বিজ্ঞানে বিশ্বাস?

একবার আমার এক আত্মীয়ের কিডনিতে পাথর জমা হয়েছিল। ধরুন আত্মীয়ার নাম আমিনা বেগম। তারা খুবই ধর্মপ্রাণ, এবং বিশ্বাসী মানুষ। তাদের ধারণা হয়েছে, এটা আল্লাহপাকের পরীক্ষা এবং শুধুমাত্র আল্লাহপাক চাইলেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে। ডাক্তাররা কিছু করতে পারবে না। তারা উছিলা মাত্রই। আসল কাজ তো আল্লাহই করেন। তিনি নিয়মিত কালোজিরা আর মধু খেতেন, তাতে নাকি সব রোগ সেরে যায়। হাদিসে লেখা আছে। কালোজিরা নাকি সব রোগের মহৌষধ।

সমস্যা ক্রমশ বাড়তে থাকায় তারা দোয়া দরুদ এবং সুরা কালাম বেশি বেশি পড়া শুরু করলো। আমি নিজেই যেচে তাদের অপারেশন করিয়ে ফেলার পরামর্শ দিলাম। তারা জানালো, কেন? এইসব অপারেশন আবিষ্কার হওয়ার আগে কী আল্লাহ মানুষকে অসুখ বিসুখ থেকে রক্ষা করে নাই? এইসব বিজ্ঞান ফিজ্ঞান আজ এক কথা বলে, কাল আরেক কথা। তারা বিজ্ঞানের ওপর আস্থা রাখতে পারে না। বিজ্ঞানের কোন ঠিক নাই। বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করা যায় না, কারণ তা মানুষের বানানো এবং পরিবর্তনশীল। একমাত্র আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল যা একবার বলেছে সেটাই সত্য। আল্লাহ কোরানে বলেছেন হায়াত মউত আল্লাহর হাতে। তিনি না চাইলে উনার কিছুই হবে না। আর তিনি মউত লিখে রাখলে ইহুদী নাসারা নাস্তিক মেডিক্যাল সায়েন্সের বাপেরও সাধ্য নাই তাকে বাঁচায়। 
এইসব বলে তিনি নিয়মিত জমজম কুপের পানি খাওয়া শুরু করলেন। তাতে নাকি কিডনির পাথর গলে যায়। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, জমজম কুপের পানি খেলে কিডনির পাথর গলবে, এরকম কোন প্রমাণ আছে? এটা কীরকম দাবী?
তিনি রেডিও মুন্না বা বাঁশেরকেল্লা কোন একটা ফেইসবুক পাতা থেকে পড়েছেন, বিজ্ঞান নাকি প্রমাণ করেছে জমজম কুপের পানিতে অলৌকিক কুদরত আছে। যা খেলে অসুখ ভাল হয়ে যায়। এমনকি এইডসের মত রোগও নাকি ভাল হয়। কোন এক জার্মান বিজ্ঞানী নাকি জমজমের পানি নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে সেটা আবিষ্কার করেছেন। আবিষ্কার করে বিজ্ঞানী ভদ্রলোক ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মাশাল্লাহ!
আমি অবাক হলাম। অবাক হয়ে বললাম, এরকম তো কোন বিজ্ঞানীর কথা আমি শুনি নি। কি নাম সেই বিজ্ঞানীর? কী সেই আবিষ্কার। তার কোন জার্নাল প্রকাশ হয়েছে এই বিষয়ে? কোথায় প্রকাশ হয়েছে জার্নালটি? এরকম হলে তো বিশ্বব্যাপী আলোড়ন হবার কথা। ভদ্রলোকের নোবেল পাওয়ার কথা।
তিনি বললেন, তোমাদের তো সব কিছুতেই খালি অবিশ্বাস। এতো প্রমাণ প্রমাণ করে চেঁচাও কেন?  ইহুদী নাসারারা ষড়যন্ত্র করে এই খবরটা ধামাচাপা দিয়েছে। নইলে সব মানুষ মুসলমান হয়ে যাবে না?
আমি উনাকে বোঝালাম, এসব ইসলামি ভণ্ডামি মাত্র। এগুলোর কোন ভিত্তি নেই। জমজমের পানির কোন অলৌকিক কুদরত নেই। বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারে পরীক্ষা করেই দেখা সম্ভব। বরঞ্চ জমজমের পানি রীতিমত দুষিত। বেশ কয়েকবারই প্রমাণিত হয়েছে সেখানে বিষাক্ত পদার্থ রয়েছে যা ক্ষতিকর।
সে বলল, এটা তার বিশ্বাস। বিশ্বাস করে খেলে কাজ হবেই। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্ক বহুদূর। আর অপারেশন করলে যে সে ভাল হবে তার কোন প্রমাণ আছে? অপারেশন করাটাও তো একটি বিশ্বাস! বিজ্ঞানও তো একটি বিশ্বাস! 
আমি জানালাম, না, অপারেশন করে কিডনির পাথর সরিয়ে ফেলাটা বিশ্বাস নয়। বিজ্ঞান কোন বিশ্বাস নয়। আপনাকে বিজ্ঞানের ওপর বিশ্বাস করতে কেউ বলবে না। আপনাকে সরাসরি দেখিয়ে দেয়া হবে, কীভাবে কিডনি থেকে পাথর সরাতে হয়। বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে সেটি প্রমাণিত।
তারপরে আমি উনাকে মানুষের শরীর থেকে কীভাবে পাথর বের করা হয়, কীভাবে কিডনি থেকে অপারেশন ছাড়াই পাথর বের করা সম্ভব তা দেখাবার জন্য এই ভিডিওগুলো দেখতে বললাম। এখানে বিশ্বাসের কিছু নেই, পরিষ্কারভাবে নিজেই সব দেখা যায়। 

সে বললো, কিন্তু বিজ্ঞান তো স্থির থাকে না। আজ যা বলে কাল অন্যটা। আমি বললাম, অবশ্যই তা সত্য। কাল যদি অপারেশনের চেয়ে আরো ভাল এবং উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়, তাহলে বিজ্ঞান সেই পদ্ধতিতেই চিকিৎসা করবে। একসময় এইসব উন্নত প্রযুক্তি ছিল না। তখন কালোজিরাই হয়তো ছিল একমাত্র ভরসা। এই কারণেই সেই সময়ে জন্মানো মুহাম্মদ কালোজিরা খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যদি তিনি এই সময়ে জন্মাতেন, তাহলে হয়তো অপারেশন করিয়ে ফেলার পরামর্শই দিতেন। আপনি তো সেই মধ্যযুগে জন্ম নেন নাই। তাহলে আপনার কাছে তো অপারেশন করাবার সুযোগ আছে। আপনি কালোজিরা খেয়ে কেন রোগ সারাবেন? এখন তো সেই সব পুরনো বিশ্বাসভিত্তিক ঔষধের দিন আর নেই। আমরা তো এখন সেই যুগ শেষ করে এসেছি।
তিনি বললেন, তুমি আসলে জানো না। কিছুই জানো না। সেই ১৪০০ বছর আগেই মহানবী বলে গেছেন পৃথিবী উট পাখীর ডিমের মত গোলাকার। সেই সময় কী মানুষ জানতো, পৃথিবীর আকৃতি কেমন? তিনি যদি সেটা জেনে থাকেন, তার মানে কালোজিরা খেলেও সব রোগ সেরে যাবে। বিজ্ঞান এখনো কালোজিরার গুণ আবিষ্কার করতে পারে নি। হয়তো ভবিষ্যতে এই মেডিকেল সায়েন্সই উঠে যাবে। সবাই কালোজিরা খেয়েই সুস্থ থাকবে। বিজ্ঞান আজ এটা বলে কাল ওটা, তাহলে এটা মেনে নিতে তোমার সমস্যা কোথায়? উল্লেখ্য, এই কথাটিও তিনি রেডিও মুন্না না বাঁশের কেল্লা পেইজ থেকে জেনেছেন।
আমি বললাম, দেখুন, মহানবী জানতো না পৃথিবীর আকৃতি কেমন। তিনি কোরানে এক একবার এক এক রকম বলেছেন। কারণ সেই সময়ে মানুষের জানা ছিল না পৃথিবীর আকৃতি। গ্রীসের চিন্তকগণ এক একজন এক এক কথা বলেছিলেন। উনারা এই নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। সেই কারণেই কোরানে এসেছে এরকম পরস্পর বিরোধী কথা। যেমন ধরুন এই হাদিসটিঃ

অথবা ধরুন কোরানের এই আয়াতটিঃ


উপরের আয়াতগুলো লক্ষ্য করে পড়লেই দেখবেন, যুলকারনাইন সুর্যাস্তের স্থানে পৌঁছালো। অর্থাৎ পৃথিবীর শেষ সীমানায়। কিন্তু যারা জানেন পৃথিবী আসলে গোল, তারা কখনই বলবেন না যে, পৃথিবীর শেষ সীমায় যেখানে সূর্য অস্ত যায়, সেখানে কেউ পৌঁছালো। এটা সম্ভব নয়। মনে হচ্ছে, পৃথিবীর আকৃতি অনেকটা নিচের ছবির মতন।

উপরের ছবিটা ইহুদীদের পৃথিবীর ধারণা বলে বহুকাল প্রচলিত ছিল। এরকম বহু কাহিনী সেই সময়ে প্রচলিত ছিল। মুহাম্মদ সেগুলোর ওপর ভিত্তি করেই এক একটি আয়াত রচনা করেছিলেন। এবং অধিকাংশ আয়াতই অস্পষ্ট, এবং গোলমেলে। আরবি এক একটি শব্দের একাধিক অর্থ হয় বলে, মাঝে মাঝে গোলকে চ্যাপ্টা বলেও অনুবাদ করা সম্ভব, বা চ্যাপ্টাকে লম্বা বলেও তালগোল পাকানো সম্ভব। এই সুযোগটি নিয়েই এই উট পাখীর ডিমের অনুবাদটি আনা হয়।
“…এবং পৃথিবীকে ইহার পর বিস্তৃত করিয়াছেন।” (সূরা নাযি’আত ৭৯:৩০), এই আয়াতটি যুগও যুগ ধরে অনুদিত এবং সকলেই জানেন। জাঁকির নায়েক হুট করে বলে বসলেন, “বিস্তৃত” বা دَحَهَا (“দাহাহা”) শব্দের আসল অর্থ হল “বিস্তৃত” নয় বরং “উটপাখির ডিম”। কিন্তু তারপরেও মেলে না। কারণ পৃথিবীর শেইপ উট পাখীর ডিমের মতও না। বরঞ্চ খানিকটা কমলালেবুর মত।
এখন জোর করে যদিও পৃথিবীকে অস্ট্রিচ বা উটপাখির ডিমের মত বানাবার চেষ্টা হয়, তাহলে প্রশ্ন আসে, মুহাম্মদ যদি এতই সব জেনে থাকে, এটাও তার জানা থাকবার কথা যে এক এক অঞ্চলে রোজা রাখার সময় এক এক রকম হবে। সেই বিষয়ে কী তিনি কিছু বলেছেন? বা কোন দিকে ফিরে নামাজ পড়বেন, পৃথিবী গোলাকার হলে? পৃথিবীর কোন জায়গা থেকে কোন দিকে ফিরে?
>আবার ধরুন, কোন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পরেই ধার্মিকদের হঠাৎ মনে পড়ে যায়, এটা আগে থেকেই কোরানে লেখা আছে। তারপরে শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে সেটা মেলাবার চেষ্টা হয়। যেমন ধরুন, এইরকম মুসলিমরা কিন্তু হাজার বছর ধরেই প্রচার করে আসছে পৃথিবী সমতল। কোরান পড়েই তিনি সেগুলো জেনেছেন।

বাঙলাদেশেও এই নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদগণ বই লিখেছেনঃ

যাইহোক। যেই না বিজ্ঞানগণ কিছু আবিষ্কার করেন, বা আবিষ্কার করলেন পৃথিবী গোলাকার, অমনি কোরানের শব্দের অর্থ পাল্টে কোরানকে বদলে দেয়া হলো। এসবকে আপনি কী বলবেন? আর আল্লাহ যদি এত কিছুই জানেন, সেই ১৫০০ বছর আগে কোরানে আলোর সঠিক স্পিড কত লিখে দিয়ে গেলেই তো হতো। আজকে আমরা নমঃ নমঃ বলে কোরানের সব দাবী মেনে নিতাম। তা না করে এরকম অস্পষ্ট, যার নানা রকম অনুবাদ সম্ভব, এসব লিখে যাওয়ার মানে কী? মাংসের গায়ে মেঘে নাকি মাঝে মাঝেই আল্লাহু লেখা দেখা যায়। এত ছ্যাবলামি না করে কোরানে আলোর গতি সঠিকভাবে মেপে বলে দিলেই তো হতো। পৃথিবীর এই ধর্ম নিয়ে মারামারি থেমে যেতো।

এসব শুনে উনি বললেন, কিন্তু কাল যদি বিজ্ঞান আবিষ্কার করে, পৃথিবী আসলেই সমতল এবং সুর্যই পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে?

আমি বললাম, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখুন, নানা ধর্মের লোকজন সেটাও নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ থেকে ঠিকই একটু অনুবাদ পালটে আবিষ্কার করে দাবী করবেন। যে এসব তাদের গ্রন্থে অনেক আগে থেকেই বলা রয়েছে। কিন্তু সত্য হচ্ছে, তাদের গ্রন্থে লেখা ছিল সেই আমলের জ্ঞান বিজ্ঞানের কিয়দাংশ। সেই সময়ে টলেমীর মডেলটি খেয়াল করুনঃ

এবারে আসুন, জানি যে পৃথিবী গোল এই ধারণা সর্বপ্রথম কে বলেছিলেন? সর্বপ্রথম পিথাগোরাস বলেছিলেন পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার। তিনি মুহাম্মদের বহু আগে জন্মেছিলেন। [ James Evans, (1998), The History and Practice of Ancient Astronomy, page 47, Oxford University Press] । কিন্তু পিথাগোরাসের এই আইডিয়াটি স্পষ্ট ছিল না। তিনি খুব অস্পষ্টভাবে সেটা বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু আপনি যদি দাবী করেন, পৃথিবী গোলাকার সেটা মুহাম্মদ সবার আগে বলেছে, তা হবে একদমই ডাঁঁহা মিথ্যাচার। কিন্তু তারপরেও, সবকিছুর বিবেচনায় কোরানের এই কুদরতের দাবী আসলে ধোপে তেকে না। আপনারা যত জোরেই দাবী করুন না কেন।

উনি বললেন, কিন্তু কাল যদি আবিষ্কার হয়…

আমি উনাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, কাল যদি কিছু আবিষ্কার হয় সেটা তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই হবে।  তা হয়ে থাকলে তা মেনে নিতেও আপত্তি হবে না। কিন্তু কোন তথ্য প্রমাণ ছাড়াই যদি আপনি দাবী করেন যে, কাল এটা আবিষ্কার হবে, তাহলে আমি কাল সেটা আবিষ্কার হওয়ার জন্যেই না হয় অপেক্ষা করবো। কিন্তু তথ্য প্রমাণ পাওয়ার আগে মেনে নেবো না। এরকম যুক্তি অনুসারে, কাল তো এটাও আবিষ্কার হতে পারে মহাবিশ্ব একটি কোলা ব্যাঙ বানিয়েছে। একারণেই বলা হচ্ছে বিগ ব্যাঙ এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের উৎপত্তি! বিগ ব্যাঙ মানে বড় ব্যাঙ! তাই কাল সেটা আবিষ্কার হতেও পারে, তাই ভেবে এখন কোলা ব্যাঙ এর উপাসনা করা বোকার মত কাজ হবে না?

ভদ্রমহিলা অনেকক্ষণ শক্ত চোখে তাকিয়ে ছিলেন। আস্তে আস্তে উনার দৃষ্টি নরম হলো। তারপরে বললেন, উনি কালোজিরাই খাবেন। অপারেশন করাবেন না। কারণ এটা উনার বিশ্বাস। আমার সব যুক্তিতর্ক আলাপ আলোচনার কোন গুরুত্ব উনার কাছে নেই। উনি যদি বিসমিল্লাহ বলে কালোজিরা আর জমজমের পানি খেতে থাকেন, একদিন উনার অসুখ আল্লাহপাক ভাল করে দেবেনই। আল্লাহ পাকের ওপর বিশ্বাস রাখাই সর্বত্তম।

আমি আর কিছু বললাম না। বোঝাবার কাজ ছিল আমার দায়িত্ব, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। বাকিটা উনার ইচ্ছা। যাইহোক, গতবছর ভদ্রমহিলা মারা গেছেন কিডনি সমস্যায়। মৃত্যুর পরে উনার পরিচিত জনেরা এই বলে দোআ করেছেন, আল্লাহ যেন উনার আত্মাকে বেহেশতে নসিব করেন!

Facebook Comments