ধর্ম এবং মানুষের মগজ

প্রথমে ভেবেছিলাম এই পোস্টের সাথে শিয়াদের মাতম করার দৃশ্যের একটা ছবি দিব, পরে ইচ্ছা করল না। ছবিতে সম্ভবত একজন পিতা নিজে তার অবুঝ শিশুকে রক্তাক্ত করছে – মাতম করবার উদ্দেশ্যে। এই ধরনের বর্বরতা শিশুদের প্রতি অন্যায় দেখলে সবার রাগ হয়। কেউ কেউ বলবেন

– “শিয়ারা কত খারাপ। এইটা কি মানুষের কাজ?”

– “এই ভাবে নিষ্পাপ শিশুদের ধর্মের নামে রক্তাক্ত করে কেন ? মানুষ এত নির্দয় এবং নির্বোধ হয় কিভাবে?”

– “ওরা কেন বোঝে না ?”

এখন একটু ভেবে দেখুন- এই ছবির শিশুটি যখন একই সমাজে বড় হবে, ত্রিশ বছর পরে খুব সম্ভবত সে অনায়েসে তার নিজ সন্তানকে নিয়ে শুরু করে দেবে একই রকম বর্বরতা । এইটাই মানব সমাজের স্বাভাবিক বাস্তবতা। মানুষ যে ভৌগোলিক অবস্থানে জন্ম নেয়া এবং যা দেখে দেখে সে বড় হয় তা তার কাছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা স্বাভাবিক বলে মনে হয় – এবং তা ই সে অনুসরণ করে।

শিয়ার ঘরে বা সমাজে জন্মালে শিয়া হবেন। সুন্নির ঘরে জন্মালে হবেন সুন্নি। যেন ঈশ্বর নির্ধারিত একজনের জন্মস্থান এবং সমাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিশ্চিত বিশ্বাসের কারন হয়ে দাড়াচ্ছে। একটু পেছন থেকে ইতিহাস ঘেঁটে দেখি বিষয়টা আসলে কি হচ্ছে। ইসলামের ইতিহাস না – মানুষের ইতিহাস।

মানুষ নামক প্রজাতিটির মগজের ওজন সমগ্র শরীরের তুলনায় ২% থেকে ৩% মতো। কিন্তু যখন ওরা ঘুমায় এই মগজ একাই তাদের শরীরের ২৫% শক্তি কেড়ে নেয়। যদিও অন্যান্য এইপ রা (APE ) এই ক্ষেত্রে নিদ্রা কালে মাত্র ৮% শক্তি ব্যবহার করে। বড় এবং জটিল মগজ হবার কারণে মানুষেকে বেশি শক্তি ব্যবহার করতে হচ্ছে। প্রচুর এনার্জির খরচ হয় এর পেছনে।

আমরা জানি যখন বিবর্তনের পরিক্রমায় আগুন আবিষ্কারের পরে মানুষ যখন খাবার সেদ্ধ করে সহজে হজম যোগ্য অবস্থায় গ্রহণ করতে শুরু করে। মানুষের খাবার হজম করার প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত দীর্ঘ intestine (নাড়িভুঁড়ি) সহজে হজমযোগ্য খাবার পাবার কারনে কালক্রমে আগের তুলনায় ছোট হতে শুরু করে। তারফলে আগুন আবিষ্কারের আগে মানুষের খাবার হজম করার প্রক্রিয়ায় যে ব্যবহৃত দীর্ঘ অন্ত্র যে পরিমান শক্তি গ্রহণ করতো তা এখন তা ছোট হবার কারণে তা মস্তিষ্কে বৃদ্ধির আকৃতি প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হবার সুযোগ পাওয়া যায়। তাই মস্তিষ্কের আকৃতি বড় হতে শুরু করে।

এখন সমস্যা হল নারীদের আর শিশুদের। একদিকে আদি মানবেরা সোজা হয়ে দু-পায়ে হাটা শুরু করে দিল, অন্যদিকে শিশুদের মাথার আকৃতি বড় হতে থাকে মস্তিষ্কের বৃদ্ধির কারণে । দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটা শুরু করার কারণে প্রয়োজন পরে সংকীর্ণতর হিপের আকৃতি। যা কিনা একই সাথে নারীদের সন্তান জন্ম দেয়ার পথ সরু করে দিতে থাকে। শিশুর মাথার আকৃতি বৃদ্ধি আর মায়েদের জন্মখালের আকৃতি সরু হবার কারনে জন্ম নেবার প্রক্রিয়ায় শিশুমৃত্যুর এবং মায়েদের মৃত্যুর হার বাড়তে থাকে। যেসব নারীরা অপেক্ষাকৃত আগে অপরিপক্ক সন্তান জন্মদিতে শুরু করে তাদের সন্তান বেঁচে থাকে আর তাই বিবর্তন প্রক্রিয়ার কালক্রমে প্রিমেচিউর বার্থ বা অপরিপূর্ণ শিশু জন্মদান সমর্থন করতে থাকে। আর তাই মানব শিশুরা অপেক্ষাকৃত অপরিপক্ক অবস্থায় জন্ম নেয়া শুরু করে। আজও তাই অন্য পশু শাবকেরা যখন কম সময়েই হাটতে শুরু করে স্বাবলম্বী হয়ে যায়, মানব শিশুর দীর্ঘ সময় ধরে পিতা মাতার উপর নির্ভর করতে হয়। একটা জন্ম নেয়া মানব শিশু যদি একা পিতামাতাহীন কোথাও পড়ে থাকে তার মৃত্যু নিশ্চিত।

এই কারণেই বেঁচে থাকার জন্য সন্তান লালন পালনে পরিবারের অন্য সদস্যদের উপর নির্ভর করতে হয়। মা এবং বাবাকে যদি পশু শিকার করতে বা খাবার সংগ্রহ করতে যেতে হয় শিশুদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে খালা ফুপি কিংবা চাচারা। আর তাই মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় বিবর্তন পরিক্রমায় বড় পরিবারে সামাজিক জীব হওয়াকে সমর্থন করতে থাকে। যেহেতু অপরিপক্ব মগজ নিয়ে তা ধীরে ধীরে যা পরিপূর্ণতা পেতে থাকে জন্মের পরে এই বৃহৎ পরিবারের সামাজিক পরিবেশে- মানব শিশুকে নিজ নিজ সমাজের সাথে মিল রেখে খ্রিস্টান বানানো বা ইহুদী বা হিন্দু কিংবা সুন্নি বা শিয়া বানানো সহজ হয়ে দাঁড়ায়।

আরো সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হল অন্য প্রাণীর সাথে মানুষের মগজের অন্যতম পার্থক্য মানুষের প্রি ফ্রন্টাল কোর্টেক্স এবং এর কার্যকারিতা । এইটা মানব মগজের সর্বশেষ (most recently evolved) বিবর্তিত অংশের মধ্যে একটা । অন্য সব প্রাইমেট দের চেয়ে মানুষ প্রজাতিটির ফ্রন্টাল কোর্টেক্স তুলনা মূলক ভাবে বড় এবং বেশি জটিল।

অনেকে ভুল করে ভেবে বসে যে শিশুরা কিন্ডারগার্টেনে যাবার সময় তাদের পরিপূর্ন আকৃতির মগজ সাথে নিয়ে যাচ্ছে। কথাটা সত্য না, কারণ মানুষের ব্রেনের ফ্রন্টাল কোর্টেক্স পুরোপুরি অনলাইনে আসতে (অর্থাৎ কার্যকর হতে) ২৫ বছরের বেশি সময় লেগে যায়। শিশু কাল থেকে বড় হবার প্রক্রিয়ায় ব্রেইনের এই অংশটাই সর্বশেষে কার্যকর হয় বয়সের পরিপূর্ণতা পাবার পরে। । এই অংশটাই মানুষের

– দীঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা,

-আবেগিক নিয়ন্ত্রন এবং

-বর্তমান পরিতৃপ্তির ইচ্ছায় বিরতি ইত্যাদির মতো জটিল কাজ করতে সাহায্য করে।

এইটা ব্রেইনের সে অংশ যা মানুষকে কঠিন কাজটি করতে সাহায্য করে যখন কঠিন কাজটি করাই সঠিক কাজ বলে সে বিবেচনা করে । বলতে পারেন ব্রেনের এক্সিকিউটিভ ফাঙ্কশন এর দায়িত্বে আছে এই অংশ। যেমন কারো খুব ইচ্ছা করছে একটা কাজ করতে কিন্তু সে বুঝতে পারছে এর পরিণতি তার জন্য খারাপ হতে পারে – তখন ব্রেইনের এই অংশই তাঁকে থামিয়ে দেবার দায়িত্ব পালন করে।

যেহেতু মানব মগজের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি শূর্ণ থেকে পূর্ণ কার্যকর হবার প্রক্রিয়া পুরোটাই হচ্ছে জন্মের পরে। এতে বোঝা যায় বংশগত বা জিনগত প্রভাবের চেয়ে জন্মের পরের সামাজিক পারিপার্শ্বিক পরিবেশে বড় অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে ব্রেইনের এই গুরুতর অংশ। খুব সম্ভবত এই কারনেও তাকে নির্দিষ্ট সমাজের প্রভাব অনুযায়ী হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কুংবা সুন্নি শিয়া বানানো প্রক্রিয়া সহজতর হয়ে যাচ্ছে ।

প্রথম প্রকাশ ইস্টিশন ১৮ই নভেম্বর ২০১৭

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: