ইহুদী বিদ্বেষের কথা।

লেখকঃ শাহিনুর রহমান শাহিন

মানুষের দৈনন্দীন জীবনে ধর্মের প্রভাব অনেক। সম্ভবত আর কোন প্রভাবক মানবজীবনকে এতো বেশী প্রভাবিত করে না। অবশ্য পৃথিবীতে ধর্মের সংখ্যা শুধু একটি নয়। এখানে অসংখ্য পরস্পরবিরোধী ধর্ম প্রচলিত আছে। এসব ধর্মের অধিকাংশ-ই তাদের উৎপত্তিস্থলের বাইরে প্রসার লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। মাত্র চারটি ধর্ম অনেকগুলো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো হলো ক্রিশ্চিয়ান, ইসলাম, বৌদ্ধ ও ইহুদি।

অনুসারীর সংখ্যার দিক থেকে সনাতন হিন্দুধর্ম তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে প্রচার করা হয়নি। তাই এটিও আঞ্চলিক ধর্ম হিসেবে থেকে গেছে।
অন্যদিকে ইহুদি ধর্মের অনুসারী অল্প। পনের মিলিয়ন হবে না। কিন্তু এই ধর্মের অনুসারীগণ অনেক আগে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে যে যার মতো করে ছড়িয়ে পড়েছেন। এখন আমি লিখছি মূলত এ ধর্মটিকে নিয়ে।

প্রথমত, আমি জানি না, পৃথিবীর আর কোন ধর্মের অনুসারীকে অন্য ধর্মের লোকেরা এতো বেশী অপছন্দ করে কিনা। মুসলমানরা দু’শ বছর ক্রিশ্চিয়ানদের সাথে ক্রুসেড লড়েছে। তবু তারা ক্রিশ্চিয়ানদের এতো বেশী খারাপ মনে করে না, যতোটা মনে করে ইহুদিদের। মুসলমানদের মতো করে অন্যান্য সকলে ইহুদিদের ঘৃণা করে। ক্রিশ্চিয়ান, বৌদ্ধ, হিন্দু, শিখ – সবাই। শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী হওয়ার কারনে যে মানুষ মানুষকে এতো বেশী ঘৃণা করতে পারে, সেটা ইহুদিদের প্রতি অন্যদের আচরণ না দেখলে বোঝার উপায় নেই।

আমি ইহুদি নই, ইহুদিদের দালালও নই। আমার সাহস কম। তবু আমি সত্য কথা বলতে চাইছি; এবং সত্য কথা বলবো। আমি যে সমাজে বড়ো হয়েছি, সেই সমাজে নিয়মিত ইহুদিদের নামে বিষোদগার করা হয়। শুধু আমাদের সমাজেই নয়, সারা বিশ্বের সব সমাজেই সম্ভবত এটা করা হয়। তাদের নামে কখনো কোন ভালো কথা বলা হয় না।

ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, ইহুদিরা পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ, তাদের মৃত্যুতে সভ্যতার বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয় না। আমি অনেককে হিটলারের পতন নিয়ে আফসোসও করতে দেখেছি। হিটলার বেঁচে থাকলে ইহুদিদের সম্পুর্ণ নির্বংশ করা যেতো। লড়াইতে হিটলার হেরে যাওয়ায় সেটা সম্ভব হয় নি বলে তাদের দুঃখের শেষ নেই। ছোটবড়ো সব রকম সমস্যার জন্য ইহুদিদের দায়ী করেন – এরকম লোকের অভাব এখনো নেই।

অথচ মানবসভ্যতা বিনির্মাণে ক্রিশ্চিয়ানদের পরেই ইহুদিদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশী। যদিও পৃথিবীতে ক্রিশ্চিয়ানদের সংখ্যা ইহুদিদের তুলনায় অন্তত ১২০ গুণ। দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্প কিংবা সাহিত্যসহ সভ্যতার অগ্রযাত্রায় প্রতিটি সহায়ক ক্ষেত্র ইহুদিদের সংস্পর্শে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হয়েছে। এক্ষেত্রে মুসলমানসহ অন্যদের ভূমিকা যৎসামান্য। উল্লেখ করার মতো না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যে বিষয়ে পড়ি, তার মেরুদণ্ড যারা দাঁড় করিয়েছেন, তাদের বেশীরভাগই ইহুদি। শুধু তাই নয়, অন্যান্য সমস্ত বিষয়ে মৌলিক গবেষণায় ইহুদিদের অবদান অবিশ্বাস্য। আসুন আমরা দেখি, মোটামুটি ছয়টি ক্ষেত্রে ইহুদি নোবেল পুরষ্কার বিজয়ীদের সংখ্যা কতো –
শান্তি ১৯০১ সাল থেকেঃ ০৯ জন
সাহিত্য ১৯০১ সাল থেকেঃ ১৫ জন
অর্থনীতি ১৯৬৯ সাল থেকেঃ ২৭ জন
পদার্থ ১৯০১ সাল থেকেঃ ৫২ জন
রসায়ন ১৯০১ সাল থেকেঃ ৩৫ জন
চিকিৎসা ১৯০১ সাল থেকেঃ ৫৩ জন
সূত্রঃ https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_Jewish_Nobel_laureates

নোবেল পুরস্কার হয়তো সবকিছু নয়। কিন্তু এটি জ্ঞান ও সভ্যতার প্রতীক হিশেবে বিবেচিত হয়। এখন আমি ফেসবুকে লিখছি। এই ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, জুকারবার্গ একজন ইহুদি। আর যে সার্চ ইঞ্জিন দ্বারা ফেসবুক চালাচ্ছি, সেটা গুগল। গুগল সার্জেই ব্রিন নামের এক ইহুদির আবিষ্কার। আরো আশ্চর্য হবেন এটা জেনে যে, এই মুহুর্তে “ডেল” ল্যাপটপে আমি ফেইসবুক ব্যবহার করছি। এ “ডেল” কোম্পানীর স্বত্বাধিকারী একজন ইহুদি। লোকটির নাম মাইকেল ডেল। আমি ল্যাপটপে মাইক্রোসফটের “Windows 8” অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করি। মাইক্রোসফটের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সিইও ইহুদি ধর্মাবলম্বি স্টিভ বালমার। তাদের আবিষ্কার আমাদের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করেছে।

আইনস্টাইন না জন্মালে পদার্থবিজ্ঞান তরতর করে এগিয়ে যেতো না। জোনাস স্যাঙ্ক পোলিও’র ভ্যাকসিন আবিষ্কার না করলে আজো হয়তো অসংখ্য লোককে পঙ্গুত্ববরণ করে অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে চলতে-ফিরতে হতো। ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর অন্যতম উদ্যোক্তা বব ডিলান ও মিত্রবাহিনীর অন্যতম কুশলী যোদ্ধা লেঃ জেনারেল জ্যাকব আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে আছেন। এভাবে অনেক ইহুদি বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, দর্শনের বিভিন্ন শাখায় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। এর পরেও তাদের প্রতিনিয়ত মানুষের ঘৃণাভরা চাহনির মুখোমুখি হতে হয়। মধ্যযুগের সাহিত্যিকরা তাদের রচনায় এদের নামে কুৎসা রটিয়ে বিমলানন্দ উপভোগ করতো। হিটলার তো আরেকটু হলে ইহুদিদের পৃথিবী থেকে বিলুপ্তই করে ফেলছিলো।

তবু আশার বিষয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইহুদিদের অবস্থা একটু ভালো হয়েছে। এখন চাইলেও কেউ আর রাস্তায় ফেলে ইচ্ছেমতো তাদের ঠ্যাঙ্গাতে পারে না। সমাজ আছে, আইন আছে।

ইহুদিদের প্রধান অপরাধ, তাদের অনেক সম্পদ। পৃথিবীর শীর্ষ একশজন সম্পদশালী লোকের মধ্যে পঁচিশজন ইহুদি বংশোদ্ভূত। গত কয়েকশ বছরে কোন ইহুদি ভিখারী দেখা যায়নি। পৃথিবীর নিয়মই এটি। সংখ্যালঘুদের মধ্যে যখন কেউ ভালো অবস্থানে উঠে আসে, অন্যরা তাদের ঈর্ষা করে। আমাদের দেশের হিন্দুরা সংখ্যালঘু। তারা যদি নিজের যোগ্যতায় উপরে উঠে দেশ চালাতো, দেশের শীর্ষস্থানীয় পদগুলো অধিকার করতো, তাহলেও সংখ্যাগুরু মুসলমানেরা তাদের ভালো চোখে দেখতো না। এই নিয়ম হয়তো সব মহাদেশের সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

আমার মূল বক্তব্য হলো, হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড দিয়ে কিছু হয় না। এটি শুধু শান্তির জন্য মানুষের অপেক্ষাকেই দীর্ঘায়িত করে। ইহুদিদের প্রতি কেউ কখনো বিদ্বেষহীন দৃষ্টিতে তাকায়নি। ফলাফল হিশেবে আমরা দেখেছি, তারাও হিংস্র হয়ে গেছে। তাদের নৃশংসতা শিউরে ওঠার মতো।

আমরা কেউ অশান্তি চাই না, শান্তি চাই। এই মানবসভ্যতা অজস্র সৃষ্টিশীল মানুষের পরিশ্রমের ফসল, ত্যাগের ফসল। এদের মধ্যে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চিয়ান, আস্তিক, নাস্তিক সবাই আছে। এরা সবাই তাদের দরদভরা সৃষ্টিশীলতা দিয়ে পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তাই আমরা প্রত্যাশা করি না, কেউ তার রচনায় এভাবে ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করুক –
“নিহত ইহুদিদের মাথার খুলি নিয়ে আমি বেহেশতের দরজায় কড়া নাড়বো….”।

আমরা এটাও চাই না, কোন ইসরাঈলি জঙ্গিবিমান কোন নিষ্পাপ ফিলিস্তিনি শিশুর চঞ্চলতাকে নীরব করে দিক।

মানুষ মানুষকে ভালবাসবে। এভাবে ঘৃণা করবে কেন? আমরা পারস্পরিক বোঝাপড়া চাই, শান্তি চাই।

Facebook Comments