পবিত্র পানির ইতিহাস

পৃথিবীর প্রায় সবগুলো প্যাগান ধর্মেই উপাসনা করা হয়েছে সূর্যকে, চাঁদকে, গাছপালা কিংবা প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে। প্রাকৃতিক শক্তিগুলো সম্পর্কে সেই সময়ে যেহেতু তাদের ধারণার অভাব ছিল, তাই তারা ভাবতো এই সব প্রাকৃতিক শক্তিগুলো এক একটি সত্ত্বা বিশেষ। যেই সত্ত্বাগুলো মানুষের মতই খায়, ঘুমায়, বিয়ে করে, বাচ্চাকাচ্চা হয়, রাগ করে, খুশি হয়, দুঃখ পায়, হিংসে করে, ইত্যাদি। এসব থেকেই মানবীয় অনুভূতির নানা দেবদাবী এবং ঈশ্বরদের সৃষ্টি। কিন্তু ধরে ধীরে মানুষ বুঝতে পারলো, এই প্রাকৃতিক শক্তিগুলো মানুষের মত নয়। মানুষ একটি জীব। জীব হিসেবে তার ক্ষুধা তৃষ্ণা পায়, রাগ দুঃখ হয়, বংশ বিস্তারের উদ্দেশ্যে তাদের মধ্যে ভালবাসা জন্মায়, ইত্যাদি। এগুলো প্রতিটি কাজই জীবের বৈশিষ্ট্য। একটি চেয়ার কিংবা টেবিল প্রেম ভালবাসা বুঝবে না। কারণ চেয়ার টেবিলের জৈবিক মস্তিষ্ক এবং নানা ধরণের হরমোন নেই। ঈশ্বর বা দেবদেবীও তেমনি রক্তমাংসের মানুষ না হওয়ায় তাদের ভালবাসা, প্রেম, হিংসা, রাগ, দুঃখ, সন্তুষ্টির মত মানবীয় অনুভূতি থাকার কথা না। তাদের উপাসনা বা তোষামোদ চাইবার কথা না।

প্রাচীনকালে এটাও ভাবা হতো, মৃত মানুষেরা আমাদের চারপাশেই আছে আত্মা হয়ে। কিন্তু আত্মাদের কথা বলতে, চিন্তা করতে, দেখতে অবশ্যই জৈবিক মুখ, মগজ এবং চোখের দরকার। পুরনো স্মৃতি জমা রাখার জন্য রক্তসঞ্চালন ও একটি মস্তিষ্ক, সেই মস্তিষ্ককে রক্তও সাপ্লাই দেয়ার মত একটি হৃদপিণ্ড অবশ্যই প্রয়োজন। সেগুলো যদি আত্মাদের না থাকে, তাহলে সেটা হবে চলন ক্ষমতাহীন, দেখা শোনা চিন্তা করা এসব যেকোন ক্ষমতাহীন। পরবর্তীতে নানা পরীক্ষায় দেখা গেছে, আত্মার ধারণাটি আসলে আদৌ সত্যি কিছু নয়। সেটা কোন সত্ত্বা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। এসবই পুরনো ধারণা।

এভাবে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ পানিকেও এক সময় একটি সত্ত্বা বলে ভাবা হতো। নদীর তীরে বিভিন্ন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, কোন কুপের আশেপাশে গড়ে উঠেছিল বাজার কিংবা নগর। সেই কারণেই, বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রথায় পানির ভূমিকা রয়েছে। পানিকে পূজা করার এবং পানিকে পবিত্র জ্ঞান করার ধারণাও গড়ে উঠেছে সেই সব কারণেই।

সর্বপ্রথম সম্ভবত মিশরেই নীল নদের পানিকে পবিত্র পানি বলে বিবেচনা করা শুরু হয়। নীল নদের পানির পবিত্রতা বোঝাতে নানা গল্প উপকথা সৃষ্টি হতে থাকে। যার একটি হচ্ছে, নীল নদের পানি হচ্ছে আইসিস দেবীর অশ্রু। অসিরিসের দুঃখে আইসিস কাঁদছিলেন, সেই থেকেই এই পানি। মিশরের এই পবিত্র পানির ধারণা পরবর্তীতে খ্রিস্টানরা গ্রহণ করে নিজেদের মত করে গল্প তৈরি করে নেয়।

এরপরে ধরুন গঙ্গাজলের কথা। ভারতে বিখ্যাত গঙ্গা নদীতে গোছল করলে পাপ ঢুয়ে যাবে, প্রায়শ্চিত্য হবে ইত্যাদি নানা কাহিনী শুনতে পাওয়া যায়। দেবী গঙ্গাকে গুরুত্বপূর্ণ দেবী বলে হিন্দু মিথলজিতে গণ্য করা শুরু হয়, এবং সেই নদীকেও একটি আলাদা সত্ত্বা হিসেবে কল্পনা করা হতে থাকে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই গল্পগুলো সৃষ্টি হয়েছে পরবর্তীতে। গঙ্গার তীরে বসতি গড়ে ওঠা, সভ্যতা গড়ে ওঠার পরেই সেই সভ্যতার মানুষেরা এই গল্পগুলো বানিয়েছিল।

অর্থাৎ বুঝতে সমস্যা হয় না, সভ্যতা আগে গড়ে ওঠে, বসতি আগে গড়ে ওঠে, এরপরে সেই নদীর ওপর মাহাত্ম্য আরোপের জন্য তার পেছনের গল্পগুলো সৃষ্টি হয়। উপকথা তৈরি হয়। এই গল্পগুলোর কোনটারই কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

মক্কার আরবে কোরাইশরা যেই কুপের পাশে তাদের বসতি গড়ে তুলেছিল, তা ছিল জমজমের কুপ। অন্য গোত্রগুলো যেন সেই স্থানকে আক্রমণ না করে, প্রতিরক্ষার কৌশল হিসেবেই সৃষ্টি করা হয়েছিল জমজম কুপ সম্পর্ক নানা গল্প কাহিনী। আব্রাহামিক ধর্মগুলো সেই সময়েই মোটামুটি সম্মানিত ধর্ম ছিল। তাই আব্রাহাম, যে হয়তো কোনদিন মক্কাতে আসেই নি, তাকে মক্কায় নিয়ে এসে গল্প তৈরি করেছিল মক্কার অধিবাসীরাই। মুহাম্মদ সেখানে জন্মাবার কারণে ইসলাম ধর্মে জমজমের পানি হয়ে উঠেছে পবিত্র পানি। মুহাম্মদ ভারতে জন্মালে, গঙ্গার পানিই হয়তো আজকের মুসলমানদের পবিত্র পানি বলে বিবেচিত হতো। অথবা ইংল্যান্ডে জন্মালে টেমস নদী, জার্মানিতে জন্মালে আজকে রাইন নদীই হতো মুসলমানদের পবিত্র পানি। তখন আমরা এরকম গল্প শুনতাম, নবী ইব্রাহিম একবার বউ বাচ্চা নিয়ে জার্মানি ঘুরতে এসে রাইন নদীর জন্ম দিয়েছিল। বা ধরুন, আজকে বাঙলাদেশের ঢাকায় কোন আব্রাহামিক নবী জন্মালে বলা হবে, নবী ইব্রাহিম ঢাকায় এসে বুড়িগঙ্গা নদীর জন্মও দিয়েছিল। তখন বুড়িগঙ্গার পানিই বিবেচিত হতো পবিত্র পানি হিসেবে। বুড়িগঙ্গার নাম পাল্টে ইসমাইলের মাতার নামে হয়তো বুড়িহাজেরা নাম দেয়া হতো।

এবং তখনো অনেকেই এও দাবী করতো, বুড়িগঙ্গার ময়লা পানি খেয়েই তাদের সব অসুখ ভাল হয়ে গেছে! আল্লাহর লীলা বোঝা বড় দায়!

Facebook Comments
%d bloggers like this: