নাস্তিকতার দর্শন

নাস্তিক্যবাদ (ইংরেজি ভাষায়: Atheism; অন্যান্য নাম: নিরীশ্বরবাদ, নাস্তিকতাবাদ) একটি দর্শনের নাম যাতে ঈশ্বর বা স্রষ্টার অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়না এবং সম্পূর্ণ ভৌত এবং প্রাকৃতিক উপায়ে প্রকৃতির ব্যাখ্যা দেয়া হয়। আস্তিক্যবাদ এর বর্জনকেই নাস্তিক্যবাদ বলা যায়। নাস্তিক্যবাদ বিশ্বাস নয় বরং অবিশ্বাস এবং যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বাসকে খণ্ডন নয় বরং বিশ্বাসের অনুপস্থিতিই এখানে মুখ্য। ইংরেজি ‘এইথিজম’(Atheism) শব্দের অর্থ হল নাস্তিক্য বা নিরীশ্বরবাদ। এইথিজম শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে গ্রিক ‘এথোস’ (ἄθεος) শব্দটি থেকে। শব্দটি সেই সকল মানুষকে নির্দেশ করে যারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই বলে মনে করে এবং প্রচলিত ধর্মগুলোর প্রতি অন্ধবিশ্বাস কে যুক্তি দ্বারা ভ্রান্ত বলে প্রমাণ করে। দিনদিন মুক্ত চিন্তা, সংশয়বাদী চিন্তাধারা এবং ধর্মসমূহের সমালোচনা বৃদ্ধির সাথে সাথে নাস্তিক্যবাদেরও প্রসার ঘটছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সর্বপ্রথম কিছু মানুষ নিজেদের নাস্তিক বলে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যার ২.৩% মানুষ নিজেদের নাস্তিক বলে পরিচয় দেয় এবং ১১.৯% মানুষ কোন ধর্মেই বিশ্বাস করে না। জাপানের ৬৪% থেকে ৬৫% নাস্তিক অথবা ধর্মে অবিশ্বাসী। রাশিয়াতে এই সংখ্যা প্রায় ৪৮% এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ ৬% (ইতালী) থেকে শুরু করে ৮৫% (সুইডেন) পর্যন্ত। পশ্চিমের দেশগুলোতে নাস্তিকদের সাধারণ ভাবে ধর্মহীন বা পরলৌকিক বিষয় সমূহে অবিশ্বাসী হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের মত যেসব ধর্মে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হয় না, সেসব ধর্মালম্বীদেরকেও নাস্তিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিছু নাস্তিক ব্যক্তিগত ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা, হিন্দু ধর্মের দর্শন, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ এবং প্রকৃতিবাদে বিশ্বাস করে। নাস্তিকরা কোন বিশেষ মতাদর্শের অনুসারী নয় এবং তারা সকলে বিশেষ কোন আচার অনুষ্ঠানও পালন করে না। অর্থাৎ ব্যক্তিগত ভাবে যে কেউ, যে কোন মতাদর্শে সমর্থক হতে পারে,নাস্তিকদের মিল শুধুমাত্র এক জায়গাতেই, আর তা হল ঈশ্বরের অস্তিত্ব কে অবিশ্বাস করা।

নিরীশ্বরবাদ (সংস্কৃত: निरीश्वरवाद, nir-īśvara-vāda, আক্ষরিক অর্থে “ঈশ্বরের অনস্তিত্ব সংক্রান্ত ধারণা”, “ঈশ্বরহীনতা সংক্রান্ত মতবাদ”) বা ঈশ্বর বা দেবতার অস্তিত্বে অবিশ্বাস হিন্দু দর্শনের একাধিক মূলধারার ও ব্যতিক্রমী ধারার শাখায় সুপ্রাচীন কাল থেকে স্বীকৃত হয়েছে। ভারতীয় দর্শনের তিনটি শাখা বেদের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করেছে। এই তিনটি শাখা হল জৈনধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও চার্বাক। এগুলিকেই ‘নাস্তিক’ দর্শন বলা হয়। নাস্তিক বা ব্যতিক্রমী ধারার দর্শনে যদিও ঈশ্বরে অবিশ্বাসের থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, বেদের কর্তৃত্ব অস্বীকার। তবে এই শাখাগুলি সৃষ্টিকর্তা দেবতার ধারণাটিকেও প্রত্যাখ্যান করেছে।

সাংখ্য ও যোগ দর্শনে চিরন্তন, স্বয়ম্ভু ও সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের ধারণাটিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। মীমাংসা দর্শনে বলা হয়েছে যে, বেদ কোনো একজন দেবতার দ্বারা রচিত হয়নি। কোনো কোনো শাখার মতে, আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে নাস্তিকের পথ অনুসরণ করা কষ্টকর। তবে নাস্তিক্যবাদ সেই শাখাগুলিতে স্বীকৃত মতবাদ।

বেদের প্রাচীনতম অংশ ঋগ্বেদে সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর ও ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সংশয়বাদ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে নাসদীয় সূক্তে বলা হয়েছে:

সত্যই কে জানেন?
কে এটি এখানে ঘোষণা করবেন?
কোথা হতে এটির উৎপত্তি? কোথা হতে এই সৃষ্টি?
ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পরে দেবতারা এসেছিলেন।
তবে কে জানেন যে কোথা হতে এটি উত্থিত হয়েছে?

বৃহদারণ্যকোপনিষদ্‌, ঈশোপনিষদ্‌, মুণ্ডকোপনিষদ্‌ (যাতে ব্রহ্মকে বলা হয়েছে সব কিছু ও ‘কিছুই না’) এবং বিশেষত ছান্দোগ্যোপনিষদ্‌ গ্রন্থগুলিকেও নিরীশ্বরবাদী বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কারণ, এই সকল গ্রন্থে ব্যক্তিগত আত্মার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

মীমাংসা দর্শন হল একটি বাস্তববাদী ও বহুত্ববাদী দার্শনিক শাখা। এই শাখায় বেদের ব্যাখ্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।[১৫] এই শাখার মূল গ্রন্থটি হল জৈমিনির পূর্ব মীমাংসা সূত্র (খ্রিস্টপূর্ব ২০০-২০০ খ্রিস্টাব্দ)। মীমাংসাবাদী দার্শনিকরা বিশ্বাস করতেন, বেদের প্রকাশ পবিত্র। বেদ ‘অপৌরুষেয়’ (মানুষের রচিত নয়) এবং অভ্রান্ত। তাঁদের মতে, ধর্ম (ব্রহ্মাণ্ডের ক্রমপর্যায়) রক্ষা করতে হলে বৈদিক ক্রিয়াকাণ্ডের পবিত্রতা রক্ষা করা একান্ত জরুরি। আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকাণ্ডের পবিত্রতায় বিশ্বাস রাখার ফলে মীমাংসা কোনো প্রকার সাকার ঈশ্বরের ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করে। প্রভাকর (খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দী) প্রমুখ পরবর্তীকালের মীমাংসা টীকাকারেরা ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছেন। প্রথম দিকের মীমাংসা ঈশ্বর ধারণাটি অনুমোদন করেনি। তবে বলেছে যে, মানুষের কাজই ঈশ্বর-বিশ্বাসের ফল উপভোগ করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট।

ভারতীয় দর্শনে সাংখ্য একটি নিরীশ্বরবাদী ও কঠোরভাবে দ্বৈতবাদী আস্তিক শাখা। ধ্রুপদী সাংখ্য দর্শনের যে প্রাচীনতম গ্রন্থটি পাওয়া গিয়েছে সেটি হল ঈশ্বরকৃষ্ণের লেখা সাংখ্যকারিকা (৩৫০-৪৫০ খ্রিস্টাব্দ)। ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব নিয়ে সাংখ্যকারিকা নীরব। যদিও গৌড়পাদ প্রমুখ প্রথম সহস্রাব্দের টীকাকারের মনে করেন, এই গ্রন্থটি ঈশ্বর সংক্রান্ত কয়েকটি ধারণার অনুকূল। যদিও সাংখ্যসূত্র (খ্রিস্টীয় ১৪শ শতাব্দী) ও তার টীকাকারেরা স্পষ্টভাবে যুক্তি দেখিয়ে ঈশ্বরের অনস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করেছেন।

চার্বাক হল ভারতীয় দর্শনের বস্তুবাদী ও নাস্তিক্যবাদী শাখা। খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ এই শাখাটি একটি পদ্ধতিগত দার্শনিক শাখা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। চার্বাকপন্থীরা পুনর্জন্ম, মৃত্যুপরবর্তী জীবন, দেহাতীত আত্মা, ক্রিয়াকাণ্ডের যথার্থতা, অন্যান্য জগত (স্বর্গ ও নরক), ভাগ্য এবং নির্দিষ্ট কর্মের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মূল্য বা মূল্যহীনতা অর্জনের মতো অধিবিদ্যামূলক ধারণাগুলি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁরা প্রাকৃতিক শক্তিগুলির উপর অতিলৌকিক কারণ আরোপেরও বিরুদ্ধে ছিলেন। ১২০০ খ্রিস্টাব্দের পর চার্বাক দর্শনের বিলুপ্তি ঘটে।

আজীবক আন্দোলনের প্রথম প্রবক্তা মক্খলি গোসাল ছিলেন বৌদ্ধধর্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌতম বুদ্ধ ও জৈনধর্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র মহাবীরের সমসাময়িক। গোসল ও তাঁর অনুগামীরা সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। খ্রিস্টীয় ১৩শ শতাব্দীর পর এই আন্দোলনের বিলুপ্তি ঘটে।

মীমাংসাবাদীরা বলতেন, জগতের সৃষ্টিকর্তা কে তা চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। বেদের লেখক বা সংকলকেরও প্রয়োজন নেই। অনুষ্ঠানগুলি অনুমোদন করার জন্য ঈশ্বরেরও প্রয়োজন নেই। তাঁরা আরও বলেছেন যে, বেদে যে সকল দেবতার নামের উল্লেখ আছে, শুধুমাত্র তাঁদের নামোল্লেখকারী মন্ত্রগুলির মধ্যেই তাঁদের অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ। তাঁদের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। সেই অর্থে, মন্ত্রগুলির শক্তিকেই দেবতার শক্তি হিসেবে দেখা হয়। মীমাংসাবাদীদের মতে, কোনো নিরাকার ঈশ্বর বেদের রচয়িতা নন। কারণ, কথা বলার জন্য তাঁর কণ্ঠই নেই। কোনো সাকার ঈশ্বর বেদ রচনা করতে পারেন না। কারণ, এমন ঈশ্বর ইন্দ্রিয়গত জ্ঞানের প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার আওতায় পড়েন। তাই তিনি বেদের মতো অতিলৌকিক প্রকাশিত বাক্য রচনায় অক্ষম।

চিরন্তন ও স্বয়ম্ভু সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সাংখ্য দর্শনের যুক্তি নিম্নরূপ:

  • যদি কর্মের অস্তিত্বকে মান্যতা দেওয়া হয়, তবে ব্রহ্মাণ্ডের নৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে ঈশ্বরের কল্পনা অপ্রয়োজনীয়। কারণ, যদি ঈশ্বর কর্মের ফলদাতা হন, তবে তিনি তা কর্ম ব্যতিরেকেই করতে পারেন। আবার যদিও তিনি কর্মের নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ থাকেন, তবে কর্মই নিজের ফলদাতা। সেক্ষেত্রে ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই।
  • যদি কর্মের অস্তিত্ব অস্বীকারও করা হয়, তাহলেও ঈশ্বরকে কর্মের ফলদাতা বলা যায় না। কারণ, ফলদাতা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে হয় আত্মকেন্দ্রিক নয় নিঃস্বার্থ। এখন ঈশ্বরের উদ্দেশ্য নিঃস্বার্থ হতে পারে না। কারণ, স্বার্থহীন হলে তিনি দুঃখময় জগত সৃষ্টি করতে পারেন না। যদি তাঁর উদ্দেশ্য আত্মকেন্দ্রিক হয়, তবে মনে করতে হবে ঈশ্বরের ইচ্ছা রয়েছে। কারণ, ইচ্ছা ব্যতিরেকে চালিকাশক্তি বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তাছাড়া যদি ধরা হয় ঈশ্বরের ইচ্ছা রয়েছে, তাহলে সেটি কর্মের দায়বদ্ধতার প্রয়োজনীয়তা থেকে ঈশ্বরের চিরন্তন স্বাধীনতার ধারণার পরিপন্থী। তাছাড়া সাংখ্যের মতে, ইচ্ছা হল প্রকৃতির গুণ। এটি ঈশ্বরের মধ্যে বিকশিত হচ্ছে, তা ধারণা করা যায় না। সাংখ্যের মতে, বেদের প্রমাণও এই ধারণাকে সমর্থন করে।
  • বিপরীত যুক্তি ছাড়াও যদি ধরে নেওয়া হয় যে, ঈশ্বরের কিছু অপূর্ণ ইচ্ছা রয়েছে, তবে তা তাঁকে অন্যান্য লৌকিক অভিজ্ঞতার মতোই দুঃখ দেবে। এই ধরনের পার্থিব ঈশ্বর সাংখ্যের উচ্চতর আত্মা ধারণার থেকে কিছুমাত্র উন্নত নন।
  • তাছাড়া ঈশ্বরের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই। তিনি দৃশ্যমান নন। এমন কোনো সাধারণ পদ্ধতি নেই, যার মাধ্যমে তাঁর অস্তিত্বের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। বেদের প্রমাণ থেকে জানা যায়, ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা হল প্রকৃতি, ঈশ্বর নন।

এই কারণে সাংখ্য দর্শন মনে করে, বিভিন্ন বিশ্বতত্ত্ব-সংক্রান্ত, তত্ত্ববিদ্যা-সংক্রান্ত ও পরমকারণমূলক যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না। শুধু তাই নয় সাধারণভাবে যে ঈশ্বরকে সর্বশক্তিমান, অন্তর্যামী, করুণাময় সৃষ্টিকর্তা মনে করা হয়, তাঁরও কোনো অস্তিত্ব নেই।

ভারতীয় নোবেল পুরস্কার-বিজয়ী অমর্ত্য সেন ক্যালিফোর্নিয়া ম্যাগাজিন-এর জন্য প্রণব বর্ধনকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে (ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কেলে কর্তৃক জুলাই-অগস্ট ২০০৬ সংস্করণে প্রকাশিত) বলেন:

কোনো কোনো ভাবে মানুষের ধারণা হয়েছে ভারতচ আধ্যাত্মিক ও ধর্মকেন্দ্রিক। এর ফলে ভারতের একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যার পথ খুলে গিয়েছে। যদিও সংস্কৃত ভাষায় এমন একটি বৃহৎ নাস্তিক্যবাদী সাহিত্যের সম্ভার রয়েছে, যা অন্য কোনো ধ্রুপদি ভাষায় নেই।

১৪শ শতাব্দীর উল্লেখযোগ্য দার্শনিক মাধব আচার্য সর্বদর্শনসংগ্রহ নামে একটি মহৎ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এই গ্রন্থে তিনি হিন্দু ধারণার মধ্যে সকল ধর্মীয় দার্শনিক মতের কথা আলোচনা করেন। প্রথম অধ্যায়টিই ‘নিরীশ্বরবাদ’ বিষয়ক – এখানে নিরীশ্বরবাদ ও বস্তুবাদের সপক্ষে জোরালো যুক্তি দেওয়া হয়েছে।

প্রেস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান তথা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজুর মতে, “…ছয়টি ধ্রুপদি ভারতীয় দর্শন রয়েছে – ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, পূর্ব মীমাংসা ও উত্তর মীমাংসা। এছাড়া তিনটি সাধারণ ধারা রয়েছে – বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম ও চার্বাক। এই নয়টি ধারার মধ্যে আটটিই নিরীশ্বরবাদী। এগুলিতে ঈশ্বরের কোনো স্থান নেই। একমাত্র নবম শাখা উত্তর মীমাংসা বা বেদান্তে ঈশ্বরের স্থান রয়েছে।”

 

অজ্ঞেয়বাদ (ইংরেজি: Agnosticism) একটি দর্শন, যা বিভিন্ন মৌলিক প্রশ্ন বা ধর্মীয় দাবি, যেমন – ঈশ্বর-এর অস্তিত্ব, ইত্যাদির সত্যতাকে মনে করে অজ্ঞাত ও অজ্ঞেয়, তথাপি জীবনযাপনের জন্য অগুরুত্বপূর্ণ। অজ্ঞেয়বাদ আস্তিকতাবাদ হতে তো বটেই, নাস্তিকতাবাদ হতেও ভিন্ন, কেননা নাস্তিকতাবাদ সরাসরি ঈশ্বরের অস্তিত্বহীনতা দাবী করে, যেখানে অজ্ঞেয়বাদ এই দাবীর প্রশ্নেও সমান সন্দিহান। দার্শনিক উইলিয়াম রোয়ের মতে, সাধারণ অর্থে, অজ্ঞেয়বাদ অর্থ ঈশ্বরে বিশ্বাস অথবা ঈশ্বরে অবিশ্বাস যেখানে নাস্তিকতাবাদ ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস করে। অজ্ঞেয়বাদে যারা বিশ্বাস করেন তাদের সাথে, যারা মৌলিক প্রশ্নের উত্তরকে অজ্ঞাত কিন্তু হয়তো অজ্ঞেয় নয় মনে করেন, তারাও নিজেদের অজ্ঞেয়বাদী দাবী করেন ও শেষের দর্শনটিকেও অজ্ঞেয়বাদেই আলোচনা করা হয়। সাধারণভাবে সকল অজ্ঞেয়বাদী ধর্ম সংক্রান্ত বিশ্বাসের ব্যাপারে সংশয়ী হন।

 

সংশয়বাদ (ইংরেজি ভাষায়: Skepticism) শব্দটি অনেক বৃহৎ পরিসরে ব্যবহৃত হয়। যেকোন কিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মনোভাবকেই সংশয়বাদ বলা যেতে পারে। সাধারণ্যে বহুল প্রচলিত কোনো ধারণাকে সন্দেহ করা অর্থে সংশয়বাদ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কোনো কিছুর নিদর্শন পেলে তাকে বিনা বাক্য ব্যায়ে মেনে না নিয়ে বরং সেই নিদর্শনটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করাই সংশয়বাদ। যারা সংশয়বাদের প্রতি আস্থা রাখেন বা সংশয়বাদ চর্চা করেন তাদেরকে সংশয়বাদী বলা হয়। চিরায়ত দর্শন থেকেই সংশয়বাদের ইংরেজি প্রতিশব্দ, স্কেপ্টিসিজম শব্দটি এসেছে। প্রাচীন গ্রিসে কিছু দার্শনিক ছিলেন যারা “কোনো কিছুকেই নিশ্চিত বলে ঘোষণা দিতেন না বরং সব কিছুতেই তাদের নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করতেন”। দার্শনিকদের এই ধারাটিকে তখন Skeptikoi বলা হতো। তাই Skeptikoi দার্শনিক ধারার দার্শনিকদের বৈশিষ্ট্যকেই স্কেপ্টিসিজম হিসেবে আখ্যায়িত করা হতে থাকে।

 

সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

Facebook Comments
%d bloggers like this: