নৈতিকতার ধারণা এবং স্রষ্টার প্রয়োজনীয়তা।

তানভির মেহতাব সাব্বিরঃ ভাই আপনার নিকট আমার একটা বন্ধুর প্রশ্ন রয়েছে। যা আমা কর্তৃক করা হয়েছে; প্রশ্নটা ছিল এই রকম যে, “রাজীব হায়দার, অভিজিৎ দাদা, ওয়াশিকুর রহমান, নিলাদ্রী নিলয় প্রমুখ ব্যক্তিবর্গকে যে দূর্বত্তরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে, দুনিয়াতে যদি এই অপরাধের কোন শাস্তি না হয় তাহলে তো আপনার যুক্তিমতে পরকালেও শাস্তি হবে না তাই না? এই থেকে বুঝা যায়, অপরাধীর বিচার করার জন্য হলেও একজন সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন আছে।” অর্থাৎ, নৈতিকতার ধারণা আমরা কোথা থেকে পাবো?

উত্তরঃ
আপনার বলা, ” এই থেকে বুঝা যায়”  মানে আমি ঠিক বুঝলাম না। আপনি বলতে চাচ্ছেন, সৃষ্টিকর্তা আছে, নাকি সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন আছে? আপনার বলা বিভিন্ন ব্লগারের হত্যাকাণ্ড থেকে এরকম সিদ্ধান্তে কী আদৌ আসা যায়? পৃথিবীতে যদি এরকম বা যেকোন ধরণের অপরাধের সঠিক বিচার না হয়, তাহলে আমাদের প্রয়োজন হচ্ছে সেই বিচারের চেষ্টা করা। বিচার বিভাগ এবং শাসক কাঠামো মেরামত করা। যেখানে দুর্নীতি, যেখানে অন্যায় অবিচার, সেগুলো ঠিক করা। পুলিশ বিভাগকে শক্তিশালী করা, আদালতকে শক্তিশালী করা, সংবিধানকে আরও উন্নত করা। সেগুলো না করে অপরাধীর বিচারের জন্য একজন স্রষ্টা কল্পনা করে আমরা শুধু এক ধরণের মানসিক আরাম পেতে পারি। এর চেয়ে বেশি তো কিছু নয়।

যেমন ধরুন, আমার এক আত্মীয়ের অসুখ হয়েছে। তার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার টাকা নেই। আমি তাদের কিছু টাকা দিতে পারি, কিন্তু তা না দিয়ে আমি তাদের বললাম, তাদের জন্য আমি অনেক প্রার্থণা করবো। কিন্তু সেই প্রার্থণার চাইতে আসলে কিছু টাকা তাকে সুস্থ করতে পারতো। কিন্তু টাকা দিতে কষ্ট লাগে, তাই আমি তাঁকে যেটা দিলাম তা হচ্ছে কোন উপযোগহীন প্রার্থণা। তাতে তার কী লাভ হবে, সমাজেরই বা কী লাভ হবে? আমি এক ধরণের আরাম পেলাম যে, তাদের জন্য আমি প্রার্থণা করে অনেক কিছু করে ফেলেছি। সত্যি কথা হচ্ছে, আমি অলস এবং কিছু করতে ইচ্ছুক নই।

দেশের বিচার বিভাগ শক্তিশালী করাটা একটি পরিশ্রমের কাজ। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা ধীরে ধীরে ঠিক হবে। ঠিক হলে অপরাধীরা শাস্তি পাবে, কিংবা তাদের শোধরাবার সুযোগ দেয়া হবে। আমাদের সেটা করা প্রয়োজন। তা না করে সৃষ্টিকর্তা থাকা প্রয়োজন, এটা হচ্ছে স্রষ্টার হাতে বিচারের দায়িত্ব দিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাবার মত অলসতা। যেটা অশিক্ষিত, মূর্খ, বিশ্বাসভিত্তিক সমাজগুলো করে থাকে।

যাইহোক, এখন দেখা যাক, আসলেই সেই প্রয়োজন আছে কিনা।

ছোটবেলা আমার মা বলতেন, ভাত না খেলে ডাইনী বুড়ি ছালার ভেতরে ভরে আমাকে নিয়ে যাবে। বা দুষ্টুমি করলে ডাইনীবুড়ি আমাকে খুব শাস্তি দেবে। বড় হওয়ার পরে বুঝতে পারলাম, সেগুলো ছিল অল্পবয়সী আমাকে ভাত খাওয়াবার একটি কৌশল। বা আমার দুষ্টুমি থামাবার কৌশল। আমার মা জানতেন আমি ভাত খেতে চাইবো না, খালি দুষ্টুমি করবো, তাই আমাকে ভয় দেখাতেন। প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার পরে বুঝতে পারলাম, সেগুলো ছিল বানানো গল্প। ভাত না খেলে আমাকে কেউ ধরে নিয়ে যাবে না। দুষ্টুমি করলে আমাকে কেউ শাস্তি দেবে না। তাহলে আমি কেন ভাত খাবো? আমি কী ভাত খাওয়া ছেড়ে দেবো? আমার ভাত খাওয়ার জন্যেও কী একজন ডাইনী বুড়ি থাকার প্রয়োজন আছে? কিন্তু আমার ভাত খাওয়া না খাওয়া কী ডাইনী বুড়ির অস্তিত্ব প্রমাণ করে? বা আমি যেহেতু আমি জানলাম, ডাইনীবুড়ি বলে কেউ নাই, তাহলে কী আমি সারাদিন দুষ্টুমি করবো? এর ওর সাথে মারামারি করবো? আমার দুষ্টুমির শাস্তি দেয়ার জন্যেও কী একজন ডাইনী বুড়ি থাকা প্রয়োজন? নইলে আমি দুষ্টুমি করবো না কেন?

প্রয়োজন তো অনেকই আছে। আমার একজন বড়লোক বাবার প্রয়োজন ছিল, নইলে আমি একটি দামী গাড়ি কিনবো কীভাবে? কিন্তু আসলে বড়লোক বাবা আমার ছিল না, তাই দামী গাড়ীটিও কিনি নি। এখন বাসে করে আসা যাওয়া করছি। সত্যটা মেনে নিয়ে যে, আমার কোন বড়লোক বাবা নেই। সেই নিয়ে তাই আফসোসও নেই। আমি বলছি না, দামী গাড়ি কেনার জন্যে হলেও আমার একজন বড়লোক বাবা প্রয়োজন আছে। আমার দামী গাড়ি কেনার যত প্রয়োজনই থাকুক, তার ওপর আমার বড়লোক বাবা থাকা না থাকা নির্ভরশীল নয়। আমি মনে মনে একজন বড়লোক বাবাকে আছে এমন ভেবে নিয়ে খুব বড়লোকি ভাব নিয়ে চলাফেরা করতেই পারি, চাকরি বাকরি করা বন্ধ করে দিতে পারি, কিন্তু তাতে আমার একজন বড়লোক বাবা আছে তা প্রমাণ হয় না। এর মানে হচ্ছে, কোন কিছুর প্রয়োজনীয়তাই সেই জিনিসের অস্তিত্বের প্রমাণ নয়। তাহলে বাঙলাদেশে একজন সুপারম্যান বা রোবোকপের প্রয়োজন ছিল। আমার একজন বড়লোক বাবার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটা নেই। গেট রিয়েল এন্ড ওয়ার্ক হার্ড

যাইহোক। প্রাপ্তবয়ষ্ক হয়ে আমি মেনে নিয়েছি যে আমাদের মাথার ওপর কোন সুপারম্যান নেই, আমাদের দুই কাঁঁধে দুই ফেরেশতা বসে বসে আমাদের পাপ পূন্যের হিসেব লিখছে না। তাহলে? আমি খুন ধর্ষণ চুরি ডাকাতি শুরু করবো? ডাইনী বুড়ি নেই, ভাত না খেলে আমাকে কেউ ধরে নিয়ে যাবে না, এটা জানার পরে তাহলে আমি ভাত খাওয়া ছেড়ে দিই নি কেন? দুষ্টুমি করলে ডাইনী বুড়ি শাস্তি দেবে না, তাহলে আমি সারাদিন মারপিট করবো? না তো! আমি একজন শিক্ষিত বুদ্ধিমান মানুষ। সেগুলো কেন করবো?

কারণ আমি প্রাপ্তবয়ষ্ক। আমি বুঝেছি, আমার জ্ঞান দিয়ে যে, ভাত খাওয়া আমার শরীরের জন্য দরকার। প্রয়োজনীয় উপাদান আসে খাদ্য থেকে। কোন ডাইনীর ভয়ে ভীত হয়ে বা পুরষ্কারের লোভে নয়, নিতান্তই জ্ঞান হওয়ার কারণে আমি নিয়মিত খাওয়া দাওয়া করি এখন। কারণ আমি একজন বুদ্ধিমান মানুষ। আমি জানি না খেলে আমার শরীরে এক ধরণের সমস্যা দেখা দেবে। আমি অসুস্থ হয়ে যাবো। শরীরের অংশগুলো ঠিকভাবে কাজ করবে না।

বা আমি যদি সবার সাথে মারপিট করি, তাহলে আমিও ব্যাথা পাবো। আমার নিজের প্রয়োজনেই, আমি মারপিট থেকে দূরে থাকবও। যেন আমাকেও কেউ মারতে না পারে।

ঠিক একই ভাবে, আমরা সমাজে বসবাস করি। সমাজের কেউ অপরাধ করলে সমাজে নানা ধরণের সমস্যা সৃষ্টি হয়। সামাজিক নিয়মেই আমরা তাকে শাস্তি দিই। আমরা বিচার এবং আইন সৃষ্টি করেছি। সেগুলো সমাজের প্রয়োজনে ধীরে ধীরে মানুষ গড়ে তুলেছে। আমরা বুঝেছি, কেউ কারো অধিকার হরণ করলে আসলে আমার অধিকারটুকুও আমি ঠিকভাবে পাবো না। আমি যেন আমার অধিকারটুকু ঠিকঠাকভাবে পাই, তাই আরেকজনার অধিকার বিষয়েও আমার সচেতন হতে হবে।

সমাজে এই নিয়মগুলো কেন এবং কীভাবে গড়ে উঠেছে? এগুলো কী ঈশ্বর বলে দিয়েছে? না। এগুলো আমরা নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছি। যেমন ধর্ষণ করা খারাপ কেন? আজকে আমি কাউকে ধর্ষণ করলে, কাল অন্যেরাও আমার মেয়েকে ধর্ষণ করতে পারে। যদি কোন নিয়ম সমাজে না থাকে, তাহলে এরকম ধর্ষণ পালটা ধর্ষণ চলতেই থাকবে। বা আজকে আমি যদি কারও বাসায় ডাকাতি করি, কাল আমার বাসাতেও ডাকাতি হতে পারে। আমি আমার সম্পদ রক্ষার কারণেই অন্যের বাসায় ডাকাতি করবো না। সমাজবদ্ধ মানুষ এরকম নানা চুক্তির মাধ্যমে একত্রে বসবাস করে। যে, আমিও তোমার ক্ষতি করবো না, তুমিও আমার ক্ষতি করো না। প্রাচীনকালে এগুলো ছিল মৌখিক চুক্তি। আধুনিককালে এই চুক্তিগুলোকে বলা হয় রাষ্ট্রের সংবিধান বা দেশের আইন। মাঝে মাঝে কেউ কেউ চুক্তি ভঙ্গ করে, তখন সেই চুক্তি অনুসারেই তাকে শাস্তি পেতে হয়। কেউ যদি সেই শাস্তিটুকু না পায়, তাহলে সেই শাসন ব্যবস্থা এবংবিচার কাঠামো পরিবর্তন করতে হয়। চুক্তিগুলো সংশোধন করতে হয়।

যেমন ধরুন, স্বৈরাচারী এরশাদের সময় আমরা দেখছিলাম, এই চুক্তিগুলো কাজ করছে না। একজন অনেক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। সে মানুষ খুন করাচ্ছে, কোন বিচার ছাড়াই। আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করে সেই অবস্থার পরিবর্তন করেছি। কোন ঐশ্বরিক শক্তির আশায় বসে থাকি নি। বা এই সময়ে আমরা দেখছি, কিছু মানুষ অনেক ধনী হয়ে যাচ্ছে। এগুলো সেই সামাজিক চুক্তির লঙ্ঘন। আমাদের এই নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করা উচিত। পরকালে এরা শাস্তি পাবে, এটা ভেবে নেয়া আসলে এইসব দুর্নীতিবাজ, অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়া। এরা যেন সমাজের বিচারের সম্মুখীন না হয়, তার সুবিধা করে দেয়া। এই ক্ষমতাবান দুর্নীতিবাজ লোকেরাও আসলে সেটাই চায় যে, আপনারা তাদের পরকালের শাস্তির কথা ভেবে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় শাস্তির কথা ভুলে যান। তাদের অবাধে দুর্নীতি করতে দিন। এ কারণেই ধর্মপ্রবন দেশগুলো এত দুর্নীতিতে আক্রান্ত।

যদি ঈশ্বরকেই মানি, পরকালের পাপ পূন্যকেই মানি, তাহলে পৃথিবীতে বিচার ব্যবস্থা, আইনকানুন সবই আসলে অর্থহীন হয়ে যায়। পাপের বিচার তো আল্লাহই করবে, তাহলে পৃথিবীতে এত ঝামেলার দরকার কী? পরকালের হাতেই কী আমরা সব ছেড়ে বসে থাকবো? না, তা আমরা করি না। আমরা প্রাপ্তবয়ষ্ক বুদ্ধিমান মানুষেরা পরকালের লোভ বা ভয়ের কথা না ভেবে পৃথিবী এবং সমাজকে গুরুত্ব দিই। আমাদের জ্ঞান আছে, তাই আমরা জানি কেউ অপরাধ করলে সমাজের অংশগুলো দুর্বল হয়ে যায়। সমাজ অসুস্থ হয়ে যায়। তাই তাদেরকে আমরা শাস্তি দিই, বা শুধরে নেয়ার সুযোগ দিই।

এদের মধ্যে, যেমন ধরুন হিটলার, কোন শাস্তি না পেয়েই মারা গেছে। এত লক্ষ লক্ষ মানুষ মেরে সে কোন শাস্তি পেলো না। তাহলে?

আধুনিক কোন শাস্তিই প্রতিহিংসামূলক নয়। সেটা যতবড় অপরাধই হোক না কেন। আপনি যখন ভাবছেন, ইশ, হিটলার তো শাস্তি না পেয়েই মরে গেল! তখন আপনি আসলে তার ওপর প্রতিশোধটুকু না নিতে পারার আফসোস করছেন। আপনি আসলে তার বিচার চাচ্ছেন না, আপনার প্রতিহিংসার আগুনটুকু নেভাবার চেষ্টা করছেন।

মৃত মানুষের সাথে সাথে তার পাপ পুণ্য দোষগুণও শেষ। এক একজন হিটলার আমাদের অনেক ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা সেগুলো পেছনে ফেলে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আবার সব শুধরে নিয়েছি। আর কোন হিটলার যেন তৈরি না হয়, সেই শিক্ষা মানব সমাজ গ্রহণ করেছে। শিখেছে। তার জন্য আমরা শিক্ষাব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র কাঠামো সংশোধন করেছি। হিটলারের শাস্তি আমরা মানবিক মানব সমাজ তাকে দিয়েছি। তার নাম এখন ঘৃণার সাথে উচ্চারিত হয়। এর চাইতে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?

Facebook Comments
%d bloggers like this: