শান্তিপ্রিয় হিন্দুত্ববাদী?

যখনই ধর্মীয় বর্বরতার প্রসঙ্গ ওঠে তখনই একটি ধর্ম ও ধার্মিকদের দেখিয়ে অন্য ধর্মের ধার্মিকরা নিজেদের ‘তুলনামূলক ভাল’ বলে দাবি করতে সোচ্চার হন। ‘কম মন্দ’ কিভাবে ‘ভাল’ হয় তা আমার বোধগম্য নয়। প্রায়ই দেখা যায় গোমূত্রসেবী গোসন্তান গোরক্ষক বর্বর খুনিদের সাফাই গাইতে হাজির হন কিছু তথাকথিত শান্তিপ্রিয় হিন্দু দাদাদিদি। তাই শুধু হিন্দুদের ও হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কলম ধরতে গিয়ে নিহত পাঁচজনের (রামচন্দ্র ছত্রপতি, নরেন্দ্র ধবলকর/দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে, এমএম কালবুর্গি, গৌরী লঙ্কেশ) ঘটনা তুলে ধরছি।
দয়া করে ‘ওরা প্রকৃত হিন্দু নয়‘, ‘ধার্মিক দিয়ে ধর্ম বিচার করবেন না‘, ‘মাত্র এই কটি!‘, ‘এগুলো হিন্দুধর্মে সমর্থিত নয়‘, ‘অমুকের চাইতে আমরা কম‘ ইত্যাদি তোতাপাখির বুলি আওরানোর আগে নিজেদের মুখে এক দলা গোবর বা এক কাপ গোমূত্র মেখে নিয়েন।

রামচন্দ্র ছত্রপতি

২১ নভেম্বর ২০০২

Ram Chander Chhatrapati murder

সবর্ভারতীয় একটি হিন্দি দৈনিকের হরিয়ানার সিরসা এলাকার সংবাদদাতা ছিলেন রামচন্দ্র ছত্রপতি। সাদামাঠা কৃষক পরিবারের ছেলে। আইনের স্নাতক হয়ে ওকালতি শুরু করলেও মন ভরেনি। হাতে তুলে নেন কলম। সর্বভারতীয় দৈনিকে কাজ করেও রামচন্দ্রের মনে হয়, এলাকার খবর করতে হলে স্থানীয় কাগজই দরকার। সেই জেদ থেকেই ২০০০ সালে প্রকাশ করেন ‘পুরা সচ্’ নামের একটি পত্রিকা। তাতেই একের পর এক ‘পর্দা ফাঁস’ শুরু করেন ‘ডেরা সচ্চা সৌদা’র ‘হজুর বাবা’র। ২০০২-এ রামচন্দ্রের ‘পুরা সচ্’-এ লেখা বেরোয় গুরমিতের আশ্রমে নির্যাতিতা এক সাধ্বীর। নাম প্রকাশ না-করে তিনি জানান, কী ভাবে তাঁর উপরে অত্যাচার ও ধর্ষণ চালিয়েছে গুরমিত। নাম প্রকাশ না-করে সেই সাধ্বীর চিঠি যায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর কাছে। প্রতিলিপি পাঠানো হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং রাষ্ট্রপতির কাছেও। শুরু হয় সিবিআই তদন্ত। অন্তর্তদন্তমূলক খবর প্রকাশ করতে থাকেন রামচন্দ্র। ‘পুরা সচ্’-এর সেই সব খবর তখন ফোটোকপি করে বিলি হতো হরিয়ানার বিভিন্ন প্রান্তে।
রাম রহিমের আশ্রমে দশ প্রধানের এক জন ছিলেন রঞ্জিত। তাঁর বোন ছিলেন সেখানকার সাধ্বী। চেলাদের সন্দেহ হয়, ওই দু’জনই রামচন্দ্রকে খবর দিচ্ছেন। আশ্রম ছেড়ে পালান ভাইবোন। রক্ষা পাননি। আততায়ীর গুলিতে প্রাণ দেন রঞ্জিত। পুলিশের কাছে নিরাপত্তার আবেদন জানান রামচন্দ্র। কিন্তু দু’রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থেকে সর্বোচ্চ স্তরের আমলারা যে-‘বাবা’র পায়ে মাথা ঠেকান, তাঁর বিরুদ্ধে যাবেন কে? ২০০২ সালের ২৪ অক্টোবর রামচন্দ্র গুলিবিদ্ধ হন। ২৮ দিন দিল্লির হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে ২১ নভেম্বর হার মানেন ওই সাংবাদিক।

নরেন্দ্র ধবলকর/দাভোলকর

২০ আগস্ট ২০১৩

Narendra Dabholkar murder

নরেন্দ্র দাভোলকর পেশায় চিকিৎসক হলেও দুনিয়া তাঁকে চেনে সমাজকর্মী হিসেবে। মহারাষ্ট্রের এই মানুষটি কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ভৌতিক জাদুর বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট খুন হন। পরের বছর সমাজসেবায় অনবদ্য অবদানের জন্য তাঁকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী সম্মান দেওয়া হয়। এমনকী দাভোলকরের মৃত্যুর কয়েকদিনের মধ্যে কুসংস্কার ও কালাজাদু সম্পর্কিত অর্ডিন্যান্স পাস করে মহারাষ্ট্র সরকার।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআই ঘটনার প্রায় তিন বছর পরে গ্রেপ্তার করেছিল হিন্দু জনজাগরণ সমিতি নামের একটি সংগঠনের নেতা বীরেন্দ্র তাবড়েকে।

গোবিন্দ পানসারে

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

Govind Pansare murder

গোবিন্দ পানসারে ও তাঁর স্ত্রী উমা পানসারেকে তাঁদের বাড়িতে আক্রমণ করা হয়। ৫টি গুলি লেগেছিল গোবিন্দ পানসারের। পাঁচ দিন পরে তিনি হাসপাতালে মারা যান। তিনিও উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিরোধিতায় সরব ছিলেন। ৮২ বছরের পানসারে পেশায় আইনজীবী এবং লেখক। কোলাপুরে টোল ট্যাক্সেরও বিরোধিতায় আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং মহারাষ্ট্রে উপশুল্ক সংগ্রহ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ্য নেতা তিনি। দিন ২০ আগে একটি জনসভায় গেরুয়া শিবিরের নাথুরাম গডসের প্রসিদ্ধি গাওয়ার সাম্প্রতিক প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। এরপরেই তাঁকে হেনস্থা করা হয়। প্রভূত হুমকির সম্মুখীন হন তিনি। একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতা সমীর গায়েকোয়াড়কে ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

মাল্লেশাপ্পা মাদিভালাপ্পা কালবুর্গি

৩০ আগস্ট ২০১৫

MM Kalburgi murder

২০১৫সালের আগস্ট মাসে এই কর্ণাটকেরই ধারবাদে নিজের বাড়িতে আততায়ীর হাতে নিহত হন বিশিষ্ট সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও শিক্ষাবিদ এম এম কালবুর্গি। হাম্পি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য কালবুর্গি লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের মানুষ। কালবুর্গি মূর্তিপুজো, কুসংস্কার ও প্রথাগত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, সরব ছিলেন ধর্মীয় আগ্রাসন, শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে। লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের সদস্য কালবুর্গি প্রচার করতেন কিভাবে ধীরে ধীরে উগ্র হিন্দুত্ববাদ বিষিয়ে তুলেছিল প্রাচীন লিঙ্গায়েত সমাজের স্বাভাবিক ধ্যান ধারণাগুলোকে।
তার মৃত্যুর পরে ঐ দিনই বজরং দলের গোরক্ষা সমিতির একজন সক্রিয় কর্মী টুইট করে,
“Then it was UR Anantamoorty and now its MM Kalburgi. Mock hinduism and die a dog’s death. And dear K.S Bhagwan you are next.”

bhuvith shetty tweet mm kalburgi

কি বুঝলেন? হত্যার পরে আবার প্রকাশ্যে হুমকি,

হিন্দুত্ব নিয়ে কটাক্ষ করবি তো কুকুরের মত মরবি

গৌরী লঙ্কেশ

০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার

gauri lankesh murder

যুক্তিবাদী ও মুক্তমনা সিনিয়র সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ তাঁর পত্রিকা ‘লঙ্কেশ পত্রিকা’ এর মাধ্যমে ‘কমিউনাল হারমনি ফোরাম’ নামে একটি গোষ্ঠীকে ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে গেছেন, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বপক্ষে এবং দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদের বিপক্ষে মতামত প্রকাশ করা হয়। এমনকি তাঁর পত্রিকায় ২০০৮ সালে ছাপা কয়েকটি লেখার জন্য মানহানির মামলাও করেছিলেন বিজেপির সংসদ সদস্য প্রহ্লাদ যোশী। সেই মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হন ও ছয় মাসের জেল হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
ব্যাঙ্গালুরুর পুলিশ কমিশনার সুনীল কুমার জানিয়েছেন, “মঙ্গলবার রাতে যখন তিনি বাড়ি ফিরছিলেন, তখন বাড়ির ঠিক সামনেই গুলি চালানো হয়।“ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “গৌরী যখন বাড়ির দরজা খুলছিলেন, ঠিক সেই সময়ই বুকে সরাসরি দুটো আর মাথায় একটা গুলি করা হয়।“ বেঙ্গালুরু পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ জোগাড় করে। সেই ফুটেজে বাইকে চেপে আসা দুষ্কৃতীদের ছবি ধরা পড়ে। তারা এসে গৌরীকে পরপর সাতটি গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। একটি গুলি খুলি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়
২০১৫ সালের অগাস্ট মাসে এম এম কালবুর্গিকে হত্যার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ৭.৬৫ এমএম পিস্তল। তদন্তে নেমে সিআইডি ফরেনসিক রিপোর্টে জানতে পারে একই আগ্নেয়াস্ত্র দিয়েই দাভোলকর ও পানসারেকেও খুন করা হয়।

খবর সূত্রঃ

রামচন্দ্র ছত্রপতি

নরেন্দ্র ধবলকর/দাভোলকর

গোবিন্দ পানসারে

মাল্লেশাপ্পা মাদিভালাপ্পা কালবুর্গি

গৌরী লঙ্কেশ

অন্যান্য

Facebook Comments

One thought on “শান্তিপ্রিয় হিন্দুত্ববাদী?

  • August 28, 2018 at 12:06 pm
    Permalink

    ধর্মান্ধতা সুস্থ সমাজের জন্য প্রধান অন্তরায়।

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: