সত্যিকারের ডাইনিদের গল্প

লিখেছেন: সরকার আশেক মাহমুদ

আমরা হয়ত কখনো কখনো আমাদের নিজেদের ভুল বা সাফল্য থেকে কিছু শিখি। কিন্তু সবকিছু ভুল বা সাফল্য থেকে শেখা সম্ভব নয়। কারণ আমাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী। প্রাণী হিসেবে আমদের বিশেষত্ব হয়তো এটাই যে, বিবর্তনের ক্রমধারায় আমাদের ভাষা সৃষ্টি হয়েছে, এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, অর্জন, ব্যর্থতা অন্য প্রজন্মের মানুষ এই ভাষার কারণেই শিখতে পারছে। এক অঞ্চলের মানুষও অন্য অঞ্চল থেকে শিখতে পারছে। বানর বা গরিলা সমাজে হয়তো তা সম্ভব নয়। আর তাই হয়ত আমরা বিদ্যালয়ে যাই। মানুষের গায়ের রং, ধর্ম, ভাষা যেমনই হোক না কেন, পৃথিবীর এক প্রান্তে আবিষ্কৃত ওষুধ পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের রোগ নিরাময়ে কাজ করে। মানব সভ্যতার বিবর্তনেও পৃথিবীর অন্য সমাজের ভুল বা সাফল্য এবং সভ্যতার অগ্রগতির ধারা যদি আমরা জানতে পারি, মানুষকে জানাতে পারি, হয়তো আমাদের নিজেদের বর্তমান এবং ভবিষ্যতে ভুলের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি।

ছোটবেলার রূপকথার বইতে জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া ভাই-বোনদের ডাইনি বুড়ির খপ্পরে পড়ার কাহিনী আপনারা সবাই হয়ত পড়েছেন। অথবা শুনেছেন হয়ত, ঝাড়ুতে ভর করে কীভাবে কীভাবে জাদুকরী উড়ে যেতে পারে আকাশে। আধুনিক রূপকথার হ্যারি পটারের কাহিনীতেও আমরা জাদুর বলে ঝাড়ুতে ভর করে উড়ে যাবার দৃশ্য দেখতে পেয়েছি। এই গল্পগুলো আমাদের জন্য যতই বিনোদনদায়ক হোক না কেন, এই জাতীয় গল্পের ঐতিহাসিক উৎসস্থলে ফিরে গেলে আমাদের নৃশংসতা আর বর্বরতা দেখে আঁতকে উঠতে হবে। মানুষের অজ্ঞতার যুগে ধর্মান্ধতার বাড়াবাড়ি পশ্চিমা বিশ্বের মানুষকেও কীভাবে ভয়ানক বর্বরতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তা থেকে উঠে আসা পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে তুলনা করতে গেলে যা কিনা অভাবনীয় মনে হবে। সেই সাথে আমাদের ভাবতে সাহায্য করে – আমাদের অজ্ঞতা, অন্ধবিশ্বাস এবং অযৌক্তিক ভীতি কীভাবে আমাদের ঠেলে দিতে পারে সহিংসতার দিকে।

ডাইনি গল্প – এক: স্কটল্যান্ড
১৭১৮ সালে উত্তর পূর্ব স্কটল্যান্ডের Caithness উইলিয়াম মন্টগোমরী (William Montgomery) নামক কাঠমিস্ত্রী ছিল, যে কিনা বেড়ালদের ভীষণ রকম অপছন্দ করতো। একদিন সে দেখতে পেল, কিছু বেড়াল তার বাড়ির পেছনের উঠোনে আনাগোনা করছে যা কিনা তার জন্য খুবই বিরক্তির উদ্রেক করছিল। একসময় সে ধরে নিল, এই বেড়ালগুলো আসলে বেড়াল নয়, বেড়ালবেশী ডাইনি। উল্লেখ্য যে, ইসলাম ধর্মে যেমন কুকুরকে ঘৃণা করার যথেষ্ট বন্দোবস্ত আছে, তেমন খ্রিষ্টান ধর্মে আছে/ছিল বেড়ালকে ঘৃণা করার যথেষ্ট মালমসলা। যাই হোক, এই ভদ্রলোক যা সন্দেহ করেছে, তার সাথে তাল মেলাল তার বাড়ির কাজের মেয়ে। সে বলল যে, সে শুনতে পেয়েছে যে বেড়ালগুলো মানুষের ভাষায় একে অন্যের সাথে কথা বলছে। তাই উইলিয়াম তার সন্দেহ সত্যি হয়েছে বলে ধরে নিল। আর তাই পরদিন বেড়ালবেশী কুচক্রী ডাইনিদের আক্রমণ করার জন্য তৈরি হয়ে গেল। একটা কুঠার, একটা ছোরা ও একটা ধারালো তরবারি নিয়ে বীর বেশে বিড়ালদের ওপরে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ল। একটা বেড়ালের পিঠে আঘাত লাগলো, আরেকটার পেছনদিকে আর তৃতীয়টার পায়ে লেগে পা খোঁড়া হয়ে গেল। কিন্তু সবগুলো পালিয়ে গেল। একটা বেড়ালকেও আটকাতে পারলো না।

কিছুদিন পরে গ্র্রামের দুই বৃদ্ধা মারা গেল এবং শোনা গেল যে, ঐ তাদের মৃত দেহ যখন চেক করা হল দেখা গেল একজনের পিঠে এবং অন্যজনের নিতম্বে সাম্প্রতিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আর গ্রামের মানুষেরা ধরে নিল, এই দুইজন বেড়ালবেশি ডাইনি ছিল। আর তাই অতি সতর্ক গ্রামবাসী তৃতীয় ডাইনী বুড়ি খোঁজার জন্য বেরিয়ে পড়ল, যার পায়ে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যাবে। কিছু সময়ের মধ্যে তারা ন্যান্সি গিলবার্ট (Nancy Gilbert) নামের এক সত্তর বছর বয়স্কা বৃদ্ধার সন্ধান পেল, যার পা ভাঙা। বয়সের ভারে বৃদ্ধার চেহারা যথেষ্ট বিচ্ছিরি হয়েছিল, যা তাকে ডাইনি হিসাবে সন্দেহ করতে সাহায্য করল, যে কিনা কাঠুরের আঘাত পেয়ে পালিয়ে এসেছে। ন্যান্সিকে তৎক্ষনাৎ বিছানা থেকে টেনে নিয়ে জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হলো।

এখানে বলে রাখা উচিত, কেউ ডাইনি হিসেবে অভিযুক্ত হলে তাকে শাস্তি দেবার আগে স্বীকারোক্তি আদায় করার ব্যাপারে তত্কালীন খ্রিষ্টানরা যে-নিয়মতান্ত্রিক বীভৎস রকমের অত্যাচার বা নির্যাতন করার প্রক্রিয়া ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়। যদিও ওই অত্যাচার শুরু করার আগে ন্যান্সি সবাইকে বলেছিল যে, কীভাবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তার পা ভেঙেছিল । কিন্তু বলা বাহুল্য, বিচারকদের কাছে স্বাভাবিক যৌক্তিক কথা গ্রহণযোগ্য হলো না। তারপর উপর্যুপরি নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে স্বীকার করতে বাধ্য করানো হলো যে, সে ডাইনি এবং তার পা ঐদিন উইলিয়াম মন্টগোমরী আঘাতে ভেঙে গিয়েছিল এবং সাম্প্রতিক মৃত দুই বৃদ্ধাও তার সহযোগী ডাইনি ছিল। যা হোক, উপর্যুপরি নির্যাতনের কারণে বৃদ্ধা কয়েদখানায় পরদিন মারা গেল।

প্রায় তিন চারশত বছর ধরে ডাইনি বা জাদুকর সন্দেহে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের এভাবেই অত্যাচারের মাধ্যমে অভিযোগ স্বীকার করতে বাধ্য করানো হয়েছিল। তবে কোনো স্বীকারোক্তিই গ্রহণযোগ্য হতো না, যতক্ষণ না অভিযুক্ত ব্যক্তি অন্য কে কে তার সাথে ডাইনিগিরি করার কাজে সহযোগিতা করে, তাদের নাম না বলতো। তারপর ধরে আনা হতো অন্যদের পালাক্রমে। যদিও ডাইনি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা কেউ কেউ অনেক বেশি মনে করে। রক্ষণশীল অনুমানে আমরা বলতে পারি প্রায় ৪০০০০ থেকে ৫০০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল তিনশ বছর ধরে । আর কোনো কোনো অনুমানে মনে করা, দুই থেকে পাঁচ লক্ষ মানুষ। একটা বইয়ের উৎস দেখিয়ে উইকিপিডিয়াতে একটা হিসাবের পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের অনেককে খুঁটিতে বেঁধে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেয়া হতো। তাছাড়াও ছিল আরো অনেক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পন্থা, যা উল্লেখ করে আপনার পড়ার রুচি নষ্ট করতে চাচ্ছি না।

ডাইনি গল্প দুই: জার্মানী
কোনো ডাইনিকে বাঁচতে দিয়ো না। (বাইবেল, যাত্রাপুস্তক ২২:১৮)
১৫৯৫ সালে এক বৃদ্ধা বাস করতেন কন্সট্যান্স (জার্মান উচ্চারণে – কন্সটাঞ্জ) নামক গ্রামের পাশে। গ্রামের আনন্দ-উৎসবে তাঁকে আমন্ত্রণ না করার কারণে তিনি বিড়বিড় করে ক্ষোভ প্রকাশ করতে করতে পাহাড়ের উপর দিয়ে সে সবার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন। কিন্তু দুই ঘন্টা পর দেখা গেল ভয়ংকর বজ্র-বৃষ্টি ওখানে আঘাত হানল, যা কিনা নৃত্যশিল্পীদের ভিজিয়ে দিল এবং এলাকার ফসলের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করলো। আর তাই গ্রামবাসী বৃদ্ধার বিরুদ্ধে ডাইনি হিসাবে জাদু করার অভিযোগ – সে একটা গর্তে মদ ঢেলে তাতে কাঠি দিয়ে ঘুটা দিতে দিতে ঝড় সৃষ্টি করেছে । আর তাই তাকে ধরে এনে উপর্যপুরি নির্যাতন করা হলো যতক্ষণ না সে স্বীকার করে যে সে ডাইনি এবং সে ঝড় সৃষ্টি করেছে। এবং বলা বাহুল্য, পরদিন তাকে জীবন্ত আগুনে জ্বালিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো।
এখানে বিশ্লেষণ করা দরকার, কী ঘটেছিল?

বহুকাল ধরে মানবসমাজে ঝড়, বৃষ্টি, রোগ-বালাইয়ের কোনো বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা মানুষের ছিল না। আবহাওয়ার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কীভাবে চলে কিংবা মানুষের স্বাভাবিক চোখে অদৃশ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু যে মানুষের রোগের জন্য দায়ী, তা জানা ছিল না, আর তাই রোগ-বালাইয়ের কারণ উদ্ধার করতে পারতো না। তাই তারা সব অমঙ্গলের জন্য ধর্মীয় কুসংস্কারভিত্তিক ব্যাখ্যা খুঁজতো। কারো ফসল নষ্ট হয়ে গেল কিংবা গবাদি পশু মারা গেল সে তার প্রতিবেশী বৃদ্ধার বিরুদ্ধে হয়তো ডাইনি হয়ে জাদু করার অভিযোগ আনতো। বৃদ্ধা ডাইনিদের সম্পর্কে মনে করা হতো যে,
১. তারা শয়তানের সাথে সখ্যতা করে, যৌনসম্পর্ক করে,
২. রাতের বেলা ঝাড়ুতে ভর করে উড়ে বেড়ায়,
৩. মানুষের মাংস খায় এবং
৪. শরীরের আকৃতি পরিবর্তন করে বেড়াল, খরগোসে পরিণত হতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি রোগ-বালাইয়ের কারণ হিসেবে জীবাণুর ভুমিকা আবিষ্কৃত হয়েছিল। তার আগ পর্যন্ত মানুষ নিজেদের বা গবাদিপশুর রোগ-বালাই এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে উপস্থিত বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা না থাকার কারণে অতিপ্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতো। আমাদের অঞ্চলে হয়ত যেটাকে জ্বীন-ভুত-জাদুটোনা বলা হত, সেটাকে ওরা বলতো শয়তান (devil) বা কালো জাদুর (Black Magic) প্রভাব।

থুরথুরে বৃদ্ধাকে ধরে এনে তাঁর বিরুদ্ধে শক্তিশালী মানুষকে হত্যা করার অভিযোগ কিংবা ঘোড়াকে ঘাড় মটকিয়ে হত্যা করার অভিযোগ স্বীকার করানো হত নির্যাতনের সাথে জেরার মাধ্যমে। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হল, খুব কম মানুষই এই ধরনের অভিযোগ যে মিথ্যা হতে পারে তা সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পেরেছে। এই অত্যাচার চালিয়ে যাওয়া হযেছে স্রেফ ধর্মান্ধতার যুক্তি মাথায় রেখে যে, শয়তান তার যন্ত্রণাকে অনুভূতিশূন্য করে দিয়েছে, যদিও সবাই রেহাই পেতে দোয়া ভিক্ষা করেছে, তাতে কাজ হয়নি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুরুষ এবং নারীদের অভিযুক্ত করে হয়েছে কখনো শুধুমাত্র এই খোঁড়া যুক্তি দিয়ে যে, তারা দেখতে বিচ্ছিরি, বৃদ্ধ, বিধবা কিংবা মানসিক রোগী এবং তাদের ধরে এনে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছে ঈশ্বরের নামে।
একটা বিষয় রহস্যজনক মনে হতে পারে: যীশুখ্রিষ্টের ভালবাসার কথা বলা ধর্ম যেখানে এক গালে থাপ্পড় খেলে অন্য গাল পেতে দেবার উপদেশ দেয়, কীভাবে সেই ধর্মের নাম করে এরকম অত্যাচার এবং বর্বরতা চলতে থাকলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। আসলে এটা মোটেও রহস্যময় নয়। অন্যসব ধর্মগ্রন্থের মত বাইবেলও অজস্র পরস্পর অসঙ্গতিপূর্ণ প্রলাপে পরিপূর্ণ। যার কারনে অন্যান্য ধর্মের মতই যে যার ইচ্ছা হাসিল করার জন্য নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ধর্মচর্চা করে যেতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ বিষয়টা হল অন্ধ বিশ্বাস। কোনো একটা মতাদর্শকে অবিসংবাদিত, তর্কাতীত, প্রশ্নাতীত মেনে নিয়ে সমাজের লোকজন যখন নিজের বিবেচনাশক্তি অন্ধবিশ্বাসের কাছে সমর্পণ করে এবং দলগত আনুগত্য মেনে নেয়, তখন এমনটা ঘটতে থাকাই স্বাভাবিক। মানুষকে যদি বিশ্বাস করানো যায় যে, অবিশ্বাসীরা নরকে জ্বলবে অনন্তকাল, বাকিটা বিশ্বাস করানো তেমন কঠিন কিছু নয়। ইনকুইজেসনের (inquisition) নামে নির্যাতনের মাধ্যমে দোষ স্বীকার করানোর গ্রহণযোগ্য হতো না যে পর্যন্ত না তার সাথে এই “পাপে” আর কে কে সঙ্গ দিয়েছে, তাদের নাম প্রকাশ না করে। এই ধরনের নির্যাতনের যৌক্তিকতা পাওয়া গেছে সরাসরি Saint Augustine থেকে “if torture was appropriate for those who broke the laws of men, it was even more fitting for those who broke the laws of God.”

এখানে উল্লেখ্য যে, ইনকুইজিশন-এর নামে জেরার বাহানায় নির্যাতন করার শুরুটা ছিল অত্যন্ত মোলায়েম, কারণ ১২১৫ সালের আগে অফিসিয়ালি নির্যাতন অনুমোদন পায়নি। কিন্তু তার আগে দুটো বিষয় এই ধরনের বিচার-তরিকা তরান্বিত করেছে। ১১৯৯ সালে Pope Innocent III ঘোষণা করেছিল অভিযুক্ত ব্যক্তির (হেরেটিকের) সকল সম্পত্তি গির্জা কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং গির্জা সে সম্পত্তি লোকাল অফিসিয়ালদের এবং অভিযোগকারীর মধ্যে বন্টন করে দেবে। দ্বিতীয়ত, Dominican order.9 Saint Dominic নিজে বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে ভাল ক্যাথলিক হওয়া যাবে:

“For many years I have exhorted you in vain, with gentleness, preaching, praying, weeping. But according to the proverb of my country, ‘where blessing can accomplish nothing, blows may avail.’ We shall rouse against you princes and prelates, who, alas, will arm nations and kingdoms against this land. . . .”

এই ধরনের ডাইনি শিকার মানে এই নয় যে, ঘরে ঘরে নক করে গিয়ে ডাইনি খোঁজা। এটার ধর হলো, কর্তৃপক্ষ লোকজনকে উৎসাহিত করতো তাদের একে অপরকে অভিযুক্ত করতে। তৎকালীন গ্রামবাসীরা এই ধরনের ডাইনি বিচার-প্রক্রিয়াকে একটা চমৎকার অস্ত্র হিসেবে পেল, যার মাধ্যমে কল্পিত কিংবা সত্যিকারের শত্রুকে ঘায়েল করা খুবই সহজ হয়ে গেল এবং কর্তৃপক্ষ তা থামানোর জন্য কোনো চেষ্টাই করেনি।
১৪৮৪ সালে এমনকি একটা গাইড বই প্রকাশ করা হয়, যার মাধ্যমে ডাইনিদের বিচার করার তরিকা বর্ণনা করা হয়েছে। Malleus Maleficarum বা Hammer of Witches নামক বইতে লিখিতভাবে বিস্তারিত নীতিমালা পাওয়া যায় কীভাবে ডাইনীদের শনাক্ত করা হবে এবং বিচার করা হবে। নির্যাতনের বিধানও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। প্রায় দুশো বছর ধরে বাইবেলের পরে এই বইটা ছিল সর্বাধিক বিক্রিত বই।

ডাইনি গল্প তিন: অষ্ট্রিয়া

কোনো ডাইনিকে বাঁচতে দিয়ো না। (বাইবেল, যাত্রাপুস্তক ২২:১৮)
১৬৭৫ সাল থেকে ১৬৯০ সাল ব্যাপী অস্ট্রিয়ার Salzburg-এর একটা ঘটনা। ১৬৭৫ সালে Barbara Kollerin নাম্নী এক মহিলাকে চুরির এবং জাদু করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হল। নির্যাতনের সময় সে স্বীকার করল যে, তার ছেলে Paul Jacob Koller শয়তানের সাথে আঁতাত করেছে এবং তার সঙ্গী এই বিষয়ে স্বীকারোক্তি প্রকাশ করে বর্ণনা করে এবং বলে, জেকব একজন ২০ বছর বয়সের যুবক এবং তার মা তাকে চুরি, ভিক্ষা করা এবং প্রতারণা করা শিখিয়েছে। Barbara Kollerin-কে ১৬৭৫ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং কর্তৃপক্ষ তার ছেলেকে গ্রেফতারের জন্য হুলিয়া জারি করে এবং কালক্রমে এই জেকব Wizard Jackl or Magician Jackl বা Jäckel নামে পরিচিত হয়। (জার্মান – Schinderjackl /”Zaubererjackl”)

১৬৭৭ সালে কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, Magician Jackl মরে গেছে। তবে তারা ১২ বছর বয়সের (Dionysos Feldner) একজন প্রতিবন্ধী ভিক্ষুককে ধরে আনে, যার নাম দেয়া হয় dirty animal এবং দাবি করা হয় যে, তার সাথে তিন সপ্তাহ আগে জাদুকর Jackl এর দেখা হয়েছিল। অত্যাচারের সময় এই শিশু-ভিক্ষুক বলে যে, জাদুকর Jackl বস্তির একদল গরীব ভিক্ষুক শিশু এবং কিশোরদের নেতা। এবং সে তাদের কালো জাদু শিখিয়েছে। এই খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং গরীব গৃহহীন শিশু-কিশোর ভিক্ষুকদের গণগ্রেফতার শুরু হয়। আর এই অসহায় টোকাইদের ওপরে যতো বেশি অত্যাচার করা হয়, জাদুকর Jackl সম্পর্কে তত বেশি গুজব বাড়তে থাকে। বলা হল, এই জাদুকর অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে এবং ইঁদুরদের ওপর জাদু করে কৃষকদের ফসল নষ্ট করে দিতে পারে। এক পর্যায়ে এটাও বলা হল যে, জাদুকর Jackl একজন খুনি এবং সে এত ভয়ানক যে, তাকে গ্রেফতার করা ঠিক হবে না। সে এক সময় শহরের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত জাদুকর হিসেবে প্রচারিত হয়। যদিও এই কাল্পনিক জাদুকর Jackl-কে কখনই গ্রেফতার করা হয়নি, তবে বিপুল সংখ্যক গরীব শিশু-কিশোরদের ধরে আনা হয় এবং তাদের ওপর আগের বছরের খারাপ আবহাওয়ার জন্য দোষারোপ করা হয়।

সর্বমোট ১৩৯ জনকে হত্যা করা হয় জাদুকর Jackl-এর অনুসারী অভিযোগ দিয়ে। তাদের মধ্যে ৩৯ জন শিশু ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী। ৫৩ জন ১৫-২১ বছর বয়সী। ১১৩ জন পুরুষ, বাকিরা নারী। witchcraft বিচারের কলঙ্কজনক ইতিহাসে এটা ছিল অস্বাভাবিক একটি অধ্যায়, কারণ অধিকাংশ ছিল ভুক্তভোগী ছিল পুরুষ। সবচেয়ে কম বয়সের Hannerl ছিল ১০ বছর বয়সী এবং সবচেয়ে বেশি বয়সের ছিল Margarethe Reinberg ৮০ বছর বয়সী।

প্রথমত, তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নির্যাতন করা হয়েছে এবং আগুনে পোড়ানো হয়েছে। কিছু সংখ্যক মানুষকে জীবন্ত জ্বালানো হয়েছে মৃত্যু নিশ্চিত করা পর্যন্ত। কাউকে কাউকে ফাসি দেয়া হয়েছে, কারো কারো গলা কেটে ফেলা হয়েছে। কারো কারো হাত কেটে জ্বলন্ত লোহা দিয়ে পোড়ানো হয়েছে।

জার্মান কবি Friedrich Spee বলেছিলেন “… If all of us have not confessed ourselves witches, that is only because we have not all been tortured.” কিন্তু Spee এই উপসংহারে নিজে নিজে উপনীত হননি। তার এক বন্ধু ছিলেন Duke of Brunswick, যিনি ডাইনি বলে অভিযুক্ত এক নারীকে শৈল্পিক উপায়ে নির্যাতন এবং জেরার ব্যবস্থা করছিলেন তাঁর উপস্থিতিতে। ঐ নারী তখন বলতে শুরু করে যে, সে দেখেছে যে Spee নিজে তাঁর আকৃতি পরিবর্তন করে নেকড়ে, ছাগল এবং অন্যান্য পশুতে পরিবর্তিত হযেছে এবং ডাইনীদের সাথে মিশে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য শিশু, যাদের মাথা ব্যাঙের মতো এবং পা গুলো মাকড়শার মতো। Spee আসলেই বিশ্বস্ত বন্ধুর সান্নিধ্যে ছিলেন বলে তাকে অভিযুক্ত হতে হয়নি। আর তাই তড়িঘড়ি করে তিনি ১৬৩১ সালের বই Cautio Criminalis রচনা করেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন ডাইনি বিচার কেন বস্তুত অবিচার ও তা অন্যায্য। Spee ছিলেন প্রথম সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যিনি ডাইনী স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে নির্যাতনের সমালোচনা করেও পার পেয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর আগে এই রকম বিচার প্রক্রিয়ায় সন্দেহপোষনকারীদের ওপর জাদুকরী এবং ডাইনি-বাজির অভিযোগ এনে হত্যা করা হয়েছিল ।

বার্ট্রান্ড রাসেল যেমনটা বর্ণনা করেছেন: “কিছু কিছু সন্দেহবাদী সাহস করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল – এই ঝড়, বজ্রপাত কিংবা শিলাবৃষ্টি কীভাবে কোনো নারীর কারসাজিতে হতে পারে? এই ধরনের প্রকাশ্যে সন্দেহবাদীদের রেহাই দেয়া হয়নি। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে University of Treves এর রেক্টর জনাব Flade, যিনি কিনা প্রধান বিচারক হিসেবে অসংখ নারী ডাইনি অভিযুক্ত করে শাস্তি দিয়েছেন, একটা পর্যায়ে বলে বসলেন, হয়তো এই নারীরা নিজেদের ডাইনি হিসেবে স্বীকার করেছে তাদের ওপর করা অসহ্য অত্যাচার সহ্য করতে না পারার কারণে। কিন্তু ধর্মীয় রীতিসম্মত বিচারপন্থার ওপর সন্দেহ আরোপ করার জন্য এই বিচারকের ওপর অভিযোগ আনা হল যে, তিনি তাঁর আত্মাকে শয়তানের কাছে বেচে দিয়েছেন। তারপর Flade-কে অত্যাচারের সাথে জেরা করা শুরু করা হল স্বীকারোক্তি আদায় করা পর্যন্ত। ১৫৮৯ সালে তাঁকে ফাঁসি দিয়ে তারপর আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।” (B. Russell, Religion and Science (1935; reprint, Oxford: Oxford Univ. Press, 1997), 95.)

ক্যাথলিক চার্চ ১৮১৬ সালে Pope Pius VII-এর সময়ে অবশেষে এই নির্যাতন-প্রক্রিয়াকে সর্বপ্রথম অফিশিয়ালি নিন্দা প্রকাশ করে।

যেসব আবহাওয়াগত প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা রোগ-শোক বা অকস্মাৎ মৃত্যুর কারণে জাদুকর বা ডাইনিদের অভিযুক্ত করা হতো, বর্তমান কালে বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে তার অনেক কিছুই মানুষ জানে ও বোঝে। কিন্তু অজানা ও অনিশ্চয়তার কারণে ধর্মীয় রীতিতে মানুষহত্যা বা নির্যাতন কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদেরকে বিজ্ঞানভিত্তিক যৌক্তিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। আদিম যুগে মূর্খদের রচিত কোনো পরস্পরবিরোধিতাময় বাণী সম্বলিত ধর্মগ্রন্থের মধ্যে সবকিছুর উত্তর আছে ভেবে নিলে হানাহানি চলতেই থাকবে এবং সভ্যতা ও পৃথিবীর অগ্রগতি অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ধর্মকারীতে ২০১৬ সালে তিন পর্বে প্রকাশিত হয়েছিল
তথ্য সূত্র : স্যাম হ্যারিসের এন্ড অফ ফেইথ এবং উইকিপিডিয়া

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: