ইসলামি জঙ্গিবাদের পেছনে আসলে কারা দায়ী?

পাকিস্তানে প্রায় প্রতিদিনই বাচ্চাদের স্কুলে বোমা মারা হচ্ছে, বিশেষ করে মেয়েদের স্কুলে। সামান্য বুদ্ধিটুকু থাকলেও বোঝা যায়, মেয়েদের স্কুলের ওপরে তালেবান বা আল কায়েদার এত আক্রোশের কারণ কী! মেয়েদের স্কুলে বোমা মারার কারণ হচ্ছে, মেয়েরা বেশি শিক্ষিত হয়ে গেলে তারা ঘর থেকে বের হতে চায়, স্বাধীনতা এবং নিজেদের অধিকার চায়। যেটা ধর্মান্ধতার সবচাইতে বড় আতঙ্কের কারণ। আফগানিস্তানের অবস্থা আরো খারাপ। নাইজেরিয়ায় স্কুল থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মেয়েদের, বোকো হারাম নামক ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠী প্রায় প্রতিদিনই তুলে নিয়ে যায় মেয়েদের। সেখানে জোর করে মুসলমান বানানো হচ্ছে খ্রিস্টান মেয়েদেরকে, অথবা যৌন দাসী হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মেয়েদের নিলামে বিক্রিও করা হচ্ছে। একদমই প্রাচীনকালের দাসপ্রথার মত করে বাজারে উঠাচ্ছে মেয়েদের। আগে ছিল আল কায়েদা, এখন এসে গেছে বোকো হারাম আর আইসিস। ইরাক সিরিয়ায় আইসিস যা করছে তা তো সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পুরো পৃথিবী জুড়েই এখন আতংক, ইউরোপে ট্রেনে বাসে চড়তে গেলে বোরখা পড়া নারী উঠলেই অন্য যাত্রীরা ভয়ে নেমে যায়। দাড়িওয়ালা মোল্লা দেখলেই তারা মনে করে এই বুঝি আত্মঘাতী বোমা মেরে দিল। এয়ারপোর্টে মুসলমান নাম দেখলেই দশবার করে চেক করা হয়, কোন বোমা সাথে নিয়ে সে যাচ্ছে কিনা।

প্রায় সপ্তাহেই কোন কোন কোন জায়গায় জঙ্গি ধরা পরে। দেখা যায়, পরিবারের ভাল ছেলে বলেই পরিচিত একটা কিশোর, যে খুব ধর্মপ্রবণ হয়ে উঠেছিল, নিয়মিত নামাজ পড়তো, রোজা রাখতো, নিয়মিত কোরান পড়তো, হাদিস অনুসরণ করে জীবন যাপনের চেষ্টা করতো, সে হুট করে সিরিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছে আইসিসে যোগ দেয়ার জন্য। এই ছেলেটার মাথায় এই ইসলামের ভুত কে ঢোকাল? কিসের নেশায় এই ছেলেটা এখন জিহাদ করে কাফের মারতে চাচ্ছে? ছেলেটা কী একদিন হুট করে জিহাদই হতে চাইলো, নাকি এই জিহাদই হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যেই সে ছিল অনেক বছর ধরে? সেগুলো কী আমাদের ভেবে দেখার সময় আসে নি?

মুসলমানরা নির্যাতিত তাই সে জিহাদ করে মুসলমানদের উদ্ধার করতে চাচ্ছে? আসলেই কী তাই?  ইউরোপের যেই মুসলমান ছেলেটা সিরিয়া যাচ্ছে জিহাদ করতে, বাঙলাদেশের ছেলেটাও যাচ্ছে। অন্য কোন ধর্মের মানুষ কেন এরকম মাত্রায় সন্ত্রাসী হচ্ছে না? নিরীহ মানুষ হত্যার এই শিক্ষা সে কোথা থেকে পেল?

এগুলো বানানো কথা নয়, রীতিমত ফ্যাক্ট। মুসলমানদেরই এই জিহাদের মূল্য কিন্তু চোকাতে হচ্ছে সাধারণ মুসলমানদেরই। কেন এমন হচ্ছে? ইউরোপের মানুষ খুব খারাপ তাই? সব ইহুদী নাসারাদের ষড়যন্ত্র? তালেবান আল কায়েদা আইসিস বোকো হারাম বলে আসলে কিছু নেই? সব মিডিয়ার সৃষ্টি? স্রেফ সব অস্বীকার করে বা অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের অপকর্ম ঢাকা দেয়ার এই চেষ্টা কোনদিনই সমস্যার সমাধান করবে না। বরঞ্চ সমস্যাকে জিয়িয়ে রাখবে, আরো বৃদ্ধি পাবে দিনকে দিন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কী করা যায়? এই সমস্যার সমাধান কী?

মডারেট মুসলিমরা দাবী করছে, এর সাথে সহি ইসলামের কোন যোগাযোগ নেই। কিন্তু এই অতি জীর্ণ বস্তাপচা যুক্তি শুনে এখন মানুষ শুধুই হাসে। ইসলামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ইসলামের শুরুটা বেশ রক্তক্ষয়ী। মুহাম্মদ জীবনে প্রচুর যুদ্ধ করেছেন, প্রচুর মানুষ সে সময়ে মারা গেছে। অনেককে দাস দাসী বানানো হয়েছে। আরবরা কোন সময়ই খুব বেশি সভ্য ছিল এমনটা দাবী করা যায় না। মুসলমানদের যেই স্বর্ণযুগ, তাতে ইরাক এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্য পুরনো ঐতিহ্যবাহী সভ্যতাগুলোর অবদানই বেশি ছিল। মুহাম্মদের মৃত্যুর পরেও ক্ষমতা নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে শুরু হয় কামড়া কামড়ি, চারজন খলিফার মধ্যে তিনজনকেই হত্যা করা হয়। মুহাম্মদের পরিবারের অধিকাংশ মানুষকেই খোদ মুসলমানরাই হত্যা করে। সেই সাথে সারা আরব অঞ্চল জুড়ে কাফের মুরতাদ কতলের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস তো আছেই। তাই মুসলমানরা যে খুব শান্তিপূর্ণভাবে শাসন করেছে, তা বলা যায় না। কাফের নিধনের বীরত্বপূর্ণ বর্ণনা অনেক ইসলামী সাহিত্যেরই মূল উপজীব্য। জেমস বন্ডের মত এক একজন মুসলমান সে সময়ে খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে কাফেরদের আক্রমণ করতো, এবং কাফের কেটে কেটে মেরে মেরে তাদের স্ত্রীদের বিয়ে করে নিতো।

যেমন ‘জঙ্গনামা’তে পুঁথি থেকে জানা যায়, হযরত আলী কাফের ও বেদীনদের ওপর এমন চোটপাট চালিয়েছেন যে গদার আঘাতে থেঁতলানো, তলোয়ারের ঘায়ে কাটা পড়া কিংবা শেষ পর্যন্ত পবিত্র ইসলামের শরণ গ্রহণ না করা পর্যন্ত কারো রক্ষা নেই। আমীর হামজার শৌর্যবীর্য অবলম্বন করে যে পুঁথি রচিত হয়েছে তা পড়লে লোম দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো অনেক চমকপ্রদ সংবাদ পাওয়া যায়। প্রায়শ দেখানো হয়েছে, মহাবীর হামজা এমন শক্তিশালী যে তিনি দেশ-দেশান্তর ঘুরে ঘুরে কাফেরদের সদলবলে পরাস্ত করছেন আর তাঁদের ঘরের সুন্দরী নারীদের পাণিপীড়ন করে চলেছেন তো চলেছেনই। (রেফারেন্সঃ বাঙালী মুসলমানের মন-আহমদ ছফা)

এইসব ইতিহাস নিয়ে কখনই বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা মুসলমানরা করে নি, ভুলগুলো শুধরে নেয় নি। রীতিমত এসব কাফের কতল আর কাফের রমণী সঙ্গমে মাধ্যমে মুসলমান সন্তান জন্ম দেয়ার ঘটনা নিয়ে বড়াই করেছে। তাই এখনো বহন করে চলেছে সেই রক্তারক্তির ঐতিহ্য, কিছু হলেই কল্লা চাই রক্ত চাই ইত্যাদির সময় বহু বছর আগেই পৃথিবী পার করে এসেছে।

সমস্যা অবশ্যই বড়, এটা বোধকরি সকলেই স্বীকার করবেন। এখন আমাদের হাতে অপশন কী? এই সমস্যার মোকাবেলা কীভাবে করা যেতে পারে? সমাধানগুলো এক এক করে আলোচনা করা যেতে পারে-

১) মডারেট মুসলমানদের ভাষ্য মতে, জঙ্গিবাদী উগ্র মৌলবাদীরা সঠিক ইসলাম পালন করছে না। সঠিক ইসলাম চর্চা করলেই সমস্যার সমাধান হবে। তারা এই ক্ষেত্রে হাদিস কোরানের রেফারেন্সকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা করছে, মানবিক করে তোলার চেষ্টা করছে। যদিও খুব একটা সফল তারা হতে পারছে না। কারণ হাদিস কোরানের রেফারেন্সগুলো বেশ স্পষ্ট, ওয়েল ডকুমেন্টেড এবং বহুল চর্চিত। একই সাথে, ঠিক কোন দেশে কথিত সহি ইসলামের চর্চা হচ্ছে, এবং সেই সহি ইসলামটাই বা আসলে কী বস্তু, তার কোন ব্যাখ্যা তারা হাজির করতে পারে না। কোরানে স্পষ্টভাবে যা বলা আছে তাকেও তারা বেঠিক ইসলাম বলে চালানোর চেষ্টা করে। তাদের এই চেষ্টাকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাধুবাদ জানানো গেলেও, আখেরে কাজের কাজ কিছুই হয় না।

২) আমেরিকা এবং ইসরাইলের ভাষ্য মডারেট মুসলমানদের সাথে হুবহু মিলে যায়। যদিও দাবী করা হয় আমেরিকা ইসরাইল ইসলাম বিদ্বেষী, কিন্তু আদতে তা একেবারেই ভুল কথা। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ধর্মকে ব্যবহার করতে চায় বটে, তবে ইসলাম বিদ্বেষ বা ইসলাম প্রীতি কোনটাই তাদের নেই। তারা ব্যবসায়ী, যখন দরকার হবে ব্যবহার করবে, যখন দরকার ফুঁড়াবে ছুড়ে ফেলবে। তারাও মডারেট মুসলমানদের সাথে তাল মিলিয়ে প্রায় একই কথা বলছে, যে এর সাথে সহি ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। তাই তারা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বোমা মেরে মানুষ হত্যা করে ঐ কথিত বেঠিক ইসলামকে ধ্বংস করে সঠিক সহি ইসলামের প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে।

তাদের বক্তব্য অনেকটাই এরকমঃ

■ ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ একটি ভাষণে ইসলামকে ‘রিলিজিয়ন অফ পিস’ আখ্যায়িত করে বলেন, The English translation is not as eloquent as the original Arabic, but let me quote from the Koran, itself: “In the long run, evil in the extreme will be the end of those who do evil. For that they rejected the signs of Allah and held them up to ridicule.” The face of terror is not the true faith of Islam. That’s not what Islam is all about. Islam is peace. These terrorists don’t represent peace. They represent evil and war.

■ একটি ইফতার পার্টির দাওয়াতে জর্জ বুশ এটাও বলেন, Islam is a vibrant faith. Millions of our fellow citizens are Muslim. We respect the faith. We honor its traditions. Our enemy does not. Our enemy doesn’t follow the great traditions of Islam. They’ve hijacked a great religion.

■ ২০০২ সালের ১১ অক্টোবর একটি ভাষণে কোনটি ছহি ইসলাম আর কোনটি ছহি ইসলাম নহে সে সম্পর্কে জর্জ বুশ বলেন, All Americans must recognize that the face of terror is not the true faith — face of Islam. Islam is a faith that brings comfort to a billion people around the world. It’s a faith that has made brothers and sisters of every race. It’s a faith based upon love, not hate.

■ এই প্রসঙ্গে বারাক ওবামা বলেন, Islam is a great religion but there is a need to isolate those who have distorted its vision. Well, the phrase jehad has a lot of meanings within Islam. It is subject to lot of different interpretations. But I will say that first Islam is one of the world’s great religions and over a billion people practice Islam.

অবাক কাণ্ড হচ্ছে, যেই ইসরাইলের সমালোচনায় মোডারেট মুসলমানগণ মুখর, সেই ইসরাইলের নেতানিয়াহুও কিন্তু ইসলামের প্রশংসায় মাঝে মাঝেই পঞ্চমুখ হন। ওবামা, বুশ, নেতানিয়াহু, এরা কেন ইসলামের প্রশংসা করেন? কোন স্বার্থে? ইসলাম টিকে থাকলে তাদের কোথায় লাভ ক্ষতি?

৩) আরেকটি পক্ষ হচ্ছে মুক্তমনা নাস্তিকরা। তাদের ভাষ্য হচ্ছে, ধর্মীয় জঙ্গিবাদের বীজ রয়ে গেছে ধর্মতত্ত্বের মধ্যেই। যেসব দেশই ধর্মবাদী, নন সেক্যুলার, সে সব দেশই জঙ্গিবাদের আখড়া। যে সব দেশে ধর্মমুখী শিক্ষা বর্তমান, সে সব দেশেই শিক্ষাবঞ্চিত জনগণকে নিয়ে খেলাধুলা করা রাজনৈতিক নেতাদের জন্য সহজ। আন্তর্জাতিকভাবেও বিশ্ব নেতাদের অনেকেই চান নির্বোধ অশিক্ষিত মগজহীন মুসলমানরা টিকে থাকুক, তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করুক।
তাই মুক্তমনাগণ বলেন, পাকিস্তান আফগানিস্তান ইরাক ইরান সৌদি আরবে আক্রমণ করে জঙ্গি দমন আসলে কোন সমাধান নয়। বিষবৃক্ষকে বাঁচিয়ে রেখে ডালপালার সাথে যুদ্ধ করলে শুধু নারী ও শিশুই মারা যাবে, দুই পক্ষেরই। যুদ্ধ কিংবা সামরিক আক্রমণ কোন সমাধান হতে পারে না। তার চাইতে ঐ সকল ধর্মবাদী দেশগুলোতে সেক্যুলার শিক্ষা প্রবর্তন করতে হবে, পরকাল বিষয়ক সকল শিক্ষা বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রকে হতে হবে পরিপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ। রাষ্ট্র কোন ধর্মকে সমর্থন দেবে না। সঠিক মাত্রায় সেক্যুলার বিজ্ঞান শিক্ষা এবং যুক্তিবাদের প্রয়োগই মানুষের মধ্যে মানবতাবাদের উন্মেষ ঘটাতে সক্ষম, উলটা দিকে ধর্মমুখী শিক্ষা এই যুগে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষেত্র বিশেষে ভয়ঙ্কর।

তাই মুক্তমনা নাস্তিকরা সেই নীতি আদর্শকে আক্রমণ করে, যা মানুষকে পরকালের হুর গেলমানের লোভে, কিংবা তাদেরকে নরকে পোড়াবার ভয় দেখিয়ে জিহাদ করতে বাধ্য করে। যারা জিহাদ করে তারা মূলত অপরাধী না, তারা যদি সেক্যুলার বিজ্ঞান শিক্ষা পেতো, তারাও এক একজন বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ হয়ে উঠতে পারতো। তাই মানুষ নয়, মুক্তমনা নাস্তিকদের আক্রমণের লক্ষ্য হচ্ছে সেই মতাদর্শ। তাই তাদের বক্তব্যের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই থাকে ধর্মতত্ত্বের সমালোচনা।

– আপনার মতে, উপরের তিনটি সমাধানের মধ্যে কোনটি যুক্তিযুক্ত? নাকি আপনার কাছে অন্য কোন সমাধান রয়েছে? নাকি আপনি মনে করে, সবই মুসলমানদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা? ধর্মভিত্তিক দেশগুলোতে কোন সমস্যাই নেই, আমাদেরও ধর্মভিত্তিক দেশ গঠন করে ইসলাম কায়েম করা উচিত?

Facebook Comments
%d bloggers like this: