতে পুনরুত্থানের জন্য অপেক্ষা করেন। কবর দেয়ার পর থেকেই তাদের ভবিষ্যত ভাগ্যের স্বাদ পেয়ে যান। যাদের জন্য নরক নির্ধারিত তারা সমাধিতেই কষ্ট ভোগ করেন, আর যাদের জন্য স্বর্গ নির্ধারিত তারা সমাধিতেই শান্তির লাভ করতে থাকেন।

শেষ দিনে যে পুনরুত্থান ঘটবে তা শারীরিক এবং ঈশ্বর সেদিন মৃতের শরীর পুনরায় সৃষ্টি করবেন। শেষ দিনে পুনরুত্থিত ব্যক্তিগণ তাদের কার্যাদির ভিত্তিতে আল্লাহ্‌কর্তৃক বিচারকৃত হবেন। ভাল ও মন্দ কাজের ভারসাম্যের ভিত্তিতে জান্নাত বা জাহান্নামে তাদের স্থান নির্ধারিত হবে। ভাল কাজের জন্য জান্নাতে ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিগণ চিরকালের জন্য আধ্যাত্মিক এবং শারীরিক প্রশান্তি লাভ করবেন, মন্দ কাজের জন্য পাপী ব্যক্তিগণ আধ্যাত্মিক ও শারীরিক কষ্ট ভোগ করবেন।

জাহান্নামে শাস্তির চিরস্থায়িত্ব নিয়ে বিতর্ক আছে। কাদেরকে নরকে পাঠানো হবে এবং কারা সেখানে চিরকালের জন্য থাকবে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কুরআনের অন্তত দুটো আয়াতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, নরকবাস ভয়ঙ্কর এবং চিরস্থায়ী। কিছু হাদিসে সকল নরকবাসীকেই নরক থেকে মুক্ত হবার কথা লেখা আছে। মুহাম্মাদ বলেছিলেন, “আল্লাহ্‌ সকল মানুষকেই আগুন থেকে তুলে আনবেন এবং তাদেরকে স্বর্গে স্থান দেবেন।” একটি হাদিসে বলা হয়েছে, শেষ বিচারের দিনে অথবা তার পরে মুহাম্মাদ ও আল্লাহ্‌ পাপীদেরকে জাহান্নাম থেকে সরিয়ে নেয়া বিষয়ে মধ্যস্থতা করবেন। কিন্তু এই মধ্যস্থতায় কেবল সেই সব পাপীই অন্তর্ভূক্ত হবেন যারা আন্তরিকভাবে কালিমা শাহদার স্বীকার করেছেন। কিন্তু এই মধ্যস্থতায়, যেসকল ব্যক্তি শিরক (মুর্তিপূজা বা বহুঈশ্বরবাদ) পালন করেছেন তারা থাকবেন না।

আহমাদি মুসলিমরা বিশ্বাস করেন যে পরকাল কোন বস্তুগত বিষয় নয়, বরং এর প্রকৃতি আধ্যাত্মিক। ইসলামের আহ্‌মদীয়া ধারার প্রবর্তক মিরজা গুলাম আহমেদের মতে, আত্মা আরেকটি বিরল অস্তিত্বের জন্ম দেবে। এই অস্তিত্বটি এমনভাবে পৃথিবীর জীবনের মত হবে যে, আত্মা পৃথিবীতে মানব অস্তিত্বের সাথে যেরকম সম্পর্ক রাখে, এই অস্তিত্বও আত্মার সাথে ঠিক সেরকম সম্পর্ক রাখবে। পৃথিবীতে যদি একজন ব্যক্তি সৎ জীবন যাপন করেন এবং নিজেকে ঈশ্বরের ইচ্ছায় স্থাপন করেন, তাহলে তার স্বাদ এমন হয়ে যায় যাতে তিনি পার্থিব লোভ লালসার বিরুদ্ধে গিয়ে আধ্যাত্মিক সুখ লাভ করতে পারেন। আহ্‌মদীয়া বিশ্বাস অনুযায়ী এই অবস্থায় ব্যক্তি তার হৃদয়ে পরিতৃপ্তি এবং শান্তি খুঁজে পান। এসময় আত্মার ভেতরের আত্মা তার আকৃতি লাভ করতে থাকে।

সুফিবাদ

সুফি স্কলার ইবনে আরাবি বারজাখকে মধ্যবর্তী জগৎ বা “ইসথমাস” বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এটা দেহের জগৎ এবং আত্মার জগতের মধ্যবর্তী অবস্থা এবং এই দুই জগতের মধ্যকার যোগাযোগের মাধ্যম। তিনি এই মধ্যবর্তী জগৎকে আত্মার জগতের মতই সরল এবং আলোকিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু দেহের জগতের মতই এই জগত বিভিন্ন আকার লাভ করতে পারে।

বাহাই ধর্ম

বাহাই বিশ্বাসের শিক্ষা বলে যে, পরকালের প্রকৃতি জীবিতদের বোঝার ঊর্ধ্বে, ঠিক যেমন এখনও জন্মগ্রহণ করেনি এমন একটি ভ্রূণ মাতৃগর্ভের বাইরের জগৎ সম্পর্কে বুঝতে পারে না। বাহাই বিশ্বাস অনুসারে আত্মা অমর এবং মৃত্যুর পর ঈশ্বরের উপস্থিতি অর্জন করার আগ পর্যন্ত এটি উন্নয়ন করতে থাকবে। পরকালে আত্মারা তাদের এককত্ব বা সত্তা এবং বিবেক ধরে রাখে এবং আধ্যাত্মিকভাবে তারা অন্যান্য আত্মাদেরকে চিনতে এবং কথা বলতে পারবে যাদের সাথে তাদের অনেক ঘনিষ্ট ও গভীর বন্ধুত্ব আছে, যেমন স্বামী ও স্ত্রীর আত্মা।

বাহাই ধর্মগ্রন্থগুলোতে এও বলা হয়েছে যে, আত্মারা তাদের নিজ কার্যের মূল্য এবং ফলাফল বুঝতে পারবে। যে সকল আত্মা ঈশ্বরের পথে চলেছে তারা আনন্দ উপভোগ করবে, আর যারা ভূল পথে চলেছিল তারা বুঝতে পারবে যে তারা তাদেরকে দেয়া সুযোগ হারিয়েছে। এছাড়াও আত্মারা সেইসব আত্মাকে চিনতে বা বুঝতে পারবে যারা তাদের সাথে একই উচ্চতায় পৌঁছেছে, কিন্তু যেসব আত্মা তাদের চেয়েও উচ্চ অবস্থানে অর্জন করেছে তাদেরকে তারা চিনতে বা বুঝতে পারবে না।

হিন্দু ধর্ম

হিন্দু ধর্মগ্রন্থসমূহের মধ্যে অন্যতম ভগবদ গীতায়, পরকাল সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এখানে কৃষ্ণ বলেছেন যে, মানুষ যেমন তার পুরনো কাপড় ছেড়ে নতুন কাপড় পরিধান করেন, আত্মাও তেমনি তার পুরনো দেহ পরিত্যাগ করে নতুন দেহ গ্রহণ করে। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, দেহ একটি খোলসের মত, এর ভিতরের আত্মা অপরিবর্তনীয় এবং অবিনশ্বর। এই আত্মা জন্ম মৃত্যুর চক্রে ভিন্ন দেহ ধারণ করে থাকে। এই চক্রের সমাপ্তিকে মুক্তি বা মোক্ষ বলা হয় যেখানে এই আত্মা ঈশ্বরের সাথে মিশে যায়।

পূর্বজন্মের কর্মের উপর নির্ভর করে পরের জন্মে আত্মা কোন দেহ নিয়ে জন্মগ্রহণ করবে। পূর্বজন্মে যদি কেউ পাপ কাজ করেন তাহলে পরের জন্মে তিনি পশু বা অন্য কোন নিম্নশ্রেণী জীবদেহে পুনর্জন্ম লাভ করবেন। আর যদি তিনি ভাল কাজ করেন তাহলে পরের জন্মে তিনি একটি ভাল পরিবারে মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করবেন এবং সুখী জীবন পাবেন। এই দুই জন্মের মাঝে ব্যক্তি তার অসৎ কর্মের জন্য নরকে শাস্তি ভোগ করেন এবং সৎ কাজের জন্য স্বর্গে প্রশান্তি উপভোগ করেন। যখন ব্যক্তির শাস্তি বা পুরষ্কার ভোগের সময়কাল শেষ হয়ে যায় তখন তাকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠানো হয় যাকে “মৃত্যুলোক”ও বলা হয়। আর এভাবে বারবার জন্মমৃত্যুর মধ্য দিয়ে ব্যক্তি জীবনের একটি চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকে যা থেকে কেবল মোক্ষের মাধ্যমেই তার মুক্তি ঘটতে পারে।

হিন্দুদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হল মোক্ষলাভ করা যা বেদ অনুসারে জ্ঞানযোগ এবং ভগবতগীতা অনুযায়ী কর্মযোগ ও ভক্তিযোগের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। জ্ঞানযোগ বলতে উপনিষদে এবং যোগসূত্রে উল্লিখিত সন্ন্যাসজীবনে গিয়ে ধ্যানের মাধ্যমে সমাধি অর্জনকে বোঝায়, জ্ঞানযোগ অনুসারে জগতের সবকিছুকে মায়া বা বিভ্রম হিসেবে চিন্তা করা হয় এবং এখানে ব্রহ্ম বা ঈশ্বরকেই একমাত্র সত্য ভাবা হয়। কর্মযোগ অনুসারে কর্মফলের আশা ত্যাগ করা এবং স্বত্তাভিমান ত্যাগ অর্থাৎ নিজেকে কোন কাজের কর্তা না ভেবে কর্ম করে যাওয়াকে কর্মযোগ বলা হয়। ভক্তিযোগ অর্থ হল নিজেকে ঈশ্বরের উপর সমর্পন করা এবং সবসময় ঈশ্বরের কথা চিন্তা করা। এই তিনটি পথের দ্বারা মোক্ষলাভ সম্ভব হয়, অর্থাৎ ঈশ্বরের সাথে আত্মার মিলন সম্ভব হয়। উল্লেখ্য বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ নামে একটি বেদান্ত দর্শন অনুসারে ভক্তিযোগ ছাড়া কেবল জ্ঞানযোগ এবং কর্মযোগের মাধ্যমেই ঈশ্বরের সাথে মিলন সম্ভব নয়। হিন্দুধর্মের কোথাও এই মোক্ষকে চরম আনন্দের অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, কোথাও দুঃখ থেকে মুক্তির অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, আবার কোথাও আনন্দ, দুঃখ থেকে শুরু করে সকল প্রকার আবেগ মুক্ত একটি অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবদ গীতা অনুসারে আত্মা কখনও মরে না, শুধু মাত্র শরীরের মৃত্যু হয় যা পাঁচটি উপাদান – ক্ষিতি (মাটি), অপ (পানি), তেজ (আগুন), মরুৎ (বায়ু), ব্যোম (আকাশ) এর সমষ্টি। এই পাঁচটি উপাদানকে পঞ্চভূত বলা হয়। এই পাঁচটি উপাদানের কোনটাই আত্মার কোন ক্ষতি বা আত্মাকে প্রভাবিত করতে পারে না।

হিন্দুরা “কর্ম”তে বিশ্বাস করেন। কর্ম হল ব্যক্তির মোট ভাল ও মন্দ কাজের সমষ্টি। সৎকর্ম দ্বারা ভাল কাজ ও বিকর্ম দ্বারা মন্দ কাজ বোঝায়। হিন্দুধর্ম অনুসারে কর্মের মূল ধারণাটি হল “যেমন কর্ম, তেমন ফল”। সুতরাং, ব্যক্তি যদি একটি সৎ জীবন যাপন করেন তাহলে তিনি পরকালে পুরষ্কৃত হবেন। যদি অসৎ জীবন যাপন করেন তবে পরজন্মে সেই অসৎকর্ম প্রতিফলিত হবে।

বৌদ্ধ ধর্ম

বৌদ্ধরা মনে করে যে মৃত্যুর পরে তাদের পুনর্জন্ম লাভ হবে যেখানে তাদের আত্মা এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় গমন করবে। পুনর্জন্মের ধরণ কী হবে তা ব্যক্তির কৃতকার্যের উপর নির্ভর করবে। যেমন ব্যক্তি যদি দেহ, বাক্য ও মনের দ্বারা লোভ, ঘৃণা ও বিভ্রমের কারণে ক্ষতিকর কাজ করে, তাহলে তারা নিম্ন জগতে বা নরক জগতে থাকবেন যার অর্থ হল একটি পশু বা ভূত হয়ে জন্মানো। অন্যদিকে যদি ব্যক্তি উদারতা, ভালবাসা, দয়া, সহানুভূতি ও জ্ঞানের দ্বারা ভাল কাজ করেন তাহলে তিনি সুখের জগতে বা স্বর্গীয় জগতে জন্মাবেন যার অর্থ হল মানুষ হয়ে জন্মানো।

বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে, প্রত্যেক বুদ্ধেরই তাদের নিজস্ব পবিত্র ভূমি থাকে যা তাদের যোগ্যতা বা সদগুণ দিয়ে সচেতন ব্যক্তির হিতার্থে তৈরি হয়েছে। সচেতন ব্যক্তি সমনোযোগে বুদ্ধদেরকে স্মরণ করলে এই পবিত্র ভূমিতে পুনর্জন্ম লাভ করেন এবং একজন বুদ্ধ হবার জন্য প্রশিক্ষিত হন। তাই পিওর ল্যান্ড বৌদ্ধধর্মের প্রধান চর্চা হল বুদ্ধের নাম ভজন করা।

তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মের টিবেটান বুক অব ডেড -এ মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী অবস্থার কথা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মৃতব্যক্তিগণ জ্ঞানের উজ্জ্বল আলো খুঁজে পাবেন যা ঊর্ধ্বে যাবার একটি সোজা রাস্তা দেখাবে এবং এর সাহায্যে ব্যক্তি পুনর্জন্মের চক্র ত্যাগ করতে সক্ষম হবেন। তারা বুঝবেন, কেউই তাদেরকে আঘাত করতে বা ক্ষতি করতে পারবে না, কারণ তাদের কোন বস্তুগত শরীর নেই।

বৌদ্ধধর্ম অনুসারে, জীবন হল মহাবিশ্বের একটি মহাজাগতিক শক্তি এবং মৃত্যুর পর এটা মহাবিশ্বের সাথে আবার জুড়ে যায়। আর যখন সেই জীবনের জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়ার সময় হয় তখন এটি জন্ম লাভ করে। যে কোন জীবনের দশটি জীবনাবস্থা রয়েছে, এগুলো হল: নরক, ক্ষুধা, রাগ, পশুবৃত্তি, পরমানন্দ, মানবিকতা, শিক্ষণ, বোধগম্যতা, বোধিসত্ত্ব এবং বুদ্ধত্ব। এগুলোর মধ্যে জীবন যে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, পুনরায় সেই অবস্থাতেই আবার জন্মলাভ করে।”

শিখ ধর্ম

শিখরা বিশ্বাস করে যে আত্মারা আধ্যাত্মিক জগতের অংশভূক্ত যার উৎপত্তি ঈশ্বরের থেকে হয়েছে। তাদের ধর্মগ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহিবের স্তবক অনুযায়ী পরকালে পুরস্কার এবং শাস্তির ব্যবস্থা আছে। কিন্তু একটি বিশাল সংখ্যার শিখগণ অন্যরকম বিশ্বাস করেন এবং মনে করেন যে সেইসব স্তবকগুলো রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

গুরু গ্রন্থ সাহিব এবং দশম গ্রন্থে পরকালের অনেক ঘটনায় স্বর্গ ও নরকের অস্তিত্বের কথা সূক্ষ্মভাবে বলা আছে। সেখান থেকে বলা যায় শিখধর্ম স্বর্গ ও নরকের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। যাইহোক, স্বর্গ ও নরক ব্যক্তিকে কেবল পুরষ্কৃত করতে ও শাস্তি দিতে তৈরি করা হয়েছে, পুরষ্কার বা শাস্তি লাভ শেষ হলে ব্যক্তিকে আবার জন্ম নিতে হবে। ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে এই জন্মমৃত্যুর চক্রের মধ্যেই থাকতে হবে। শিখ ধর্মগ্রন্থ অনুসারে মানবিক আকার হল ঈশ্বরের সবচেয়ে নিকটবর্তী আকার এবং ঈশ্বরের সাথে পুনরায় যুক্ত হবার জন্য সবচাইতে ভাল সুযোগ। শিখ গুরুরা বলেন যে, কিছুই মরে না, কিছুই জন্মায় না, সবকিছুই চিরকাল বর্তমান থাকে, এরা শুধু নিজেদের আকৃতি বদল করে। আসলে আত্মা কখনই জন্মলাভ বা মৃত্যুবরণ করে না। আত্মা ঈশ্বরের একটি অংশ এবং তাই তা চিরকাল জীবিত থাকে।

উইক্কা

উইক্কাদের পরকালকে “দ্য সামারল্যান্ড” হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এখানে আত্মা বিশ্রাম নেয়, জীবন থেকে পুনরুদ্ধৃত হয় এবং জীবদ্দশায় থাকার সময় তার অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটায়। বিশ্রামের একটা সময় শেষে, আত্মা পুনর্জন্ম লাভ করে এবং তাদের গতজন্মের সব স্মৃতি মুছে যায়। অনেক উইক্কান দ্য সামারল্যান্ডকে তাদের জীবদ্দশায় করা কৃতকার্যের প্রতিফলনের স্থান হিসেবে দেখেন। এটা পুরষ্কৃত হবার কোন স্থান নয়, বরং একটি জীবনের যাত্রাপথের ইতি।

শিন্তৌ ধর্ম

জাপানে কোন শ্রাইনে শিন্তো ধর্মের উৎসবগুলোতে সবাই অংশগ্রহণ করে। তবে মৃত্যুর পর, বৌদ্ধধর্মের নিয়মে অন্তেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেয়। প্রাচীন জাপানী কিংবদন্তী অনুসারে, মৃতেরা ইয়মি নামক একটি তমসাচ্ছন্ন পাতালের জগতে প্রবেশ করে। সেখানে একটি নদী আছে যা জীবিতদেরকে মৃতদের থেকে পৃথক করে। শিন্তৌ ধর্মে মৃত্যু এবং মৃতদেহ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা করা হয় এবং এদেরকে কেগারে নামক দূষণের উৎস বলে মনে করা হয়। যাইহোক, শিন্তৌ ধর্মে মৃত্যুকে স্বর্গীয়মাত্রায় মহিমান্বিত করার পথ হিসেবেও ধরা হয়। এর সাক্ষ্য হিসেবে শিন্তো পুরাণে মৃত্যুর পর কিংবদন্তী নায়কদেরকে মহিমান্বিত অবস্থান পাবার ঘটনাকে দেখানো যায়।

শিন্তো ধর্মে বিশ্বাসী হবার জন্য সকলের সামনে শিন্তো ধর্মকে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করতে হয় না। যখনই জাপানে একজন শিশুর জন্ম হয়, একটি স্থানীয় শিন্তো শ্রাইন (মন্দির)-এ একটি লিস্টে বাচ্চার নাম নথিভুক্ত করে ফেলে এবং তা সেই শ্রাইনে রেখে বাচ্চাটিকে একটি উজিকো (পারিবারিক সন্তান) হিসেবে ঘোষণা করে। শিন্তো ধর্মমতে মৃত্যুর পর উজিকো ফ্যামিলি স্পিরিট বা ফ্যামিলি কামি বা পারিবারিক আত্মায় পরিণত হয় যাকে উজিগামি বলা হয়। স্থান পরিবর্তনের ফলে কেউ নিজের নাম অন্য কোন লিস্টে নথিভূক্ত করতে পারেন, তাহলে তার নাম উভয় জায়গাতেই নথিভূক্ত থাকবে। এই নাম সম্মতি ছাড়াই এবং যেকোন ধর্মমতের ব্যক্তির ক্ষেত্রেই নথিভূক্ত হতে পারে।

ইউনিটারিয়ান ইউনিভারসালিজম

ইউনিটারিয়ান ইউনিভারসালিস্টরা একধরণের সার্বজনীনতাবাদে বিশ্বাস করেন যা অনুসারে তাদের আত্মা চূড়ান্তভাবে উদ্ধারকৃত হবে এবং তাদেরকে কোনধরণের নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে না। এদের মধ্যেও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে মতভেদ আছে, কারণ এই ব্যাপারে একই অবস্থান নয়। যদিও তারা একটি আক্ষরিক অর্থে বোঝানো একটি নরকে বিশ্বাস করেন, তারা বিশ্বাস করেন, সকলেই স্বর্গে যাবে। আধুনিক ইউনিটারিয়ান ইউনিভারসালিস্টরা স্বর্গ, পুনর্জন্ম এবং মৃত্যু পরবর্তী চিরসমাপ্তি বা অবলিভিয়নে বিশ্বাস করেন। তারা বিশ্বাস করেন যে স্বর্গ এবং নরক চেতনার একটি সাংকেতিক স্থান এবং এই বিশ্বাস পরকালের চেয়ে ইহকালকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

আধ্যাত্মবাদ

এডগার কেসের মতে, পরকাল নয়টি জগত নিয়ে গঠিত যা জ্যোতিশাস্ত্রের নয়টি গ্রহকে ইঙ্গিত করে। প্রথমটি শনি গ্রহের প্রতীকস্বরূপ, এটি আত্মার শুদ্ধিকরণের একটি স্তর। দ্বিতীয়টি হল বুধ যা সমস্যাকে বুঝতে পারার ক্ষমতা দান করে। তৃতীয়টি পৃথিবী কর্তৃক শাসিত হয়, এবং এই পৃথিবী পার্থিব সন্তুষ্টির সাথে সম্পর্কযুক্ত। চতুর্থটি হল শুক্র যেখানে আমরা ভালবাসা খুঁজে পাই। পঞ্চমটি হল মঙ্গল গ্রহ যেখানে আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানতে পারি। ষষ্ঠ রাজ্যটি নেপচুন কর্তৃক শাসিত হয় এবং এখানে আমরা আমাদের সৃজনশীলতা ব্যবহার করতে এবং বস্তুজগৎ থেকে মুক্ত করতে শিখি। সপ্তম রাজ্য বৃহস্পতি গ্রহ দ্বারা প্রতীকায়িত হয় যা আত্মার কার্যকারিতাকে বৃদ্ধি করে যার ফলে আত্মা কোন অবস্থাকে বুঝতে পারে, মানুষ, স্থান, বস্তু এবং অবস্থা বিশ্লেষণ করতে পারে। অষ্টম পরকালের রাজ্য ইউরেনাস কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এটা সাইকিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। নবম পরকাল রাজ্য প্লুটো দ্বারা প্রতীকায়িত হয় যা অচেতনদের জ্যোতিশাস্ত্রীয় রাজ্য। এই পরকালের জগৎ একটি ক্ষণস্থায়ী স্থান যেখানে আত্মারা সৌরজগতের অন্য জগৎগুলোতে ভ্রমণ করতে পারে। এটা আত্মার চিরকালীন স্বাধীনতা এবং এই জগৎ আমাদের সৌরজগত থেকে মহাজগতের দিকে দরজা খুলে দেয়।

মূলধারার আধ্যাত্মবাদীরা সাত জগতের একটি সিরিজের কথা বলেন যা এডগার কেসের নয়টি গ্রহ দ্বারা শাসিত নয় জগতের পরকালের মত না। এর বিবর্তনের সাথে সাথে আত্মারা ঊর্ধ্ব থেকে ঊর্ধ্ব দিকে যেতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত এরা আধ্যাত্মিক একত্বের চূড়ান্ত জগতে না পৌঁছায়। এখানে প্রথম জগত হল নরকের সমতুল্য যেখানে সংকটগ্রস্ত আত্মারা পরবর্তী স্তরে যাবার আগে অনেক সময় অতিবাহিত করে যতক্ষণ না তারা পরবর্তী স্তরে যেতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয় স্তরটি হল যেখানে বেশিরভাগ আত্মাই সরাসরি চলে যায়, এই স্থানকে নরকের নিম্ন স্তর থেকে মহাজগতের উচ্চ যথার্থ জগতে যাবার একটি মধ্যবর্তী স্তর। তৃতীয় স্তরটি হল তাদের জন্য যারা কর্মফলের দায় নিয়ে নিয়ে কাজ করেছেন। চতুর্থ স্তর হল সেই স্থান, যেখান থেকে বিবর্তিত আত্মারা পৃথিবীবাসীদেরকে শিক্ষা এবং নির্দেশনা দেয়। পঞ্চম স্তরটি হল সেই স্থান যেখানে আত্মারা মানব চেতনাকে পিছনে ফেলে আসে। ষষ্ঠ স্থানে আত্মারা মহাজাগতিক চেতনার সাথে যুক্ত হয় এবং এসময় তাদের একত্ব এবং বিচ্ছিন্নতার কোন চেতনা থাকে না। চূড়ান্তভাবে সপ্তম স্তরটি হল সকল আত্মার লক্ষ্য। এই স্থানে আত্মা তার নিজের আত্মাময়তার চেতনাকে অতিক্রম করে এবং বিশ্বের আত্মা বা পরমাত্মার সাথে পুনরায় যুক্ত হয়ে যায়।

জরাথুস্ট্রবাদ

জরাথুস্ট্রবাদ বলে, দেহচ্যুত আত্মা বা উরভান নিচের দিকে ইমার দ্বারা শাসিত মৃতের রাজ্যে যাবার পূর্বে পৃথিবীতে তিন দিন বিলম্ব করে। এই তিন দিনের জন্য আত্মা পৃথিবীতে বিশ্রাম নেয়, সৎ আত্মা তার শরীরের মাথার কাছে বসে এবং আনন্দের সাথে উস্তাভইতি গাথাস এর ভজন করে, যেখানে মন্দ ব্যক্তি দেহের পায়ের কাছে বসে দুঃখপ্রকাশ করে এবং ইয়াসনার ভজন করে। জরাথুষ্ট্রবাদ বলে যে সৎ আত্মার জন্য একটি সুন্দরী কুমারী আবির্ভূত হয় যা ব্যক্তির উত্তম চিন্তা, কার্য এবং বাক্যেরই নারীরূপ। অন্যদিকে একজন মন্দ ব্যক্তির বেলায় খুবই বৃদ্ধ, কুৎসিত ও নগ্ন ডাইনি আবির্ভূত হয়। তিন রাতের পর মন্দ ব্যক্তির আত্মাকে ভিজারেসা নামক একজন দৈত্য চিনভত সেতুতে নিয়ে যায় যা অন্ধকারে (নরক) যাবার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

ইমাকে পৃথিবী শাসন করা প্রথম রাজা বলে বিশ্বাস করা হয়, এবং একই সাথে তাকে প্রথম মৃত বলেও বিশ্বাস করা হয়। ইমার রাজ্যে আত্মারা একটি ছায়াময় অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকে, এবং তারা তাদের নিজেদের বংশধরের উপর নির্ভরশীল যারা এখনও পৃথিবীতে বেঁচে আছে। তাদের বংশধরদেরকে পৃথিবীতে করা বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্বপুরুষ আত্মার ক্ষুধা ও বস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে হয়।

প্রথম দিন দিনে যে অনুষ্ঠানগুলো করা হয় সেগুলো অত্যাবশ্যকীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেগুলো আত্মাকে মন্দ ক্ষমতার হাত থেকে রক্ষা করবে এবং এটা তাদেরকে পরকালে যেতে শক্তি দান করবে। তিন দিন পর আত্মা চিনভত সেতু পাড়ি দেবে যা হল আত্মার শেষ বিচার। রাশনু এবং স্রাওশা শেষ বিচারের সময় উপস্থিত থাকে। উপস্থিতদের তালিকা কখনও কখনও বর্ধিত হয় এবং এখানে ভাহমান, অরমাজদও থাকে। রাশনু হল ইয়াজাতা যিনি ন্যায় এর দাঁড়িপাল্লা ধরে থকেন। দাঁড়িপাল্লায় যদি ব্যক্তির ভাল কাজ তার মন্দ কাজের চেয়ে ভারি হয় তাহলে আত্মা স্বর্গে গমনের জন্য উপযুক্ত হবে। যদি তার খারাপ কাজ ভাল কাজের চেয়ে ভারি হয় তাহলে সেতুটি সরু হতে হতে সেতুটির একটি কিনারার সমান হবে এবং একটি বিকট ডাইনি আত্মাকে তার হাত দিয়ে টেনে নিয়ে তার সাথে নিচে নরকে নিয়ে যাবে।

মিসভান গাতু হল ‘মিশ্রিতদের স্থান’ যেখানে আত্মারা ধূসর অস্তিত্ব নিয়ে থাকে এবং তাদের কোন আনন্দ ও বেদনা থাকেনা। একটি আত্মা সেখানে যায় যদি রাশনুর দাঁড়িপাল্লায় তার ভাল কাজ ও খারাপ কাজের ভর সমান হয়।

প্যারাসাইকোলজি

১৮৮২ সালে পরকাল এবং আধ্যাত্মিকতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত করার জন্য সোসাইটি ফর সাইকোলজিকাল রিসার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদস্যগণ তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্যারানরমাল বিষয়ের উপর গবেষণা পরিচালনা করছে। এখানকার প্রথমদিকের প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি করে ব্যবহার করে পরকাল সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এর প্রথমদিকের সদস্যদের মধ্যে উইলিয়াম ক্রুক্সদের মত বিশিষ্ট গবেষক এবং হেনরি সিজউইক এবং উইলিয়াম জেমসের মত বিশিষ্ট দার্শনিক ছিলেন।

পরকালের প্যারাসাইকোলজিকাল তদন্তগুলোর মধ্যে হন্টিং, মৃতদের ভূত, ইনস্ট্রুমেন্টাল ট্রান্স যোগাযোগ, ইলেকট্রনিক ভয়েস ফেনোমেনা, এবং মিডিয়ামশিপ অন্তর্ভূক্ত ছিল। এছাড়া নেয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স বা মৃত্যু পরবর্তী অভিজ্ঞতা নিয়েও গবেষণা করা হয়। এই ক্ষেত্রে যেসব বিজ্ঞানীগণ কাজ করেছেন তাদের মধ্যে আছেন রেমন্ড মুডি, সুজান ব্ল্যাকমোর, চার্লস টার্ট, উইলিয়াম জেমস, ইয়ান স্টিভেনসন, মাইকেল পারসিংগার, পিম ভ্যান লোমেল, পেনি সারটরি প্রভৃতি।

১৯০১ সালে ফিজিশিয়ান ডানকান ম্যাকডুগালের পরিচালিত একটি গবেষণায় মৃত্যুর পর আত্মার শরীর থেকে বের হয়ে যাবার ফলে তার কী পরিমাণ ওজন কমে তা পরিমাপ করা হয়। তিনি আত্মাকে বস্তুগত, স্পৃশ্য এবং পরিমাপযোগ্য প্রমাণ করার জন্য মৃত্যু নিকটবর্তী এমন রোগীর ওজন পরিমাপ করেন। যদিও ম্যাকডুগালের ফলাফল তার দাবীকৃত “২১ গ্রাম” থেকে যথেষ্ট পরিমাণে ভিন্ন ছিল, তবুও কিছু লোক এই ২১ গ্রামকেই আত্মার ভরের পরিমাপ হিসেবে মেনে নেয়। ২০০৩ সালের চলচ্চিত্র ২১ গ্রামস নামটি ম্যাগডুগালের এই ফলাফলের রেফারেন্সেই নেয়া হয়। তার ফলাফলকে কখনই আর পুনঃপ্রস্তুত করা হয় নি, এবং এই ফলাফলকে সাধারণত অর্থহীন এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিভায় এর কোন অবদান থাকলে তাকে খুবই সামান্য বলা হয়।

ফ্র্যাংক টিপলার যুক্তি দেখান, পদার্থবিজ্ঞান অমরত্মকে ব্যাখ্যা করতে পারে, যদিও এধরণের যুক্তি মিথ্যা হিসেবে প্রমাণযোগ্য নয় বলে বিজ্ঞান অনুসারে কার্ল পপারের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এটি যুক্তি হবার যোগ্যতা রাখে না।

২৫ বছর ধরে প্যারাসাইকোলজিকাল গবেষণার পর সুজান ব্ল্যাকমোর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, পরকালের কোন গবেষণামূলক সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই।

আধুনিক দর্শন

ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রশ্নে এখনও একটি অবস্থান রয়েছে যাকে মুক্ত ব্যক্তিবাদ বা ওপেন ইন্ডিভিজুয়ালিজম নামে অভিহিত করা হয়, এবং এটার সাথে প্রাচীন বিশ্বাস মনোসাইকিজমের সাথে মিল রয়েছে। মনোসাইকিজম অনুসারে ব্যক্তির আলাদা আলাদা অস্তিত্ব মায়াময় বা বিভ্রম, এবং আমাদের চেতনা আমাদের মৃত্যুর পর অন্য কোন সচেতন জীবে চলে যাওয়ার মাধ্যমে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। মৃত্যুর পর অস্তিত্ব ভিত্তিক অবস্থান বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদার্থবিদ যেমন এরভিন শ্রোডিঙার এবং ফ্রিম্যান ডাইসন বিশ্বাস করতেন।

মৃত্যুর পর কোন ব্যক্তির অস্তিত্বের ধারাবাহিকতায় কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নের উদয় হয়। পিটার ভ্যান ইনোয়াগেন তার পুনর্জন্ম সংক্রান্ত যুক্তিতে উল্লেখ করেন, মেটারিয়ালিস্টদের অবশ্যই কোন ধরণের শারীরিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। জন হিকও তার রচনা ডেথ এন্ড এটারনাল লাইফ গ্রন্থে ব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি একটি উদাহরণ ব্যবহার করেন যেখানে একজন ব্যক্তির অস্তিত্ব একটি স্থানে বিলীন হয়ে যায় এবং আরেকটি স্থানে সেই ব্যক্তির ঠিক একই রেপ্লিকা আবির্ভূত হয়। যদি সেই রেপ্লিকাটির পূর্বের ব্যক্তির মত একই অভিজ্ঞতা, বৈশিষ্ট্য এবং শারীরিক প্রকাশ থেকে থাকে, তাহলে আমরা কী বলতে পারব যে দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রথম ব্যক্তির পরিচয় বহন করছে?

প্রোসেস ফিলোসফি

প্রোসেস ফিলোসফি ও ধর্মতত্ত্বের প্যানেনথিস্টিক মডেল অনুযায়ী আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেড এবং চার্লস হার্টশোর্ন বস্তু দ্বারা তৈরি জগৎ অস্বীকার করেন এবং এর বদলে তারা মনে করেন জগৎ জীবন্ত অভিজ্ঞতা দ্বারা তৈরি। হার্টশোর্নের মতে মানুষ পরকালে ব্যক্তিবাচক বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লাভ করে না, কিন্তু তারা বস্তুবাচক অমরত্ব লাভ করে কারণ তখন তাদের অভিজ্ঞতা চিরকালের মত ঈশ্বরে বাস করে, যা পূর্বের সব কিছু ধারণ করে। যাই হোক, অন্যান্য প্রোসেস ফিলোসোফার যেমন ডেভিড রে গ্রিফিন লিখেছেন যে মৃত্যুর পর মানুষের ব্যক্তিবাচক অভিজ্ঞতা থাকতে পারে।

বিজ্ঞান

বিজ্ঞান সমাজ ধর্মগুলোতে বিশ্বাস করা মৃত্যু পরবর্তী চেতনার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে সংশয়বাদী অবস্থান নেয়। মনদৈহিক সমস্যার উপর ভিত্তি করে বেশিরভাগ স্নায়ুবিজ্ঞানী বা নিউরোসাইন্টিস্ট, ফিজিকালিস্ট বা শরীরবাদী অবস্থান নেন যা অনুসারে চেতনা শরীরের বৈশিষ্ট্য যেমন মস্তিষ্কের স্নায়বিক কার্যাবলি থেকেই উৎপন্ন হয়। এই প্রতিজ্ঞাটির নিহিতার্থটি হচ্ছে, একবার ব্রেইন ডেথের পর মস্তিষ্ক তার কার্যক্রম বন্ধ করে ফেললে, চেতনার অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটে। বিজ্ঞান সমাজের কেউ কেউ স্বীকার করেন যে, মৃত্যুর সময় মানবাত্মার তথ্যসমূহ কেবল মাত্র তাদের থেকেই আবিষ্কার করা সম্ভব যারা মৃত্যুর অভিজ্ঞতা লাভ করছেন। এসম্পর্কিত তথ্য আবিষ্কার করার জন্য তিব্বতীয় লামাদের একটি দল তাদের শিষ্যদের তাদের মরার সময়কার অভিজ্ঞতা জানিয়ে যান। লামাদের বলা লক্ষণসমূহের মধ্যে ছিল –

  • ১. শরীরে চাপের একটি অনুভূতি
  • ২. ভিজে ঠাণ্ডা এবং তারপর জ্বরজ্বর উষ্ণতা
  • ৩. শরীর পরমাণুসমূহে পরিণত হচ্ছে এধরণের অনুভূতি

এরকমও অনেক উদাহরণ আছে যেখানে ব্যক্তিকে ক্লিনিকালি মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল কিন্তু ব্যক্তি বেঁচে উঠেছেন। সেই সব ব্যক্তিকে যখন তাদের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা দাবী করেন তারা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তার জন্য যথেষ্ট শব্দ নেই। ডাক্তার রেমন্ড মুডি ১০০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে নিয়ে গবেষণা করেছেন যাদেরকে ক্লিনিকালি ডেথ বা ক্লিনিক্যালি মৃত বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছেন। তিনি তার প্রাপ্ত তথ্যগুলোকে লাইফ আফটার লাইফ (১৯৭৫) নামক রচনায় প্রকাশ করেন। এই গবেষণার ফলাফলগুলো থেকে মৃত্যু সম্পর্কিত অভিজ্ঞতার কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য উদ্ঘাটিত হয়। ব্যক্তিগণ প্রায়ই দেহ-বহির্ভূত অভিজ্ঞতার কথা বলেন যেখানে শরীর এবং আত্মা বিচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং ব্যক্তিগণ জগৎকে তাদের “এস্ট্রাল বডি”র মাধ্যমে দেখেন। ফ্রেড স্কুনমেকার নামক একজন কার্ডিওলজিস্ট ১৯৭৯ সালে মুডির এই ফলাফলগুলোকে তার একটি গবেষণায় ভেরিফাই করেন যেখানে তার গবেষণাটি ছিল মারাত্মক মৃত্যুঝুঁকি থেকে বেঁচে ফেরা ২,৩০০ জন রোগীকে নিয়ে। সুপরিচিত পদার্থবিদ এবং প্যারাসাইকোলজিস্ট স্যার উইলিয়াম ব্যারেট ১৯২৬ সালে এধরণের ঘটনা নিয়ে ডেথ বেড ভিশন নামক রচনা প্রকাশ করেন। তার রচনায় অসুস্থ ব্যক্তি গান শোনেন এবং তার ভালবাসার মৃত ব্যক্তিকেও দেখতে পান। একটি কেস স্টাডিতে দেখা যায়, ব্যক্তি একজন মৃত ব্যক্তিকে দেখেন যার সেই সময় মৃত্যুই হয় নি। সেকেলে পদ্ধতি গবেষণা এবং প্রচণ্ডভাবে ব্যক্তির সত্বার উপর নির্ভরশীল এই কেস স্টাডিগুলোর অনেকগুলোই যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছে। তার উপর, বর্তমানে দাবী করা হচ্ছে আউট-অব-বডি বা দেহ-বহির্ভূত অভিজ্ঞতাগুলো ক্ষয় হতে থাকা মস্তিষ্কের তৈরি হেলুসিনোজেনিক বা বিভ্রম তৈরিকারী এফেক্টের ফল।

পরকালে বিশ্বাসের জন্মের মনোবিজ্ঞানগত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে কগনিটিভ ডিসপোজিশন বা জ্ঞানীয় স্বভাব, সাংস্কৃতিক শিক্ষা এবং ইনটুইটিভ রেলিজিয়াস আইডিয়া সজ্ঞাত ধর্মীয় ধারণা। গবেষনায় দেখা যায়, বাচ্চারা মৃত্যুর সময় শারীরিক ও মানসিক সমাপ্তিকে স্বীকার করেছিল, কিন্তু তারা ইচ্ছা, আত্মা এবং আবেগের সমাপ্তিকে স্বীকার করতে দ্বিধাবোধ করছিল।

Facebook Comments

সিয়ামুজ্জামান মাহিন

Feminist,Atheist,Humanist-Writer/Blogger

Leave a Reply

%d bloggers like this: