সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ!

লেখকঃ শাহিনুর রহমান শাহিন

আমাদের দেশটি নাকি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ! সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন নাকি আমাদের দেশে খুব সুখেশান্তিতে বসবাস করছে! আজকাল এসব কথা শুনলে প্রচণ্ড দুঃখের মধ্যেও হেসে উঠতে ইচ্ছে করে। মানুষ কোন যুক্তিতে এসব কথা বলতে পারে?

আসুন, ছোট্ট একটি পরীক্ষা করে দেখা যাক। আপনি ফেইসবুক ব্যবহার করছেন। এর মানে হচ্ছে আপনি ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানেন। দয়া করে একটা কাজ করুন। ‘……… উপজেলায় মন্দির/প্রতিমা ভাংচুর’ লিখে গুগলে সার্চ দিন। ফাঁকা স্থানটিতে যে কোন একটি উপজেলার নাম লিখুন, লিখুন আপনার ইচ্ছে মতো। আপনি লিখতে পারেন টেকনাফ-তেতুলিয়া-শ্যামনগর-জকিগঞ্জ-মিঠাপুকুর-ডোমার-মুলাদি-আমতলী-চকোরিয়া-চৌদ্দগ্রাম-বিশ্বনাথ-শ্রীমঙ্গল-গফরগাঁও-হালুয়াঘাট ইত্যাদি যা ইচ্ছা তাই।

লিখেছেন? লিখলে আপনি কী পাবেন, আমি বলে দিই। পাবেন যে, দুর্বৃত্তদের হাতে সেখানে সত্যিই মন্দির ভাংচুর হয়েছে। এবং তারিখটি লক্ষ্য করলে দেখবেন, এই ভাংচুরের কমপক্ষে একটি ঘটনা ঘটেছে সর্বশেষ তিন বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, গত তিন বছরে প্রায় সবগুলো উপজেলায় অন্তত একটি মন্দির ভাংচুর হয়েছে। আমি যতোগুলো উপজেলার নাম লিখে সার্চ দিয়েছি, প্রতিটির ক্ষেত্রে একই ফলাফল পেয়েছি। দেশে উপজেলার সংখ্যা ৪৮৯টি। ধরে নিচ্ছি, তিন বছরে এদের মধ্যে ৪৫০টি উপজেলায় মন্দির ভাঙ্গা হয়েছে। তাহলে প্রতি বছর গড়ে অন্তত ১৫০টি উপজেলায় অন্তত একটি মন্দির ভাংচুরের শিকার হয়েছে। একশত পঞ্চাশটি মন্দির! এরপরও মানুষ বলবে, আমাদের বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ!

এবার আরেকটি পরীক্ষা করা যাক। ধরে নিচ্ছি, আপনি জানেন যে, স্বাধীনতার পর আমাদের দেশ পেয়েছে –
০১) রাষ্ট্রপতি ১৭ জন।
০২) প্রধানমন্ত্রী ১০ জন।
০৩) স্পিকার ১১ জন।
০৪) ডেপুটি স্পিকার ১২ জন।
০৫) প্রধান বিচারপতি ২১ জন।
০৬) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ০৫ জন।
০৭) চিফ হুইপ ১০ জন।
০৮) অ্যাটর্নি জেনারেল ১৫ জন।
০৯) সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীপ্রধান ৪৪ জন।
১০) পুলিশের আইজি ২৮ জন।
১১) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ১০ জন।
১২) জাতীয় অধ্যাপক ২৩ জন।
১৩) প্রধান নির্বাচন কমিশনার ১১ জন।

এবার দয়া করে আপনি দেখুন, উপরের পদগুলোর মধ্যে কয়টিতে সংখ্যালঘুগণ দায়িত্বপালন করেছেন। আপনি যদি বইপত্র ঘেটে দেখেন, তাহলে জানবেন যে, এদের মধ্যে শুধু একজন বিচারপতি (সুরেন্দ্র কুমার সিনহা) ও একজন জাতীয় অধ্যাপক (ডঃ রঙ্গলাল সেন) নিযুক্ত করা হয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে। এই দু’জনের বাইরে আর কেউ নেই। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বলতে আমি বুঝিয়েছি হিন্দু-বৌদ্ধ-পাহাড়ীদের।

এছাড়া স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি (১৫ জন), আইন কমিশনের চেয়ারম্যান (০৭ জন), জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি (১৪ জন), মহা হিশাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (১১ জন), র্যাবের মহাপরিচালক (০৮ জন), বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক (১৫ জন), পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান (১৩ জন), দুদকের চেয়ারম্যান (০৪ জন), বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান (১২ জন) ইত্যাদি পদে এখনো কোন সংখ্যালঘুকে স্থান দেয়া হয়নি।

এখন হয়তো অনেকে প্রশ্ন তুলবেন – কেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তো সংখ্যালঘুদের মন্ত্রীত্ব দেয়া হয়েছে? হ্যাঁ, দেয়া হয়েছে। এবং তাদেরকে দেয়া হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো। স্বরাষ্ট্র-পররাষ্ট্র-অর্থ-শিক্ষা-আইন-যোগাযোগ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে সংখ্যালঘুদের কোন স্থান নেই। অবিশ্বাস্য বলে মনে হলেও এটাই বাস্তব।

কেন তাদেরকে স্থান দেয়া হয়নি, আমি জানি না। হয়তো এদের যোগ্যতা কম ছিল! যোগ্যতার প্রশ্ন উঠলে পাকিস্তানের কথা মনে পড়ে যায় আমার। পাকিস্তানিরা ভাবতো, বাঙ্গালিদের ভালো পদে যাওয়ার যোগ্যতা নেই। এখন বাঙালি সংখ্যাগুরু লোকেরা সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে একই রকম কথা চিন্তা করেন। তাদের নাকি যোগ্যতা কম! বাংলাদেশ দিনে দিনে বাংলাস্থান হয়ে যাচ্ছে, বাঙালি মুসলমানদের মনন দিনে দিনে পাকিস্তানি হয়ে যাচ্ছে, এসব কি তারই লক্ষণ নয়?

কিংবা সংখ্যালঘুদের প্রতি সংখ্যাগুরুদের আস্থা নেই, এমনও হতে পারে। এবং এটিই বোধহয় যুক্তিযুক্ত। হয়তো ধারনা করা হয়, তাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হলে তারা ভারতের দালাল হয়ে যাবেন। একজন মানুষের ক্ষেত্রে এর চেয়ে অপমানের ও দুঃখের ব্যপার আর কী হতে পারে? কিংবা মোল্লাশ্রেণীর চেঁচামেচির ভয়েও এধরনের বৈষম্য করা হয়ে থাকতে পারে। কে জানে!

গতকাল ছিল মাতৃভাষা দিবস। আমরা যে অল্প কয়েকটি বিষয় নিয়ে গর্ব করতে পারি, এটি তার মধ্যে অন্যতম। অথচ এদিনও খাগড়াছড়িতে সংখ্যালঘু পাহাড়ীদের উপর হামলা হয়েছে, পঞ্চগড়ে মঠের অধ্যক্ষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আদিবাসী পাহাড়ীদের উপর বাঙ্গালিদের আক্রমণের ব্যপারে অনেকে ফেইসবুকে লিখেছেন। আমি নিজেও খোঁজ নিয়ে দেখেছি। অথচ, একটি অখ্যাত অনলাইন পত্রিকা ছাড়া অন্য কোন পত্রিকায় এটি আসেনি। আর যে পত্রিকায় খবরটি এসেছে, সেটিও বাঙ্গালীদের পক্ষেই লিখেছে।

কোন সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে তাকে চিহ্নিত করতে হয়, সমস্যাটিকে স্বীকার করে নিতে হয়। আমরা যদি নিজেদের শুধরে না নিয়ে শুধু ক্রমাগত একে অস্বীকার করে যাই, তাহলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে থাকবে। পাশাপাশি আমরা অপেক্ষাকৃত যোগ্য লোকদের সেবা থেকেও বঞ্চিত হবো। প্রিয় পাঠক, এই স্ট্যাটাসে আমি শুধু এটিই বলতে চেয়েছি।

(২২/০২/১৬ তারিখের স্ট্যাটাসের পুনঃপ্রকাশ)

Facebook Comments