ধর্ষিত সাফিয়া

ইসলামের ইতিহাসে সাফিয়ার নাম অবিস্মরনীয় হয়ে আছে নবী মুহাম্মদের একজন স্ত্রী হিসেবে। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, সাফিয়ার সাথে মুহাম্মদের বিবাহের ঘটনাটি কেমন ছিল। কেন এই ঘটনাটি সমস্ত ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম একটি বিতর্কিত বিষয়। এবিষয়ে আরো বিস্তারিত জানার জন্য শুরুতেই যেটা জেনে নেয়া দরকার সেটা হলো, সাফিয়া ছিলেন একটি ইহুদী গোত্রের নেতা কিনানার নববধূ এবং কুরাইজা ও আন নাজির ইহুদী গোত্রের শীর্ষস্থানীয় নারী। মুহাম্মদ এবং তার সাহাবীগণ তার স্বামীকে হত্যা করে তাকে বন্দি করেন এবং জোরপূর্বক তাকে বিবাহ করেন।

উপরের এসব কথা আমরা বিভিন্ন উৎসের আলোকে ব্যাখ্যা করবো এবং এবিষয়ে মুসলিমদের বিভিন্ন দাবি বিশ্লেষণ করবো।

তার ইতিহাস

মুসলিমরা খাইবারের যুদ্ধে জয়ী হলে যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হয় এবং অন্যান্য নারী ও শিশুদের সাথে সাফিয়াকেও যুদ্ধবন্দি হিসেবে বন্দি করা হয় এবং গনিমতের মাল হিসেবে বণ্টন করে দিহইয়া কালবীরকে দেওয়া হয়। [1] ধনদৌলতের গোপন জায়গা খুঁজে পেতে কিনানাকে নির্যাতন এবং হত্যা করা হয়েছিলো, [2][3][4] একটি উৎস থেকে জানা যায়, সাফিয়া ও তার বিয়ের কেবল একদিন হয়েছিলো। [5] তিনি এতো রূপবতী ছিলেন যে মুসলিমরা তার প্রশংসা করতে শুরু করেন, [6] এবং তাই মুহাম্মদ সাফিয়াকে তার সামনে নিয়ে আসতে দিহইয়াকে আদেশ করেছিলেন। সাফিয়াকে দেখে মুহাম্মদ বলেন, “তাকে বাদে যেকোনো যুদ্ধবন্দিকে গ্রহণ করো” [7] এবং তিনি সাফিয়াকে নিজের জন্য পছন্দ করলেন। [8] মুসলিমরা মদিনায় ফিরে যাবার জন্য খাইবার ত্যাগ করেন এবং যাত্রাপথে সাদ্দুস সাহাবা নামক একটি স্থানে তারা থামেন, সেইসময় সাফিয়ার মাসিক শেষ হয়। [9] একটি ছোট দস্তুরখানে (খেজুর-ঘি ও ছাতু মিশ্রিত) হায়স নামক খানা দ্বারা বিয়ে ভোজের আয়োজন করা হয় এবং আশেপাশের সবাই একসাথে জড়ো হয়। [10] আবার, অন্য একজন বলেন, “… এ ওয়ালীমাতে গোশতও ছিল না, রুটিও ছিল না। কেবল এতটুকু ছিল যে, তিনি বিলাল (রাঃ)-কে দস্তরখান বিছাতে বললেন। তা বিছানো হল। এরপর তাতে কিছু খেজুর, পনির ও ঘি রাখা হল”। [11] তারপর মুহাম্মদ সেখানে তিন রাত অবস্থান করেন এবং সাফিয়ার সাথে বাসর করেন। [12] এ অবস্থা দেখেও মুসলিমরা বুঝতে পারছিলেন না যে, সাফিয়া মুহাম্মদের বিবিদের একজন বলে বিবেচিত হবেন নাকি যৌনদাসী বলে বিবেচিত হবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না মুহাম্মদ সাফিয়ার ওপর জোরপূর্বক পর্দা খাটিয়ে দিলেন। [13] সাফিয়াকে যুদ্ধবন্দি থেকে মুক্তিদানকে মুহাম্মদ সাফিয়ার বিয়ের মোহর হিসেবে গণ্য করেন। [14]

বিশ্লেষণ

হাদিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, সাফিয়ার ইচ্ছায় বিয়েটি হয় নি কিংবা সাফিয়ার এই বিয়েতে কোনো মত ছিলো না। তিনি বিয়ের আগ পর্যন্ত যুদ্ধবন্দিনী ছিলেন এবং যখন মুহাম্মাদ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, সাফিয়া দাসী নন বরং স্ত্রী হবেন তখন তিনি জানিয়ে দিলেন সাফিয়াকে যুদ্ধবন্দি থেকে মুক্তিদান করাই তার বিয়ের মোহর। হাদিসের ওপর নির্ভর করে এবিষয়টি একেবারেই পরিষ্কার যে, মুহাম্মদ কেন সাফিয়াকে নিজের জন্য নিয়েছিলেন। সাফিয়ার সামাজিক অবস্থান এই ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ হবে না, কারণ মুহাম্মদ খাইবারের ইহুদীদের সাথে বন্ধুসুলভ বন্ধন বজায় রাখার মনস্থ করেননি। প্রকৃতপক্ষে তিনি তাদেরকে জোরপূর্বক খাইবার থেকে বের করে দিতে চেয়েছিলেন, তবে ইহুদীরা মুহাম্মদের কাছে অনুরোধ করলেন, যেন তাদের সে স্থানে বহাল রাখা হয় এই শর্তে যে, তারা সেখানে চাষাবাদে দায়িত্ব পালন করবেন আর ফসলের অর্ধেক মুসলিমদেরকে দিবেন। [15]

কিছু মিথ্যে ও জাল বিবরণ ছাড়া এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়না যা নিশ্চিত করে, সাফিয়ার মুসলিম হওয়ার বাসনা ছিলো। তিনি দুটি গোত্রের প্রধান ইহুদী উপপত্নী ছিলেন যারা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো, তাই তার ধর্মগত ধর্মানুরাগ মুহাম্মদের দেখার বিষয় হবে না। তার ধনদৌলত যুদ্ধের লুণ্ঠিত দ্রব্য হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিলো, তাই ধনদৌলতও দেখার বিষয় হবে না। যেহেতু মুহাম্মদ সাফিয়াকে বন্দি করার আগ পর্যন্ত সাফিয়ার ব্যাপারে কিছুই জানতেন না এবং তার আগ্রহ কেবল তখনি জাগে যখন তিনি সাফিয়ার রূপের ব্যাপারে জানতে পারেন, সেহেতু একমাত্র ন্যায়সংগত ব্যাখ্যা হবে, মুহাম্মদ সাফিয়াকে বিয়ে করার মূল কারণ ছিলো কামলালসা। নিচে উল্লেখিত মুহাম্মদের একজন অনুসারীর বিবৃতির ওপর নির্ভর করে মুহাম্মদের এমন আচরণ তাকে ভন্ড প্রমাণ করে :

সংযোজিত বিবরণ

নিচে উল্লেখিত বিবরণ সমূহ সহিহ হাদিস ব্যতীত নিশ্চিত হতে পারেনা তবে তারপরও সেসব সাফিয়ার সাথে জড়িত :

যখন মুসলিমরা আল-কামুস (ব. আবুল হুকায়ক এর দুর্গ) দখল করলেন, বিলাল (একজন সাহাবি) সাফিয়াকে এবং আরেকজন মহিলাকে মুহাম্মদের সামনে আনলেন। তিনি তাদেরকে হত্যাকৃত ইহুদিদের মধ্যে দিয়ে নিলেন এবং সাফিয়ার সাথের মহিলা যখন তাদের দেখলেন তখন তিনি চিৎকার করলেন ও তার মুখে থাপ্পড় মারলেন এবং তার মাথায় ধুলাবালি ঢাললেন। মুহাম্মদ বললেন, “এই শয়তান মহিলাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাও”। তারপর তিনি সাফিয়াকে তার পিছনে রাখতে আদেশ করেন এবং তারপর তিনি তার আঙরাখা সাফিয়ার উপর ছুড়ে দেন, যা ইংগিত প্রদান করেন যে, তিনি সাফিয়াকে নিজের জন্য পছন্দ করেছিলেন। বলা হত যে, আল্লাহ্‌র নবী বিলালকে জিজ্ঞাস করেন, “বিলাল, তোমার কি কোনো সহানুভূতি নেই, যখন তুমি দুইজন মহিলাকে নিয়ে আসলে তাদের মৃত স্বামীদের সামনে দিয়ে?” [16]

এই গল্পটি গ্রহণযোগ্য নয়, কেননা সহিহ হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি যে, সাফিয়াকে দিহইয়া কালবীরের সাথে আনা হয়, অন্যকোন মহিলার সাথে নয়, কেবলমাত্র সাফিয়ার সৌন্দর্য নিয়ে মুহাম্মদের কৌতুহল পরিতৃপ্ত করার জন্য।

সাফিয়ার চেহারায় একটি দাগ ছিলো, এবং যখন মুহাম্মদ তাকে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন তখন তিনি তাকে বলেন যে, তার স্বামী তাকে এতো জোরে প্রহার করেছিলেন যে তিনি (তার স্বামী) তার (সাফিয়া) চোখ কৃষ্ণবর্ণ (প্রহার করে) করেন। তিনি বলেন, তিনি যখন তার স্বামী কিনানার সাথে বিবাহিত ছিলেন তখন তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেই স্বপ্নে চন্দ্র তার কোলে পতিত হয়। যখন তিনি তার স্বামীকে তা বললেন, তার স্বামী বলেন, “তারমানে তুমি হেজাজের রাজা মুহাম্মদকে কামনা কর” এবং তারপর তাকে প্রহার করেন। [17]

আরেকটি উৎস অনুযায়ী, কিনানার মৃত্যুর আগে সাফিয়া কেবল একদিনের জন্য তার স্ত্রী ছিলেন। কৃষ্ণবর্ণ হওয়া চোখ একদিনে কেবল একটি দাগে পরিণত হয় না। অর্থাৎ, আলোচ্য গল্প অনুযায়ী সাফিয়া তার স্বামীর সাথে একদিনের অধিক সময় ধরে বিবাহিত ছিলেন, যা প্রকাশ করে কেউ একজন সাফিয়ার স্বামীকে হত্যা করার এবং সাফিয়া নব্য বিধবা হওয়া সত্ত্বেও সাফিয়ার সাথে মুহাম্মদের ইদ্দতকাল পালন না করার নিদারুণ নিষ্ঠুরতা নরম করার উদ্দেশ্যে গল্পটি বানিয়েছেন।

আরেকটি বিবরণ অনুযায়ী, বিয়ে ভোজের পর সাফিয়া আবরিত ছিলেন, মুহাম্মাদ তাকে কনের তাঁবুতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার উটের পিঠে চড়ালেন। সকালবেলা, তিনি তাবুর পর্দার বিরুদ্ধে কারো খচমচে আওয়াজ শুনতে পেলেন। আবু আইয়ুব সেখানে ছিলেন, এবং তিনি তলোয়ার হাতে সারারাত পাহারা দিয়েছিলেন। মুহাম্মদ যখন তাকে সেখানে পাহারা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলেন তখন তিনি বলেন, তিনি সাফিয়াকে বিশ্বাস করেন না কারণ মুহাম্মদ তার স্বামীকে একদিন আগে হত্যা করেছিলেন। মুহাম্মদ তাকে তার সতর্ক প্রহরার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। [18]

গল্পটি সত্যি হলে এটি সহিহ হাদিসের বিবৃতিতে একটি কৌতুহলোদ্দীপক ঘূর্ণন এনে দেয়। গল্পটি প্রকাশ করে, সাফিয়ার স্বামীকে যেইদিন হত্যা করা হয় সেইদিনই মুহাম্মদ সাফিয়াকে ধর্ষণ করেন। যাইহোক, হাদিস অনুযায়ী বিয়ের আগে সাফিয়ার মাসিক পূর্ণ হয়েছিলো যা মদিনা যাওয়ার পথে ঘটেছিলো। এবিষয়টি আশ্চর্যজনক যদি মুহাম্মদ আসলেই একজন বন্দিনীর মাসিক পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করার নিয়ম পালন করেন। আমরা ইতিমধ্যে জানি, মুহাম্মদ ইদ্দত পালন করার নিয়ম মানেন নি। সেই উৎস যদি সত্য হয় যা বলে, সাফিয়ার স্বামী নিহত হওয়ার পূর্বে সাফিয়া কেবল একদিনের জন্য তার নববধূ ছিলেন, তাহলে ব্যাপারটি অসম্ভাব্য যে, খাইবার বিজয়ের সময় তার মাসিক চলছিলো। কোন ধরনের নারী তার বিয়ের সময় নির্ধারন করেন যখন তার মাসিক চলছে, বিশেষ করে যখন ইহুদিরা মনে করেন এরকম নারী হচ্ছেন “অপবিত্র” যার ভিত্তি আবার তোরাহতে বর্নিত কঠোর উদযাপনি নিয়মাবলি?

টিপিক্যাল ইসলামিক ডিফেন্স

মুসলিমদের দ্বারা সাফিয়ার গল্প বহুসংখ্যক জীবনী ও বইতে পুনরায় বলা হয়েছে। তবে মুসলিমদের এসব বর্ণনা সহিহ হাদিসের তথ্যের সাথে বৈপরীত্য তৈরি করে। এই আর্টিকেলে তার কিছুসংখ্যক উদাহরণ তুলে ধরা হলো :

মহানবী (সাঃ) এর বিবাহ : মুসলিমদের খাইবারের যুদ্ধ জয়ের পর যুদ্ধের সকল বন্দীদের সমবেত করা হয়। মহানবী (সাঃ) এর একজন সাহাবি, হযরত দিহইয়া কালবীর তাকে একজন দাসীর জন্য অনুরোধ করেন। মহানবী (সাঃ) তাকে একজন নির্বাচন করতে অনুমতি দেন। তদানুসারে, তিনি হযরত সাফিয়াকে নির্বাচন করেন। তবে অন্য একজন সাহাবি মহানবী (সাঃ) এর মনোযোগে আনেন যে দিহইয়া বানু নাজির এবং বানু কুরাইজা গোত্রের প্রধান নারীকে নির্বাচন করেছেন। তিনি বোঝান, একটি আরব গোত্রের প্রধান নারীর সাথে একজন সাধারণ নারী হিসেবে আচরণ করা উচিৎ নয়। তাই মহানবী (সাঃ) দিহইয়া কালবীরের জন্য অন্য একজন নারীকে তার দাসী হিসেবে বরাদ্দ করলেন। তারপর তিনি হযরত সাফিয়ার দাসত্বমোচন করলেন এবং তাকে বিয়ে করলেন। (Bukhari)

আরেকটি বিবরণ অনুযায়ী, হযরত সাফিয়া হযরত দিহইয়ার জন্য বরাদ্দ হয়েছিলেন। মহানবী (সাঃ) বন্দীদের কার্য দর্শন করতে অবিরাম শিবিরে গেলেন। হযরত সাফিয়া তার ঘটনা মহানবী (সাঃ) কে বলেন যে তিনি তার গোত্র প্রধানের মেয়ে, তিনি আরও ভালো ব্যবস্থার যোগ্য। মহানবী (সাঃ) তার মিনতিপূর্বক গবাদিপশুর সাত মাথার বিবেচনার ওপর হযরত দিহইয়ার কাছ থেকে তার দাসত্বমোচন করেন। তারপর হযরত সাফিয়া সত্য দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করার দাওয়াত পান। হযরত সাফিয়া ইতিমধ্যে ইসলামের প্রতি আগ্রহদীপ্ত ছিলেন এবং অতঃপর তিনি ইচ্ছাপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর মহানবী (সাঃ) তাকে বিয়ে করেন। (Usudul Ghaba)

মদিনার পথে মহানবী (সাঃ) সাহবা নামক একটি জায়গায় সাময়িকভাবে থামেন যেখানে তিনি বিয়ে ভোজের আয়োজন করেন। সাহবা থেকে যাত্রা শুরুর সময়ে, মহানবী (সাঃ) হযরত সাফিয়াকে নিজের উটের পিঠে চড়ান এবং নিজের পোশাক দ্বারা তাকে ঢেকে দেন যা ইংগিত প্রদান করে, তিনি এখন তার বিবি হয়েছেন। ইসলামের নবীর সাথে বিয়ে হওয়ার পর তিনি সবচেয়ে সৌভাগ্যবান নারী ভেবে খুশিতে সাফিয়া তার পরিবারের সাথে ঘটা দুঃখজনক ঘটনা ভুলে যান।

Ahmed, Dr. (Mufti) M. Mukarram. (2005) Encyclopaedia of Islam. (pp 163-164). New Delhi: J.L. Anmol Publications Pvt. Ltd

প্রথমত, সাফিয়া এ বিয়েতে রাজি ছিলেন বা, সাফিয়া বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন এবং স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছিলেন, এমন কোনো তথ্য কোনো সহিহ হাদিসে খুঁজে পাওয়া যায়না। সাফিয়া আগে থেকেই ইসলামের প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়েছিলেন, এরকম কোনো তথ্যও কোনো সহিহ হাদিসে খুঁজে পাওয়া যায়না। বিয়েতে সাফিয়ার রাজি থাকা না থাকার কথা নাহয় বাদ দিলাম, তারপরও সাফিয়ার আগে থেকেই ইসলামের প্রতি আগ্রহ থাকা এবং বিয়ের আগে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত পেয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করার মতো বিশাল ব্যাপার কেন কোনো সহিহ হাদিসে বর্ণিত নেই? সাফিয়ার বিয়ে বিষয়ক এতো হাদিস থাকা সত্ত্বেও কেন কোনো সহিহ হাদিস এমন তথ্য দেয় না যে, সাফিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো এবং তিনি স্বেচ্ছায় বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন বা, তিনি আগে থেকেই ইসলামের প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং ইসলামের দাওয়াত পেয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন?

দ্বিতীয়ত, যিনি সাফিয়ার বাবা, চাচা, ভাই, স্বামী এবং অন্যান্য সকল পুরুষ স্বজনকে হত্যা করেছেন, যিনি সাফিয়া এবং তার অন্যান্য নারী স্বজনকে বন্দি করেছেন, তাকে সাফিয়া স্বেচ্ছায় বিয়ে করবেন এবং তার সাথে স্বেচ্ছায় বিছানায় চলে যাবেন, এরকম ভাবনার সত্যি কোনো অর্থ নেই। বিশেষভাবে মেয়েদেরকে প্রশ্নটা করছি, একটু কল্পনা করে দেখুন, একজন লোক আপনার পুরো পরিবার হত্যা করে আপনাকে পরিবার হারা করে আপনাকে বন্দি করেছেন, সেই লোককে কি আপনি স্বেচ্ছায় বিয়ে করে স্বেচ্ছায় তার সাথে বিছানায় যেতে পারবেন? কাল যেই লোক আপনার পুরো পরিবার হত্যা করেছেন আজ সেই লোকের সাথে আপনি স্বেচ্ছায় যৌনসংগম করতে পারবেন?

সাফিয়া নিজের পুরো পরিবার হারানোর শোক একদিনের মধ্যে কাটিয়ে স্বেচ্ছায় বিয়ের পিড়িতে বসেছিলেন, এমন ধারনার কোনো মানে নেই! আজ আপনি আপনার পুরো পরিবার হারালে কালকেই আপনার স্বেচ্ছায় বিয়ে করার মানসিক অবস্থা থাকবে না!!

নিচে লিখিত উদ্ধৃতি সমূহ “Umm ul-Mukminin Safiyyah: The Jewish Wife of Muhammad” (by Mohd Elfie Nieshaem Juferi) থেকে তুলে ধরা হলো :

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে হযরত সাফিয়া (রাঃ) এর বিয়ে

“সাফিয়া ছিলেন হুয়ায় ইবনে আখতাবের কন্যা, যিনি যেমন বানু নাজির গোত্রের নেতা ছিলেন তেমন ইহুদী পন্ডিত ছিলেন। তিনি (সাফিয়া) মুসলিমদের যুদ্ধবন্দি হন যখন তারা খাইবারের নগরদুর্গ আল কামুস দখল করেন। যখন মহানবী (সাঃ) এর একজন সাহাবি তার দাসত্ব সম্পর্কে জানতে পারেন তখন তিনি মহানবী (সাঃ) এর কাছে যেয়ে একটি পরামর্শ দেন যে যেহেতু, তিনি বানু আল নাজির গোত্রের একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন সেহেতু কেবল মহানবী (সাঃ) তাকে বিয়ে করার জন্য মানানসই। মহানবী (সাঃ) তার পরামর্শের সাথে একমত হলেন এবং তার (সাফিয়ার) স্বাধীনতা মেনে নিলেন এবং তাকে বিয়ে করলেন।”

খেয়াল করুণ, লেখক এই তথ্যটি একেবারেই উল্লেখ্য করেননি যে, মুহাম্মদ সাফিয়াকে নিজের জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করেননি যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি দেখেছেন সাফিয়া সত্যি কতো সুন্দর!

সাফিয়া (রাঃ) কে বিয়ে করার এমন অর্থপূর্ণ কাজ প্রকৃতপক্ষে তার জন্য অত্যন্ত মর্যাদার, এটি কেবল তার মর্যাদা রক্ষা করেনি বরং, এটি তার একজন দাসী হওয়া প্রতিরোধ করেছে। হায়কাল উল্লেখ্য করেন :

নবী তাকে স্বাধীনতা প্রদান করেন এবং বিয়ে করেন, মহান বিজয়ীদের উদাহরণ অনুসরণ করে যারা সেইসব রাজাদের কন্যা এবং বিবিদের বিয়ে করেছিলেন যাদের তারা পরাজিত করেছিলেন, কিছু মাত্রায় তাদের শোকাবহ ব্যাপার উপশম করতে এবং কিছু মাত্রায় তাদের মর্যাদা বজায় রাখতে। (1)

যদি যৌনতা ছাড়া অন্য কোনো কারনে দখলদাররা দখলকৃত রাজাদের কন্যা ও স্ত্রীদের বিয়ে করতো, সেটা হচ্ছে নিজেদেরকে নতুন শাসক হিসাবে বৈধতা দিতে। সেসব নারীদের অনুভূতি এবং মর্যাদা নিয়ে বিজয়ীদের মাথাব্যথা ছিলো না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে নর্মান বিজয়ীরা নিজেদেরকে নতুন শাসক হিসেবে বৈধতা কদাচিৎ অসবর্ণ বিয়ে ব্যবহার করতেন।

একজন নারীর পরিবারের সকল পুরুষ হত্যা করে, তাদের সমস্ত ধনদৌলত নিজেদের নামে দখল করে, তাকে মা হারা বাবা হারা ভাই হারা স্বামী হারা করে জোরপূর্বক বিয়ে করাকে মর্যাদা দান করা বলেনা, আর এবিষয়টি আপনি অবশ্যই বুঝবেন যদি আপনার মধ্যে কমন সেন্স থাকে।

সাফিয়া (রাঃ) এর বিয়ের একটি রাজনৈতিক মমার্থও ছিলো, কেননা বিয়েটি যুদ্ধবিগ্রহ দমন করতে এবং মিত্রতা জুড়তে সাহায্য করেছে। John L. Esposito উল্লেখ্য করেন :

আরব প্রধানদের জন্য, অনেক বিবাহই ছিলো মিত্রতা জুড়তে রাজনৈতিক বিবাহ। (2)

আমরা ইতিমধ্যেই হাদিস থেকে জেনেছি যে, যুদ্ধবিগ্রহ শেষ করা এবং মিত্রতা তৈরি করা মুহাম্মদের লক্ষ্য ছিল না, যিনি ইহুদীদেরকে নির্বাসিত করতে চেয়েছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে, যখন বিলাল ইবনে রাবাহ (রাঃ), নবী (সাঃ) এর একজন সাহাবি, অন্য একজন ইহুদী মহিলার সাথে সাফিয়াকে যুদ্ধে নিহত হওয়া ইহুদিদের মধ্যে দিয়ে নবী (সাঃ) এর নিকট আনেন, তখন মুহাম্মদ (সাঃ) ব্যক্তিগতভাবে বিলালকে ভর্ৎসনা করেন এবং বলেন, “বিলাল, তোমার কি কোনো দরদ নেই, যখন তুমি দুইজন মহিলাকে নিয়ে আসলে তাদের মৃত স্বামীদের সামনে দিয়ে? (3)

অবশ্যই লেখক এটি প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, সাফিয়ার স্বামী ঠিক কিভাবে মারা যান। কিনানা যুদ্ধে নিহত হন নি। তিনি নির্মমভাবে মুসলিমদের হাতে নির্যাতিত এবং নিহত হন গোপন ধনদৌলতের সন্ধানের জন্য। একজন প্রকৃত সহানুভূতিশীল মানুষ কখনওই একজন বন্দির নির্যাতন এবং হত্যায় জড়িত হবেন না।

সাফিয়া (রাঃ) যে মহানবী (সাঃ) এর মৃত্যু অব্ধি তার অনুগত ছিলেন তা সবাই জানে। (4) নিচে উল্লেখিত প্রস্তাব মহানবী (সাঃ) সাফিয়া (রাঃ) কে করেন, যা Martin Lings লিপিভুক্ত করেন :

তিনি (নবী মুহাম্মদ) তারপর সাফিয়াকে বলেন যে, তিনি তাকে মুক্ত করতে প্রস্তুত এবং তিনি তাকে (সাফিয়া) ইহুদী হয়ে থেকে ইহুদীদের কাছে ফিরে যাওয়া অথবা, ইসলামে প্রবেশ করে তাকে বিয়ে করার মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। তিনি (সাফিয়া) বললেন, “আমি আল্লাহ্‌ এবং তার নবীকে গ্রহণ করলাম”। তারপর তারা স্বদেশাভিমুখ যাত্রার প্রথম থামার স্থানে বিয়ে করলেন। (5)

লেখকের উল্লেখিত বিবরণটি লেখকের নিজ বর্ণনার সাথেই বৈপরীত্য তৈরি করে। খেয়াল করুণ, লেখক উপরে বলেছেন, বিয়েটি কেবল সাফিয়ার মর্যাদা রক্ষা করেনি বরং তাকে একজন দাসী হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। অর্থাৎ, বিয়ে না হলে সাফিয়াকে একজন যৌনদাসী হতে হত। অথচ, মার্টিন লিংসের লিপিভুক্ত বিবরণটি বলছে, সাফিয়াকে দুটি পছন্দ দেওয়া হয়েছিলো, ইহুদী হয়ে থেকে ইহুদীদের কাছে ফিরে যাওয়া অথবা ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মদকে বিয়ে করা। অর্থাৎ, মার্টিন লিংসের লিপিভুক্ত বিবরণ অনুযায়ী, বিয়ে না হলে সাফিয়া স্বাধীন হয়ে ফিরে যেতে পারতো।

যাইহোক, সাফিয়ার বিয়ে বিষয়ক সহিহ হাদিস সমূহের কোথাও এমন তথ্য আসেনি যে, তাকে ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের নবীকে বিয়ে করা অথবা, স্বাধীন হয়ে ইহুদিদের কাছে ফিরে যাওয়ার দুটি পছন্দ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও যদি মার্টিন লিংসের বিবরণ সত্য হয়, তাতে প্রমাণিত হয় না যে, সাফিয়া ইসলাম গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিলেন এবং মন থেকে মুহাম্মদকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলেন।

সাফিয়ার স্বামীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়, তার বাবা চাচা ভাই এবং অন্যান্য পুরুষ স্বজনদেরকেও হত্যা করা হয়। তার নারী স্বজনদেরকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে বন্দি করা হয়। পরিবার পরিজন সবাইকে হারিয়ে সে হয়েছিল একজন অনাথা। সে কোথায় যেতে পারতো? বিয়েটা যদি না হতো তাহলে সাফিয়া অন্য কোনো মুসলিমের যৌনদাসী হয়ে যেত।

লেখক বলেছেন, সাফিয়া মুহাম্মদের মৃত্যু অব্ধি তার অনুগত ছিলেন, তবে তাতে প্রমাণিত হয় না যে, বিয়ের সময় বিয়েতে সাফিয়ার আগ্রহ ছিল এবং তিনি স্বেচ্ছায় মুহাম্মদের সাথে যৌনসংগম করেছিলেন।

Sources:

1. Muhammad Husayn Haykal, The Life of Muhammad (North American Trust Publications, 1976), p. 373

2. John L. Esposito, Islam: The Straight Path, pp. 19-20

3. A. Guillaume (trans.), The Life of Muhammad: A translation of Ibn Ishaq’s Sirat Rasul Allah (Oxford University Press, 1978), p. 515

4. An account of how Safiyyah’s loyalty was affirmed by the Prophet(P) himself is recorded in Muhammad Husayn Haykal, op. cit., p. 374, of which an online document can be found.
5. Martin Lings, Muhammad: His Life Based On The Earliest Sources (George Allen & Unwin, 1983), p. 269

উপসংহার

সহিহ হাদিস সমূহ থেকে আমরা জানতে পারি যে, সাফিয়া বিয়ের আগ পর্যন্ত যুদ্ধবন্দি হিসেবে বন্দি ছিলেন, যা নিশ্চিত করে যে সাফিয়ার ইচ্ছানুযায়ী বিয়ে হয় নি। সাফিয়ার বিয়ে বিষয়ক এতো সহিহ হাদিস থাকা সত্ত্বেও কোথাও এমন তথ্য আসেনি যা বলে, সাফিয়া ইসলাম গ্রহণ করতে এবং মুহাম্মদকে বিয়ে করতে আগ্রহী ছিলেন, যা এড়িয়ে যাওয়ার মতো বিষয় নয়।

সাফিয়ার বাবা এবং চাচাকে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিলো, তার স্বামীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিলো, তার সকল ভাই ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে পুরুষদের হত্যা করা হয় এবং আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে নারীদের যুদ্ধবন্দি হিসেবে বন্দি করা হয়। সাফিয়া তার বন্দিকারী এবং তার বাবা চাচা ভাই ও স্বামীর হত্যাকারীর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেছিলেন এবং স্বেচ্ছায় তার সাথে যৌনসংগম করতে বিছানায় চলে গিয়েছিলেন, এরকম ধারনা একেবারেই অর্থহীন, অবাস্তব এবং অস্বাভাবিক। মানসিকভাবে সুস্থ একজন নারী নিজের পুরো পরিবার হারানোর ভয়াবহ শোক রাতারাতি ভুলে স্বেচ্ছায় বিয়ে করে বিছানায় চলে যাবেন যৌনসংগম করতে এমন ধারনার সত্যি কোনো মানে নেই!

References

  1. Sahih Bukhari 2:14:68
  2. Ishaq. I (Author), Guillaume. A (Translator). (2002). The Life of Muhammad. (p. 515). Oxford University Press
  3. Tabari vol. 8, p.123
  4. Muir, Sir William. (1878). The Life of Mahomet, New Edition. (pp. 390-391) London:Smith, Elder and Co.
  5. Muir, Sir William. (1878). The Life of Mahomet, New Edition. (pp. 392) London:Smith, Elder and Co.
  6. Sahih Muslim 8:3329
  7. Sahih Bukhari 1:8:367
  8. Sahih Bukhari 3:34:437
  9. Sahih Bukhari 5:59:522
  10. Sahih Bukhari 4:52:143
  11. Sahih Bukhari 5:59:524
  12. Sahih Bukhari 5:59:524
  13. Sahih Bukhari 5:59:524
  14. Sahih Bukhari 5:59:512
  15. Sahih Bukhari 3:39:531
  16. Ishaq. I (Author), Guillaume. A (Translator). (2002). The Life of Muhammad. (p. 515). Oxford University Press
  17. Ishaq. I (Author), Guillaume. A (Translator). (2002). The Life of Muhammad. (p. 515). Oxford University Press
  18. Muir, Sir William. (1878). The Life of Mahomet, New Edition. (pp. 392-393) London:Smith, Elder and Co.
Facebook Comments

Marufur Rahman Khan

Atheist, Feminist

Leave a Reply

%d bloggers like this: