একটি আযানের দোয়া ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের সুন্নতে খৎনা

লিখেছেনঃ সুবচন নির্বাসনে

কে ওই শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি।
মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।
কি মধুর আযানের ধ্বনি!

কবি কায়কোবাদ এর এই আযান কবিতাটি আমাদের সবার প্রিয়। আর কবি নজ্রুলতো তার কবর দিতে বলেছেন মসজিদের পাশে, তার গানেই শুনে দেখুনঃ

মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই.
যেন গোরে থেকেও
মোয়াজ্জিনের আজান শুন্‌তে পাই..

উনি আমাদের জাতীয় কবি, মস্লেম বলে কথা আমরা তো কোন মালাউন কবিকে জাতীয় কবি করতে পারি না, এক জাতীয় সঙ্গীত করেই কত বায়নক্কা , মাদ্রাসা গুলোতে এই মালাউন কবির সংগীত হারাম। তবে কবি নজ্রুল খৎনা করা মস্লেম হলে কি হবে তিনি হরহামেশাই মোল্লা – পুরুত এমনকি ভগবানের বুকেও পদচিহ্ন এঁকে দিতেন। তাই সে আমলে মোল্লা – পুরুত তাকে কাফির মুরতাদ বলে অনেক আগেই ফতওয়া জারি করেছিলেন। তবে সেই কলিকালে বরতমানের মত চাপাতি মুমিন ছিলনা বিধায় বেচারা এক পিছ অটুট দেহ নিয়ে মসজিদের পাশেই শুয়ে আছেন আর প্রতিদিন আযান শুনছেন। চিন্তা করে দেখুন আমাদের চাপাতি মুমিনরা যদি উনাকে করবানির পশুর মত শত কয়েক টুকরা করতেন, কোথায় থাকত তার কান আর , কোথায় থাকত তার মগজ। আযান শুনার সাধ আর পুরন হতো না। তবে মরে গিয়েও উনার শান্তি নাই, সহি ইস্লামি ওয়াজ শুনছিলাম আমার অতি প্রিয় আলিম মওলানা হায্রাত আব্দুর রাযযাক বিন ইয়ুসুফের। পাদটীকায় , বলে রাখি উনি আমার প্রিয় কারন উনি sugar coating ছাড়া প্রকৃত ইসলাম বলেন। উনি সহি কথাই বলছিলেন যে কবর মসজিদের পাশে কেন কাবা শরিফের নীচে কবর দিলেও  বেচারা নজ্রুল নাজাত পাবেন না। এ কথা বলার সময় মওলানা সাহেব হাত দিয়ে  এক ধরনের অঙ্গ ভঙ্গি করছিলেন যেটি দুষ্ট বালকরা সাধারণত কারো পশ্ছাদ দেশে বাঁশ বা অন্য কোন তদ্রূপ অঙ্গ প্রবেশ করিয়ে অগ্র-পশ্ছাদ চালনা করাকে বুঝিয়ে থাকে, আশা করি আকাল মন্দ পাঠককে আর বুঝিয়ে বলতে হবে না। খুঁজে পেলে ওয়াজ টির লিঙ্ক দিয়ে দেব। বেচারা জাতীয় কবির জন্য খারাপই লাগলো, আগে তো শুধু এই বলে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল ঃ “নজ্রুল তুমি করিয়াছ ভুল, দাঁড়ি না রাখিয়া রাখিয়াছো লম্বা লম্বা চুল”। কে জানে এক মুষ্টি সুন্নাতি দাঁড়ি মুবারক থাকলে হয়ত তিনি মরে গিয়ে রক্ষা পেতেন।

যাই হোক, লেখার বিষয় কিন্তু মটেও মুরতাদ কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে নয়। আপনারা যারা মধ্য বয়সের তারা হয়তো স্মরণ করতে পারবেন , কবে প্রথম আমাদের বিটিভি তে আযান দেওয়া শুরু হয় অর্থাৎ সুন্নতে খৎনা করান হয়। সাচ্চা আরবিয় আযান শুনে তখন খুব অদ্ভুত লেগেছিল। এখন তো আমার পাড়াতেই তিনটি মসজিদ তার উপর রেডিও টিভি তো আছেই। শব্দ দূষণ কাহাকে বলে ও কতো প্রকার সেটা যদি কাওকে শেখাতে চান , তাকে দয়া করে ঢাকা শহরে সাত দিনের একটি শর্ট কোর্সে ভর্তি করিয়ে দিবেন, সাধেই আমরা বসবাসের অযোগ্য শহরের মধ্যে শীর্ষ স্থান লাভ করিনি। জানিনা আপনারা কেও কেও কবি কায়কোবাদ কে মওলানা হায্রাত আব্দুর রাযযাক বিন ইয়ুসুফের মত অঙ্গ ভঙ্গি করে দেখাবেন কিনা।  আর তালাশ করে দেখুন বেচারা নজ্রুল এখনো তার কবরে আছে নাকি অস্থি সমেত চম্পট দিয়েছেন। সবাই ভাবেন শব্দ দূষণ শুধু ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় , উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক বাড়ায় আর শ্রবণ ক্ষমতা কমায়  তবে এ কথা হয়ত জানা নেই যে উচ্চ শব্দ গর্ভের সন্তানের ভেতর রক্ত চলাচল কমিয়ে দিয়ে তার সার্বিক বিকাশ ব্যাহত করে।

জানি, শব্দ দূষণের জন্য যে লোক মাইকে আযান বন্ধ করতে বলবে তার রাবনের মত ঘাড়ে নিদেন পক্ষে ১০ টি মাথা থাকতে হবে। তবে, সমস্যা মোটেও আযান নিয়ে নয়, বিপদ ঘটলো আযানের দোয়া যখন বাংলায় তরজমা করা হল আর দৈনিক ৫ বার আমাদের কর্ণ কুহরে ঢালা হল। ভাই আরবিতে তো ভালই ছিল, এতে নবির চাচার গুষ্টি উদ্ধার করা হচ্ছে না প্রেমিকার নিতম্বের প্রশংসা করা হচ্ছে কেও বুঝত না। স্বর্গীয় গুরু গম্ভীর কাঁপা কাঁপা গলায় ভেসে আসলো এক অমোঘ বানীঃ

আল্লাহুম্মা রাব্বাহাযিহিদ দাওয়াতিত্তাম্মাহ ওয়া সালাতি ক্বায়িমা, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা অয়াল ফাদিলা ওয়াদ্দারাজাতার রাফিয়াহ, ওয়াব আসহু মাক্কামাম্মাহমুদানিল্লাযি ওয়া আত্তাহ, ইন্নাকা লা তুখলিফুল মিয়াদ

বাংলা তরযমাঃ

“হে আল্লাহ! এই পরিপূর্ণ আহ্বান ও  শাশ্বত  নামাযের তুমিই প্রভু ! হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে দান কর বেহেস্তের সর্ব উচ্চ সন্মানিত স্থান এবং এবং সুমহান মর্যাদা। আর তাঁকে অধি ষ্টিত  কর শ্রেষ্ঠ তম প্রশংসিত স্থানে  যার প্রতিশ্রুতি তুমি  তাঁকে দিয়েছ।  আর নিশ্চয় তুমি ভঙ্গ করনা অঙ্গিকার।”

গোল বাঁধল শেষের লাইন এঃ  আর নিশ্চয় তুমি ভঙ্গ করনা অঙ্গিকার।

বুঝলাম নবী মহাম্মাদ (দঃ)  কে দৈনিক ৫ বার করে বহুত পাম পট্টি  মারতে হবে কিন্তু এ কেমন কথা, আল্লাহকে কিনা বলা হচ্ছে যে সে অঙ্গিকার ভঙ্গ করতে পারে! নাউযুবিল্লাহ! সন্দেহ করা হচ্ছে যে সে কিনা কথা নাও রাখতে পারে ? আল্লাহ কি আদম ব্যাপারী যে টাকা খেয়ে ভিসা না দিয়ে অফিস এ তালা ঝুলিয়ে চম্পট দেবে ? ব্যাস আর যায় কই, নিশ্চয়ই বিটিভি র উচ্চ মহলে সরকাররের আমলা, তথ্য মন্ত্রী র ঘন ঘন  ফোন আর  হুমকিতে  এই খৎনা করা বিটিভি র কর্মকর্তাদের প্যান্টের পেছনটা গোধূলি বরন ধারন করেছিল। এবার জুতা আবিষ্কার এর মত আবির্ভূত হল নতুন অনুবাদ। শেষের লাইন টা একটু ঘুরিয়ে পশ্ছাদ দেশ রক্ষা।

নতুন শেষের লাইনঃ নিশ্চয় তুমি প্রতিশ্রুতির বাতিক্রম কর না।

আহা কত চমৎকার , বাংলা ভাষা বলে কথা , আরবিতে কি এটা করা যেত? তবে তখন জোকার নায়ক ছিলনা , থাকলে উটের ডিম বা হাঁসের ডিম দিয়ে চালিয়ে দিত। আগেই বলেছিলাম, ভাই , ধর্মের মন্ত্র অবোধ্য হিং টিং ছট এ সীমাবদ্ধ রাখেন , কি দরকার বাংলায় বুঝতে দেওয়া। তবে নতুন তরজমায় সবাই খুশি, সাপও মরল আর লাঠিও ভাঙল না। হঠাৎ এক দিন ছোট এক বিপত্তি বাধল। নানা প্রাইভেট চ্যানেলে ইস্লামি জিজ্ঞাসা জাতীয় অনুষ্ঠান বেশ জনপ্রিয়। এমনি এক অনুষ্ঠানএ এক বেরসিক দর্শক প্রশ্ন করে বসলো এই নতুন অনুবাদের সত্যতা নিয়ে। উত্তর কারি হযুর অতি পরিচিত বুজুর্গ চেহারার , মেহেন্দি চর্চিত দাঁড়ি মোবারকের অধিকারী , পরে জানলাম উনি ফরিদপুরে বাচ্ছু রাজাকার নামে সুপরিচিত আর বিভিন্ন অপকর্মের হোতা। শুনা যায় উনি পাক ভুমিতে হিজরতে আছেন। সেটা , যাই হোক, উনি যথারতই বলে দিলেন , আর নিশ্চয় তুমি ভঙ্গ করনা অঙ্গিকার টাই সঠিক অনুবাদ।  শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চয় তুমি প্রতিশ্রুতির বাতিক্রম কর না দিয়েই চলছে। তবে, সুন্নতে খৎনা করার পর থেকে বিটিভি সাবালক হয়েছে , “মিথ্যা বলনা, ওজনে কম দিয় না”  জাতীয় বাবুরাম সাপুড়ের নির্বিষ সাপের মত দু চারটি হাদীস- কোরানের বাংলা তরযমা দেওয়া ছাড়া কোরানের গর্দান মারা বা দাসী সম্ভোগ করার মত গরম আয়াতের বাংলা কস্মিন কালেও আপনারা বিটিভি তে দেখবেন না।

আমার লেখার এখানেই সমাপ্তি। তবে, পাদটীকায় , দু চারটি কথা বলি। আল্লাহর এই অঙ্গিকার ভঙ্গের আয়াত অন্যান্য ইস্লামি সৈনিক দের মধ্যেও মাথা ব্যাথার কারন হয়ে দাড়ায়।  এবার , এই শেষ লাইন কে বাদ দিয়ে হাদীস খোঁজা শুরু হল, পাওয়াও গেল গোটা কয়েক। তবে, এসব তেনা বাজির ক্ষেত্রে আমি শরানপন্ন হই সৌদির প্রয়াত প্রধান মুফতি ইবনে বাজ এর ফতওয়াতে, কারন, কোন সুন্নি মওলানা বা সৌদির টাকায় চলা দেশী মোল্লাদের সাধ্য নেই ইবনে বাজ এর ফতওয়া অস্বীকার করে। বায়হাকির হাদীস এ এই অঙ্গিকার ভঙ্গের আয়াতএর সত্যতা মিলল, নিচে দেওয়া তথ্য সুত্র দেখুন। শেষ করছি আযানের একটি সহি হাদীস দিয়ে , যেখানে বলা আছে আযান শুনে শয়তান পাদ দিতে দিতে পলায়ন করে, যদিও, পাদ দেওয়ার ব্যাপারটা “হাওয়া ছেড়ে পলায়ণ”  করে বলা হয়েছে, তবে আমি নিশ্চিত মুমিন, অ মুমিন সকলেই নাক চেপে হলেও শয়তানের পাদ দেওয়াটাই পছন্দ করবেন। তবে আযনের শব্দ প্রচুর শুনেছি, অপেক্ষায় আছি শয়তানের পাদের বজ্রধ্বনি শোনার।

 

তথ্যসূত্রঃ

১ পাদ দেওয়ার হাদীস

আবদুল্লাহ ইবন ইউসুফ (র.) _ _ _ আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ যখন সালাতের জন্য আযান দেওয়া হয়, তখন শয়তান হাওয়া ছেড়ে পলায়ণ করে, যাতে সে আযানের শব্দ না শোনে। যখন আযান শেষ হয়ে যায়, তখন যে আবার ফিরে আসে। আবার যখন সালাতের জন্য ইকামত বলা হয়, তখন আবার দূরে সরে যায়। ইকামত শেষ হলে সে পুনরায় ফিরে এসে লোকের মনে কুমন্ত্রণা দেয় এবং বলে এটা স্মরণ কর, ওটা স্মরণ কর, বিস্মৃত বিষয়গুলো সে স্মরণ করিয়ে দেয়। এভাবে লোকটি এমন পর্যায়ে পৌছে যে, সে কয় রাকাআত সালাত আদায় করেছে তা মনে করতে পারে না। [সহীহ বুখারী শরীফ -ইসলামিক ফাউন্ডেশন : ৫৮১, তাওহীদ পাবলিকেশন : ৬০৮]

আযানের দোয়ার তথ্যসূত্র

Dua After Azan

Simlarly, once the call to prayer is pronounced, one must immediately make this Dua after Adhan:

اللّهُـمَّ رَبَّ هَذِهِ الدّعْـوَةِ التّـامَّة وَالصّلاةِ القَـائِمَة آتِ محَـمَّداً الوَسيـلةَ وَالْفَضـيلَة وَابْعَـثْه مَقـامـاً مَحـموداً الَّذي وَعَـدْتَه إِنَّـكَ لا تُـخْلِفُ الميـعاد.

Allaahumma Rabba haathihid-da ‘watit-taammati wassalaatil-qaa’imati, ‘aati Muhammadanil-waseelata walfadheelata, wab ‘ath-hu maqaamam-mahmoodanil-lathee wa’adtahu, [‘innaka laa tukhliful-mee’aad]

After replying to the call of Mu’aththin. you should recite in Arabic Allah’s blessings on the Prophet.

O Allah , Lord of this perfect call and established prayer. Grant Muhammad the intercession and favor, and raise him to the honored station You have promised him, [verily You do not neglect promises].

Reference:
Al-Bukhari 1/152, and the addition between brackets is from Al-Bayhaqi 1/410 with a good (Hasan) chain of narration. See ‘Abdul-Azlz bin Baz’s Tuhfatul-‘Akhyar, pg. 38.

আযানের দোয়া নিয়ে ভিন্ন মত

আযানের দোয়া : নবীজির অপমান

৪ কাজী নজরুল ই ধর্ম বুজেনা,রবি ঠাকুর কিভাবে ধর্ম বুজবে?-শাইখ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ।

এই বিষয়ে হযুরের হয়ত আরও ভিডিও রয়েছে, আর  অঙ্গ ভঙ্গি করা ভিডিওটি খুজে পেলাম না, তবে যারা উনার ভিডিও দেখে থাকে সকলেই এই ভঙ্গিটির সাথে পরিচিত।

Facebook Comments

shubochon

A free thinking human being and humanist

Leave a Reply

%d bloggers like this: