মনুর চোখে নারী – হিন্দু ধর্মে নারীর দুরবস্থা

“বিশ্বের যা কিছু মহান, যা চিরকল্যানকর।

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।”

-কাজী নজরুল ইসলাম

এই মূল্যবোধ আধুনিক কবির থাকলেও ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রবক্তা মনুর কিঞ্চিতও ছিল না। ছিলনা বলেই শূদ্রের পাশাপাশি, সকল বর্ণের নারীরই মানবিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছিলেন মনু। নারীর যে কোনো উঁচুজাতেই সম্মানজনক স্থান নেই, তাই তিনি স্পষ্ট করেছেন। তার রচিত শাস্ত্রের নাম ‘মানব শাস্ত্র’ অথবা ‘মনুসংহিতা’ এবং তার ধর্মের নাম ‘মানব ধর্ম’। বর্তমান মানবিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীতে মনুর ‘মানব ধর্ম’ প্রকৃতপক্ষে ছিল , ‘দানব ধর্ম’, শোষণ-বঞ্চনার এক মারণাস্ত্র। মনুকে হিন্দু সমাজের রীতি নীতির মূল প্রবক্তা বলা যায়।

এই মনুসংহিতাতে নারীকে জঘন্যভাবে উপস্থাপন করেছেন মনু, হরণ করেছেন তার সকল মৌলিক মানবিক অধিকার।

নারীদের সকল শিক্ষা,ধর্মীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন মনু-

উপনয়ন সংস্কারের মাধ্যমেই বৈদিক সমাজে পুরুষেরা তাদের শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করতো কিন্তু মনু তার রচিত গ্রন্থে স্ত্রীদের উপনয়ন সংস্কার নিষিদ্ধ করেছেন এবং দেহশুদ্ধির জন্য তিন বর্ণের পুরুষদের যে সকল মন্ত্র উচ্চারণ করতে হত, স্ত্রীদের সে সকল মন্ত্র উচ্চারণে নিষেধ করেছেন। (২/৬৬) নারীদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করেছেন।

নারীরা যে শিক্ষাহীন ছিল তা স্পষ্ট হয় মনুর নিচের উক্তিতে-

“যে ব্যক্তিকে অভিবাদন করা হবে সে ব্যক্তি যদি সংস্কৃত না জানেন তাহলে অভিবাদনের পর অভিবাদনীয় ব্যক্তিকে ‘আমি অভিবাদন করছি’-এই কথা বলবেন। স্ত্রীলোকদেরকে এইভাবেই অভিবাদন করবেন।” ২/১২৩

নারীরা পুরুষদের ন্যায় সংস্কৃত জানেন না, তাই প্রকাশ পাচ্ছে এই শ্লোকে।

ধর্মাচরণের স্বাধীনতাও যে মহিলাদের ছিল না তা পরিষ্কার হয় মনুসংহিতার নিচের শ্লোক থেকে-

“যেহেতু শাস্ত্রোক্ত বিধি অনুযায়ী মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমেই স্ত্রীজাতির জাতকর্ম সংস্কার পালিত হয় না তাই তাদের অন্তকরণ নির্মল হয় না। স্মৃতি শাস্ত্র ও বেদ প্রভৃতি ধর্ম শাস্ত্রের ওপর স্ত্রীজাতির কোনো অধিকার নেই। তাই তারা ধর্মজ্ঞ হতে পারে না।এমনকি কোনো মন্ত্রের ওপরেও স্ত্রীজাতির অধিকার না থাকায় তারা কোনো পাপ করলে মন্ত্রের সাহায্যে তা ক্ষালন করতে পারে না। তাই শাস্ত্রমতে স্ত্রিজাতি মিথ্যা অর্থাৎ অপদার্থ।” ৯/১৮

আরো বলা হয়েছে,

“স্ত্রীলোকের স্বামী ভিন্ন পৃথক যজ্ঞ নেই। স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোনো ব্রত এবং উপবাস নেই। কেবলমাত্র স্বামীর সেবা করেই স্ত্রীলোক স্বর্গে যেতে পারেন।” ৫/১৫৫

শিক্ষাবঞ্চিত নারীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে,

“বিবাহ সংস্কারই স্ত্রীলোকের বৈদিক উপনয়ন সংস্কার। সেখানে স্বামীর সেবাই হল গুরুকূলে বাস এবং স্বামীর গৃহ কর্মই হল প্রাতঃসন্ধ্যাকালীন হোমরূপ অগ্নি পরিচর্যা।”২/৬৭

নারীদের সম্বন্ধে করা হয়েছে জঘন্য সব মন্তব্য-

  • “ইহলোকে পুরুষদের দূষিত করা স্ত্রীলোকেদের স্বভাব। এই জন্য পন্ডিতেরা স্ত্রীলোকদের সম্পর্কে অসাবধান হন না।”২/২১৩
  • “স্ত্রীগণ সৌন্দর্য বিচার করেন না। যুবা কী বৃদ্ধ সে ব্যাপারেও তাদের কোনো আপত্তি থাকে না। সুরূপই হোক বা কুরূপই হোক পুরুষ পেলেই তারা তার সঙ্গে সম্ভোগ করেন।” ৯/১৪
  • “পুরুষের দর্শন মাত্রেই স্ত্রীজাতির মনে তার সঙ্গে মিলনের ইচ্ছা জন্মায়। তাই স্বাভাবিক ভাবেই তাদের চিত্তচাঞ্চল্য থাকে।” ৯/১৫
  • “শয়ন, আসন, ভূষণ,কাম, ক্রোধ,পুরহিংসা, কুটিলতা ও কুৎসিত ব্যবহার- এইসকল প্রবৃত্তি স্ত্রীলোকের জন্যই সৃষ্টির সময় মনু কল্পনা করেছেন।অর্থাৎ ওইসকল প্রবৃত্তি নারীদের স্বভাবগত ব্যপার।” ৯/১৭
  • নারীর ‘অন্তকরণ নির্মল হয় না।’ ৯/১৮
  • শাস্ত্রমতে স্ত্রিজাতি মিথ্যা অর্থাৎ অপদার্থ। ৯/১৮
  • ” মূর্খই হোক আর বিদ্বানই হোক কাম ক্রোধের বশীভূত পুরুষদের অনায়াসেই বিপথে নিয়ে যেতে কামিনীরা সমর্থ হয়।” ২/২১৪

ঋতুমতী নারীকে অশুচি বলে ঘোষণা করা হয়েছে, চণ্ডাল প্রভৃতি তথাকথিত  অশুচিদের সাথে ঋতুমতী স্ত্রীও অশুচির পর্যায়ে পড়েছে-

“চণ্ডাল, ঋতুমতী স্ত্রী, ব্রহ্মবধ করেছেন এমন পতিত ব্যক্তি, দশদিন পর্যন্ত নবপ্রসূতা সূতিকা,শব ও শবস্পরশী- এদের স্পর্শ করলে স্নানের মাধ্যমেই শুদ্ধ হওয়া যায়।” ৫/৮৫

সুতরাং ভগবান মনুর কাছ থেকে আমরা কি শিখলাম? শিখলাম- চণ্ডাল, মরদেহ, খুনি, ঋতুমতী নারী, দশদিনের সন্তান প্রসবকারিণী সম অপবিত্রা।

ভ্রষ্ট পুরুষদের দোষ আড়াল করে মনু আউড়েছেন ভিন্ন বাণী, দোষ দিয়েছেন নারীর উপরেই-

“ইহ সংসারে দেহধর্মবশত সব মানুষই কাম ক্রোধের বশীভূত। তাই মূর্খই হোক আর বিদ্বানই হোক কাম ক্রোধের বশীভূত পুরুষদের অনায়াসেই বিপথে নিয়ে যেতে কামিনীরা সমর্থ হয়।” ২/২১৪

‘নারীদের এমন স্বভাবেই সৃজন করেছেন বিধাতা’ , তাই নারীদের সব সময় বশে রাখার (রক্ষার) ব্যাপারে পুরুষদের সচেষ্ট হতে বলেছেন মনু (৯/১৬)-

মনু বলেছেন,

  • “বাল্যকালে স্ত্রীলোক পিতার বশে, যৌবনে স্বামীর বশে এবং স্বামীর মৃত্যু হলে পুত্রের বশে থাকবেন।পুত্র না থাকলে স্বামীর সপিণ্ডের বশে থাকবেন। অর্থাৎ স্ত্রীলোক কখনোই স্বাধীনভাবে অবস্থান করবেন না।” ৫/১৪৮
  • “শাস্ত্রমতে বিবাহের পূর্বে স্ত্রী জাতিকে কন্যা অবস্থায় পিতা রক্ষা করবেন।যৌবন অবস্থায় বিবাহিত স্ত্রীকে স্বামী রক্ষা করবেন। বৃদ্ধ কালে পুত্র রক্ষা করবেন। এমনকি পতিপুত্রহীন নারীকেও নিকটস্থ পিতৃ প্রভৃতিরা রক্ষা করবেন, কোনো অবস্থাতেই স্ত্রী জাতি স্বাধীন থাকবেন না।” ৯/৩
  • “স্বামী প্রভৃতি আত্মীয় পরিজনেরা দিনরাত্রির মধ্যে কখনোই স্ত্রীজাতিকে স্বাধীনভাবে অবস্থান করতে দেবেন না। বরং সর্বদাই নিষিদ্ধ রূপ ও রসের ব্যাপারে তাদের অনাসক্ত করে তাদেরকে নিজের বশে রাখবেন।”৯/২
  • “কী বালিকা, কী যুবতী, কী বৃদ্ধা গৃহে থাকাকালীন কোনো কাজই স্বতন্ত্রভাবে করতে পারবেন না।” ৫/১৪৭
  • “স্ত্রীলোক কখনোই পিতা,স্বামী বা পুত্রের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা করবেন না। কারণ এদের থেকে পৃথক হলে পিতৃকূল ও পতিকূল- উভয় কূলকেই তিনি কলঙ্কিত করবেন।” ৫/১৪৯

নারীদের বশে রাখার বিভিন্ন উপায় বর্ণনা করেছেন মনু-

“কোনো পুরুষই বল প্রয়োগ করে কোনো স্ত্রীকে সৎ পথে রক্ষা করতে পারে না। তবে নিম্নোক্ত উপায় অবলম্বন করলে স্ত্রীদের সহজেই রক্ষা করা যায়।” ৯/১০

উপায়গুলো হল-

“অর্থের সংগ্রহ ব্যয় সাধনে, নিজের শরীর ও গৃহ দ্রব্যের শুদ্ধিবিধানে , স্বামীর স্থাপিত অগ্নির শুশ্রুসায়, পাককার্যে এবং বিভিন্ন গৃহ দ্রব্যের পর্যবেক্ষণে স্ত্রী জাতিকে সর্বদা নিযুক্ত রাখা উচিত। এই সকল বিষয়ের কার্যভার স্ত্রীর উপর অর্পণ করলে সর্বদাই সৎ কর্মে ব্যস্ততায় মগ্ন থাকায় কুকর্ম ঘটানোর সম্ভাবনা থাকে না।” ৯/১১

নারীদের বশে রেখে শাসন করার জন্য ভগবান মনু বানিয়েছেন সকল বৈষম্যমূলক আইন; এমনকি নারীদের প্রহার করতেও বলা হয়েছে তার রচিত মানবশাস্ত্রে-

  • “পত্নীর সঙ্গে কখনোই তিনি (স্নাতক ব্রাহ্মণ) একপাত্রে ভোজন করবেন না ।” ৪/৪৩
  • “স্ত্রী,পুত্র,দাস,শিষ্য এবং সহোদর কনিষ্ট ভাই অপরাধ করলে সূক্ষ্ম রজ্জু দিয়ে অথবা বেণুদল বা বাঁশের বাখারি দিয়ে শাসনের জন্য তাদের আঘাত করবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে রজ্জু বা বাখারি দিয়ে শরীরের পৃষ্ঠ দেশেই একমাত্র আঘাত করতে হবে কখনোই উত্তমাঙ্গে বা মস্তকে আঘাত করা যাবে না।” ৮/২৯৮-৩০০

(স্বামী অপরাধ করলে স্ত্রী কি করবে, এ বিষয়ে যে কিছু বলা নেই, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।)

নারীকে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে বলা হয়েছে- 

“বন্ধ্যা নারী অর্থাৎ যার স্বামী অন্য স্ত্রী গ্রহণ করে গ্রাসাচ্ছাদন বহনোপযোগী অর্থ দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছে,পুত্রহীন প্রোষিতভর্তৃকা , যে স্ত্রীর কোনো সপিণ্ড অভিভাবক নেই অথচ যে নিজে সাধ্বী, বিধবা এবং রুগ্না স্ত্রী – এদের সকলের ধন অনাথ বালকের সম্পদের মতোই রাজা নিজে রক্ষা করবেন।” ৮/২৮

নারীর বাল্যবিবাহ ও বিবাহে বয়সবৈষম্য

  • “তিরিশ বছরের যুবক মনোমতো বারো বছরের কন্যাকে বিবাহ করবে। চব্বিশ বছরের যুবক মনোমতো আট বছরের কন্যাকে বিবাহ করবে। কিন্তু যদি ধর্মহানির আশঙ্কা থাকে অর্থাৎ ব্রহ্মচারীর বেদ গ্রহণ যদি তিরিশ বা চব্বিশ বছরের আগেই শেষ হয় তাহলে আগেই বিবাহ করা যেতে পারে। টীকাকার কুল্লুকের মতে, কন্যার বয়স অপেক্ষা বরের বয়স প্রায় তিন গুণ বেশি হবে- এই মাত্রা জ্ঞাপন করাই এই বচনের তাৎপর্য। কন্যার বয়ঃক্রম নির্ধারণ করা এই বচনের তাৎপর্য নয়।” (৯/৯৪)

এইভাবে একদিকে নারীদের বাল্যবিবাহের বিধান দেওয়া হয়েছে এবং অপরদিকে শিশু কন্যার সাথে তার তিনগুণ বয়সের পুরুষের বিবাহের নিয়ম তৈরি করা হয়েছে।

নিচুজাতির কন্যাকে ভোগ করার প্রবৃত্তি এবং উচ্চবর্ণের কন্যার সাথে নিম্নবর্ণের পুরুষের বিবাহের অস্বীকৃতি

আর্যদের বর্ণপ্রথা সম্বন্ধে আপনারা সকলেই হয়তো কমবেশি জানেন। এই প্রথায় ব্রাহ্মণ সবচেয়ে সুবিধাভোগী ,শূদ্র সবচেয়ে নির্যাতিত আর অস্পৃশ্যদের তো মানুষ হিসাবে স্বীকৃতিই নেই। এই বর্ণপ্রথায় নারীভোগের এক বিশেষ পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল সুচতুর ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়। ব্রাহ্মণ এর ঘাড়ে দোষ চাপানোর কারণ হল, এইসব রীতি নীতির তারাই প্রবক্তা এবং তারাই এর সবচেয়ে নির্লজ্জ সুবিধাভোগী। বর্ণপ্রথাতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সবার মধ্যে শিক্ষা, জীবিকা, ধর্মাচার সকল বিষয়ে অসাম্য ও বৈষম্য  কাজ করতো এবং সেই বৈষম্যের কুৎসিত প্রকাশ পায় নারী বিবাহ/ ভোগ বিষয়ে।

বিবাহের ক্ষেত্রে বর ও কনের বর্ণ বিবেচনা করে বিবাহকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল।

১/ অনুলোম বিবাহঃ উচ্চ বর্ণের পুরুষের সাথে নিম্নবর্ণের স্ত্রীর বিবাহ।

২/ প্রতিলোম বিবাহঃ এক্ষেত্রে কন্যা উচ্চবর্ণের ও বর নিম্নবর্ণের হয়ে থাকে।

ব্রাহ্মণ মনু তার শাস্ত্রে অনুলোম বিবাহের অনুমোদন দেন এবং প্রতিলোম বিবাহকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন।

এই অনুলোম-প্রতিলোম নিয়মের ফলে ব্রাহ্মণ চাইলে ব্রাহ্মণী,ক্ষত্রিয়া, বৈশ্যা ও শূদ্রা যেকোনো বর্ণের স্ত্রীকে বিবাহ করতে পারতো।

ক্ষত্রিয় পারতো ক্ষত্রিয়া,বৈশ্যা,শূদ্রা রমণীকে বিবাহ করতে। কিন্তু ক্ষত্রিয়ের ব্রাহ্মণীকে বিবাহ করা নিন্দনীয় ছিল।

বৈশ্য, বৈশ্যা ও শূদ্রা নারীকে বিবাহ করতে পারতো কিন্তু ক্ষত্রিয়া ও ব্রাহ্মণীকে বিবাহ করতে পারতো না।

কিন্তু শূদ্র বেচারা সবার নিচে অবস্থান করায় সে কেবল শূদ্রাকেই বিয়ে করতে পারতো তার অন্য বর্ণে বিবাহের কোনো অধিকার ছিল না।

এই পদ্ধতির বিশ্লেষণে দেখা যায় কূট বুদ্ধিসম্পন্ন ব্রাহ্মণ সকল বর্ণের নারীর উপর তার হস্ত চালনা করেছে, বাকি বর্ণ গুলোও পারছে অন্যান্যা বর্ণের নারীকে বিবাহ করতে কিন্তু শূদ্র জাতি (বিশেষত শূদ্র পুরুষ) বঞ্চিত হচ্ছে অন্য বর্ণে বিবাহে এবং শূদ্রা পরিণত হয়েছে সকল উচ্চবর্ণের সাধারণ ভোগ্যপণ্যে।

অপরদিকে, আর্যরা তাদের নারীদের ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করেছে , যখন উচ্চবর্ণের কোনো নারী নিম্নবর্ণের কোনো পুরুষকে বিবাহ করতে গিয়েছে তখনই উৎপন্ন সন্তানকে নিন্দনীয় বর্ণসংকর ঘোষণা করা হয়েছে এবং তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়েছে।

মনু বলেন,

  • “নিকৃষ্ট জাতির কন্যা যদি সম্ভোগের জন্য নিজের থেকে উৎকৃষ্ট জাতির পুরুষকে ভজনা করে তাহলে ঐ কন্যার কিছুই দণ্ড হবে না।কিন্তু সে যদি অপকৃষ্ট জাতির পুরুষকে ভজনা করে তাহলে যে পর্যন্ত তার কাম নিবৃত্তি না হয় সে পর্যন্ত তাকে গৃহে আটকে রাখতে হবে।”৮/৩৬৫
  • “উত্তম জাতির সকামা কন্যাকে অধম জাতির পুরুষ যদি ভজনা করে তাহলে ঐ পুরুষের শারীরিক বধ দণ্ড হবে। ……” ৮/৩৬৬

 

মহর্ষি মনু ‘কোনো অভিযোগ না করে উচ্চ তিন বর্ণের দাসত্ব করে যাওয়াকে’ – শূদ্রের কর্তব্য বলে বর্ণনা করেছিলেন কিন্তু তার সমাজে নারী যেন অলিখিত শূদ্র। কোনো বর্ণেই তার যেন মর্যাদা নেই, স্বাধীনতা নেই। শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নারীকে পিতা-ভ্রাতা-স্বামী-রাজার দাস করে রেখেছিলেন মনু ও তার সমাজ। তাই তো দাসরূপ নারীকে বলা হয়েছে,

পতিসেবাই তার একমাত্র ধর্ম-

  • “পিতা স্বয়ং যে ব্যক্তির কাছে কন্যা দান করেছেন কিংবা পিতার অনুমতিক্রমে ভাই যে ব্যক্তির কাছে বোনকে দান করেছেন, সেই স্বামীর জীবিতকাল পর্যন্ত তার সেবা করা এবং স্বামীর মৃত্যুর পরও ব্যভিচার না করা স্ত্রীলোকের কর্তব্য।” ৫/১৫১
  • স্ত্রীলোককে গৃহ কর্মে দক্ষ হতে বলা হয়েছে। (৫/১৫০)
  • কায়মনোবাক্যে পতিসেবা পরায়ণতাই স্ত্রীজাতির ধর্ম। পতিসেবাপরায়ণ ভক্তিমতী স্ত্রীদের পুরষ্কার স্বরূপ স্বামী-পিতামহের পিণ্ডের উচ্চিষ্ট দান করার কথা বলা হয়েছে। (৩/২৬২) কায়মনোবাক্যে পতিসেবাপরায়ণ নারীধর্ম পালনকারী নারী ইহলোকে অত্যন্ত সুখ্যাতি পান এবং মৃত্যুর পরে পতিলোকে গমন করেন। (৫/১৬৬-১৬৭) তাই স্বামীর জীবনকালে, এমনকি মৃত্যুর পরেও স্ত্রীদের অনিষ্টাচরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পরেও কখনোই তার মৃত স্বামীর অপ্রিয় আচরণ না করতে বলা হয়েছে। এর ফলেই নাকি স্ত্রী তার উপার্জিত পূণ্যে স্বামীর কাছে স্বর্গে গমন করবেন (৫/১৫৬) এবং ইহলোকে সাধ্বী স্ত্রীর খেতাব প্রাপ্ত হবেন! (৯/২৯)
  • স্বামী ধন,মান,কূল,শীলে অপকৃষ্ট হলে স্ত্রীলোকের অন্যকোনো পুরুষকে গ্রহণ করাকে নিন্দনীয় বলা হয়েছে। (৫/১৬৩)
  • ‘আমি ধনীর কন্যা’- এরূপ দম্ভরূপে অথবা নিজের সৌন্দর্যের অহংকারে কোনো নারী স্বামীকে ত্যাগ করে অন্য পুরুষকে গ্রহণ করলে তাকে লোকজনের সামনে কুকুর দিয়ে খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে। আর সেই নারী যে পুরুষের সঙ্গ লাভ করেছিল তাকে গরম লৌহ শয্যায় শুইয়ে রেখে পুড়িয়ে মেরে ফেলার কথা বলা হয়েছে এবং যতক্ষণ না সেই পুরুষ পুড়ে ছাই হয়ে যায় ততক্ষণ আগুনে কাঠ নিক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। (৮/৩৭১-৩৭২)

স্ত্রীর দাসত্ব স্বামীর মরণেও শেষ হয় না, তাকে মৃত স্বামীরও দাসত্ব করতে হয়।

স্বামী মারা গেলে স্ত্রীজাতির কর্তব্য-

স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীদের পুনর্বিবাহ অর্থাৎ বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ করে বলা হয়েছে-“……বিবাহ সম্বন্ধীয় শাস্ত্রে এমন কোনো বিধি লিখিত নাই যে বিধবাদের পুনর্বিবাহ হতে পারে।” ৯/৬৫

বিধবার জীবন ছিল মৃত্যুর থেকেও ভয়ঙ্কর, বিধবার যাতে আর দৈহিক সৌন্দর্য না থাকে, সে যাতে আর অন্য পুরুষকে আকৃষ্ট করতে না পারে তাই কঠোর ব্রহ্মচর্যের মাধ্যমে তার সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়ার জন্য বলা হয়-

  • “স্বামী মারা গেলে স্ত্রী পবিত্র ফলমূল আহার করে জীবন যাপন করবেন। কিন্তু কখনোই ব্যভিচারের ইচ্ছায় পরপুরুষের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করবেন না।” ৫/১৫৭
  • “যতদিন না নিজের মৃত্যু হয় ততদিন পর্যন্ত পতিপরায়ণা স্ত্রী ক্লেশ সহিষ্ণু ও নিয়মচারিণী হয়ে মধু মাংস ও মৈথুন বর্জন করে ব্রহ্মচর্য পালন করবেন। অর্থাৎ সতী সাধ্বী স্ত্রীলোকের যা অন্যতম পরম ধর্ম সেই ধর্ম পালনেই তিনি একাগ্র হবেন।” ৫/১৫৮
  • ” সদাচারশালী স্ত্রী স্বামীর মৃত্যু হলে ব্রহ্মচর্য ব্রত অবলম্বন করবেন। কিন্তু কখনোই পরপুরুষের সংযোগে পুত্র উৎপাদন করবেন না। কারণ অপুত্রা হলেও উক্ত ব্রহ্মচারীদের (বালখিল্য ঋষি) মতোই তিনিও স্বর্গে গমন করতে পারবেন।”৫/১৬০

স্ত্রী যাতে পরপুরুষের সাথে কোনোরূপ সম্পর্ক না করতে পারে সেদিকে আর্যরা বেশ সচেষ্ট ছিল। (৯/৮-৯)বিধবা রমণীকে ভয় দেখিয়ে বলা হয়েছে, “স্ত্রীলোক যদি পরপুরুষের উপভুক্ত হন তাহলে ব্যভিচার দোষে সংসারে নিন্দনীয় হন। এইরূপ স্ত্রীলোক পরকালে শেয়াল হয়ে জন্মান এবং কুষ্ঠ প্রভৃতি বিভিন্ন পাপরোগে আক্রান্ত হয়ে অত্যন্ত পীড়া ভোগ করেন।” (৫/১৬৪ ; ৯/৩০)

সুতরাং স্ত্রীজাতির দায়িত্ব আমরণ তার স্বামীর সেবা করা এবং স্বামীর মারা গেলেও তার অপ্রিয় আচরণ অর্থাৎ অন্য পুরুষের সংসর্গ  এবং পুনরায় বিবাহ থেকে বিরত থাকা এবং কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করা।

এবার তাদের স্ত্রীদের আজীবন কষ্টের কি প্রতিদান দিয়েছেন আর্যপুরুষেরা দেখা যাক-

নারীদের সাথে প্রতারণার ভালোই পথ তারা বেছে নিয়েছিল আর্য পুরুষেরা, মনু তাদের সেইরকমই শিক্ষা দিয়ে বলেন,

“‘তুমি আমার পরম প্রেয়সী,অন্যকে আমি প্রার্থনা করিনি’- এইভাবে সঙ্গ লাভের জন্য কামিনী (নারী) বিষয়ে মিথ্যা শপথ করলে পাপ হয় না। ‘আমি অন্য বিবাহ করবো না’, এইরূপ ক্ষেত্রে বিবাহ বিষয়ে এবং গোরুর ভক্ষ্য বিষয় সম্বন্ধে ,হোমের জন্য কাষ্ঠ আহরণ বিষয়ে এবং ব্রাহ্মণের রক্ষার জন্য মিথ্যা শপথে কোনো পাপ হয় না।” ৮/১১২

বিবাহিতা নারীর প্রতি শক্ত হয়েছে আর্যসমাজ, নারীর ত্রুটি পেলেই তাকে ত্যাগ করতে বলা হয়েছে। মনুর শাস্ত্রে বলা হয়েছে-

  • মদ্যপানে আসক্ত, দুশ্চরিত্র, পতিবিদ্বষিণী, কঠিন রোগগ্রস্থ, অপকার সাধনে সক্ষম, ধনক্ষয়কারী স্ত্রীকে ত্যাগ করে স্বামীকে দ্বিতীয় বিবাহ করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। (৯/৭৯-৮০)
  • “……স্ত্রী যদি অপ্রিয়ভাষিণী হন তাহলে কালক্ষয় না করে তৎক্ষণাৎ স্বামী বিবাহ করবে।” ৯/৮১
  • “স্ত্রী যদি স্বামীর প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন হন তাহলে স্বামী স্ত্রীর জন্য এক বৎসর কাল প্রতীক্ষা করবে। তার মধ্যে স্ত্রীর দ্বেষভাব গত না হলে স্বামী তাকে অলঙ্কার প্রভৃতি সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে তার সহবাস ত্যাগ করবে।” ৯/৭৭
  • ঘরে স্ত্রী থাকার পরেও স্বামী যদি পুনরায় বিবাহ করেন, আর তাতে স্ত্রী যদি নারাজ হয়ে ঘর ছেড়ে চলে যেতে উদ্যত হন তাহলে সেই স্ত্রীকে অবরুদ্ধ করার উপদেশ দেয়া হয়েছে মনুস্মৃতিতে অথবা সেই স্ত্রীকে আত্মীয় স্বজনের সামনে ত্যাগ করার কথা বলা হয়েছে। (৯/৮৩)

এবং সর্বোপরি সতী সাধ্বী স্ত্রী মারা যাওয়ার পর স্বামীকে পুনরায় বিবাহ করতে বলা হয়েছে-

“সতী সাধ্বী স্ত্রী আগে মারা গেলে তার দাহকার্য ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাপ্ত করার পর পুরুষ পুনরায় বিবাহ করবেন এবং পুনরায় অগ্ন্যাধান কর্ম সম্পন্ন করবেন। এইভাবে পূর্বোক্ত বিধান অনুযায়ী নিত্য পঞ্চমহাযজ্ঞ সম্পাদন করবেন এবং পুনরায় দার পরিগ্রহ করে পরমায়ুর দ্বিতীয় ভাগে গৃহস্থাশ্রমেই বাস করবেন। “৫/১৬৮-১৬৯

পুত্রপ্রাপ্তিতে মরিয়া মনুর সমাজ-

  • পুত্রের জন্য মানুষ স্বর্গ লাভ করে। পৌত্রের জন্য মানুষ ঐ স্বর্গ লোকে চিরস্থায়িত্ব লাভ করে এবং প্রপৌত্রের জন্য মানুষ সূর্যলোক লাভ করে। মনুসংহিতা ৯/১৩৭

পুত্র শুধু স্বর্গে পৌঁছাতে সাহায্য করে না, স্বর্গের সাথে সাথে পুত্র নরক থেকেও তার পিতৃকুল ও মাতৃকুলকে ও রক্ষা করে-

  • “পুত্র যেহেতু পিতাকে পুন্নাম নরক থেকে ত্রাণ করে তাই ব্রহ্মা স্বয়ং ‘পুত্র’ এই নাম রেখেছেন। পৌত্র এবং দৌহিত্রের মধ্যে এমন কিছু পার্থক্য শাস্ত্রে বলা হয়নি। কারণ দৌহিত্র পরলোকে পৌত্রের মতোই মাতামহকে পরিত্রাণ করে।……” ৯/১৩৮-১৩৯

সনাতন নারী শস্যক্ষেত্র, পুরুষ সেই ক্ষেত্রের মালিক-

পুত্র যেহেতু স্বর্গের দ্বার ও নরক হতে উত্তরণের পথ তাই আর্যরা পুত্রলাভের জন্য অত্যন্ত মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কখনো কখনো দেখা গেল, কোনো কোনো আর্যপুরুষ ললাটদোষে উর্বরতাহীনতার কারণে পুত্র উৎপাদনে অক্ষম। কেউ কেউ অপুত্রক অবস্থায় ভূত প্রেতে পরিণত হল। এমন জটিল পরিস্থিতিতে ভগবান মনুই তাদের পথ দেখালেন, বাতলে দিলেন পুত্রপ্রাপ্তির পথ । যেহেতু বেদে বলা আছে বিধাতা নারীকে গর্ভ ধারণের জন্যই সৃষ্টি করেছেন (৯/৯৬ ) তাই, স্থির হল, চুপিসারে গভীর রাতে নপুংসক স্বামী অথবা গুরুজনের আদেশে সধবা অথবা বিধবা স্ত্রীকে ঘি মাখিয়ে প্রস্তুত করে রাখা হবে, আর ওই রমণীর সাথে কোনো পরিচিত পরপুরুষ রমণ করবে এবং তার গর্ভে একটি পুত্র উৎপাদন করবেন; কখনো একাধিক পুত্র উৎপাদনের বিধানও দিয়েছিলেন মহর্ষি মনু। ( ৯/৬০, ৯/৬১) এই গোপন কর্মে পরপুরুষ যত কাছের হবে ব্যাপারটিও ততোই গোপন রবে। তাই আর্যধর্ম অনুযায়ী দেবর আর ভাসুরের কর্তব্য স্থির হল গভীর রাতে ভ্রাতৃবধুরমণ। (৯/১৪৬) তবে, দেবর- ভাসুরের অভাবে বংশের অন্য কোনো পুরুষকেই এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে হত। যেভাবেই হোক নরক থেকে নিষ্কৃতি ও স্বর্গ মার্গে পদক্ষেপন করতে তো হবে!

পাঠকদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। এই যে গুপ্ত পদ্ধতিতে পুত্র উৎপন্ন হল, এই পুত্র তো স্বর্গগমনেচ্ছুক আর্যপুত্রের ঔরসজাত নয়। তাহলে কি করে সে মৃত্যু-পরে স্বর্গোপরে লীলা-খেলা করবে?

এই প্রশ্ন ও বিস্ময়ের সমাধান দিয়েছেন, আমাদের মনু ভগবান। তিনি দাঁড় করিয়েছেন তার ‘ক্ষেত্রজপুত্র’ নামক থিওরি। এই তত্ত্বে তিনি নারীকে, এবার পরিণত করেছেন ক্ষেতে। মনু বলেছেন, নারী হল পুরুষের ক্ষেত আর পুরুষ এর থাকে বীজ। (৯/৩৩-৩৪) আর খেতে বীজ লাগিয়েই চারাগাছ উৎপন্ন করা হয়। কিন্তু রাম এর ক্ষেতে যদি বলরাম অমাবস্যার রাতে, অন্ধকারে,বীজ লাগিয়ে আসে, আর তাতে ধান, গম এর ফলন হয়, তবে রাম তার ক্ষেতের ফসল বলরামকে দেবে কেন, যতই বলরামের বীজ হোক না কেন?

ভগবান মনুর ভাষায়,

“যেমন অন্যের গাভী,মহিষী,স্ত্রী উট ও স্ত্রী ঘোড়া প্রভৃতি জন্তুদের সঙ্গে অন্যের বৃষ, মহিষ,উট এবং ঘোড়া প্রভৃতির মিলনে উৎপন্ন সন্তান গাভী প্রভৃতি পশু মালিকদেরই অধিকৃত হয়ে থাকে; বৃষ প্রভৃতি পশু মালিকদের হয় না। সেইরূপ পরক্ষেত্রে অর্থাৎ পরস্ত্রীতে উৎপাদিত সন্তান উৎপাদকের হয় না, ক্ষেত্র স্বামীরই হয়ে থাকে। যার ক্ষেত্র নেই কেবল বীজ আছে সে যদি পরের ক্ষেত্রে বীজ বপন করে তাহলে তার শস্যফল কিছুই লাভ হয় না। ক্ষেত্রস্বামীই ঐ ফল ভোগ করে থাকে।”
( ৯/৪৮-৪৯)

এইভাবেই নারীকে ক্ষেতে রূপান্তরিত করে তাতে নানান জাতের বীজ লাগাতেন প্রতিভাবান আর্যপুত্রগণ।

ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবসময় নারীর ইচ্ছার  মূল্য দেওয়া হত না, স্বামীর মৃত্যুর পর নারী যাতে স্বেচ্ছায় ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদনের মাধ্যমে পরপুরুষের সাথে মিলিত হতে না পারে এবং নারীর তথাকথিত  সনাতন সতীত্ব যেন কোনোমতে ক্ষুণ্ণ না হয় সেজন্য নারীকে এই কাজ করতে নিরুৎসাহিত করে মনু ভগবান চরম স্ববিরোধী কথা বলেন-

(উল্লেখ্যঃ- বিধবা নারীর পুনর্বিবাহও নিষিদ্ধ করেছিলেন মনু, কিন্তু স্ত্রী মারা যাওয়ার সাথে সাথেই পুরুষকে পুনরায় বিবাহ করতে বলেছিলেন।)

“সন্তান না থাকলে স্বর্গ গমন হয় না একথা ভুল। বালখিল্য প্রভৃতি বহু সহস্র ব্রহ্মচারী ব্রাহ্মণ সন্তান উৎপাদন না করেই কেবলমাত্র ব্রহ্মচর্য বলেই অক্ষয় স্বর্গ লোক লাভ করেছেন। সুতরাং ওই সকল ব্রহ্মচারীর মতোই সাধ্বী স্ত্রী সন্তানবতী না হলেও স্বীয় ব্রহ্মচর্য বলেই স্বর্গ গমন করেন।”  ৫/১৫৯

ক্ষেত্রজ পুত্রের উদাহরণ হিসাবে বলা যায় মহাভারতের ধৃতরাষ্ট্র, পান্ডু প্রভৃতির জন্মকথা। মহাভারতের রাজা বিচিত্রবীর্য অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে, বংশের গুরুজনেরা তার স্ত্রী অম্বিকা এবং অম্বালিকার গর্ভে ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদনের পদক্ষেপ নেন। মাতা সত্যবতী স্থির করেন তার পুত্র বেদব্যাস দ্বারা মৃত পুত্রের স্ত্রী অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে পুত্র উৎপাদন করবেন। ডাকা হল, বেদব্যাসকে। গভীর রাতে তিনি বৌদিদের শয়নকক্ষে প্রবেশ করলেন। যেহেতু বেদব্যাস অত্যন্ত কুৎসিত, কদাকার দেখতে ছিলেন তাই অম্বিকা ও অম্বালিকা সম্মত ছিলেন না বেদব্যাসের সাথে পুত্র উৎপাদনে।

সঙ্গমকালে অম্বিকা চোখবুজে কুরু বংশের অবিবাহিত বীর ভীষ্মের কথা ভাবছিলেন আর অপরদিকে অম্বালিকা ভয়ে পাণ্ডু বর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। সহবাসকালে অম্বিকার চোখ বন্ধ থাকার কারণে কারণে তার পুত্র ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হলেন, আর ভয়ে অম্বালিকার গায়ের রঙ পান্ডু বর্ণ হয়ে যাওয়ার ফলে তার পুত্রের নাম হল পান্ডু।

অর্থাৎ দেখা যায়, বেদব্যাস ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদনের জন্য অম্বিকা ও অম্বালিকাকে একপ্রকার ধর্ষণ করেছিলেন।

কতই না মহৎ ছিলেন আর্যপুরুষগণ। প্রয়োজনে স্ত্রীকে ক্ষেত বানিয়েছেন, সেই ক্ষেতে নানা জাতের বীজ লাগিয়েছেন, সেই ক্ষেত থেকে অদ্ভুত রকম ফলন পেয়েছেন এবং প্রয়োজনে স্ত্রীদের ধর্ষণও করিয়েছেন!

সহায়ক গ্রন্থ-

মনুসংহিতার অধিকাংশ শ্লোকের তর্জমা চৈতালি দত্তের অনুবাদকৃত মনুসংহিতা হতে গৃহীত হয়েছে

আগ্রহীদের জন্য অনলাইনে মনুসংহিতা পড়া ও ডাউনলোডের লিংক

সম্পূর্ণ লেখাটির পিডিএফ ডাউনলোড করুন

Facebook Comments

Leave a Reply