আপনি কি জানেন ব্রাহ্মণই প্রকৃত দেবতা? – মনুসংহিতা ও ব্রাহ্মণ্যবাদ

ব্রাহ্মণের উৎপত্তি

মানুষ ও জীবজগতের উদ্ভব সম্বন্ধে যদি বিবর্তন তত্ত্বের কথা শুনে থাকেন, তবে তার কথা ভুলে যান। শুনুন, মনুস্মৃতিতে বর্ণিত মানবের উৎপত্তির কথা। একদিন সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি ব্রহ্মার মানব সৃজনের ইচ্ছা হলে  তিনি তার বিভিন্ন অঙ্গ থেকে ব্রাহ্মণ ,ক্ষত্রিয় , বৈশ্য ও শূদ্রকে সৃষ্টি করেন। একই প্রজাতির প্রাণী-সৃষ্টির এমন অদ্ভুত কাহিনী অন্য কোনো ধর্মের উপকথায় আছে কিনা জানা নেই।

মনুসংহিতা মতে,

“সর্বস্যাস্য তু সর্গস্য গুপ্ত্যর্থং স মহাদ্যুতিঃ।
মুখবাহূরুপজ্জানাং পৃথক্ কর্মাণ্যকল্পয়ৎ।। (মনুসংহিতা-১/৮৭)
অর্থাৎ : এই সকল সৃষ্টির অর্থাৎ ত্রিভুবনের রক্ষার জন্য মহাতেজযুক্ত প্রজাপতি ব্রহ্মা নিজের মুখ, বাহু, উরু এবং পাদ– এই চারটি অঙ্গ থেকে জাত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের পৃথক পৃথক কার্যের ব্যবস্থা করে দিলেন।”

স্রষ্টা প্রজাপতি  যে কেবল ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের মানুষদের সৃষ্টি করলেন, তাই নয়, তিনি সকলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নির্দিষ্ট কাজের ব্যবস্থাও করে দিলেন। কোনো কর্ম স্বেছায় গ্রহণ বা বর্জনের স্বাধীনতা  মানুষের আর রইলো না-

ব্রহ্মা তপস্যা করে দেবলোক ও পিতৃ লোকের হব্যকব্য বহনের জন্য এবং জগত সংসারের রক্ষার জন্য নিজের মুখ থেকে প্রথমে ব্রাহ্মণকে সৃষ্টি করলেন।। ১/৯৪

ব্রাহ্মণের কাজ স্থির করলেন, অধ্যাপন,অধ্যয়ন,যজন, যাজন ইত্যাদি-

“অধ্যাপনমধ্যয়নং যজনং যাজনং তথা।
দানং প্রতিগ্রহঞ্চৈব ব্রাহ্মণানামকল্পয়ৎ।। (মনুসংহিতা-১/৮৮)
অর্থাৎ : অধ্যাপন, স্বয়ং অধ্যয়ন, যজন, যাজন, দান ও প্রতিগ্রহ (উপহার বা দান-সামগ্রি গ্রহণ)– এই ছয়টি কাজ ব্রহ্মা ব্রাহ্মণদের জন্য নির্দেশ করে দিলেন।”

ক্ষত্রিয়ের জন্য অধ্যয়ণ,প্রজারক্ষণ ইত্যাদি কাজ স্থির করলেন। বৈশ্যের জন্য অধ্যয়ণ,পশুরক্ষা,বাণিজ্য ইত্যাদি কাজ স্থির করলেন, আর শূদ্রের জন্য স্থির করলেন তিন বর্ণের সেবা/ দাসত্ব করা।

তবে ব্রহ্মা, ব্রাহ্মণের পেটের ভাত নিশ্চিত করার জন্য স্পষ্ট ভাবেই বলে দিলেন, একমাত্র ব্রাহ্মণেরই অধ্যাপনের কাজ করা উচিত ,অন্য বর্ণের অধ্যাপন  করা উচিত নয়-

  • “শাস্ত্রে বলা আছে ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য এই তিন দ্বিজাতি সর্বদাই নিজ নিজ ধর্মে নিরত থেকে বেদাধ্যয়ণ করবেন। কিন্তু একমাত্র ব্রাহ্মণই বেদের অধ্যাপনা করবেন। এর থেকেই বোঝা যায় যে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য- এই দুই দ্বিজ কখনোই বেদের অধ্যাপনা করবেন না। অর্থাৎ তারা যদি অনাপতকালে অধ্যাপনা করেন তাহলে তাদের অধিক প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।”  ১০/১

উচ্চ তিন বর্ণের অর্থাৎ ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের কাজ নির্দিষ্ট হলেও আপাতকালে অর্থাৎ কঠিন পরিস্থিতিতে অথবা যদি কখনো প্রাণসংশয় দেখা দেয় তবে তারা অন্য জাতির বৃত্তি অবলম্বন করে নিজেদের প্রাণ রক্ষা করতে পারতো। কিন্তু অন্য সবার তুলনায় ব্রাহ্মণের পেট নিয়েই দেখি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা বেশি চিন্তিত ছিলেন। তাই তিনি বলে দিলেন, অত্যন্ত বিপদে পড়লেও কখনোই ব্রাহ্মণের পেটের ভাতে (অর্থাৎ অধ্যাপন প্রভৃতি কাজে) অন্যান্য বর্ণের  টান মারা উচিত নয়।

মনুতে বর্ণিত আছে,

  • “ব্রাহ্মণ বিপদে পড়লে যেমন অন্য জীবিকা গ্রহণ করতে পারেন সেইরূপ ক্ষত্রিয় বিপন্ন হলে অন্য জীবিকা গ্রহণ করবেন। কিন্তু কখনোই ব্রাহ্মণের বৃত্তি অবলম্বন করতে পারবেন না।” ১০/৯৫

ব্রাহ্মণেরা যে নিজেদের জন্য  ধর্ম ব্যবসার কোটা সংরক্ষণ করেছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কেননা মনুসংহিতাতেই উক্ত আছে-

  • “একমাত্র ব্রাহ্মণই সকল বর্ণের শাস্ত্রসম্মত জীবিকার উপায় জানবেন ও সকল বর্ণের মানুষকে উপদেশ দেবেন। উপরন্তু নিজেও সর্বদাই শাস্ত্র সম্মত কর্মে রত থাকবেন।” ১০/২

ব্রাহ্মণ

ব্রাহ্মণের সামাজিক অবস্থান সবার উপরে

সমাজের সকল ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণেরা  নিজেদের উচ্চ স্থান স্থির করে নেয়। ব্রাহ্মণের  সর্বশ্রেষ্ঠ অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করা হয় মনুস্মৃতিতে।

নামকরণের ক্ষেত্রে বলা হয়-

১.”ব্রাহ্মণের নাম হবে মঙ্গলবাচক, ক্ষত্রিয়ের নাম হবে বলবাচক, বৈশ্যের নাম হবে ধনবাচক এবং শুদ্রের নাম হবে নিন্দাবাচক।” (২/ ৩১)

২.”ব্রাহ্মণের নামের সঙ্গে শর্মা,ক্ষত্রিয়ের নামের সাথে বর্মা, বৈশ্যের নামের সাথে ভূতি বা অন্য পুষ্টিবোধক উপাধী যুক্ত হবে। শুদ্রের নাম হবে নিন্দাবাচক।যেমনঃশুভশর্মা,বলবর্মা,বসুভূতি,দীনদাস ইত্যাদি।”(২/ ৩২)

উপনয়ন সংস্কারের মাধ্যমেই আর্যরা তাদের ব্রহ্মচর্য আশ্রমে প্রবেশ করতো অর্থাৎ তাদের শিক্ষা জীবনের সূত্রপাত হত। উপনয়ন থেকে শুরু করে ব্রহ্মচর্য আশ্রম অবধি নানান বর্ণের সংস্কারের মধ্যে স্পষ্ট জাতিভেদ পরিলক্ষিত হয় এবং এতে ব্রাহ্মণের স্থান হয় সবার উপরে।যথা-

৩.”ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচারী কৃষ্ণসার মৃগ চর্মের উত্তরীয় ও শণবস্ত্র পরিধান করবেন।ক্ষত্রিয় ব্রহ্মচারীর পরিধান হবে ক্ষৌমবস্ত্র আর রুরু নামক মৃগ চর্মের উত্তরীয়। বৈশ্য ব্রহ্মচারী পড়বেন মেষলোমের তৈরি বস্ত্র এবং ছাগচর্মের তৈরি উত্তরীয়।” ২/৪১

৪.”ব্রাহ্মণের মেখলা অর্থাৎ মধ্যবন্ধনী সুখস্পর্শ যুক্ত সমান তিনগাছি মুঞ্জ তৃণে তৈরি করতে হবে। ক্ষত্রিয়ের জন্য মূরবায় নির্মিত ধনুকের ছিলার মতো এবং বৈশ্যের জন্য শণতন্তুতে তৈরি তিনহারা মেখলা তৈরি করতে হবে।” ২/৪২

৩.”ব্রাহ্মণের উপবীত তৈরি হবে কার্পাস সুতোয়, ক্ষত্রিয়ের শণ সুতোয় এবং বৈশ্যের উপবীত হবে মেষলোমের সুতোয়।সকলের উপবীতই তিনগাছি সুতোয় তৈরি হবে এবং তার ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত লম্বা হবে।” ২/৪৪

৪.”ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচারীর দণ্ড হবে বিল্ব বা পলাশের তৈরি। ক্ষত্রিয় ব্রহ্মচারীর হবে বট বা খদিরের দণ্ড এবং বৈশ্য ব্রহ্মচারী পিলু বা  যজ্ঞ ডুমুরের দণ্ড ধারণ করবেন।ব্রাহ্মণের দণ্ড হবে কেশ পর্যন্ত লম্বা, ক্ষত্রিয়ের হবে ললাট পর্যন্ত , বৈশ্যের দণ্ডের পরিমাপ হবে নাসাগ্র পর্যন্ত দীর্ঘ।”২/৪৫-৪৬

৫.”উপনীত ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচারী প্রথমে ভবত শব্দ উচ্চারণ করে অর্থাৎ ভবতি ভিক্ষাং দেহি বলে ভিক্ষা করবেন। ক্ষত্রিয় ব্রহ্মচারী ভবত শব্দ মাঝখানে রেখে অর্থাৎ ভিক্ষাং ভবতি দেহি বলে ভিক্ষা করবেন আর বৈশ্য ব্রহ্মচারী ভবত শব্দ শেষে রেখে ভিক্ষাং দেহি ভবতি বলে ভিক্ষা প্রার্থনা করবেন।” ২/৪৯

ব্রাহ্মণ যেন উপবীত,মেখলা,দণ্ড ও ভবত শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্বই ঘোষণা করে চলেছে।

ব্রাহ্মণ দেবতা

 অতি চতুর,সুবিধাভোগী পু্রোহিত সম্প্রদায় ফায়দা লোটবার জন্য শাস্ত্র রচনা করে তাতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে।

মনুসংহিতাতে একে একে বলা হয়-

১. “ব্রহ্মার পবিত্রতম মুখ থেকে উৎপন্ন বলে, সকল বর্ণের আগে ব্রাহ্মণের উৎপত্তি হওয়ায়, এবং বেদসমূহ ব্রাহ্মণকর্তৃক রক্ষিত হওয়ার জন্য (বা বেদসমূহ ব্রাহ্মণেরাই পঠন-পাঠন করেন বলে)– ব্রাহ্মণই ধর্মের অনুশাসন অনুসারে এই সৃষ্ট জগতের একমাত্র প্রভু।” (১/৯৩)

২.”স্থাবর জঙ্গমে পূর্ণ এই চরাচর জগতের মধ্যে যত সৃষ্ট পদার্থ আছে তার মধ্যে যাদের প্রাণ আছে তারাই শ্রেষ্ঠ। প্রাণীদের মধ্যে যাদের বুদ্ধি আছে তারা শ্রেষ্ঠ।বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণীদের মধ্যে আবার মানুষ শ্রেষ্ঠ এবং মানুষদের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ।” ১/৯৬

৩.”যখন ব্রাহ্মণ জন্মগ্রহণ করেন তখন তিনি পৃথিবীতে সকলের শ্রেষ্ঠ হয়েই জন্মগ্রহণ করেন। কারণ পৃথিবীতে প্রচলিত সর্ব ধর্ম রক্ষার জন্যই ব্রাহ্মণের উৎপত্তি।” ১/৯৯

৪. “ব্রাহ্মণ জন্মগ্রহণ করা মাত্রই পৃথিবীর সকল লোকের উপরিবর্তী হন অর্থাৎ সমস্ত লোকের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হন। কারণ, ব্রাহ্মণই সকলের ধর্মকোষ অর্থাৎ ধর্মসমূহ রক্ষার জন্য প্রভুসম্পন্ন হয়ে থাকেন।” (১/৯৯)

নিজেই নিজেকে জগতের সব ধনস্পত্তির অধিকারী ঘোষণা করে ব্রাহ্মণ মনু বলে-

৫.”জগতে যা কিছু ধনসম্পত্তি সে সমস্তই ব্রাহ্মণের নিজ ধনের তুল্য; অতএব সকল বর্ণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে ব্রাহ্মণই সমুদয় সম্পত্তি পাবার যোগ্য।” (১/১০০)

৬.”জন্ম থেকেই ব্রাহ্মণ মানুষের ও দেবতাদের পূজ্য এবং ইহলোকের প্রমাণ স্বরূপ। সুতরাং ব্রাহ্মণের উপদেশ বেদমূলক।” ১১/৮৫      [ব্রাহ্মণ এমনকি দেবতাদেরও পূজ্য!]

৭.”সংস্কৃতই হোক আর অসংস্কৃতই হোক অগ্নি যেমন মহান দেবতা তেমনি বিদ্বানই হোক আর অবিদ্বানই হোক ব্রাহ্মণও মহাদেবতা স্বরূপ।” ৯/৩১৭

৮.”শ্মশানে শবদাহ কালে ব্যাপৃত মহাতেজা অগ্নি যেমন অপবিত্র হয় না বরং যজ্ঞকার্যে আহুতি লাভ করে বৃদ্ধি পান; সেইরূপ ব্রাহ্মণরা যদি নিন্দনীয় কর্মে ব্যাপৃত থাকেন তবুও তারা সকলের কাছে পূজনীয়ই থাকবেন; যেহেতু ব্রাহ্মণ পরম দেবতা স্বরূপ।” ৯/৩১৮-৩১৯

দেখা যাচ্ছে, নিন্দনীয় কাজে নিযুক্ত থাকার পরও ব্রাহ্মণ পরমদেবতা স্বরূপই থাকেন।

এবং

৯. “ব্রাহ্মণ স্বভাবতই জল ও অগ্নির মতো পবিত্র। যেমন অতি পবিত্র গংগাজল অপবিত্র উদকে কখনোই অপবিত্র হয় না, সেইরূপ ব্রাহ্মণের পক্ষে গর্হিত ব্যক্তির অধ্যাপন, যাজন ও প্রতিগ্রহে কোনো দোষ হয় না। এমনকি প্রাণসংশয়ের সম্ভাবনা থাকলেও ব্রাহ্মণ যদি নীচ ব্যক্তির অন্ন গ্রহণ করেন তাহলে আকাশে যেমন পঙ্ক লিপ্ত হয় না সেই ব্রাহ্মণেরও গায়ে কোনো পাপ স্পর্শ করে না।” ১০/১০৩-১০৪

ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হিসাবে বলা হয়-

১.”দেবতারা যে ব্রাহ্মণের মুখ থেকে সর্বদা হবনীয় দ্রব্য ভোজন করেন এবং যাদের মুখ থেকে পিতৃগণও কব্যদ্রব্য অর্থাৎ শ্রাদ্ধে প্রদত্ত অন্ন ভোজন করেন এই পৃথিবীতে সেই ব্রাহ্মণ অপেক্ষা অধিকতর শ্রেষ্ঠ আর কে আছে!” ১/৯৫

২.”বেদের অধ্যয়ণ, অধ্যাপনা ও ব্যাখ্যান বিষয়ে সবিশেষ যোগ্যতা থাকায় এবং উপনয়ন সংস্কারে ক্ষত্রিয়াদি অপেক্ষা বিশিষ্ট হওয়ায় ও সর্ব বর্ণের মধ্যে প্রধান হওয়ায় এবং হিরণ্য গর্ভ ব্রহ্মার উত্তমাঙ্গ থেকে উদ্ভূত হওয়ায় ব্রাহ্মণ সর্বশ্রেষ্ঠ।” ১০/৩

ব্রাহ্মণের অলৌকিক ক্ষমতা

সাধারণের মনে ভয়,ভীতি তৈরির মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখবার জন্যে ব্রাহ্মণ মনু তার গ্রন্থটিতে ব্রাহ্মণদের নানান অলৌকিক ক্ষমতার কথা প্রচার করেন। যেমনঃ

১.”যাদেরকে আশ্রয় করে ত্রিলোকসমূহ ও স্বর্গের দেবতাগণ অবস্থান করেন; ব্রহ্মই যাদের  একমাত্র সম্পদ বেঁচে থাকাকালীন সেই ব্রাহ্মণদেরকে রাজা হিংসা করবেন না অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্যায় পারদর্শী বা ব্রহ্মজ্ঞানে অভিজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ যজন যাজনের মাধ্যমে পৃথিবী প্রভৃতি ত্রিলোক সমূহের এবং সকল দেবতাকে সন্তুষ্ট করেন। আবার এই ব্রাহ্মণরাই ক্রুদ্ধ হলে অভিশাপ দিয়ে এদের সকলকে বিনষ্ট করতে পারেন। সুতরাং যার বাচার ইচ্ছা আছে তার কখনোই ব্রাহ্মণদের হিংসা করা উচিত নয়।” ৯/৩১৬

ব্রাহ্মণদের প্রধান এক হাতিয়ারের নাম ছিল, অভিশাপ-অস্ত্র। অভিশাপের ভয় দেখিয়ে তারা সহজেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করতো-

২.”ক্ষত্রিয়রা অত্যন্ত বৃদ্ধি লাভ করে ব্রাহ্মণদের পীড়া দিলে অথবা ব্রাহ্মণদের প্রতিকূল আচরণ করলে ব্রাহ্মণরা তাদের অভিশাপ দিয়ে শাসন করবেন। কারণ ক্ষত্রিয় জাতি ব্রাহ্মণ থেকে উৎপন্ন।” ৯/৩২০

৩.”রাজা অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত হলেও কখনোই ব্রাহ্মণের বিরুদ্ধে যাবেন না; কারণ এরূপ করলে ব্রাহ্মণেরা ক্ষুব্ধ হয়ে অভিশাপ দিয়ে শক্তি ও বাহনসহ রাজাকে তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট করবেন।” ৯/৩১৩

৪.”যে ব্রাহ্মণেরা ক্রুদ্ধ হয়ে অগ্নিকে সর্ব ভক্ষ্য করেছেন এবং যারা অগাধ জলের সমুদ্রকে অপেয় করেছেন, যারা চন্দ্রকে ক্ষয় করে পরে পূর্ণ করেছেন সেইরূপ ব্রাহ্মণকে ক্রুদ্ধ করলে তাকে বিনষ্ট হতেই হবে।” ৯/৩১৪

মানুষকে অভিশাপের ভয় দেখিয়ে,পূণ্যের লোভ দেখিয়ে, নানাবিধ উপায়ে ব্রাহ্মণ নিজেদের সুরক্ষার বন্দোবস্ত করে নেয়।

ভারতের বর্ণবাদ

ব্রাহ্মণের সুরক্ষা

মনুসংহিতায় ২১ টি নরকের বর্ণনা  আছে। তার মধ্যে একটি নরকের নাম হল তামিশ্র। ৪/৮৭-৯০

অন্যান্য বর্ণকে মিথ্যা ভয় দেখিয়ে মনুসংহিতায় ব্রাহ্মণ মনু  বলেন-

১.”ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য শূদ্র যদি হত্যা করার জন্য ব্রাহ্মণের উপর দণ্ডাঘাত করেন অথবা কেবলমাত্র দণ্ড উত্তোলন করেন তাহলেও তাকে তামিশ্র নরকে একশো বছর ধরে পরিভ্রমণ করতে হয়।” ৪/১৬৫

আরও বলা হয়-

২.”ক্রুদ্ধ হয়ে কিংবা জেনে শুনে যদি কেউ তৃণ দিয়েও ব্রাহ্মণকে তাড়না করে তাহলে সেই পাপে তাকে একুশ জন্ম পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করতে হয়।” ৪/১৬৬

৩.”অস্ত্রাঘাতে আহত ব্রাহ্মণের শরীর থেকে নির্গত রক্তে যতগুলি ধূলিকণা একত্রিত হয় শোণিতৎপাদক ব্রহ্মঘাতীকে পরলোকে তত সংখ্যক বৎসর ধরে শেয়াল কুকুরে খায়।এই কারণে বিদ্বান ব্যক্তি বিপদগ্রস্ত হলেও কখনোই ব্রাহ্মণের ওপর দন্ডোত্থাপন করবেন না কিংবা তাকে তৃণ দিয়েও আঘাত করবেন না অথবা ব্রাহ্মণের শরীর থেকে রক্তপাত ঘটাবেন না।” ৪/১৬৮-১৬৯

ব্রহ্মহত্যা- ক্ষত্রিয়,বৈশ্য,শূদ্র এইসকল বর্ণের প্রাণের তুলনায় ব্রাহ্মণের প্রাণকে অধিক মূল্যবান  দেখিয়ে ব্রাহ্মণের হত্যাকে এক বিশেষ নাম দেওয়া হয়, তা হল ‘ব্রহ্মহত্যা’ , আর ব্রহ্মহত্যাকারীর শাস্তি ছিল সর্বোচ্চ। ইহকালেই কেবল ব্রহ্মহত্যাকারী ,ব্রাহ্মণকে হত্যা করার শাস্তি ভোগ করে না, পরকালেও তার নরক ভোগ অবধারিত, এমনকি জন্ম জন্মান্তরেও তার শাস্তিভোগ সমাপ্ত হয় না। এভাবেই কুসংস্কারের ছড়ানোর মাধ্যমে ভয়ের খেলা খেলে ব্রাহ্মণ তার জীবনকে অত্যন্ত সুরক্ষিত করে নেয়।

মনুর নিচের বিবৃতি থেকে এসব জানা যায়-

৪.ব্রাহ্মণ হত্যাকারীকে মহাপাতকী বলে ঘোষণা করা হয়।৯/২৩৫-২৩৬; ১১/২৪০-২৪১; ১১/১৮৩

৫.পৃথিবীতে ব্রাহ্মণ বধের তুলনায় প্রবল পাপ আর কিছুই নেই। এজন্য রাজা কখনোই ব্রাহ্মণকে বধ করার কথা চিন্তা করবেন না। ৮/৩৮১

৬.”যে সকল মহাপাপী ব্রহ্মহত্যা করে তারা বহু বৎসর ধরে ভয়ঙ্কর নরক যন্ত্রণা ভোগ করে এবং পাপ নাশ হলে বক্ষ্যমাণ জন্মবিশেষ প্রাপ্ত হয়।” ১২/৫৪

৭.”ব্রহ্মহত্যাকারীর  নরক ভোগ শেষ হলে, শূকর, কুকুর, গর্ধব, উট, গোরু, ছাগল, মেষ, মৃগ, পক্ষী, চণ্ডাল এবং নিষাদের ঔরসে শূদ্রার গর্ভজাত পুক্কস প্রভৃতির যোনি প্রাপ্ত হয়।”১২/৫৫

৮.”যে ব্যক্তি লোভবশত দেবতার ধন বা ব্রাহ্মণের ধন অপহরণ কর সে পরজন্মে শকুনির উচ্ছিষ্টভোজি হয়।” ১১/২৬ [লক্ষণীয় ব্যাপার হল দেবতা ও ব্রাহ্মণ পুনরায় একসাথে পাশাপাশি উল্লেখিত, যেন ব্রাহ্মণই প্রকৃত দেবতা! কোনো বিশ্বাসী, ধর্মভীরু শাস্ত্রকারের পক্ষে এইধরণের প্রমাদ বকা অসম্ভব যদি না সে সম্পূর্ণ ধান্দাবাজ হয়ে থাকে। ]

এত সব অলৌকিক ভেলকি দেখিয়ে ব্রাহ্মণের কি লাভ হল? প্রথমত এভাবেই ব্রাহ্মণেরা সমাজে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখে,নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে, এছাড়া তারা নিজেদের ঝোলা ভালো ভাবেই ভর্তি করে নেয়।

সব যাক গোল্লায়, তবুও বামুন  না মরুক

রাজা দেউলিয়া হয়ে গেলেও ব্রাহ্মণকে পুত্রের মত রক্ষা করা রাজার কর্তব্য বলে বর্ণনা করেছেন মনু। যেভাবেই হোক ব্রাহ্মণের সুরক্ষা প্রদান রাজার প্রধান কর্তব্য বলে প্রচার করা হয়েছে মনুসংহিতায়-

  • “রাজা অর্থাভাবে মরণাপন্ন হলেও বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের কাছ থেকে কখনো কর গ্রহণ করবেন না এবং নিজের রাজ্যে বসবাসকারী বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ যাতে ক্ষুধাজনিত কষ্ট ভোগ না করেন সে দিকে রাজা সজাগ দৃষ্টি রাখবেন।” ৭/১৩৩
  • “রাজা কখনো ব্রাহ্মণের ধন গ্রহণ করবেন না। ব্রাহ্মণের ধন সর্বদাই বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ গ্রহণ করবেন এবং বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের অভাবে সামান্য ব্রাহ্মণেরা ওই ধন গ্রহণ করবেন। তবে সকলের অভাব হলে ক্ষত্রিয় প্রভৃতি অন্যান্য বর্ণের ধনের ওপর রাজার অধিকার থাকবে।” ৯/১৮৯
  • “যে রাজার রাজ্যে বেদজ্ঞ ক্ষুধায় কাতর হন সেই রাজ্য অচিরেই দুর্ভিক্ষে পীড়িত হয়।” ৭/১৩৪
  • “শোত্রিয় ব্রাহ্মণের বেদ বেদাঙ্গের জ্ঞান ও কর্ম বিবেচনা করে রাজা তার উপযুক্ত বৃত্তি প্রদান করবেন এবং পিতা যেমন নিজের ঔরসজাত পুত্রকে সর্বদা রক্ষা করেন সেইরূপ চোর ডাকাতের উপদ্রব থেকে রাজা ঐ বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণকে রাজা সর্বদা রক্ষা করবেন।” ৭/১৩৫

ছিনতাইকারী ব্রাহ্মণ

যজ্ঞ করার নামে দেবতারূপ ব্রাহ্মণ প্রায়ই সাধারণের পয়সা লুঠ করে নিতেন-

  • “শাস্ত্রজ্ঞ রাজার রাজ্যে ক্ষত্রিয় যজমানের গৃহে যদি দ্রব্যের অভাবে ব্রাহ্মণের আরাধ্য যজ্ঞের একাঙ্গ অসম্পূর্ণ থাকে তাহলে ঐ ব্রাহ্মণ যে বৈশ্যের বহু ধন আছে অথচ যে যাগযজ্ঞ করে না এবং সোমপানও করে না তার কাছ থেকে যজ্ঞসিদ্ধির জন্য ঐ দ্রব্য বলপূর্বক গ্রহণ করবেন অথবা অপহরণ করে আরদ্ধ যজ্ঞের অঙ্গ সম্পূর্ণ করবেন।” ১১/১১-১২

ব্রহ্মা ব্রাহ্মণের পকেট ভর্তি করেন (!)

বর্ণ ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণের স্থান যেহেতু সবার উপরে তাই উপরোক্ত সুবিধা ছাড়াও অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্রাহ্মণ আরও অনেক সুবিধা পেত-

  • “……যদি ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য,শূদ্র চারপুত্র এবং একজনই ব্রাহ্মণী কন্যা থাকে তাহলে পৈতৃক ধন চৌদ্দ ভাগে ভাগ করে ভাগের এক অংশ ব্রাহ্মণী কন্যাকে দিয়ে অবশিষ্ট দশভাগের মধ্যে ব্রাহ্মণ চার ভাগ, ক্ষত্রিয় তিনভাগ, বৈশ্য দুভাগ এবং শূদ্র একভাগ নেবে। যদি ব্রাহ্মণ একপুত্র এবং ব্রাহ্মণী এক কন্যা থাকে তাহলে সব ধন আটভাগ করে এক ভাগ ভগিনী পেয়ে থাকে। সাত ভাগ ভাই পাবে।” ৯/১১৮
  • “ব্রাহ্মণের গর্ভজ সন্তানকে বিভাগের পূর্বে একটি কৃষক, একটি বৃষ, একটি যান, অলঙ্কার ও বাসভবন এবং অন্য বিষয়ের যত অংশ হবে তার মধ্যে একটি প্রধান অংশ উদ্ধার হিসেবে দেবেন। তারপর ব্রাহ্মণী পুত্র তিন অংশ, ক্ষত্রিয়া পুত্র দুই অংশ, বৈশ্য পুত্র দেড় অংশ এবং শূদ্রা পুত্র একাংশ পাবে।” ৯/১৫০-১৫১
  • “অথবা উদ্ধারভাগ না করে একজন বিভাগ ধর্মবিদ ব্যক্তি সমস্ত পৈতৃক সম্পত্তিকে দশভাগ করে নিম্নোক্ত নিয়ম অনুযায়ী বিভাগ করবেন। এক্ষেত্রে ব্রাহ্মণী পুত্র চারভাগ, ক্ষত্রিয়া সূত তিনভাগ, বৈশ্য পুত্র দুই ভাগ এবং শূদ্র পুত্র একভাগ পাবে। ব্রাহ্মণী, ক্ষত্রিয়া অথবা বৈশ্যা কারও গর্ভে সন্তান উৎপন্ন হোক বা না হোক শূদ্র গর্ভজ সন্তান একভাগের অতিরিক্ত অংশ পাবে না।” ৯/১৫২-১৫৫
  • “… নিজের দায়িত্ব বুঝে উত্তমর্ণ বর্ণানুক্রমে ব্রাহ্মণ প্রভৃতি অধমর্ণের কাছ থেকে শতকরা দুই পণ, ক্ষত্রিয়ের কাছ থেকে শতকরা তিন পণ ,বৈশ্যের কাছ থেকে শতকরা চার পণ ও শূদ্রের কাছ থেকে শতকরা পাঁচ পণ সুদ প্রতিমাসে নিতে পারে। ৮/১৪২          [ ধার করা অর্থের ওপর ব্রাহ্মণের দেয়  সুদের পরিমাণ ছিল সর্বাপেক্ষা কম]

এছাড়াও মনুসংহিতায় বলা হয়-

  • “জগতে যা কিছু সম্পত্তি আছে তা ব্রাহ্মণের নিজস্ব। সকল বর্ণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হওয়ায় এবং ব্রহ্মার উত্তম স্থান থেকে উৎপন্ন হওয়ায় ব্রাহ্মণই সমুদয় সম্পত্তি পাবার যোগ্য।” ১/১০০
  • “ব্রাহ্মণেরা যে পরের অন্ন ভোজন করেন, পরিধান হিসেবে যে পরকীয় বসন ব্যবহার করেন এবং যা দান করেন তা পরকীয় হলেও নিজস্ব। কারণ ব্রাহ্মণের অনুগ্রহে অপরাপর সমস্ত প্রাণী পান ভোজন করে বেঁচে আছে।” ১/১০১
  • “যদি কেউ ঐ প্রাপ্তধন নিজে পেয়ে অথবা অন্যের লব্ধ ধনকে নিজের মনে করে তাহলে রাজা ঐ ধনস্বামীর গুনাগুণ বিবেচনা করে তার কাছ থেকে প্রাপ্ত ধনের ছয় বা বারো ভাগ গ্রহণ করবেন এবং অবশিষ্ট অংশ তাকে দান করবেন।”৮/৩৫
  • “যদি বিদ্বান ব্রাহ্মণ পূর্ব রক্ষিত কোনো ধন পেয়ে থাকেন তাহলে তার সমগ্রই তিনি নিজে গ্রহণ করবেন,রাজাকে কোনো অংশই দেবেন না। কারণ বিদ্বান ব্রাহ্মণ কি নিজের কি অন্যের সকল ধনেরই অধিপতি।রাজলব্ধ ধন যদি ধনস্বামী নিজের বলে প্রমাণ করতে পারে তাহলে রাজা ঐ ধনের ছয়ভাগ গ্রহণ করবেন কিন্তু বিদ্বান ব্রাহ্মণের কাছ থেকে সামান্য পরিমাণ ধনও রাজা পাবেন না।” ৮/৩৭
  • “রাজা যদি ভূমির মধ্যে পূর্ব নিহিত কোনো ধন পেয়ে থাকেন তাহলে ঐ ধনের অর্ধেক ব্রাহ্মণদের দেবেন এবং নিজে অর্ধেক নেবেন।” ৮/৩৮

ব্রাহ্মণকে দান করলে সব থেকে  বেশি পূণ্য অর্জন করা যায়, এই জাতীয় কথা প্রচার করে, ব্রাহ্মণ নিজের থলি ভর্তি করেন-

  • “অন্যান্য সম্পত্তির মত ব্রাহ্মণ প্রদত্ত ধন ধান্য রূপ ঐ অক্ষয়নিধি কখনো নষ্ট হয় না এবং শত্রু বা চোর কেউই তা অপহরণ করে না।সুতরাং ব্রাহ্মণদের কাছে এই অক্ষয়নিধি দান করা ও তা রক্ষণে যত্নশীল হওয়া রাজামাত্রেরই কর্তব্য।”৭/৮৩
  • “আগুনে ঘৃতাহুতি দান করলে কখনো তা গলে নীচে পড়ে যায় , কখনো তা শুষ্ক হয়ে যায় , কখনো বা তা দগ্ধ হয়ে বিনষ্ট হয়।কিন্তু ব্রাহ্মণের মুখে আহুতি অর্থাৎ ব্রাহ্মণের মুখে দান করলে তা গলে যায় না, শুষ্কও হয় না আবার নষ্টও হয় না। সুতরাং অগ্নিহোত্র যজ্ঞ হোমের অপেক্ষা অধিক ফল দান করে।” ৭/৮৪
  • “ব্রাহ্মণ ছাড়া ক্ষত্রিয় প্রভৃতি অন্য কাউকে কিছু দান করলে শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী ফললাভ হয় । অর্থাৎ যে দ্রব্য দানে যে ফল শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে তাই লাভ হয়। নিরক্ষর ও নিষ্ক্রিয় ব্রাহ্মণকে দান করলে দ্বিগুণ ও বেদাধ্যয়ণকারী ব্রাহ্মণকে দান করলে লক্ষ গুণ ফল লাভ হয়। কিন্তু সকল গুণ ও বেদান্তে পারদর্শী বিপ্রকে দান করলে অনন্ত ফল লাভ হয়।” ৭/৮৫

এছাড়াও বলা হয়-

  • “বয়োবৃদ্ধ ও তপোবৃৃদ্ধ ও বেদবেত্তা দেহে মনে পবিত্র ব্রাহ্মণদের প্রতি রাজা সেবাপরায়ণ হবেন।” ৭/৩৮
  • “গুরুকূল থেকে প্রত্যাগত বেদবিদ্যাসম্পন্ন গার্হস্থ্য আশ্রমে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক ব্রাহ্মণকে রাজা ধন ধান্য দিয়ে পূজা করবেন। কারণ এরূপ পাত্রে প্রদত্ত ধনধান্য  অক্ষয় নিধি রূপে শাস্ত্রে ব্যাখ্যাত হয়েছে।” ৭/৮২

বামুনের ট্যাক্স মাফ

অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিকেও যেখানে কর থেকে মুক্ত করা হত না সেখানে রাজা মরণাপন্ন হলেও ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে কর আদায় করতে পারতেন না-

  • “রাজা প্রতি প্রজার কাছ থেকে বাৎসরিক কর গ্রহণ করবেন। এমনকি যেসকল দুঃখী প্রজা শাকপাতার মত সামান্য বস্তু ক্রয় বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করে তাদের কাছ থেকেও রাজা বাৎসরিক কর হিসেবে যৎকিঞ্চিত অর্থ গ্রহণ করবেন।” ৭/১৩৭
  • “রাজা অর্থাভাবে মরণাপন্ন হলেও বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের কাছ থেকে কখনো কর গ্রহণ করবেন না এবং নিজের রাজ্যে বসবাসকারী বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ যাতে ক্ষুধাজনিত কষ্ট ভোগ না করেন সে দিকে রাজা সজাগ দৃষ্টি রাখবেন।” ৭/১৩৩

ব্রাহ্মণের পেট শান্তি তো ত্রিলোক শান্তি!

ব্রাহ্মণের পেটের ভাত যেন সোজা প্রজাপতি ব্রহ্মার পেটে যায়! কে জানে!ব্রহ্মার মুখ থেকে সৃষ্টি বলে হয়তো, বামুনের পেটের সাথে ব্রহ্মার মুখের কোনো কানেকশন  আছে! তাই বোধহয় ব্রাহ্মণকে কিভাবে ভোজন করানো উচিত ব্রহ্মা তার অত্যন্ত রসিয়ে কসিয়ে বর্ণনা দেন। (ব্রহ্মা নাকি স্বয়ং মনুকে মনুসংহিতা বলেছিলেন!)

যেভাবে ব্রাহ্মণভোজন করানো উচিত-

  • “ব্রাহ্মণদের যে সকল অন্ন ব্যঞ্জনে অভিরুচি হয় মাৎসর্য ত্যাগ করে সেই দ্রব্যই ব্রাহ্মণদের পরিবেশন করবেন। ব্রাহ্মণদের ভোজন কালে তাদের সঙ্গে পরমাত্মা বিষয়ক কথা বলবেন। এতে পিতৃ লোক সন্তুষ্ট হন।” ৩/২৩১
  • “শ্রাদ্ধকর্তা নিজেই প্রসন্ন চিত্তে প্রিয়বচনে ব্রাহ্মণদের পরিতুষ্ট করবেন। ধীরে ধীরে তাদের ভোজন করাবেন এবং খাদ্যদ্রব্যের গুণকীর্তন করে তা গ্রহণ করার জন্য ব্রাহ্মণদের বারবার অনুরোধ করবেন।” ৩/২৩৩

এছাড়াও প্রতিদিন নিয়ম করে ব্রাহ্মণের সেবা করা সকলের কর্তব্য-

  • “প্রতিদিন প্রত্যুষে গাত্রোত্থান করে রাজা বয়োবৃদ্ধ ও তপোবৃদ্ধ , বেদজ্ঞ ও নীতি শাস্ত্রাভিজ্ঞ ব্রাহ্মণদের সেবা করবেন এবং তারা যা কিছু আদেশ করবেন তাও সঠিকভাবে প্রতিপালন করবেন।”৭/৩৭

এ কেমন বিচার!

অন্যান্য সামাজিক,অর্থনৈতিক সুবিধার মত বিচারের ক্ষেত্রেও ব্রাহ্মণকে যথেষ্ট ছাড় দেওয়া হয়। বলা হয়-

  • “ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় পরস্পর গালিগালাজ করলে রাজা ব্রাহ্মণকে প্রথম সাহস দণ্ড বা আড়াইশ পণ দণ্ড এবং ক্ষত্রিয়কে মধ্যাম সাহস বা পাঁচশ পণ দণ্ড দেবেন। সেইরূপ বৈশ্য ও শূদ্রের মধ্যে পারস্পরিক আক্রোশ বশত যদি গালাগাল চলে তাহলে রাজা বৈশ্যকে প্রথম সাহস ও শূদ্রকে মধ্যম সাহস দণ্ড দেবেন।যদিও পূর্বোক্ত নিয়মে শূদ্রের জিহ্বা ছেদের কথা বলা হয়েছে ,তবু এক্ষেত্রে বৈশ্য,শূদ্রের মধ্যে গালিগালাজ হলে জিহ্বা ছেদ হবে না। একমাত্র ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের প্রতি শূদ্র গালিগালাজ করলে তার জিহবাছেদ হবে।” ৮/২৭৬-২৭৭
  • “ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য বর্ণের কেউ যদি অকামা কন্যাতে গমন করে তাহলে তার লিঙ্গ ছেদনাদিরূপ দণ্ড হবে।……” ৮/৩৬৪

ব্রাহ্মণের সাত খুন মাফ!

ব্রাহ্মণ কোনো অপরাধ করলে কি  তার উপযুক্ত শাস্তি পেত? প্রথমত, বর্ণপ্রথা অনুযায়ী  এক বর্ণ থেকে অন্য বর্ণে একই অপরাধে শাস্তির তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। বর্ণের সবচেয়ে উপরে অবস্থান করা ব্রাহ্মণের যেকোনো অপরাধে শাস্তি হয় সবচেয়ে কম। ব্রাহ্মণ,খুন,ধর্ষণ,চুরি,লুন্ঠন যাই করুক না কেন তাকে কোনো মতেই বধ বা শারীরিক কোনো দণ্ড দেওয়া যেত না, অন্যদিকে লঘুপাপেই শূদ্রকে হত্যা বা অঙ্গচ্ছেদের শাস্তি দেয়া হত।

মনুর মতে,

  • “ক্ষত্রিয়,বৈশ্য,শূদ্র- এই তিন বর্ণের মানুষ যদি বারবার মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় তাহলে তাদেরকে পূর্বোক্ত বিধান অনুযায়ী অর্থ দণ্ড করে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। কিন্তু ব্রাহ্মণকে অর্থ দণ্ড না করে কেবলমাত্র নির্বাসন দেওয়া হবে।”৮/১২৩
  • ” স্বায়ম্ভূব মনু মহা অপরাধে শারীরিক দণ্ড করার জন্য দশটি স্থান নির্দেশ করেছেন। এই শারীরিক দণ্ড কেবল তিন বর্ণের ওপর অর্থাৎ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের ওপর প্রযুক্ত হবে।কিন্তু ব্রাহ্মণকে শারীরিক দণ্ড না দিয়ে অক্ষত শরীরে দেশ থেকে নির্বাসন দেওয়া হবে।” ৮/১২৪-১২৫
  • “যজ্ঞের নিমিত্ত বলাৎকারে বা চুরি করে যে ব্রাহ্মণ পরধন অপহরণ করেন রাজা তাকে কোনো দণ্ড দেবেন না। কারণ রাজার মূর্খতা বশতই ব্রাহ্মণ ক্ষুধায় অবসন্ন হন। ক্ষুধায় অবসন্ন ব্রাহ্মণের পরিবার, শাস্ত্রজ্ঞান ও সদাচার জেনে রাজা নিজের কোষ থেকে তার বৃত্তি বিধান করবেন।” ১১/২১-২২
  • “প্রাণঘাতি দণ্ড না দিয়ে ব্রাহ্মণের মস্তক মুণ্ডন দণ্ড শাস্ত্রে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষত্রিয় প্রভৃতি অন্যান্য বর্ণের ক্ষেত্রে প্রাণান্ত দণ্ডই বিহিত। সর্ব পাপে পাপী হলেও ব্রাহ্মণকে কখনোই বধ করা উচিত নয়। সেক্ষেত্রে সমস্ত ধনের সঙ্গে অক্ষত শরীরে তাকে রাজ্য থেকে নির্বাসন দেওয়া উচিত।” ৮/৩৭৯-৩৮০

ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় আঁতাত

ব্রাহ্মণের পক্ষে একা তো আর এমন লোকঠকানোর উৎকট খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভবপর ছিল না! শত হলেও পড়াশোনা করা লোক, পুঁথি,যজ্ঞেই দিন কেটে যায়, ওই কোমল হাতে ঠগবাজির শাস্ত্র রচিত হতে পারে, তবে তা বাস্তবায়ন করা ব্রাহ্মণের পক্ষে একাকী সম্ভবপর ছিল না। তাই সে ক্ষত্রিয়ের শরণাপন্ন হয়। ব্রাহ্মণের  বিধানে ব্রাহ্মণের পরেই ক্ষত্রিয় শ্রেণী সকল সুযোগ সুবিধা লাভ করে এবং ব্রাহ্মণের বিধান সমাজে চালু করতে সাহায্য করে-

  • “ব্রাহ্মণহীণ ক্ষত্রিয় কখনও বৃদ্ধি পায় না এবং ক্ষত্রিয় ছাড়া ব্রাহ্মণও বৃদ্ধি পান না। কিন্তু ক্ষত্রিয়ত্ব ও ব্রাহ্মণত্ব যদি একত্র মিলিত হয় তাহলে ইহকাল ও পরকাল দুইকালেই তারা বৃদ্ধি লাভ করেন। তাৎপর্য হল, ব্রাহ্মণের সাহায্য ছাড়া ক্ষত্রিয়ের হোম, যজ্ঞ প্রভৃতি ধর্মীয় বৈধ কার্য সমূহ সম্পন্ন হয় না। সুতরাং ব্রাহ্মণরহিত ক্ষত্রিয়ের বৃদ্ধি সম্ভব নয়। আবার আত্মরক্ষা ছাড়া ব্রাহ্মণেরও যাগযজ্ঞ কর্ম সম্পন্ন হয় না। সুতরাং ক্ষত্রিয়ের সাহায্য ছাড়া ব্রাহ্মণ বৃদ্ধি পেতে পারেন না। তাই সিদ্ধান্ত করা হয়েছে, এই দুই বর্ণের মানুষ পরস্পর মিলিত হয়ে ইহলোক ও পরলোকে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ লাভে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হন।” ৯/৩২২

ব্রাহ্মণ-রাজা

ক্ষত্রিয়ের সাথে মিত্রতার সুবিধাও গ্রহণ করে ব্রাহ্মণ। রাজা কখনো শাসনে অক্ষম হলে তার গদিতে প্রথম  অধিকার হয় ব্রাহ্মণের-

  • “রাজা যদি স্বয়ং বিচার করতে না পারেন তাহলে বিদ্যা ও অন্যান্য গুণসম্পন্ন ব্রাহ্মণকে ঐ কাজে নিযুক্ত করবেন। যোগ্য ব্রাহ্মণের অভাব হলে গুণান্বিত ক্ষত্রিয়কে নিয়োগ করবেন। গুণী ক্ষত্রিয় না পাওয়া গেলে গুণবান বৈশ্যকে নিয়োগ করবেন। কিন্তু কখনোই ধার্মিক সর্ব গুণান্বিত শূদ্রকে ওই পদে নিয়োগ করবেন না।” ৮/২০

শোষণে ব্রাহ্মণদের গাইড বই মনুসংহিতা, সুতরাং অন্যান্য বর্ণের কাছ থেকে এটি লুকিয়ে রাখা উচিত

ব্রাহ্মণদের ধাপ্পাবাজির এই আকরগ্রন্থকে জনসাধারণের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখে কেবল ব্রাহ্মণদেরই তা পঠনের অধিকার দেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে বামুনের ফন্দি ফিকির ফাঁস না হয়ে যায়-

  • “বিদ্বান ব্রাহ্মণগণ সম্যক যত্ন সহকারে এই শাস্ত্র অধ্যয়ণ করবেন এবং তারাই এই শাস্ত্র শিষ্যদের সম্যকরূপে অধ্যয়ণ করাবেন। অন্য কোনো বর্ণই অধ্যয়ণ করতে পারবেন না।” ১/১০৩
  • “জন্মের পূর্বে অর্থাৎ গর্ভাধান থেকে মৃত্যুর পর অর্থাৎ অন্তেষ্টি ক্রিয়া পর্যন্ত সমস্ত জীবনকাল যাদের শাস্ত্রবিহিত মন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাহিত হয় সেই ব্রাহ্মণগণই এই মানবশাস্ত্র অধ্যয়ণ ও শ্রবণ করার অধিকারী, অন্য কেউ নয়।” ২/১৬

সহায়ক গ্রন্থ- 

চৈতালি দত্তের মনুসংহিতার অনুবাদ থেকে অধিকাংশ শ্লোক গৃহীত হয়েছে এই লেখায়

যারা মনুসংহিতা ডাউনলোড করতে আগ্রহী তারা এই লিংকে ক্লিক করে মনুসংহিতা ডাউনলোড করতে পারেন। 

সম্পূর্ণ লেখাটির পিডিএফ ডাউনলোড করুন

Facebook Comments

Leave a Reply

  1. শূদ্র বা অস্পৃশ্য দের নিয়ে তিনটি লেখাই খুবই সুন্দর হয়েছে। লেখাটা মুলত রেফারেন্স নির্ভর যা লেখাটাকে আর‌ও সুন্দর করেছে।