কোরআন এবং বীর্যের উৎস

সূরা আত-তারিক আয়াত ৫

فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ

ফালইয়ানযুরিল ইনছা-নুমিম্মা খুলিক।

অতএব, মানুষের দেখা উচিত কি বস্তু থেকে সে সৃজিত হয়েছে।

সূরা আত-তারিক আয়াত ৬

خُلِقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ

খুলিকা মিম্মাইন দা-ফিকি।

সে সৃজিত হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে।

সূরা আত-তারিক আয়াত ৭

يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ

ইয়াখরুজুমিম বাইনিসসুলবি ওয়াত্তারাইব।

এটা নির্গত হয় মেরুদন্ড ও বক্ষপাজরের মধ্য থেকে।

উপরে উল্লেখিত আয়াত সমূহ পড়লে আমরা জানতে পারি যে, কুরআনে বলা হয়েছে, মানুষকে সৃষ্টি করা হয় দ্রুতবেগে নির্গত তরল থেকে যা আসে মেরুদণ্ড ও বুকের পাঁজরের মধ্যে থেকে। এখানে সবেগে স্খলিত পানি বা দ্রুতবেগে নির্গত তরল বলতে নিঃসন্দেহেই বীর্যকে বুঝানো হয়েছে। কেননা, এখানে মানুষ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায় একজন মানুষ বা পিতার মেরুদণ্ড ও বুকের পাঁজরের মধ্যে থেকে আসা এমন এক তরল পদার্থের কথা বলা হয়েছে যা থেকে আরেকজন মানুষ বা সন্তান সৃষ্টি হয়। এখানে মানবদেহের এক প্রকার তরলকে সন্তানের উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং সন্তানের উৎসের সাথে জড়িত তরল অবশ্যই মানবদেহের যৌন তরল হবে, যা বীর্য। দুইজন মানুষ যৌনসংগম করলেই তাদের সন্তান হয়, দুইজন মানুষের যৌনসংগমের ফলে একজনের দেহ থেকে বীর্য দ্রুতবেগে নির্গত হয়ে অন্যের দেহে প্রবেশ করলেই তাদের সন্তান হবে। অতএব, উপরে উল্লেখিত আয়াত সমূহে সবেগে স্খলিত পানি বলতে নিঃসন্দেহেই বীর্য বুঝানো হয়েছে। তাই সরাসরি বীর্য লেখা হয়নি বলে বীর্য বুঝানো হয়নি এমনটা ভাববার কোনো সুযোগ নেই।

এখন কথা হলো, কুরআন অনুযায়ী বীর্য নির্গত হয় বা আসে মেরুদণ্ড ও বুকের পাঁজরের মধ্যে থেকে। বাস্তবতা কি তাই বলে? বাস্তবতা হলো, মানুষের বীর্য চারটি গ্রন্থির উৎপাদিত বস্তু দ্বারা গঠিত : অন্ডকোষ শুক্রাণু বা পুংজননকোষ উৎপাদন করে, সেই শুক্রাণু যে তরলে বাহিত হয় তা আসে সেমিনাল ভেসিকল, প্রোস্টেট গ্রন্থি এবং বালবোইউরেথাল গ্রন্থি থেকে। এই চারটি গ্রন্থির একটারও অবস্থান মেরুদন্ড এবং বুকের পাঁজরের মধ্যে নয়। অর্থ্যাৎ, নিঃসন্দেহেই কুরআন ভুল তথ্য দেয়।

ইসলামিস্টরা কুরআনের এই ভুলটি ভুল নয় প্রমাণ করার জন্য এযাবৎ অনেক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। আমি এই প্রবন্ধে ইসলামিস্টদের সেইসব ব্যাখ্যা সমূহের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরবো। তার আগে এই বিষয়টি আমি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবো যে আয়াতটি দ্বারা আসলে কি বুঝানো হয়েছে। আয়াতটি দ্বারা কি এটা বুঝায় যে বীর্য মেরুদণ্ড ও বুকের পাঁজরের মধ্যে থেকে উৎপন্ন হয়? নাকি আয়াতটি সেই অর্থ নির্দেশ করে না? এই বিষয়টি আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

আসুন, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তাফসীর হিসেবে পরিচিত বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইবনে কাসিরের তাফসীর এবিষয়ে কি বলে তা দেখে নেই:

[…] মানুষ সবেগে স্থলিত পানি অর্থাৎ নারী-পুরুষের বীর্য দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে। এই বীর্য পুরুষের পৃষ্ঠদেশ হতে এবং নারীর বক্ষদেশ হতে স্খলিত হয়। নারীদের এই বীর্য হলুদ রঙের এবং পাতলা হয়ে থাকে। উভয়ের বীর্যের সংমিশ্রণে শিশুর জন্ম হয়। […]

কুরআন ৮৬:৭

তাফসীর ইবনে কাসির

দেখুন ইবনে কাসিরের তাফসীর কি বলছে। ইবনে কাসিরের তাফসীর থেকে আমরা জানতে পারি যে, কুরআনের আয়াতে যে বীর্যের কথা বলা হয়েছে তা কেবল পুরুষের একার বীর্য নয়, বরং তা নারী-পুরুষ উভয়ের বীর্য। পুরুষের বীর্য স্খলিত হয়ে থাকে পুরুষের মেরুদণ্ড থেকে এবং নারীর বীর্য স্খলিত হয়ে থাকে নারীর বুকের পাঁজর থেকে। অর্থ্যাৎ, ইবনে কাসিরের তাফসীর থেকে আমরা জানতে পারি, সূরা তারিকের আয়াত ৭ এ যে তরলের কথা বলা হয়েছে তা হল নারী-পুরুষ উভয়ের মিশ্রিত বীর্য,  ‘মেরুদণ্ড’ শব্দটি পুরুষের বীর্যের জন্য ব্যাবহার করা হয়েছে এবং ‘বুকের পাঁজর’ শব্দটি নারীর বীর্যের জন্য ব্যাবহার করা হয়েছে (যদিও নারীর বীর্য বলে কিছু নেই, তবে এবিষয়ে এই প্রবন্ধে কোনো আলোচনা করবো না)। ইবনে কাসিরের তাফসীর থেকে পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায় যে, মেরুদণ্ডকে পুরুষের বীর্যের উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বুকের পাঁজরকে নারীর বীর্যের উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এখন আপনি বলতে পারেন, ” ইবনে কাসির তো আমাদের নবী নয়, তাহলে ইবনে কাসিরের ব্যাখাটাই যে আমাদের সঠিক বলে মানতে হবে এমন কোনো কথা আছে? ইবনে কাসির যে ব্যাখা দিয়েছেন সেই ব্যাখাটাই যে সঠিক তার প্রমাণ কি?”

হ্যাঁ ইবনে কাসির ইসলামের নবী নয়, কুরআনের আয়াতে যা বলা হয়েছে তা বুঝতে তার ভুলও হতে পারে। তার তাফসীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে তার তাফসীরে কোনো ভুল থাকতে পারে না এমনটা ধরে নেওয়ার কোনো মানে নেই। তবে কোনোরকম নিরীক্ষণ ছাড়াই তিনি আল্লাহর নবী নয় বলে তার তাফসীর এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক হবে না।

সূরা আল-আরাফ আয়াত ১৭২

وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا بَلَىٰ ۛ شَهِدْنَا ۛ أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَٰذَا غَافِلِينَ

ওয়া ইয আখাযা রাব্বুকা মিম বানীআ-দামা মিন জুহূরিহিম যুররিইইয়াতাহুম ওয়া আশহাদাহুম ‘আলাআনফুছিহিম আলাছতুবিরাব্বিকুম কা-লূবালা-শাহিদনা আন তাকূলূইয়াওমাল কিয়া-মাতি ইন্না-কুন্না-‘আন হা-যা-গা-ফিলীন।

আর যখন তোমার পালনকর্তা বনী আদমের পৃষ্টদেশ থেকে বের করলেন তাদের সন্তানদেরকে এবং নিজের উপর তাদেরকে প্রতিজ্ঞা করালেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই ? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। আবার না কেয়ামতের দিন বলতে শুরু কর যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।

গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৮১/ সদয় হওয়া (كتاب الرقاق)
হাদিস নম্বরঃ ৬৫৫৭

৮১/৫১. জান্নাত ও জাহান্নাম-এর বিবরণ।

৬৫৫৭. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ক্বিয়ামাতের দিন সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত লোককে আল্লাহ্ বলবেন, দুনিয়ার মাঝে যত সম্পদ আছে তার তুল্য সম্পদ যদি (আজ) তোমার কাছে থাকত, তাহলে কি তুমি তার বিনিময়ে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে? সে বলবে, হ্যাঁ। এরপর আল্লাহ্ বলবেন, আমি তোমাকে এর চেয়েও সহজ কাজের হুকুম দিয়েছিলাম, যখন তুমি আদামের পৃষ্ঠদেশে ছিলে। তা এই যে, তুমি আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। কিন্তু তুমি তা অস্বীকার করলে আর আমার সাথে শরীক করলে। [৩৩৩৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬১০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬১১১)

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৫২। কিয়ামাত, জান্নাত ও জান্নামের বর্ণনা (كتاب صفة القيامة والجنة والنار)
হাদিস নম্বরঃ ৬৯৭৬

১০. কাফির কর্তৃক পৃথিবীপূর্ণ স্বর্ণ মুক্তিপণ দিতে চাওয়া প্রসঙ্গ

৬৯৭৬-(৫১/২৮০৫) উবাইদুল্লাহ ইবনু মুআয আল আম্বারী (রহঃ) ….. আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) এর সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহান্নামীদের মাঝে যার শাস্তি সবচেয়ে কম হবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে বলবেন, পৃথিবী এবং পৃথিবীর মাঝে যা কিছু আছে সব কিছু যদি তোমার হয়ে যায়, তবে কি তুমি এসব কিছু মুক্তিপণ হিসেবে প্রদান করে নিজেকে আযাব থেকে রক্ষা করবে? সে বলবে, হ্যাঁ, অবশ্যই। তখন তিনি বলবেন, তুমি আদামের পৃষ্ঠে থাকা অবস্থায় আমি তো তোমার কাছে এর থেকেও সহজ জিনিস আশা করেছিলাম। তা হলো, তুমি শিরক করবে না। রাবী বলেন, আমার মনে হয়, তিনি বলেছেনঃ তাহলে আমি তোমাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাব না। কিন্তু তুমি তা উপেক্ষা করে শিরকে জড়িয়ে পড়েছে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৮২৪, ইসলামিক সেন্টার ৬৮৮০)

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

উপরে উল্লেখিত আয়াত ও হাদিস সমূহ থেকে পরিষ্কারভাবেই জানা যায় যে সন্তানের উৎস তার পিতার পিঠ অর্থ্যাৎ, মেরুদণ্ড। অর্থ্যাৎ, নিঃসন্দেহেই কুরআন এবং হাদিস অনুযায়ী, পুরুষের বীর্যের উৎস তার পিঠ বা মেরুদণ্ড।

অর্থ্যাৎ, কুরআনের সূরা আত-তারিক আয়াত ৭ এ বীর্যের মেরুদণ্ড ও বুকের পাঁজরের মধ্যে থেকে নির্গত হওয়া বলতে মেরুদণ্ড থেকে পুরুষের বীর্য আসা এবং বুকের পাঁজর থেকে নারীর যৌন তরল আসা বুঝানো হয়েছে। মেরুদণ্ড পুরুষের বীর্যের উৎস এবং বুকের পাঁজর নারীর যৌন তরলের উৎস।

কুরআন এবং হাদিস অনুযায়ী নারী-পুরুষ উভয়ের বীর্যের মিশ্রিত তরল বা মিশ্র বীর্য থেকেই মাতৃগর্ভে মানবসন্তানের উদ্ভব হয়।

সূরা আল-ইনসান  আয়াত ২

إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا

ইন্না-খালাকানাল ইনছা-না মিন নুতফাতিন আমশা-জিন নাবতালীহি ফাজা‘আলনা-হু ছামী‘আম বাসীরা- ।

আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র বীর্য থেকে, এভাবে যে, তাকে পরীক্ষা করব অতঃপর তাকে করে দিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন।

গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩। হায়য ঋতুস্রাব (كتاب الحيض)
হাদিস নম্বরঃ ৬০২

৭. মহিলার মানী (বীর্য) বের হলে তার উপর গোসল করা ওয়াজিব।

৬০২-(৩৩/…) ইবরাহীম ইবনু মূসা আর রায়ী, সাহল ইবনু উসমান ও আবূ কুরায়ব (রহঃ) ….. আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। এক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলল, মেয়েলোকের যখন স্বপ্নদোষ হবে এবং সে বীর্যরস দেখতে পাবে তখন কি সে গোসল করবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এরপর আয়িশাহ (রাযিঃ) মহিলাটিকে বললেন, তোমার উভয় হাত ধূলিময় হোক এবং তাতে অস্ত্রের খোচা লাগুক। তিনি [‘আয়িশাহ্ (রাযিঃ)] বলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ছেড়ে দাও ওকে (ভৎসনা করো না) সন্তান মা-বাবার সদৃশের কারণেই হয়ে থাকে। যখন স্ত্রীর বীর্য পুরুষের বীর্যের আগে জরায়ুতে প্রবেশ করে তখন সন্তানের আকৃতি তার মামাদের মতই হয়। আর যখন পুরুষের বীর্য মেয়েলোকের বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন তার আকৃতি চাচাদের মতই হয়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৬০৬, ইসলামিক সেন্টারঃ  ৬২২)

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এখন কথা হলো, সূরা তারিক আয়াত ৭ বলছে, পুরুষের বীর্য তার মেরুদণ্ড থেকে স্খলিত হয় বা নির্গত হয় বা আসে এবং নিঃসন্দেহেই সেটা একটি ভুল তথ্য।

এবার আমি এই আয়াতের ব্যাপারে ইসলামিস্টদের দাবি সমূহ এবং সেইসব দাবি সমূহের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরবো:

সূরা তারিকের ৭ নং আয়াতের ‘সাল্ব’ শব্দটি দ্বারা পুরুষের মেরুদণ্ডের যেকোনো অংশ বোঝায়, বিশেষভাবে কটিদেশীয় অংশ এবং কোমর (Loins)। আর এটি বলতে কোনো সমস্যা নেই যে একজন পুরুষের বীর্য তার কোমরের এরিয়া থেকে বের হয়ে আসে“।

 আরবী-ইংরেজী ডিকশনারি Len’s Lexicon থেকে আমরা জানতে পারি, আরবী শব্দ ‘সাল্ব’ এর অর্থ মেরুদণ্ডের যেকোনো অংশ, বিশেষভাবে কটিদেশীয় অংশ এবং কোমর। [1]

এখন কথা হলো, কুরআনের আয়াতটিতে যদি ‘সাল্ব’ শব্দটি দ্বারা আসলেই ‘কোমর’ বুঝানো হয়ে থাকে, তাহলে কি কুরআনের আয়াতটি নির্ভুল প্রমাণিত হয়? অবশ্যই নয়।

পুরুষের প্রজনন অঙ্গ সমূহের মধ্যে মেরুদণ্ড বা কোমর পড়ে না। প্রজননের সাথে পুরুষের মেরুদণ্ড বা কোমরের কোনো যোগসূত্র নেই। একজন পুরুষের মেরুদণ্ড বা কোমর প্রজননে কোনো ভূমিকা রাখে না। এখন আপনি যদি বলেন আয়াতটি দ্বারা এটা বুঝানো হয়েছে যে, একজন পুরুষের বীর্য তার কোমরের এরিয়া থেকে বের হয়ে আসে তাহলে সেটা আপনার নিজস্ব অনুমান ব্যতীত কিছুই না, কুরআনের লেখকও যে তা নির্দেশ করেছেন তার কোনো প্রমাণ নেই। কুরআনের এই আয়াতটিতে যদি ‘সাল্ব’ শব্দটি পুরুষের দেহের অংশ ও ‘তারাইব’ শব্দটি নারীর দেহের অংশ বুঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে তাহলে কুরআনের আয়াতটি আমাদের এই তথ্য দেয় যে পুরুষের বীর্য মেরুদণ্ড কিংবা কোমর থেকে বের হয়ে আসে বা নির্গত হয়, যা সঠিক নয়। আর এই আয়াত অনুযায়ী, একজন পুরুষের বীর্য যে তার মেরুদণ্ড বা কোমর থেকে বের হয়ে আসে কিংবা, তার মেরুদণ্ড বা কোমর যে তার বীর্যের উৎস কিংবা, তার মেরুদণ্ড বা কোমর যে প্রজননে ভূমিকা রাখে, সেটা আমরা কুরআন এবং হাদিসের তথ্য থেকেই নিশ্চিত হতে পারি। উপরে আগেই সেটা দেখানো হয়েছে। ‘বীর্য কোন অঙ্গ থেকে বের হয়ে আসে বা নির্গত হয়?’ এই প্রশ্নটির সঠিক উত্তরটি কুরআন দেয় না।

‘সাল্ব’ শব্দটি দ্বারা কোমরও (Loins) বোঝায়। আর কোমর শব্দটির সেকেন্ডারি ডেফিনেশন থেকে জানা যায়, কোমর শব্দটি ‘পুরুষের প্রজনন অঙ্গ সমূহ’ এর জন্য একটি ইউফেমিজম (কোমল বা পরোক্ষ অর্থের প্রকাশ)”

ইসলামিস্টদের এই ব্যাখায় সমস্যা হলো এই যে, ইংরেজি ভাষাতেই ‘কোমর’ শব্দটি দ্বারা কোমল বা পরোক্ষ অর্থে প্রজনন অঙ্গ সমূহ বোঝায়, আরবি ভাষায় নয়। ইসলামিস্টরা এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন না যা নিশ্চিত করে যে প্রাচীন আরবরা ‘কোমর’ শব্দটি দ্বারা কোমল বা পরোক্ষ অর্থে প্রজনন অঙ্গ সমূহ বোঝাতো।

Oxford English Dictionary অনুসারে Loins (কোমর) শব্দটির প্রাইমারি ডেফিনেশন [2] নিচে তুলে ধরা হলো:

শব্দটির সেকেন্ডারি ডেফিনেশন অনুযায়ী, শব্দটি যৌনাঙ্গ বা লজ্জা স্থান সমূহের জন্য একটি ইউফেমিজম। Oxford English Dictionary ও Online Etymology Dictionary [3] উভয় ডিকশনারিই তা নিশ্চিত করে:

ইউফেমিস্টিক সংজ্ঞাটি বর্ণনা করা হয়েছে ‘কারো যৌনাঙ্গ বা লজ্জা স্থান সমূহ’ হিসেবে, যা ষোড়শ শতাব্দীর সময় উদ্ভূত হয়। কোনো ইংরেজি শব্দের ষোড়শ শতাব্দীর সময় জন্ম হওয়া একটি সংজ্ঞাকে সপ্তম শতাব্দীতে ব্যাবহৃত হওয়া একটি আরবী শব্দের ওপর আরোপ করা অত্যন্ত হাস্যকর।

বীর্য সেমিনাল ভেসিকলে উদ্ভূত হয়, যা মেরুদণ্ড ও বুকের পাঁজরের মধ্যেই পড়ে” (খাড়াভাবে বা উপর থেকে নিচ বরাবর ধরা হলে)

এখানে প্রশ্ন এসে যায়, ‘মেরুদণ্ড ও বুকের পাঁজরের মধ্যে’ কথাটি খাড়াভাবে বা উপর থেকে নিচ বরাবর ধরে ব্যাখ্যা করা গ্রহনযোগ্য কিনা। এভাবে ব্যাখ্যা করলে ‘মেরুদণ্ড ও বুকের পাঁজরের মধ্যে’ কথাটি দ্বারা হাত পা ও মাথা বাদে পুরো শরীরেরই ভেতরের অংশকে নির্দেশ করা যাবে। নিচের চিত্রটি দেখুন:

হ্যাঁ ইসলামিস্টরা এই ব্যাখাটি ব্যবহার করে দাবি করতে পারেন যে সূরা তারিকের ৭ নং আয়াতটি সঠিক। তবে এই ব্যাখাটি কুরআনের আয়াতটিকে আরও বেশি সমস্যার মধ্যে ফেলে দেয়, কেননা এই ব্যাখাটি আয়াতটিকে অত্যন্ত অস্পষ্ট একটি আয়াত হিসেবে প্রমাণ করে।

ধরা যাক, কোনো স্কুলে গণিত পরীক্ষা হচ্ছে এবং সেই পরীক্ষার একটা প্রশ্ন হলো, ‘২৩৯৮৬ এবং ৪৯৬২৭ যোগ করলে কতো হয়?’ রাশেদ নামে একজন ছাত্র এই প্রশ্নের উত্তর লিখলো ‘কোনো এক সংখ্যা’, আবার শফিক নামে একজন ছাত্র উত্তর লিখলো ‘অনেক বড় একটি সংখ্যা’ এবং শ্রাবণী নামে একজন ছাত্রী উত্তর লিখলো ‘৭৩৬১৩’।

‘২৩৯৮৬ এবং ৪৯৬২৭ যোগ করলে কতো হয়?’ এই প্রশ্নের একেবারে সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর হলো ‘৭৩৬১৩’। তবে কি রাশেদ আর শফিকের উত্তর সঠিক নয়? হ্যাঁ তাদের উত্তরও সঠিক। ‘৭৩৬১৩’ সংখ্যাটি কোনো একটি সংখ্যাই। তাই কেউ যদি রাশেদের মতো বলে ‘৭৩৬১৩’ সংখ্যাটি ‘কোনো একটি সংখ্যা’, তাহলে ভুল কিছু বলা হয় না। আবার, ‘৭৩৬১৩’ সংখ্যাটি অনেক বড় একটি সংখ্যাও। তাই কেউ যদি শফিকের মতো বলে ‘৭৩৬১৩’ সংখ্যাটি ‘অনেক বড় একটি সংখ্যা’, তাহলেও ভুল কিছু বলা হয় না। রাশেদ আর শফিকের পরীক্ষার খাতা যে শিক্ষক দেখবেন তিনি কি তাদের এই প্রশ্নের উত্তর সঠিক বলে গ্রহণ করবেন এবং মার্কস দেবেন? অবশ্যই নয়, কোনো যুক্তিবাদী শিক্ষকই এমনটা করবেন না। কেন করবেন না? কারণ রাশেদ আর শফিকের উত্তরটি গ্রহণযোগ্য নয়। কেন গ্রহণযোগ্য নয়? কারণ, ‘৭৩৬১৩’ সংখ্যাটি কোনো একটি সংখ্যা হলেও সকল সংখ্যাকেই ‘কোনো একটি সংখ্যা’ বলা যায়। আবার, ‘৭৩৬১৩’ সংখ্যাটি অনেক বড় একটি সংখ্যা হলেও এমন সংখ্যার কোনো শেষ নেই যাদের ‘অনেক বড় একটি সংখ্যা’ বলা যায়। তাই ‘২৩৯৮৬ এবং ৪৯৬২৭ যোগ করলে কতো হয়?’ প্রশ্নটির উত্তরে ‘কোনো একটি সংখ্যা’ বা ‘অনেক বড় একটি সংখ্যা’ বলা হলে তা হবে খুবই অস্পষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য উত্তর!

একই সমস্যা কুরআনের আয়াতেও এসে পড়ে যদি সূরা তারিকের ৭ নং আয়াতের ‘মেরুদণ্ড ও বুকের পাঁজরের মধ্যে’ কথাটি খাড়াভাবে বা উপর থেকে নিচ বরাবর ধরে ব্যাখ্যা করা হয়। এভাবে ব্যাখ্যা করলে ‘মেরুদণ্ড ও বুকের পাঁজরের মধ্যে’ কথাটি দ্বারা হাত পা ও মাথা বাদে একজন মানুষের পুরো শরীরের ভেতরটাই নির্দেশ করা যায়। একজন পাঠকের এখানে বোঝার কোনো কায়দা নেই যে বীর্য আসলে দেহের কোথায় থেকে উদ্ভূত হয় বা বের হয়ে আসে। এখানে এটা বোঝারও কোনো কায়দা নেই যে কুরআনের লেখক আসলেই জানেন কিনা যে একজন মানুষের বীর্য তার দেহের ঠিক কোন জায়গা থেকে উদ্ভূত হয় বা বের হয়ে আসে।

তথ্যসূত্র:

1. “لبѧѧѧѧص) sulb)” Edward William Lane. An Arabic-English Lexicon. Librairie Du Liban. 1968. Vol.4, page 1712

2. “loin, n.” The Oxford English Dictionary. 2nd edition, 1989; online version June 2012.

3. “Loin”. Online Etymology Dictionary.

Marufur Rahman Khan

Ex-Muslim Atheist - Feminist - Secularist

4 thoughts on “কোরআন এবং বীর্যের উৎস

  • October 1, 2018 at 3:58 pm
    Permalink

    The term islam is no more applicable for the muslims. Mohammad first picked up this word meaning “Shelter” for the followers of Moses, Jesus and Mohammad. Later he dissociated the first two. Mohammad declared whatever he found suitable for his rising to power, all however, in the name of allah. His extreme shortage of knowledge is reflected in the above suras of quran.

    Reply
  • October 3, 2018 at 5:52 am
    Permalink

    Dear Asif Bhai,
    লেখালেখির কারনে আমার ফেইসবুক ডিসেবেল করে দিয়েছে। কিভাবে আমি আমার আইডি ফিরে পাবো যদি জানান তাহলে খুব উপকার হবে। আপনি একদিন লাইভে বলেছিলেন মাতুব্বর ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করতে কিন্তু তার ইমেইল আইডি আমার কাছে নেই। আপনি কাইন্ডলি আমার সমস্যাটা তার কাছে একটু জানাবেন। আমার ফেইসবুকে অনেক লেখালেখি আছে যেগুলো আমার ফিরে পাওয়া দরকার। তাছাড়া বন্ধু তালিকায় অনেক মুক্তমনা মানুষ ছিল।

    ধন্যবাদ আপনাকে।
    জুয়েল রানা (ডেভিড)।

    Reply
  • September 20, 2019 at 7:09 pm
    Permalink

    হাহাহাহা ভাই আপনি ওটা পরুষের বির্য না ধরে মেয়েদের বাচ্চা গর্ভাশয় ধরে মিলায়ে ব্যাখ্যা প্রদান করলে বুঝবেন হইত,,,,

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: