শিবলিঙ্গের কাহিনী- লিঙ্গ মানে কি লিঙ্গ নয়?-২য় পর্ব

১ম পর্বের পর…

মাতৃকা দেবী

সিন্ধু সভ্যতায় পশুপতি শিবের অস্তিত্বের বিষয়টি পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়নি সেটি হল, মহেঞ্জদাড়ো, হরপ্পা, চানহুদাড়ো, সিন্ধপ্রদেশ এবং বালুচিস্তান হতে প্রচুর ছোটো ছোটো নারী মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এই নারী মূর্তিগুলির মুকুট প্রায়ই পেখমের মতো ছড়ানো এবং দুদিকে এদের দুটি বাটির মতো অংশ রয়েছে। এই বাটির মতো অংশগুলিতে কালো পোড়া দাগ দেখা যায়। হুইলার অনুমান করেছেন, এগুলো প্রদীপ হিসাবে ব্যবহৃত হত আর নয়তো এগুলোতে ধূপ ধুনো পোড়ানো হত। এই মূর্তিগুলি ধর্মানুষ্ঠানের সাথে জড়িত বলে মনে করা হয়। আধুনিক কালের প্রতিমার গায়ে সিঁদুর মাখাবার মতো মূর্তিগুলোর গায়েও লাল রঙ মাখাবার প্রথা ছিল।আদিম সভ্যতাগুলিতে সিঁদুরকে উর্বরতার প্রতীক হিসাবে ধরা হত। তাই অনুমান করা হয় মূর্তিগুলি উর্বরতা বিষয়ক মাতৃকা মূর্তি।

নিচের ছবিটি লক্ষ্য করুন-


উত্তর দক্ষিণ বেলুচিস্তান হতে আবিষ্কৃত নারী মূর্তিগুলি পূর্ণাঙ্গ নয়। কোমরের নিচের দিকটা কাটা, মাটির ওপর বসালে মনে হবে যেন মাটি ফুড়ে উঠেছে। এ জাতীয় মূর্তি চানহুদাড়োতেও পাওয়া গিয়েছে। এই মূর্তির বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে স্টেন মন্তব্য করেছেন,

“ this strikingly confirms the view previously advanced that these figures represent a divinity of fertility,the mother goddess of many eastern cults.” [৩]


এই মূর্তিগুলোকে মাতৃকা দেবী বা বসুমাতা বলে অনুমান করা হয়েছে।

এছাড়াও, হরপ্পার ধ্বংসস্তুপ হতে একটি আশ্চর্য সীলমোহর পাওয়া গিয়েছে- ‘তার একপিঠে উত্তানপদ দেবীমূর্তি ,এই দেবীর গর্ভ থেকেই উদ্ভিদের উদ্ভব দেখানো হয়েছে।‘ [৩]
অন্যান্য সিলেও দেবীকে উদ্ভিদে ঘেরা দেখানো হয়েছে।

indus-lajjagauri
রমাপ্রসাদ চন্দ এই ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবী মাহাত্ম্যে স্বয়ং দেবী ঘোষণা করছেন-

শাকম্বরী দেবী

“অনন্তর বর্ষাকালে আত্মদেহ সম্ভূত প্রাণধারক শাকের সাহায্যে আমি সমগ্র জগতের পুষ্টি সরবরাহ করব; তখন আমি জগতে শাকম্ভরী নামে বিখ্যাত হব।“ [৩]
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “শাকম্ভরী নামের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত হল শাকাদি উদ্ভিদ দেবীর গর্ভ প্রসূত। অর্থাৎ দেবী এখানে বসুমাতা পৃথিবী।“ তাই তো ফসলের সময়েই দুর্গোৎসবের আয়োজন। দুর্গা আদিতে শস্য দেবী ছিলেন বলে তার অপর নাম অন্নদা বা অন্নপূর্ণা। [৩]
সুতরাং দুর্গা যে সিন্ধুর যুগের আরাধ্যা মাতৃকা বা বসুমাতা তা অনুমান করা যায়।প্রশ্ন উঠতে পারে, দুর্গা তো দশভুজা, মহিষ-মর্দিনী, কিন্তু সিন্ধুতে কেন তার এই রূপ দেখতে পাওয়া যায় না? উত্তরে বলা যায়, দুর্গার এই রূপটি অনেক অর্বাচীন। প্রচলিত উপাখ্যান অনুসারে,রাবণ বধের বর প্রার্থনায় রাম মহিষ-মর্দিনীর উপাসনা করেছিলেন। কিন্তু বাল্মীকির মূল রামায়ণে এই উপাখ্যানটি নেই। [৩]

শক্তি বিনে শিব কেমনে?

তন্ত্রের শাক্ত সাধকেরা বলেন,“শক্তি যুক্ত না থাকলে শিব শব স্বরূপ হন।“ তাহলে দেবীর আলোচনা ব্যতীত কি করে শিবের রহস্যের সমাধান হতে পারে? শিবের সাথে দেবী নানারূপে বিরাজিতা, কখনো দুর্গা, কখনো বা চণ্ডী, কালী, পার্বতী। শিবের সাথে নারীশক্তিও উপাসিত হয়ে থাকেন। স্যার জন মার্শাল মন্তব্য করেছেন,

“ আদিম মাতৃ উপাসনার বিকাশের এই পর্যায়টিতে দেবী নারী শক্তির প্রতীকে (শক্তি) এবং সৃষ্টির সনাতন তত্ত্বে (প্রকৃতি) পরিণত হয়েছেন, সনাতন পুরুষ তত্ত্বের সঙ্গে (পুরুষ) যুক্ত হয়ে তিনি বিশ্বের আদিকারণ মা জন্মদায়িনী ( ‘জগত মাতা’ বা জগদম্বা) রূপে পরিকল্পিত, তার চূড়ান্ত অভিব্যক্তি হল শিবসঙ্গিনী ‘মহাদেবী’র রূপ।

শঙ্করাচার্য তার সৌন্দর্য লাহিড়ী তে (শ্লোক নং ১) বলেন,

“শিব যখন শক্তির সাথে মিলিত হন, তিনি সৃষ্টিকার্যে সমর্থ হন, অন্যথায় তিনি নড়তেও সক্ষম হন না” [১]

অনন্দানুভূতিতে বলা আছে- গুহ্য (স্ত্রী জননাঙ্গ) হতে উদ্ভূত আনন্দের রূপ হল শক্তি আর শিব হল লিঙ্গ। এই দুইয়ের মিলনই হল মহাবিশ্বে প্রাপ্ত সুখের কারণ। [১]
মহীশূরে প্রাপ্ত একটি লেখে লিখিত আছে- শিব ও শক্তির মিলনের ফলেই জগতের সৃষ্টি হয়। [১]
পুরুষ আর নারী শক্তির যে এই মেলবন্ধন, পৃথিবীর নানা স্থানেই এরূপ পরিলক্ষিত হয়-

  • মিশরে ওসাইরাসের সাথে পূজিত হতেন আইসিস। এছাড়াও মিশরে সৃজন শক্তির অধিকারী Khem কে বলা হত পিতা এবং Maut কে বলা হত মাতা। Khem এর প্রভাব শুধু মানব প্রজননের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং উদ্ভিদ জগত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। উদ্ভিদ ও বৃক্ষ পরিবেষ্টিত তার অনেক মূর্তি পাওয়া যায়।
  • প্লুটার্ক বলেন, “মানুষের কাছে আকাশ হল পিতৃ স্বরূপ আর পৃথিবী হল মাতৃ স্বরূপা। আকাশ পিতা কারণ তিনি পৃথিবীতে বীজ বপন করেন, পৃথিবী তা গ্রহণ করে ফলপ্রদায়িনী হন, তাই তিনি মাতা।“
  • ভারজিল আকাশ ও পৃথিবীর বিবাহের কথা বলেন।
  • অ্যাসিরীয়দের প্রধান দেবতার নাম ছিল Bel. তিনি ছিলেন সৃজনকর্তা। তার স্ত্রীর নাম ছিল Mylitta। তিনি ছিলেন প্রকৃতির ফলদায়ক শক্তি। তিনি উর্বরতার রানী বলে অভিহিত হতেন।
  • তাদের আরেকজন দেবতার নাম ছিল Vul. তিনি লিঙ্গ প্রতীক যুক্ত ছিলেন।তার সাথে সংযুক্ত দেবীর নাম ছিল shala.
  • সেন্ট অগাস্টিন বলেন, Liber এ রাখা পুং জননাঙ্গকে পিতা এবং Liberia তে রাখা স্ত্রী জননাঙ্গ কে বলা হত মাতা।
  • আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের মিথ অনুসারে প্রথম পুরুষ ও দ্বিতীয় নারী আকাশ,পৃথিবী,মানুষ এবং সব কিছুরই সৃষ্টি করেছিল।
  • নিউজিল্যান্ড এর মিথ অনুসারে, তাদের দুজন আদি পূর্ব পুরুষ ছিল। একজন পিতা ও অপরজন মাতা। তাদের একজন আকাশ এবং অপরজন পৃথিবী। তাদের নাম Rangi এবং Papa। যে পৃথিবী থেকে সব কিছু জন্মায় তিনি হলেন মাতা আর রক্ষাকারী ও শাসনকারী আকাশ হলেন পিতা।

সুতরাং দেখা যায় সভ্যতার শৈশব থেকেই মানুষ স্ত্রী ও পুরুষ শক্তির আরাধনা করে চলেছে।

জাদুর কথা

হঠাৎ করে আবার ‘জাদুর কথা’ কেন? শিবলিঙ্গ বিষয়ক আলোচনায় ‘জাদু’ কিভাবে প্রাসঙ্গিক? জাদুর প্রাসঙ্গিকতা জানতে পড়তে থাকুন।
আমাদের আলোচ্য ‘জাদু’ আধুনিক কালের জাদুর মতো সুচতুর জাদুকরের হাতের চালাকি বা চোখ ধাঁধানো জটিল কোনো ক্রিয়া-কৌশল নয়। বরং এই জাদু হল আদিম মানুষদের এক অদ্ভুত বিশ্বাস যা প্রকৃতিকে বশে আনার চেষ্টা করে। প্রকৃতপক্ষে, এই পদ্ধতি প্রকৃতিকে বশে আনতে ব্যর্থ হলেও আদিম মানুষদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম ছিল। ই.বি. টাইলরের মতে জাদু হল – “একটি কাল্পনিক যোগসূত্রকে আসল বলে ভুল করা।“
সমাজবিজ্ঞানী স্যার জেমস ফ্রেজার আদিবাসীদের উপর গবেষণার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রভূত তথ্য সংগ্রহ করে  দেখিয়েছেন জাদু মূলত দুই প্রকার। ১/ হোমিওপ্যাথিক বা অনুকরণমূলক জাদু ও ২/ সংক্রামক জাদু।
প্রথম প্রকারের জাদুর ক্ষেত্রে প্রকৃতির কোনো বিশেষ ঘটনার নকল করে প্রকৃতিকে প্রভাবিত করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। যেমনঃ ক) শত্রুর ক্ষতিসাধনের জন্য কোনো পুতলকে শত্রু ভেবে তাতে সূচ দিয়ে আঘাত করা হয়, পুতুলটির হাত পা ছিড়ে ফেলা হয়।ফলস্বরূপ জাদুবিশ্বাস অনুযায়ী শত্রুটিও অনুরূপ আঘাতপ্রাপ্ত হয়। খ) বৃষ্টিপাত ঘটনোর জন্য জাপানের আইনো-রা (Ainos) মস্ত বড়ো একটি ছাঁকনিতে জল ঢেলে বৃষ্টি তৈরি করে । ইত্যাদি ইত্যাদি।
দ্বিতীয় প্রকার, সংক্রামক জাদু ‘একদা সংযুক্ত, সর্বদা সংযুক্ত’ এই নীতি অনুসরণ করে। উদাহরনস্বরূপ বলা যায় এই প্রকারের জাদুতে কোনো শত্রুর অনিষ্ট করার জন্য শত্রুর শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন নখ, চুল, দাঁত ইত্যাদিকে নষ্ট করে ফেলা হয় আর ভাবা হয় এর ফলে শত্রুর অনিষ্ট হবে।

উর্বরতা কেন্দ্রিক জাদু বিশ্বাস

পূর্বেই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে লিঙ্গ পূজা অথবা লিঙ্গকে পবিত্র ভাবার বিষয়টি বিষদে আলোচিত হয়েছে, কামাখ্যার যোনিপূজা এবং সিন্ধু হতে প্রাপ্ত লিঙ্গ-যোনি মূর্তিগুলো সম্বন্ধেও আমরা জেনেছি এবং শিবলিঙ্গ যে পুং জননাঙ্গ এই বিষয়টিও বিষদে আলোচিত হয়েছে। আমরা জেনেছি পৃথিবী ব্যাপী আদিম মানুষেরা কিভাবে তাদের কল্পনায় প্রকৃতিকে মানবের সত্ত্বা প্রদান করতো। প্রকৃতির সৃজন শক্তিকে তারা নর নারীর মধ্য দিয়ে দেখতো।শিবলিঙ্গ যে যোনির সাথে যুক্ত অবস্থায় পূজিত হয় এই বিষয়টি লক্ষণীয়।হিন্দুদের মতে শিব ও শক্তি মিলিত হয়ে সৃষ্টি কার্যে প্রবৃত্ত হন ,শিবলিঙ্গের মধ্যেও শিব ও শক্তি অবস্থান করেন। আদিতে যে দুর্গা অন্নদা বা অন্নপূর্ণা ছিলেন,যিনি ছিলেন বসুমাতা বা মাতৃকা দেবী, যিনি উর্বরতার দেবী ছিলেন, কালের বিবর্তনে একসময় শিবের সাথে যুক্ত হয়ে তিনিই হয়ে দাঁড়িয়েছেন মহাবিশ্বের সৃজনকারিনী।

এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আদিম মানুষদের জমিকে উর্বর করার জন্য শস্যক্ষেত্রে যৌনক্রিয়া সম্পাদন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যাক। স্যার জেমস ফ্রেজার তার Golden Bough গ্রন্থে এ বিষয়ে অনেক তথ্য সরবরাহ করেছেন-

  • মধ্য আমেরিকার পিপিলিরা ক্ষেতে বীজ বপন করার আগের রাতে তাদের স্ত্রীদের সাথে মিলনে প্রবৃত্ত হত। এমনকি বীজ বপন করার মুহূর্তে যৌন মিলনের জন্য লোক নিয়োগ করা হত।
  • জাভার কোনো কোনো জায়গায় ফসলের বৃদ্ধি কে ত্বরান্বিত করার জন্য স্বামী স্ত্রী শস্যক্ষেত্রে গিয়ে যৌন মিলনে রত হত।
  • অস্ট্রেলিয়া এবং নিউগিনির মধ্যকার দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা সূর্যকে পুরুষ এবং পৃথিবীকে স্ত্রী বলে ভাবতো। সূর্য পৃথিবীকে উর্বর করে তুলতো। স্থানীয়দের বিশ্বাস ছিল, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পৃথিবীকে গর্ভবতী করার জন্য সূর্য নেমে আসেন। এইদিনে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের যৌন মিলনে প্রবৃত্ত হতে দেখা যায়। তারা মনে করতো, এর ফলে তারা বৃষ্টি, গবাদি পশু, খাদ্য, পানীয়, সন্তান সন্ততী প্রভৃতিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।
  • এমবয়নাতে পুরুষেরা রাতে উলঙ্গ হয়ে শস্য ক্ষেতে যেত। তাদের ধারণা তারা যেভাবে নারীকে যেভাবে গর্ভবতী করে তোলে, তেমনি জমিকেও তারা উর্বর করে তুলবে, যাতে সেখানে আরো বেশি ফসল জন্মায়।
  • মধ্য আফ্রিকার বাগান্ডারা ‘নর নারীর যৌনমিলনের সঙ্গে জমির উর্বরতার সম্পর্ক রয়েছে’ এই ধারণায় এতটাই বিশ্বাসী যে, তারা তাদের বন্ধ্যা স্ত্রীকে ফেরত পাঠিয়ে দেয় এইভেবে যে, সে তার স্বামীর বাগানের গাছগুলোর ফল উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটাবে। এর বিপরীতে বিশ্বাস করা হয়, যেসকল দম্পতি যমজ সন্তানের জন্ম দেবে তাদের বাগান ফলে ভরে উঠবে।
  • ইউক্রেনে St. George’s Day তে নববিবাহিত দম্পতিরা জমিতে গিয়ে গড়াগড়ি করতো ফসলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য।

মানুষের এমন আচরণের কারণ হিসেবে বলা হয়, এর মূলে রয়েছে এক ধরণের জাদু বিশ্বাস। নর নারীর সন্তান উৎপাদনের শক্তির সাথে প্রকৃতির উৎপাদিকা শক্তিকে এক করে ফেলা। ফ্রেজার বলছেন, এই ধরণের বিশ্বাস হচ্ছে হোমিওপ্যাথিক বা অনুকরণমূলক জাদু বিশ্বাস। নর নারী যেন নিজেকেই সমগ্র প্রকৃতি ভেবে সৃষ্টিকার্যে রত হত। এই বিশ্বাস হতেই জন্ম লাভ করেছিল জননাঙ্গের আরাধনা, মাতৃরূপী পৃথিবী দেবীর আরাধনা প্রভৃতি।

সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত লিঙ্গ ও যোনি মূর্তি প্রসঙ্গে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেন,

‘অন্যান্য নানা দেশের নানা ধর্ম-বিশ্বাসের মতোই আমাদের দেশের এই প্রাগৈতিহাসিক ধর্মবিশ্বাসটিও এক আদিম উর্বরতামূলক জাদু-বিশ্বাস থেকেই জন্মলাভ করেছিল। সেই আদিম পর্যায়ের মানুষ প্রাকৃতিক উৎপাদিকা-শক্তির বাস্তব রহস্য উদ্ঘাটন করতে শেখেনি, প্রকৃতির ফলপ্রসূতাকেও মানবীয় ফলপ্রসূতার অনুরূপ বলেই কল্পনা করেছিল এবং মানবীয় প্রজননের সান্নিধ্যে বা সাহায্যে প্রাকৃতিক উৎপাদিকা শক্তিকে উদ্বুদ্ধ ও সমৃদ্ধ করার আয়োজন করেছিল। অতএব আদিম মানুষদের মধ্যে প্রচলিত এই জাদুবিশ্বাসমূলক আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে মানবীয় জননাঙ্গ ও তার অনুকরণের বিবিধ প্রয়োগ চোখে পড়ে; প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসগুলি থেকে তার চিহ্ন বিলুপ্ত হয়নি– সিন্ধু যুগের ধর্মবিশ্বাস থেকেও নয়।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন)

সিন্ধুসভ্যতা ও বর্তমান হিন্দু ধর্মে বসুমাতা বা মাতৃকা দেবী বা ভগবতী দেবীর আরাধনার কারণ হিসাবে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেন,

“…পৃথিবী বা প্রকৃতির ফলপ্রসূতা বা কামনা থেকেই বসুমাতা বা আদ্যাশক্তি বা জগদম্বা পরিকল্পনার উদ্ভব অর্থাৎ এই বসুমাতা কল্পনার উৎসে আছে এক আদিম বিশ্বাস, সেই বিশ্বাস অনুসারে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতা ও মানবীয় ফলপ্রসূতা সমগোত্রীয়। তাই শস্যদায়িনী প্রকৃতিও সন্তানদায়িনী মাতার অনুরূপ- প্রকৃতিও মাতৃরূপে পরিকল্পিত। অতএব প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতাও মানবীয় প্রজননের সংস্পর্শ বা অনুকরণের সঙ্গে সংযুক্ত। নৃতত্ত্ব বিদদের পরিভাষায় এই আদিম বিশ্বাসের নাম ‘ফারটিলিটি ম্যাজিক’- উর্বরতা মূলক জাদুবিশ্বাস। “ [৩]

শিবলিঙ্গ পূজার কারণ হিসাবে ড. অমলেন্দু মিত্র বলেন,

“লিঙ্গ পূজা বা শিবপূজার আবির্ভাব ও বিবর্তন নিয়ে বহু পণ্ডিত বহুরকম আলোচনা করেছেন। সব আলোচনার সার থেকে (পৌরাণিক অতিকল্পনার ঢেউ এড়িয়ে) এটুকু বোঝা যায়, “ ফার্টিলিটি কাল্ট থেকে লিঙ্গ পূজার উৎপত্তি। কেবলমাত্র আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর বহু অনুন্নত সমাজে ( যে কালে মৃত্তিকা তত্ত্ব, আবহাওয়া তত্ত্ব সম্পর্কে মানুষ অজ্ঞ ছিল সে কালে) , অনুর্বরা ভূমিকে উর্বরা করবার উদ্দেশ্যে শস্যক্ষেত্রে যৌনক্রিয়া সম্পাদন একটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বলে গণ্য হত। নারীদেহের সন্তান ধারণের ক্ষমতার সঙ্গে জমির ফসল জন্মানোর ক্ষমতা এক করে মিলিয়ে দেবার মানসিকতা প্রবলভাবে কার্যকর ছিল। এটাও একটি জাদুবিশ্বাস ছাড়া আর কিছু নয়। ” (রাঢ়ের সংস্কৃতি ও ধর্ম ঠাকুর)

লিঙ্গপূজার কিভাবে সম্ভাব্য সূত্রপাত ঘটেছে, এ-বিষয়ে ড. অতুল সুর বলেছেন,

‘পরিষ্কার বুঝতে পারা যাচ্ছে যে ভারতের বিস্তৃত ভূখন্ডে প্রত্নোপলীয় যুগ থেকে নবোপলীয় ও পরে তাম্রাশ্ম যুগ পর্যন্ত সভ্যতার একটা ধারাবাহিকতা ছিল।
…অন্তিম প্রত্নোপলীয় যুগের মানুষ হয় নদীর ধারে, আর তা নয়তো পাহাড়ের ওপরে বা পাহাড়ের ছাউনির মধ্যে মাটির ঘর তৈরি করে বাস করত। এসব জায়গায় কোন কোন স্থানে আয়ুধ-নির্মাণের কারখানাও পাওয়া গিয়েছে। তা থেকে বুঝতে পারা যায় যে, সে-যুগের মানুষ সম্পূর্ণভাবে যাযাবরের জীবন যাপন করত না। তার মানে, এ যুগের মানুষ সমাজবদ্ধ হবার চেষ্টা করছিল। সেটা বুঝতে পারা যায় কয়েক জায়গায় পাহাড়ের গায়ে তাদের চিত্রাঙ্কন থেকে। এ চিত্রগুলি তারা খুব সম্ভবত ঐন্দ্রজালিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করত। অর্থাৎ তাদের মধ্যে ধর্মেরও উন্মেষ ঘটছিল।

এই স্থায়ী বসতিস্থাপনের প্রবণতা নবোপলীয় যুগেই বিশেষভাবে প্রকটিত হয়। তারা পশুপালন ও কৃষির উপযোগী স্থানেই বসতিস্থাপন করত। কৃষির উদ্ভব কিভাবে ঘটেছিল, সেটা এখানে বলতে চাই। ভূমিকর্ষণের সূচনা করেছিল মেয়েরা। পশুশিকারে বেরিয়ে পুরুষের যখন ফিরতে দেরি হত, তখন মেয়েরা ক্ষুধার তাড়নায় গাছের ফল এবং ফলাভাবে বন্য অবস্থায় উৎপন্ন খাদ্যশস্য খেয়ে প্রাণধারণ করত। তারপর তাদের ভাবনা-চিন্তায় স্থান পায় এক কল্পনা। সন্তান-উৎপাদনের প্রক্রিয়া তাদের জানাই ছিল। যেহেতু ভূমি বন্য অবস্থায় শস্য উৎপাদন করে, সেইহেতু তারা ভূমিকে মাতৃরূপে কল্পনা করে নেয়। যুক্তির আশ্রয় নিয়ে তারা ভাবতে থাকে, পুরুষ যদি নারীরূপ ভূমি (পরবর্তীকালে আমাদের সমস্ত ধর্মশাস্ত্রেই মেয়েদের ‘ক্ষেত্র’ বা ‘ভূমি’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে) কর্ষণ করে সন্তান উৎপাদন করতে পারে তবে মাতৃরূপ পৃথিবীকে কর্ষণ করে শস্য উৎপাদন করা যাবে না কেন? তখন তারা পুরুষের লিঙ্গস্বরূপ এক যষ্টি বানিয়ে নিয়ে ভূমি কর্ষণ করতে থাকে। (Przyluski তাঁর ‘Non-Aryan Loan in Indo-Aryan’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে ‘লিঙ্গ’, ‘লাঙ্গুল’ ও ‘লাঙ্গল’– এই তিনটি শব্দ একই ধাতুরূপ থেকে উৎপন্ন)। মেয়েরা এইভাবে ভূমি কর্ষণ করে শস্য উৎপাদন করল। পুরুষরা তা দেখে অবাক হল। তারা লক্ষ্য করল লিঙ্গরূপী যষ্টি হচ্ছে passive, আর ভূমিরূপী পৃথিবী ও তাদের মেয়েরা হচ্ছে active। Active মানেই হচ্ছে শক্তির আধার। ফসল তোলার পর যে প্রথম ‘নবান্ন’ উৎসব হল, সেই উৎসবেই জন্ম নিল লিঙ্গপূজা ও ভূমিরূপী পৃথিবীর পূজা।’- (ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়)

‘প্রৎসিলুসকি (Przyluski) দেখিয়েছেন যে ‘লিঙ্গ’ ও ‘লাঙ্গল’ শব্দদ্বয় অস্ট্রিক ভাষার অন্তর্ভুক্ত শব্দ, এবং ব্যুৎপত্তির দিক থেকে উভয় শব্দের অর্থ একই। তিনি বলেছেন যে পুরুষাঙ্গের সমার্থবোধক শব্দ হিসাবে ‘লিঙ্গ’ শব্দটি অস্ট্রো-এসিয়াটিক জগতের সর্বত্রই বিদ্যমান, কিন্তু প্রতীচ্যের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমূহে এর অভাব পরিলক্ষিত হয়। তিনি আরও বলেছেন যে সংস্কৃত ভাষায় যখন শব্দ দুটি প্রবিষ্ট হল, তখন একই ধাতুরূপ (‘লনগ্’) থেকে লাঙ্গুল ও লিঙ্গ শব্দ উদ্ভূত হয়েছিল। অনেক সূত্রগ্রন্থ ও মহাভারত-এ ‘লাঙ্গুল’ শব্দের মানে লিঙ্গ বা কোন প্রাণীর লেজ। যদি ‘লাঙ্গল = লাঙ্গুল’, এই সমীকরণ স্বীকৃত হয়, তা হলে এই তিনটি শব্দের (লাঙ্গল, লাঙ্গুল ও লিঙ্গ) অর্থ-বিবর্তন (semantic evolution) বোঝা কঠিন হবে না। কেননা, সৃষ্টি প্রকল্পে লিঙ্গের ব্যবহার ও শস্য-উৎপাদনে লাঙ্গল দ্বারা ভূমিকর্ষণের মধ্যে একটা স্বাভাবিক সাদৃশ্য আছে। অস্ট্রিকভাষাভাষী অনেক জাতির লোক ভূমিকর্ষণের জন্য লাঙ্গলের পরিবর্তে লিঙ্গ-সদৃশ খনন-যষ্টি ব্যবহার করে। এ সম্পর্কে অধ্যাপক হিউবার্ট ও. ময়েস বলেছেন যে মেলেনেসিয়া ও পলিনেসিয়ার অনেক জাতি কর্তৃক ব্যবহৃত খননযষ্টি লিঙ্গাকারেই নির্মিত হয়। মনে হয়, ভারতের আদিম অধিবাসীরাও নবোপলীয় যুগে বা তার কিছু পূর্বে এইরূপ যষ্টিই ব্যবহার করত, এবং পরে যখন তারা লাঙ্গল উদ্ভাবন করল, তখন তারা একই শব্দের ধাতুরূপ থেকে তার নামকরণ করল।’- (ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়)

শিব কি কেবল সংহার করেন?

অনেকেই আপত্তি করে প্রশ্ন তুলতে পারেন, শিব তো সংহার কর্তা,সুতরাং শিব ও শিবলিঙ্গের সাথে কি করে ফারটিলিটি কাল্ট যুক্ত হতে পারে? উর্বরতার দেবতারা তো সাধারণত সৃজন করে থাকেন? আগেই শিব ও শক্তির সৃজন ক্ষমতা আলোচিত হয়েছে খানিকটা। অক্ষয় কুমার দত্ত তার ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় গ্রন্থে বলেন,

“ সাধারণ মতে ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা, বিষ্ণু পালন কর্তা ও শিব সংহার কর্তা ; কিন্তু ঐ সকল দেবতার উপাসকেরা প্রত্যেকেই আপন আপন উপাস্য দেবতাকে সৃজন , পালন, সংহার এই ত্রিগুনেরই আশ্রয় বলিয়া অঙ্গীকার ও প্রচার করিয়াছেন। তদনুসারে শিব ও সৃজন কর্তা ও তদীয় লিঙ্গমূর্তি সৃজন শক্তির পরিচায়ক।
লিঙ্গ পুরাণে দুই প্রকার শিবের বিষয়ে লিখিত আছে; অলিঙ্গ ও লিঙ্গ। অলিঙ্গ শিব নিষ্ক্রিয় ও নির্গুণ স্বরূপ, আর লিঙ্গ শিব জগতের কারণ।
“স্থূল, সূক্ষ্ম, জন্মরহিত ও সর্ব ব্যাপী মহাভূত স্বরূপ লিঙ্গ শিব জগতের কারণ ও বিশ্বরূপ। তিনি অলিঙ্গ শিব হইতে উৎপন্ন হইয়াছেন। (লিঙ্গ পুরাণ/ ৩য় অধ্যায়)”
ঐ পুরাণের সপ্তদশ অধ্যায়ে আছে, মহাদেবের সৃজনশক্তিই লিঙ্গ”

নিয়মের ব্যতিক্রম

সত্যানুসন্ধানকারীদের সবসময় সততা বজায় রাখা উচিত। শিবলিঙ্গের যে একটি ভিন্ন দিকও রয়েছে, সেটি এড়িয়ে গেলে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করা হবে না। অনেক হিন্দু লেখকেরা শিবলিঙ্গের জননাঙ্গের দিকটিকে আড়াল করে, তার অন্যদিকটিই কেবল সামনে এনে থাকেন। আমিও যদি শিবলিঙ্গ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে, তাদেরই পথ অনুসরণ করে শিবলিঙ্গের জননাঙ্গ হওয়ার দিকটিই কেবল উল্লেখ করি, তবে তাদের সাথে তফাৎ কি রইলো! তাই শিবলিঙ্গের যে একটি ব্যতিক্রম দিকও রয়েছে সেটিও তুলে ধরছি-
অথর্ব বেদ থেকে এক স্কম্ভের কথা জানা যায়। স্কম্ভের প্রশংসায় বলা হয়েছে,

“ यस्य त्रयसि्ंत्रशद् देवा अग्डे. सर्वे समाहिताः । स्कम्भं तं ब्रूहि कतमः सि्वदेव सः ।। (Atharvaveda Kanda 10 Sukla 7 verse 13)

Meaning: Who out of many, tell me, is that Skambha. He in whose body are contained all three-and-thirty Deities? ”

এবং

“ स्कम्भो दाधार द्यावापृथिवी उभे इमे स्कम्भो दाधारोर्वन्तरिक्षम् । स्कम्भो दाधार प्रदिशः षडुर्वीः स्कम्भ इदं विश्वं भुवनमा विवेश ।। (Atharvaveda Kanda 10 Sukla 7 verse 35)

Meaning: God the Pillar of the support (Skambha) is holding both earth and the heaven and it is holding the vast atmosphere. Pillar of the support (Skambha) is holding 6 directions and Pillar of the support is pervading this entire universe “
এই স্কম্ভ থেকেই শিবলিঙ্গের কল্পনা বলে অনেকে দাবী করে থাকেন।

পুরাণগুলো থেকে শিবলিঙ্গের জননাঙ্গের স্বরূপ যেমন জানা যায়, তেমনি অনেক স্থানে জ্যোতির্ময়  শিবলিঙ্গের আবির্ভাবের কথা বলা হয়েছে।

স্কন্দ পুরাণের কাহিনী অনুসারে (প্রভাসখণ্ডন্তার্গত অর্বুদখণ্ড ৩৪/১২-১৩) , ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে তাদের মধ্যে যুদ্ধ চলছিল। এই সময় তাদের মাঝে আবির্ভূত হয় তেজোময় মহালিঙ্গ-

“সেই সময় আকাশবানী হল – তোমরা যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হও।এই মহেশ্বর লিঙ্গের শেষ যিনি দর্শন করবেন তিনিই হবেন শ্রেষ্ঠ। ব্রহ্মা ঊর্ধ্ব দিকে এবং বিষ্ণু অধোভাগে লিঙ্গের সীমা প্রত্যক্ষ করতে যাত্রা করলেন।কেউই অন্ত পেলেন না।রুদ্রের তেজে দগ্ধ হয়ে বিষ্ণু কৃষ্ণত্ব প্রাপ্ত হলেন। ব্রহ্মা লিঙ্গের অন্ত পাওয়ার মিথ্যা আড়ম্বর প্রকাশ করায় বিষ্ণু কর্তৃক শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান পেলেন কিন্তু মহাদেব কর্তৃক অভিশপ্ত হলেন।“ [৪]

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে (৬০/১৮-২৩) ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর বিবাদকালে অগ্নিময় লিঙ্গ প্রাদুর্ভূত হয়েছিল-

“জয়েচ্ছু ব্রহ্মা ও বিষ্ণু এইরূপ বলতে থাকলে উত্তর দিক ব্যপ্ত করে অবস্থিত অগ্নি দেখা গেল।সেই অগ্নি দেখে তারা বিস্মিত হলেন, সেই তেজে সকল জ্যোতি ম্লান হয়ে গেল। অত্যদ্ভূত সেই বহ্নি বর্ধিত হতে থাকলে ব্রহ্মা এবং আমি (বিষ্ণু) স্বত্বর সেই অগ্নির দিকে ধাবিত হয়েছিলাম। সেই অগ্নিমণ্ডল আকাশ এবং পৃথিবী ব্যপ্ত করে অবস্থিত। সেই অগ্নির মধ্যে দেখলাম, তীব্র জ্যোতিসম্পন্ন উজ্জ্বল প্রাদেশপ্রমাণ অব্যক্ত লিঙ্গ।“ [৪]

শিব পুরাণেও (জ্ঞানসংহিতা/২/৬২-৬৪) অনুরূপভাবে জ্যোতির্ময় লিঙ্গের আবির্ভাব হবার কথা বলা আছে।

শিব পুরাণের (বিদ্যেশ্বর সংহিতা,৪র্থ অধ্যায়) আর একটি কাহিনী অনুসারে, ব্রহ্মা ও বিষ্ণু একে অপরের প্রতি মাহেশ্বর অস্ত্র ও পাশুপাত ত্যাগ করলে ত্রিলোক রক্ষা করার জন্য মহাদেব ভয়ানক অগ্নিস্তম্ভরূপে আবির্ভূত হন আর তাতে অস্ত্রদ্বয় বিলীন হয়। [৪]
শিবলিঙ্গের আবির্ভাব বিষয়ে এই ধরণের নানা প্রকার কাহিনী রয়েছে। কিন্তু এগুলো শিবলিঙ্গের উৎপত্তি সম্বন্ধীয় না হয়ে বরং শিবলিঙ্গের মহিমাবাচক হওয়াই সম্ভব। কেননা, আগে শিবলিঙ্গের জননাঙ্গ হওয়া সম্বন্ধে যেসব পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ করেছিলাম, তার মধ্যেও অন্তহীন শিবের লিঙ্গের অন্ত খুঁজতে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর ধাবিত হওয়ার কাহিনী রয়েছে। সেই কাহিনী অনুসারে, সমস্ত জগত সেই লিঙ্গে লীন হয়ে গিয়েছিল। অন্তহীন শিবলিঙ্গের মাধ্যমে যে তার অপার মহিমা প্রকাশ করা হয়েছে সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই।

জলজ্যান্ত প্রমাণ

সবচেয়ে পুরোনো যে দুটি শিবলিঙ্গের (কেবলমাত্র জননাঙ্গের মতো দেখতে মূর্তি নয়, এগুলোকে শিবলিঙ্গ বলেই সবাই পূজা করে থাকে) ব্যাপারে আমরা জানতে পারি, সে দুটিই একেবারে জননাঙ্গের মতো দেখতে। এর মধ্যে দ্বিতীয় প্রাচীন শিবলিঙ্গ হল, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে নির্মিত গুডিমাল্লাম এর শিবলিঙ্গ। গুডিমাল্লাম হল একটি গ্রাম, যেটি মাদ্রাজের রেনিগুন্টা রেলওয়ে জাংশনের ছয় মাইল উত্তর পূর্বে অবস্থিত। এই শিবলিঙ্গটি আজো পূজিত হয়। [১]
নিচে গুডিমাল্লাম এর শিবলিঙ্গের ভিডিও-

খ্রিষ্ট পূর্ব প্রথম শতাব্দীতে নির্মিত প্রাচীনতম শিবলিঙ্গটি ভিত (Bhita) হতে পাওয়া গিয়েছিল। এটি ভিত লিঙ্গ (Bhita Linga) নামে পরিচিত এটিও ঠিক জননাঙ্গের মতোই দেখতে। বর্তমানে এটি লখ্নৌ এর জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। [১]

তৃতীয় প্রাচীণ শিবলিঙ্গটিও জননাঙ্গের মতোই দেখতে। এটি রয়েছে Central Travaneore এর chennittalai গ্রামের শিব মন্দিরে। [১]

এছাড়া ভারতের বিভিন্ন স্থানে পূজিত জননাঙ্গ সদৃশ শিবলিঙ্গের ছবিগুলো পরপর নিচে দেওয়া হল-


দক্ষিণ কানাড়া জেলার ইন্ডাবেট্টু গ্রামের অর্ধ নারীশ্বর মন্দিরে জননাঙ্গের মত দেখতে একটি ২০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দের  প্রাচীন শিব লিঙ্গ পাওয়া গিয়েছে। [source] নিচের ছবিটি দেখুন-

 

[image source]

laxman-jhula

[lakshman jhula, rishikesh] [source]

[kamrup kamakhya,Asam] [source]

শিবলিংগের ভিডিও-

 

এছাড়াও শিবের উত্থিত লিঙ্গ কিছু মূর্তি রইলো-

shiva1

IBK-239531 - © - Stefan Auth/imageBROKER

[gorakhnath temple,kathmandu,nepal]

[গোরখনাথ মন্দির, কাঠমাণ্ডু, নেপাল]

এটাও সত্য যে,  বর্তমানে শিবের যে সকল লিঙ্গ পূজিত হয় তার অধিকাংশের উপরিভাগ (লিঙ্গ মুণ্ড) উপরের শিবলিঙ্গগুলির অনুরূপ নয়। সম্ভবত লোকললজ্জার ভয়ে শিবলিঙ্গের এরূপ বিবর্তন হয়েছে। এছাড়া আমরা দেখেছি শিবলিঙ্গের জননাঙ্গের অনুষঙ্গ ছাড়াও অন্যান্য আধ্যাত্মিক দিকও রয়েছে। তবে এই আধ্যাত্মিকতা নিশ্চয় অত্যাধিক প্রাচীন নয়। এর জননাঙ্গের অনুষঙ্গটিই সুপ্রাচীন হতে বাধ্য, কেননা আমরা পৌরাণিক, বৈদিক ধর্ম হতে প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা থেকেই জননাঙ্গ ও উর্বরতার দেব দেবীদের আরাধনা দেখতে পাই। এর সাথে জড়িত উর্বরতা কেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসও সমগ্র পৃথিবীর আদিম সভ্যতাগুলোতেই পরিলক্ষিত হয়।

শেষের কথা

হিন্দুদের লিঙ্গ ও যোনির আরাধনার মধ্যে কি কিছু অশ্লীলতা আছে? হিন্দুরা লিঙ্গ ও যোনিকে অতি ভক্তি সহকারে পূজা করে,আসলেই তাদের অনেকে জানেই না যে, শিবলিঙ্গ শিবের জননাঙ্গ। আর যারা জানে, যারা সজ্ঞানে লিঙ্গ বা যোনির পূজা করে,তাদের মধ্যেও কোনো অশ্লীল মনোভাব বিরাজ করে না। তারা শিবলিঙ্গ ও ভগবতীর যোনিকে পরম পবিত্র  মনে করে।

সাঁওতালদের মধ্যেও একধরণের রীতি রয়েছে, বিশেষ অনুষ্ঠানে তারা দলবদ্ধভাবে যৌনাচারে লিপ্ত হয়। তান্ত্রিক সাধনা, বাউলদের দেহসাধনাতেও যৌনতার আরাধনা রয়েছে। অনেক প্রখ্যাত পণ্ডিতেরাও এসবকে অত্যন্ত অশ্লীল বলে বিবেচনা করেছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় বৌদ্ধদের গুহ্য আরাধনা সম্বন্ধে বলেছেন, “একজন ইউরোপীয় পণ্ডিত বলিয়াছেন , বৌদ্ধদের এইসকল পুঁথি ‘ঘোমটা দেওয়া কামশাস্ত্র’ আমি বলি তিনি ইহা ঠিক বর্ণনা করিতে পারেন নাই ।যেখানে কামশাস্ত্রের শেষ হয় সেইখানে বুদ্ধদিগের গুহ্যপূজা আরম্ভ।”[৫] ‘গুহ্যসমাজ’ বা ‘তথাগত গুহ্যক’ নামে বৌদ্ধদের একটি পুঁথি সম্বন্ধে রাজেন্দ্রলাল মিত্র বলেছেন, এই বড়ো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ইহারা যে সকল মত প্রকাশ করিয়াছেন এবং যে সকল ক্রিয়া কর্মের উপদেশ দিয়াছেন, যত জঘন্য স্বভাবেরই মানুষ হউক না কেন তাহা অপেক্ষা ভয়ানক ও ঘৃণিত মত বা ক্রিয়াকর্মের কল্পনাও করিতে পারে না। ইহার সহিত তুলনা করিলে গত শতকে হলিওয়েল স্ট্রিটে যে সকল পুঁথি পাঁজি বাহির হইত তাহা অতি পবিত্র বলিয়া মনে হয়। [৬] এই মানসিকতার বিরোধীতা করে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেন,  “প্রাচীনেরা কাম ও মিথুনকে যে চোখে দেখেছেন, এই ক্রিয়ার যে উদ্দেশ্য কল্পনা করেছেন, তার সঙ্গে আমাদের আজকালকার ধ্যানধারণার মিল হয় না। তার কারণ খুব সহজ: প্রাচীনেরা ছিলেন প্রাচীন, আধুনিক নন। তাই আধুনিক ধ্যানধারণাও তাদের মধ্যে থাকবার কথা নয়।“ [৭] আমাদের একটি কথা মনে রাখা দরকার- “… যৌনব্যবহার সম্বন্ধে আধুনিক কালের ধারণা দিয়ে প্রাচীন কালের ধারণাকে বোঝবার কোনো উপায় নেই…”[৭] এঙ্গেলস এর একটি মন্তব্য  এখানে অপ্রাসঙ্গিক নয়-

“All understanding of primitive conditions remains impossible so long as we regard them through brothel spectacles” –Engles

অর্থাৎ, গণিকালয়ের ঠুলি পরে আদিম অবস্থার তাৎপর্য বোঝা অসম্ভব। [৭]

লিঙ্গ পূজায় অশ্লীল মনোভাব না থাকলেও, আজকের যুগে এই আরাধনা নির্বুদ্ধিতা বলেই মনে হয় । আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগেও ঐতিহ্য, সংস্কৃতির নামে পৌত্তলিকা, উর্বরতা কেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস এসব বয়ে নিয়ে চলার কোনো মানেই হয় না। এছাড়াও হাজার হাজার লিটার দুধ ঢেলে কাল্পনিক শিবকে সন্তুষ্ট করার নামে যে অপচয় ঘটে চলেছে তা কখনোই কাম্য নয়।


তথ্যসূত্রঃ-
[১] (Elements Of Hindu Iconography- Part 2- vol 1)
[২] ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়- অক্ষয়কুমার দত্ত
[৩] ভারতীয় দর্শন- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

[৪] হিন্দুদের দেবদেবী বিবর্তন ও ক্রমবিকাশ- হংস নারায়ণ ভট্টাচার্য

[৫] বৌদ্ধ ধর্ম- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

[৬] “…but in working it out, theories are indulged in , and practices enjoined which are at once most revolting and horrible that human depravity could think of, and compared to which worst specimens of Holiwell Street literature of the last century would appear absolutely pure” -বৌদ্ধ ধর্ম- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

[৭] লোকায়ত দর্শন-দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

সহায়ক গ্রন্থসূচিঃ-

১/শিব পুরাণ
২/ লিঙ্গ পুরাণ
৩/বামন পুরাণ
৪/ স্কন্দ পুরাণ
৫/ ভাগবত পুরাণ
৬/ সিন্ধু সভ্যতার স্বরূপ ও সমস্যা- ড. অতুল সুর
৭/ লিঙ্গ পুরাণ- অনির্বাণ
৮/ horoppa.wordpress.com
৯/wikipedia.org
১০/ ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় – অতুল সুর
১১/ ভারতীয় দর্শন- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
১২/ রাঢ়ের সংস্কৃতি ও ধর্ম ঠাকুর – ড. অমলেন্দু মিত্র
১৩/ টোটেম ও ট্যাবু- সিগমুণ্ড ফ্রয়েড
১৪/ Golden Bough – Sir James Frazer
১৫/ উচ্চমাধ্যমিক নৃবিজ্ঞান/দ্বিতীয় পত্র/বিভাগ ঘ/ পরিচ্ছদ ২২ – ড. দীপক মুখোপাধ্যায়
১৬/ হিন্দুদের দেবদেবী-ড. হংস নারায়ণ ভট্টাচার্য
১৭/ Phallic Worship By Hooder M Westroop Originally a Paper Read Before The Anthropological Society of London On April 5th,1870- Later Published in 1875
১৮/ ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়- অক্ষয় কুমার দত্ত
১৯/ Elements of Hindu Iconography Vol 2- Part 1

২০/ কূর্ম পুরাণ

২১/ বৌদ্ধ ধর্ম- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

২২/ ঋগ্বেদ:অনুবাদক- রমেশচন্দ্র দত্ত

২৩/ লোকায়ত দর্শন- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

সম্পূর্ণ লেখাটির পিডিএফ ডাউনলোড করুন

Facebook Comments

Leave a Reply

  1. আমি নাস্তিক | আমার এই ব্যাপারে জানা ছিল না | আমাকে জানানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ |