ফাইন টিউনিং মহাবিশ্ব এবং ঈশ্বর বিভ্রম

যদি আপনি সুপরিকল্পিত মহাবিশ্ব যুক্তির সাথে পরিচিত না হন তবে এটি এরকম :

মহাবিশ্ব পরিচালনার জন্য কিছু মৌলিক ধ্রুবক ও রাশি প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা একটি বিস্ময়কর উপলব্ধিতে এসেছেন যে এসব ধ্রুবক সংখ্যাসমূহ অনেক সাবধানে একটি অত্যাশ্চর্য সুনির্দিষ্ট মানে পরিকল্পনা করা যা অত্যন্ত সংকীর্ণ প্রানের অস্তিত্বের অনুমতি সীমার মধ্যে পড়ে। এই ধ্রুবকসমূহের যদি কোন একটি এমনকি চুল পরিমাণও পরিবর্তিত হয়, কোন ধরনের জীবনই কোথাও বিদ্যমান থাকতে পারবে না।

যদি পৃথিবী সূর্যের মাত্র ৫% কাছাকাছি হত, তবে এটির ভাগ্য শুক্র গ্রহের মত হত যাতে একটি প্রায় ৯০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রার গ্রীনহাউস প্রতিক্রিয়া বর্তমান। বিপরীতভাবে, যদি পৃথিবী সূর্য থেকে ২০ শতাংশ দূরে থাকত তাহলে, কার্বন ডাই অক্সাইড পৃথিবীর উপরের বায়ুস্তরে গঠিত হত, যা মঙ্গলগ্রহের মত একটি বরফ এবং ঠান্ডা চক্রের সূচনা করত।

৫% এবং ২০% শুনতে বেশি মনে হয় না, কিন্তু সেই জায়গাটি ৩৭,৩৯৯,০০০ কিলোমিটার চওড়া। এছাড়া পৃথিবীর কক্ষপথ একটি নিখুঁত বৃত্তও নয়, উপবৃত্তাকার। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব এমনিতেও সবসময় স্থির নয়। মহাবিশ্বে ১০০ বিলিয়ন ছায়াপথে ১০০ বিলিয়নেরও বেশি নক্ষত্র রয়েছে যাদের সৌরজগতে রয়েছে একাধিক গ্রহ। আমাদের সৌরজগতে কমপক্ষে ৮টি গ্রহ (সরি প্লুটো!) রয়েছে। এটি বিস্ময়কর নয় কি, যে কেবল মাত্র কিছু বছর হল আমরা টেলিস্কোপ ব্যবহার করতে শিখেছি এবং তারমধ্যেই আমরা তাদের চিহ্নিত করতে এবং হাজার হাজার সৌরজগত বহির্ভূত গ্রহও আবিষ্কার করতে পেরেছি? আমাদের গ্যালাক্সিতেই প্রায় ৪০ বিলিয়ন গ্রহ রয়েছে যেসব গ্রহ একটি নক্ষত্রের হ্যাবিটেবল জোনের কাছাকাছি অবস্থান দিয়ে পরিভ্রমণ করে।

মহাবিশ্বের বেশিরভাগ জায়গা হচ্ছে বিপদজনক ভ্যাকুয়াম যা কিনা হয় লাভার ন্যায় গরম নাহয় বরফ ঠান্ডা এবং এতে নিঃশ্বাস নেবার মত কোন বায়ুই নেই তাই আমরা এতে সেকেন্ডের মধ্যে মারা যাবো। প্রকৃতপক্ষে, মহাবিশ্বের 99.999 শতাংশ জায়গা মানুষের জীবনের জন্য উপযুক্ত নয় এবং এ সংকীর্ণ কোণটিতে আমাদের বিবর্তিত হয়ে জায়গা গড়ে তুলতে কোটি কোটি বছর সময় লেগেছিল।

তাই বলা যায় যে, মহাবিশ্ব মানব জীবনের জন্য সুপরিকল্পিত বলাটা যেন, সিডনি অপেরা হাউসে ৫ মিনিট আগে একটি মহিলার পকেট থেকে পরা চীজের টুকরার উপর ক্রমশ জন্মানো ছত্রাকের জন্য অপেরা হাউসটিকে সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি বলা।

মানুষের জীবনের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে নির্মিত একটি মহাবিশ্ব কি রকম হতে পারে সেটার একটা ধারনা দেই। যেমন, প্রতিটি নক্ষত্র একাধিক বাসযোগ্য গ্রহের সাথে পরিবেষ্টিত হবে নিখুঁত সামঞ্জস্যতা রেখে। আর এসব গ্রহে ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরি সৃষ্টিকারী টেকটনিক প্লেট থাকবে না। কোন বিপজ্জনক আবহাওয়ার অস্তিত্ব থাকবে না, আমরা অতিবেগুনী রশ্মি তে সংবেদনশীল হব না, যদি আমরা আদৌ থাকি। জলভাগ থেকে স্থলভাগের অনুপাত বেশি হত এবং জলভাগের একটি বৃহত্তর অংশ পানযোগ্য হত। জীবনের শর্ত এত সংকীর্ণ হত না। আমরা বোধহয় মহাকাশেও বেঁচে থাকতে সক্ষম হতাম এবং সহজেই এতে পরিভ্রমণ করতে পারতাম। আর এরকম মহাবিশ্ব এখনকার পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী কাজ করতে সক্ষম নাও হতে পারত। কিন্তু সে দরকার হত না, কারণ তখন মহাবিশ্ব ঈশ্বর দ্বারাই পরিচালিত হত। আমাদের মহাবিশ্ব সবসময় যে বৈজ্ঞানিক ধ্রুবকসমূহের প্রতিপালন করে এবং সেসব দ্বারা খুব ভালভাবে পরিচালনা করে সেটাই আসলে প্রমাণ করে যে ঈশ্বর একটি বাহুল্যমাত্র।

আমরা একটি ক্ষুদ্র শিলাপিন্ডে বসবাস করি, যা একটি বিশাল অগ্নিকুন্ডকে ঘিরে মহাবিশ্বের শূন্যতায় প্রাণপণে ছুটছে। আমাদের গ্রহটি প্রতিনিয়ত উল্কা এবং গ্রহাণু দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় দ্বারা আবদ্ধ হয়ে আছে। আমাদের আলো এবং শক্তির প্রাথমিক উৎস আমাদের ক্যান্সার দেয়। কেবল একজন বোকা লোকই বলবেন এ গ্রহটি নিখুঁতভাবে ডিজাইন করা। কেবলমাত্র একজন অন্ধ পাগল মানুষই জীবনের জন্য একে সুপরিকল্পিতভাবে নির্মিত বলবে, অথচ আমাদের চারপাশের সবকিছু আমাদেরকে মুছে ফুলতে তৎপর।

মহাবিশ্ব জীবনের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে নির্মিত নয়, তবে জীবনের জন্য প্যারামিটার আমরা যতোটা সংকীর্ণ মনে করি ততটাও নয়। উনিশ শতকে, ভাবা হত যে, মানুষ প্রতি ঘন্টায় পঞ্চাশ মাইলের বেশি গতিতে বেঁচে থাকতে পারবে না। এ ধারণাটি কতটুকু হাস্যকর তা প্রদর্শন করতে অ্যাপোলো ইলেভেনের মহাকাশচারীদের ঘণ্টায় ২৪৭৯০ মাইল ভ্রমণের উদাহরণ দেয়া যায়।

আস্তিকরা মনে করেন, জীবনের অস্তিত্বের জানালাটি অনেক ছোট। আসুন টারটিগ্রেডের দিকে তাকাই, এ ছোট্ট প্রাণীটি -৩২৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট (-২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং উচ্চ তাপ ৩০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (১৪৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রায়ও বেঁচে থাকতে পারে।

তেজস্ক্রিয়তা? কোন সমস্যা নেই! তারা মানুষের জন্য প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তার ১০০০ গুণ বেশিও নিতে পারে, এবং আমাদের বায়ুমন্ডলের তুলনায় ৬০০০ গুণ বেশি চাপে থাকতে পারে।

এমনকি, আমরা এমন ব্যাকটেরিয়াও খুঁজে পেয়েছি যা মহাশূন্যেও বেঁচে থাকতে পারে। আসলে, আমরা জানি না জীবনের পরিসর কতোটা সীমিত। হ্যাঁ, আমরা এ গ্রহে অভিযোজিত হয়ে গেছি, তবে অন্যান্য পরিস্থিতিতে জীবের অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ আমরা যা ভাবি তার চেয়েও বৃহদাকার হতে পারে।

যদি আমরা কোনো উষ্ণতর গ্রহে জন্মাতাম তাহলে আমরা সম্ভবত থার্মোফাইল থেকে বিকশিত হতাম এবং হয়ত ভালো কুলিং মেকানিজম থাকত অথবা, আমাদের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম তাপে বিকশিত হত। তাহলে কি আপনি বলবেন, ঐ গ্রহটিও জীবনের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে নির্মিত?

তাহলে মহাবিশ্বের ধ্রুবকসমূহের কি হবে?

মাধ্যাকর্ষণ শক্তি মহাকর্ষীয় ধ্রুবক দ্বারা নির্ধারিত হয়। যদি এ ধ্রুবক ১০^৬০ ভাগের ১ ভাগেরও কম বেশি হয় তবে আমাদের কারোরই অস্তিত্ব থাকত না।

এটি খুবি অদ্ভুত লাগে, তবে এখানে একজন সত্যিকার পদার্থবিদ এ ব্যাপারে কি বলেছেন দেখা যাক :

পদার্থবিজ্ঞানী শন ক্যারল বলেন,

পদার্থবিজ্ঞানে একটি বিখ্যাত উদাহরণ আছে, যা ধার্মিকরা এমনকি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে যারা এ ব্যাপারে যথেষ্ঠ ভাবেননি তারাও দিতে চান যে, প্রাথমিক মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ হার ১০^৬০ ভাগের ১ ভাগ পর্যন্ত সমন্বয় করা আছে। যা একটি সাদাসিধে অনুমান যা আপনি খামের পিছনে পেন্সিল ও রাবার নিয়ে হিসাব করেন। তবে এখানে, আপনি আরও ভাল করতে পারেন। আপনি সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণসমূহে যেতে পারেন, এতে একটি সঠিক সম্ভাব্যতার কঠোর ডেরিভেশন পাবেন এবং যখন আপনি সঠিক সমীকরণ ব্যবহার করে একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবেন, আপনি দেখতে পাবেন যে আসলে সম্ভাবনাটা হল এক, শূন্য বাদে সমস্ত কিছুর একটি সেট। মহাবিশ্বের একটি সঠিক সম্প্রসারণ হার আছে যা একটি দীর্ঘ সময় পর প্রাণের অস্তিত্ব থাকার মত পরিবেশে আসে।

অথবা অন্য আরেকটি,

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ হার বিবেচনা করুন। এটি মহাজাগতিক ধ্রুবক দ্বারা পরিচালিত হয়। এ ধ্রুবকের ১০^১২০ ভাগের ১ ভাগও যদি পরিবর্তন হত তাহলে মহাবিশ্ব খুব দ্রুত বা খুব ধীরে ধীরে প্রসারিত হত। উভয় ক্ষেত্রে, মহাবিশ্বতে প্রাণ বলে কিছুই থাকত না।

এ বিষয়ে প্রফেসর লরেন্স ক্রাউস বলেন,

প্রকৃতির সবচেয়ে সুপরিকল্পিতার সমস্যা যা আমি প্রথমেই প্রস্তাব করেছিলাম, তা হল মহাজাগতিক ধ্রুবক সমস্যা (মহাবিশ্বের ডার্ক এনার্জি), যা মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য, যা দেখলে অবিশ্বাস্য সুপরিকল্পিতভাবে নির্মিত মনে হয়!! ১২০ টি ঘাতের এর ১ ভাগ কমবেশি, যা হচ্ছে  প্রকৃতির সবচেয়ে খারাপ সুপরিকল্পনা সমস্যা…। ডঃ ক্রেগ এই বলে লাফিয়ে উঠবেন যে, ‘দেখুন, যদি এটা আরেকটু বড় হত, তাহলে হয়ত আমরা থাকতাম না।’ কিন্তু সত্যিকার অর্থে, যদি এই ধ্রুবকের মান শূন্য হত যা আরও সুন্দর একটা প্রাকৃতিক সংখ্যা তাহলে আমরা দেখতে পাই আরও জীব অস্তিত্বলাভ করত।

আচ্ছা, ইলেকট্রোউইক বল এর কি হবে? দেখা যায় যে, এটি সুপরিকল্পিত মনে হলেও এটিই একমাত্র মান যা আমরা পরিবর্তন করতে পারি।

এদিকে ড. হার্নাক এবং তার সহকর্মীরা একযোগে অন্যান্য প্যারামিটারগুলোও একসাথে পরিবর্তন করে একটি পুরোপুরি টেকসই মহাবিশ্ব প্রদর্শন করেছেন, এমনকি উইক ফোর্সের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতেও।
অন্যদিকে, যদি আপনি সম্ভাব্যতা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে এটা অনুমান করারও কোন কারণ নেই যে মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে প্রসারিত ও সংকুচিত হচ্ছে না। কিংবা আমাদের মহাবিশ্ব যে অনেকের মধ্যে একটা নয়।

পদার্থবিজ্ঞানী লি স্মোলিনের মহাজাগতিক প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বটি বলে যে কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্ব পুনরুৎপাদন উপায় হতে পারে, যাদের প্রতিটি সামান্য ভিন্ন পদার্থবিজ্ঞানের ধ্রুবক ধারণ করে।

যদি এমন হয় এবং অসীম সংখ্যক মহাবিশ্ব থাকে, তাহলে এমনকি ধার্মিকদের জড় বস্তু থেকে সহসা প্রাণ সৃষ্টির অসম্ভবতার ধারনা সত্য হলেও, এটির সম্ভাবনার কথা অপ্রাসঙ্গিক হবে। যদি প্রাণ সৃষ্টির সম্ভাবনা সত্যিই “এক ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়নের ভাগের এক ভাগ” হয় তাহলে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ধ্রুবকসহ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মহাবিশ্বতে আমাদের অস্তিত্ব একটি পরিসংখ্যানগত প্রয়োজনীয়তা হবে মাত্র। এতে আমাদের মহাবিশ্ব জীবনের জন্য সুবিন্যস্ত না হয়ে কৃষ্ণগহ্বর গঠনের জন্য সূক্ষ্মভাবে সুবিন্যস্ত হবে। কৃষ্ণগহ্বরের সংখ্যাধিক্য সেদিকেই নির্দেশ করে। যেসব মহাবিশ্ব কৃষ্ণগহ্বর তৈরি করে না সেসব ধ্বংস হয়ে যায় আর যেসব করে সেসবই রয়ে যায়। মহাবিশ্বের এসকল পদার্থ থেকে মানুষের উদ্ভব শুধুমাত্র একটি পার্শপ্রতিক্রিয়া বলা যায়।

আমরা সত্যিকার অর্থে, ছন্নছাড়া মহাবিশ্বের শূন্য তিমিরে অসম্ভব রকমের ছোট্ট একটা জায়গায় বসবাস করি। তাই অহংকারীদের মত রাতের অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে, “এই সব আমাদের জন্য তৈরি” অনুমান করা হবে মহাবোকামি।

চরম অবস্থার মধ্যে দিয়ে করে মানুষ এবং তার প্রাচীন অমানব পূর্বপুরুষ অভিযোজিত হয়েছে এ গ্রহটি ধীরে ধীরে শীতল হবার সাথে সাথে। আমাদের মধ্যে যারা পুনরুৎপাদন করার সময় পর্যন্ত টিকতে পারেনি তারা হারিয়ে গেছে। আমরা এখানে বেঁচে থাকার জন্য বিবর্তিত হয়েছি। আমরা এ গ্রহে নিজেদেরকে সুপরিকল্পিতভাবে সাজাচ্ছি, উল্টোটা নয়। আমরা যেখানে পৌঁছেছি সেখানে আসতে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। আর এটি জীবনকে উপভোগ করার এবং ধ্বংস না করার একটি কারণ হোক। অথবা, আমাদের একমাত্র বাসস্থান পৃথিবীকে বসবাস অযোগ্য না করারও একটি কারণ হোক।

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: