একজন ঈশ্বর বিশ্বাসী নাস্তিকের কথা

আমি একজন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি এবং তিনি সত্যিকার অর্থে সর্বশক্তিমান । একজন একাধিক না এবং পরকালে তার কাছ থেকে ভাল কাজের প্রতিদান আশা করছি। তবে আমি কি বিশ্বাস করি তা বলার আগে আমি কি বিশ্বাস করি না এবং কেন তা বিশ্বাস করিনা তা বলা প্রয়োজন় ।

আমি বিশ্বাস করিনা ইহুদীদের গির্জা থেকে প্রচারিত ধর্মীয় বিশ্বাস (ইহুদি ধর্ম),
রোমান গির্জা থেকে প্রচারিত ধর্মীয় বিশ্বাস (খ্রিস্টান ধর্ম) কিংবা
মুসলিম (Turkish church*) থেকে প্রচারিত ধর্মীয় বিশ্বাস (ইসলাম ধর্ম ) ।
কিংবা অন্য যত গির্জার কথা আমি শুনেছি।
আমার নিজের মনই (বিবেকই) আমার গির্জা, মন্দির বা মসজিদ ।

আমি এই ঘোষণা দিতে গিয়ে বলতে চাচ্ছিনা যে, যারা অন্য কিছু বিশ্বাস করে তাদেরকে আমি নিন্দা করছি। আমার যেমন নিজের বিশ্বাসের উপর আস্থা করার অধিকার আছে তেমনি তাদেরও অধিকার আছে নিজেদের বিশ্বাস ধরে রাখার।

ধর্মের বিশ্বাসের সাথে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের যেখানে ব্যাভিচার মূলক সম্পর্কটি হয়েছে- সেখানেই মানুষকে প্রতিষ্ঠিত ধর্ম গুলোর সমালোচনাকে হুমকি, ভয় আর অত্যাচারের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রতিটা ধর্ম তাকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এক ধরনের ঐশ্বরিক দায়িত্ব পালনের ভনিতা করে- বলে কিনা কোন একটা নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে তা ঈশ্বর একান্ত গোপনে অর্পণ করেছিল রেভেলেশন (Revelation) বা ঐশ্বরিক বাণীর মাধ্যমে।

ইহুদীদের আছে মুসা নবী।
খ্রিস্টানধর্মাবলম্বীদের আছে ইসা মাসীহ, তার এপাসল এবং পরবর্তীতে সেইন্ট সমূহ।
মুসলিমদের আছে হজরত মোহাম্মদ সা:।
সংগঠিত ধর্ম গুলোর দাবি এমন যে ঈশ্বরের দিকে যাবার বা ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগের রাস্তা সব মানুষের জন্য সমান ভাবে খোলা নাই কিংবা যেমন ঈশ্বর সবার সাথে যোগাযোগ করতে অক্ষম।

প্রতিটা গির্জা একটা করে নির্দিষ্ট বইয়ের কথা বলে এবং বলে যে এইটা ঈশ্বরের বাণী (বা রেভেলেশন/ উন্মোচন)

ইহুদিরা বলে তাদের ঈশ্বরের বাণী ঈশ্বর নিজে মুসাকে সামনাসামনি এসে দিয়ে গিয়েছিল।
খ্রিস্টানরা বলে তাদের ঈশ্বরের বাণী এসেছিল ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণার (divine inspiration) মাধ্যমে।
আর মোসলমানরা বলে তাদের ঈশ্বরের বাণী কোরআন মোহাম্মদের কাছে নিয়ে এসেছিল একজন ফেরেস্তা স্বর্গপুরী থেকে নেমে এসে। এদের প্রত্যেকে একে অন্যেকে অবিশ্বাসের দোষে দোষারোপ করে। আর আমি অবিশ্বাস করি এদের সবাইকে।

বাকি আলাপে যাবার আগে আমাকে বলে নিতে হচ্ছে ঐশ্বরিক বাণী বা রিভেলেশন কে ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে বোঝানো হয় এমন কিছু যা ঈশ্বর থেকে সরাসরি মানুষের কাছে দেয়া হবে। কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের এইভাবে যোগাযোগ করবার ক্ষমতার আছে এবং যদি চান এভাবে যোগাযোগ করতে উনি তা পারবেন – কারণ উনি সর্বশক্তিমান।

এখন আপনারা যদি বলেন একটা নির্দিষ্ট ঐশ্বরিক বাণী শুধু একজন ব্যাক্তির কাছে উন্মোচন করা হয় এবং অন্য কারো কাছে তা উন্মোচন না করা হয়, তাহলে ঐ ঐশ্বরিক বাণী শুধু ঐ ব্যক্তি জন্যে প্রযোজ্য- কারণ তার কাছেই শুধু এই ঐশ্বরিক বাণী উন্মোচন করা হয়েছে । কিন্তু এই তথাকথিত ঐশ্বরিক বাণী যখন সে দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে বলবে বা দ্বিতীয় ব্যক্তির থেকে কথাটা তৃতীয় ব্যক্তির কাছে লিখিত বা মৌখিক ভাবে পৌঁছাবে তাহলে তা আর তাদের কাছে ঐশ্বরিক বাণী থাকেনা । এটা একটা রিভলেশন বা ঐশ্বরিক বাণী হিসেবে থাকে শুধু মাত্র প্রথম ব্যক্তিটি কাছে কারণ সে নিজে তা পেয়েছে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় ব্যক্তির কাছে এইটা হয়ে যায় শোনা কথা- যে প্রথম ব্যক্তি দাবি করছে তার উপর নাকি ঐশ্বরিক বাণী নাজিল হয়েছে । (তাই সে প্রথম ব্যক্তি নিজে হয়তো ঐ বাণীতে বিশ্বাস রাখতে বাধ্য হবে ন ) তবে তার কাছে কি নাজিল হয়েছে তার কাছ থেকে শোনে কেউ তা বিশ্বাস করতে অন্যরা বাধ্য নয় কারণ তা তাদের উপরে নাজিল হয়নি । তা লিখিত বা মৌখিক ভাবে হোকনা কেন সেকেন্ড হ্যান্ড সোর্স থেকে আসা কোনো কিছুকে ঐশ্বরিক বাণী বলার কোনো যৌক্তিকতা নাই।

যখন মুসা ইসরাইলের সন্তানদের বলল যে সেই ঈশ্বরের হাত থেকে দুইটি টেবিলে লিপিবদ্ধ ঐশ্বরিক বাণী / কমান্ডমেন্ট পেয়েছেন তা ওদের বিশ্বাস করবার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিলনা কারণ মুসার মুখের কথা ছাড়া তাদের কাছে এমন কোন কর্তৃত্ব ছিলনা যে এটা বিশ্বাস করবে। এমনিভাবে আমার পক্ষেও এমন কোন কর্তৃত্ব নাই যে আমি ঐতিহাসিকদের কাছ থেকে শোনা এই ধরনের ভিত্তিহীন দাবির কথা মেনে নেব।

কমান্ডমেন্ট গুলো তে তেমন বিশাল কিছু ছিলনা যা ঈশ্বর থেকে আসতে হবে । হ্যাঁ তার মধ্যে কিছু কিছু নৈতিক আদেশ ছিল যা কিনা যে কোন আইন প্রণয়নকারী সে সময় নিজেই ঈশ্বরের পরামর্শ ব্যতীত তা প্রস্তুত করতে পারত।

একই রকমভাবে আমাকে যখন বলা হয় যে কোরআন স্বর্গের রচিত হয়েছিল এবং ফেরেশতার মাধ্যমে মোহাম্মদের কাছে আনা হয়েছিল তখন আমার কাছে তো একই রকমই শোনা কথা বলে মনে হবে – আমি নিজের চোখে যেহেতু ফেরেশতাকে দেখি নাই আমার বিশ্বাস না করার অধিকার বলবৎ আছে।

একই যুক্তিতে আমাকে যখন বলা হয় যে কুমারী মেরি নামক একজন নারী একটি শিশুকে জন্ম দিয়েছে কোনো প্রকার পুরুষ এর সাথে মেলামেশা ছাড়া এবং তার স্বামী জোসেফ তা জানতে পেরেছে কোন ফেরেস্তার কাছ থেকে আমি এই দাবি মেনে নিতে বাধ্য নই। এই ধরনের দাবি মেনে নেওয়ার পেছনে মুখের কথার চেয়ে বেশি কোন concrete যৌক্তিক প্রমাণ থাকা দরকার আছে। আর আমরা কোনভাবেই মেরি এবং জোসেফের নিকটবর্তী কেউ নই আর এবং এই প্রসঙ্গে জোসেফ কিংবা মেরি কেউই কিছু লেখে যায়নি একজনের থেকে আরেকজন শুনে শুনে গুজবের পড়ে গুজবের ভিত্তিতে এই কথা গুলো আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে সুতরাং এতে বিশ্বাস করবার কোনো যৌক্তিকতা নাই।

কোন অলৌকিক দাবি যদি আমার চোখের সামনে ঘটে তখন আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য তানাহলে আমাকে বিশ্বাস করবে প্রয়োজন দেখছি না। কারণ এটা হবে শোনা কথায় বিশ্বাস স্থাপন।
তারচেয়ে বড় কথা যিশুখ্রিস্টে ঈশ্বরের পুত্র ছিল এই দাবি করা হয়েছিল এমন একটা সময়ে যখন হিথেণ (heathen) মিথলজির ঈশ্বর রা এসে নারীদের সাথে sex করে যেত- তখন মুখে মুখে এরকম অনেকগুলো গুজব প্রচলিত ছিল যে ঈশ্বর নারীদের সাথে যৌন সম্পর্ক করে এবং সন্তান জন্ম দেয়। তাদের বর্ণনায় জুপিটার এসে শত শত নারীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে গেছে। এইরকম উর্বর গুজব চর্চার যুগে যিশুর গল্প প্রতিষ্ঠা বিশাল কোন কৃতিত্ব ছিল না লেখকের ভাষায়
“the story, therefore, had nothing in it either new, wonderful, or obscene; it was conformable to the opinions that then prevailed among the people called Gentiles, or Mythologists,”

( Thomas paine তার Age of Reason 1794 বইটির আংশিক বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে এই লেখাটা লিখলাম। লেখক তারপর সাংগঠনিক ধর্মগুরুর উপর বিশ্বাস না রাখার পক্ষে আরো অনেক যুক্তি উপস্থাপন করেন। বিজ্ঞ পাঠকদের অনেকেই স্ববিরোধী টাইটেলটা দেবার জন্য আমার সমালোচনা করবেন । কথা ঠিক, পেইন একজন ডিইস্ট ছিলেন । তবে যাদের ডিইজম এই সম্পর্কে ধারনা নেই তাদের বোঝার জন্য এভাবে ব্লগের টাইটেলটা দিয়েছি – কারন অনেকেই এটাকে সাত পাঁচ টা ধর্মের মত ভেবে বসে। পশ্চিমা বোধোদয় enlightenment আমেরিকান-ফরাসি বিপ্লব সময় নেতৃত্ব প্রদানকারী অনেক ব্যক্তিবর্গের ঈশ্বর সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি এইধরনের ছিল এবং তারা সংগঠিত গির্জার ক্ষমতায়নের বিরোধিতা করেছিল কঠোরভাবে।
এখানে বিশেষভাবে দর্শনীয় যে এই বইটি যখন লেখা হয়েছিল তখন তুর্কিশ ottoman empire অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল এবং * থমাস পেইন ইসলামকে তুর্কিদের গির্জার ধর্ম বলেছেন। আমি পাঠকদের জটিলতায় না ফেলবার জন্য ইসলাম শব্দটা ব্যবহার করেছি। খুব সম্ভবত ইসলাম শব্দটি তখনও ততটা সুপরিচিত ছিলনা। আপনাদের কারো এই সম্পর্কে কিছু জানা থাকলে মন্তব্য আশা করছি।)

প্রথম প্রকাশ ইস্টিশন মে ২৭, ২০১৮

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: